উদ্ভিদবিদ্যা: প্লাস্টিকের গাছকে নকল করা লতা
এবার এমন এক গল্প, যা নিয়ে বিজ্ঞানীরা আজও রীতিমতো তর্ক করছেন। দক্ষিণ চিলি আর আর্জেন্টিনার নাতিশীতোষ্ণ রেইনফরেস্টে জন্মায় 'বোকিলা ত্রিফোলিওলাটা' নামের এক কাঠুরে লতা। উদ্ভিদবিদ্যার খাতায় এই গণের নাম উঠেছে সেই ১৮৩৯ সালে। স্থানীয় আদিবাসীরা বহুকাল ধরে এর আঁশ দিয়ে ঝুড়ি আর দড়ি বোনেন, আর এর রস ব্যবহার করেন চোখের ব্যথায়। কিন্তু গাছটির সবচেয়ে আশ্চর্য গুণটা বিজ্ঞানীদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল প্রায় পৌনে দুশো বছর।
দুই হাজারের দশকের গোড়ায় চিলির উদ্ভিদ-বাস্তুবিদ এর্নেস্তো জিয়ানোলি ও ফের্নান্দো কারাস্কো-উরা জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে একটা অদ্ভুত গাছের কাণ্ড দেখতে পান। কাছে গিয়ে খেয়াল হয়, ওটা গাছ নয় - ওটা একটা লতা, যে পাশের গাছটার পাতা এমন নিখুঁতভাবে নকল করেছে যে আকার, মাপ, এমনকি শিরার বিন্যাস পর্যন্ত মিলে যাচ্ছে!
পরে আরও ঘেঁটে দেখা গেল, ব্যাপারটা আরও অবিশ্বাস্য। এই লতা যে কোনও গাছকে নকল করতে পারে। আর সবচেয়ে অদ্ভুত, একটাই লতা যদি একাধিক গাছ বেয়ে ওঠে, তাহলে তার বিভিন্ন উচ্চতার পাতা বিভিন্ন গাছের পাতার মতো হয়ে যায়। একই দেহে একাধিক ছদ্মবেশ। এর ডাকনাম হয়ে গেল 'গিরগিটি লতা'। সাধারণত ছদ্মবেশী গাছেরা একটাই আশ্রয়দাতাকে নকল করে; এই লতা একসঙ্গে অনেককে করে। আর একটা তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হল, এই লতা তার আশ্রয়দাতা গাছকে পরজীবীর মতো শোষণ করে না, সে শুধু বেয়ে ওঠে, আর ছদ্মবেশ ধরে।
ছদ্মবেশ কেন? জিয়ানোলিদের ব্যাখ্যা ছিল আত্মরক্ষা। উপরে উঠে গেলে মাটির পোকামাকড়ের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া যায়, আর আশ্রয়দাতার পাতার সঙ্গে মিশে গেলে পাতা-খেকো শত্রুরাও তাকে আলাদা করে চিনতে পারে না। কিন্তু আসল প্রশ্নটা এখানেই! গাছটা 'বুঝছে' কী করে যে পাশে কেমন আকারের পাতা আছে? গাছের তো আর চোখ নেই! জিয়ানোলি আর কারাস্কো-উরা দুটো সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। এক, প্রতিবেশী গাছের ছাড়া উদ্বায়ী রাসায়নিক গন্ধ লতাটা কোনওভাবে টের পায় এবং সেই অনুযায়ী নিজের পাতার আকার বদলায়। দুই, বাতাসে ভেসে আসা ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীবের মাধ্যমে আশ্রয়দাতার জিনের কিছু অংশ লতার শরীরে ঢুকে পড়ে।
এই জায়গাতেই আসরে ঢোকেন এই গল্পের আমাদের দুই নায়ক তাঁদের এক চমকপ্রদ পরীক্ষা নিয়ে। ফেলিপে ইয়ামাশিতা কাজ করেন জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষ ও আণবিক উদ্ভিদবিদ্যা প্রতিষ্ঠানে। তাঁর সহলেখক জ্যাকব হোয়াইট আবার পেশাদার বিজ্ঞানীই নন! তিনি নিতান্ত শখে বাড়িতে গাছ লালনপালন করেন। তাঁদের যুক্তিটা ছিল সরল ও ধারালো। যদি লতাটা সত্যিই গন্ধ শুঁকে বা জিন ধার করে নকল করে, তাহলে এমন কিছুকে সে নকল করতে পারবে না যার গন্ধও নেই, জিনও নেই। অতএব একটা প্লাস্টিকের নকল গাছ বসিয়ে দিলে কেমন হয়?
পরীক্ষাটা তাঁরা সাজিয়েছিলেন যত্ন করে। জীবন্ত বোকিলা লতার পাশে বসানো হল প্লাস্টিকের নকল লতা। লতার কাণ্ডকে অস্বচ্ছ তাক দিয়ে উপর, মাঝ ও নিচ - এই তিন ভাগে ভাগ করা হল, আর প্লাস্টিকের পাতাগুলো রাখা হল মাঝের তাকে, শিকড় থেকে প্রায় আঠাশ সেন্টিমিটার উঁচুতে।
ফলাফল? লতাটা প্লাস্টিকের পাতা নকল করতে শুরু করল।
শুধু 'করল' বললে কম বলা হয় - গবেষকরা মেপে দেখিয়েছেন কতটা করল। নকলনবিশ পাতাগুলোর ক্ষেত্রফল, পরিধি, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সব বদলে গিয়েছিল; সেগুলো হয়ে উঠেছিল বেশি লম্বাটে, খাঁজহীন। চারটি জ্যামিতিক মাপকাঠিতে হিসেব করে দেখা গেল, নকল পাতার দৈর্ঘ্য-প্রস্থের অনুপাত বেশি, আর আয়তাকৃতি ও আকৃতি-সূচক কম। এমনকি পাতার শিরার নকশাও বদলে গিয়েছিল - শিরার জালটা কম ঘন, শিরা সরু, আর মুক্তপ্রান্ত শিরার সংখ্যা কম। এবং সবচেয়ে মজার তথ্য হল প্লাস্টিকের গাছটা কারখানার ত্রুটির কারণে নিখুঁত ছিল না, তার পাতাগুলো একেকটা একেকরকম, লতাটা সেই ত্রুটিগুলোরও পিছু নিয়েছিল!
এখানেই ধাক্কা খেল আগের ব্যাখ্যা। প্লাস্টিকের গাছের কোনও গন্ধ নেই, জিন নেই, ব্যাকটেরিয়া নেই। তাহলে খবরটা গেল কীভাবে? হোয়াইট আর ইয়ামাশিতা একটা সাহসী অনুমান করলেন যে গাছেরও হয়তো একরকম আদিম 'দৃষ্টি' আছে। পাতার উপরিভাগের কিছু কোষ হয়তো লেন্সের মতো কাজ করে, প্রতিফলিত আলো ধরে প্রতিবেশীর আকৃতির একটা আবছা ছাপ তৈরি করে। এই কল্পিত উদ্ভিদ-চক্ষুর নাম দেওয়া হল 'ওসেলাই'।
ধারণাটা কিন্তু একেবারে নতুন নয়, তবে সেটা জানা থাকলে তবেই ব্যাপারটা কম উদ্ভট শোনায়। একশো বছরেরও বেশি আগে গটলিব হাবারলান্ট আর চার্লস ডারউইনের পুত্র ফ্রান্সিস ডারউইন এমন কথা তুলেছিলেন যে উদ্ভিদের পাতার কোষ আলোকীয়ভাবে প্রতিবিম্ব তৈরি করতে পারে। ধারণাটা তখন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, একশো বছর ধরে প্রায় চাপা পড়ে ছিল।
তবে সততার খাতিরে বলতেই হবে যে মূলধারার উদ্ভিদবিদদের একটা বড় অংশ এই ব্যাখ্যায় আদৌ একমত নন। কেউ কেউ পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন, নমুনার সংখ্যা যথেষ্ট ছিল কি, নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট কড়া ছিল কি। কেউ বলেছেন, 'গাছ দেখতে পায়' - এই দাবিটা এতই অসাধারণ যে তার জন্য অসাধারণ প্রমাণ দরকার, আর সেই প্রমাণ এখনও মেলেনি। বিরুদ্ধ পক্ষের যুক্তিটা ন্যায্য, বিষয়টা এখনও একটা চমকপ্রদ কিন্তু অপ্রমাণিত ধারণা। কেউ কেউ পরবর্তী ধাপের পরীক্ষার পরামর্শও দিয়েছেন, কল্পিত 'ওসেলাই' কোষগুলো যদি সত্যিই থাকে, সেগুলো নষ্ট করে দিয়ে দেখা হোক নকল করা বন্ধ হয় কিনা!
২০২৪ সালে উদ্ভিদবিদ্যায় ইগ নোবেল পেল এই কাজটাই। এইখানেই ইগ নোবেলের চরিত্রটা সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়। এই পুরস্কার কিন্তু বলছে না যে গাছ দেখতে পায় বা বলছে না যে গবেষণাটা নির্ভুল। বরং এটা একটা প্রশ্নকে সামনে টেনে আনছে যে একটা লতা কীভাবে জানল যে পাশে প্লাস্টিকের পাতা ঝুলছে? উত্তরটা যা-ই হোক, প্রশ্নটা অসামান্য। একজন অপেশাদার গাছ-প্রেমিক আর একজন তরুণ গবেষক মিলে যে এমন একটা প্রশ্ন তুলে গোটা উদ্ভিদবিজ্ঞান মহলে হইচই ফেলে দিতে পারেন - বিজ্ঞানের দরজা যে সবসময় প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে খোলে না, এ তার আরেক প্রমাণ।
শারীরবিদ্যা: পায়ু দিয়ে শ্বাস নেওয়া যায় নাকি!
এটাই ইগ-নোবেলের শেষ বিভাগ। তাই শেষ বিভাগে এসে এমন একটা গল্প হয়ে যাক যে আপনি প্রচন্ড প্রচন্ড সিরিয়াস টাইপের মানুষ না হলে, হালকা হাসির ছোঁয়া আসবেই ঠোঁটের কোণে। ২০২৪ সালে শারীরবিদ্যায় ইগ নোবেল পেলেন একদল জাপানি ও মার্কিন গবেষক তাঁদের এই আবিষ্কারের জন্য যে বহু স্তন্যপায়ী প্রাণী আসলে মলদ্বার দিয়েও অক্সিজেন নিতে পারে!
ওকে, কেসটার দাবিটা বুঝে নিয়েছেন তো? তাহলে এবার গল্পের গোড়ায় যাওয়া যাক যেখানে আছে একটা মাছ। লোচ নামে একরকম তলার-দিকে-থাকা মাছ আছে, যারা কম-অক্সিজেনের ঘোলা জলে দিব্যি বেঁচে থাকে। কীভাবে? তারা মাঝেমধ্যে জলের উপরে উঠে এসে খানিকটা বাতাস গিলে নেয়, আর সেই বাতাসের অক্সিজেন তাদের অন্ত্রের দেয়াল দিয়ে সরাসরি রক্তে মিশে যায়। ফুলকা যতটুকু দিতে পারে না, অন্ত্র সেটুকু পুষিয়ে দেয়। এই 'অন্ত্র দিয়ে শ্বাস' ব্যাপারটা কেবল লোচেরই একচেটিয়া নয় - সমুদ্র-শশা আর কিছু কচ্ছপের ক্ষেত্রেও একই কৌশল দেখা যায়। প্রকৃতি এই সমাধানটা একাধিকবার আলাদা আলাদা করে বার করেছে।
এবার প্রেক্ষাপটে আসুন - ২০২০ সাল, কোভিড অতিমারি চলছে। পৃথিবীজুড়ে হাসপাতালে ভেন্টিলেটর আর কৃত্রিম ফুসফুসের ভয়াবহ আকাল, রোগীরা শ্বাসকষ্টে মারা যাচ্ছেন কেবল যন্ত্রের অভাবে। ঠিক এই সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে সিনসিনাটি চিলড্রেন্স হাসপাতাল আর জাপানের একদল গবেষক প্রশ্ন তুললেন, লোচ যা পারে, মানুষ কি তা পারবে?
দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তাকানোরি তাকেবে, আর ছিলেন প্রথম লেখক রিও ওকাবে। তাঁরা লক্ষ করলেন, অন্ত্রের নিচের অংশে রক্তনালীর জাল অত্যন্ত ঘন, আর সেখানকার দেয়াল যথেষ্ট পাতলা, অর্থাৎ গ্যাস আদানপ্রদানের পক্ষে জায়গাটা মন্দ নয়। দরকার শুধু এমন একটা মাধ্যম, যা প্রচুর পরিমাণ অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যেতে পারে।
সেই মাধ্যমটার নাম পারফ্লুরোকার্বন, সে এমন এক শ্রেণির তরল, যা বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন গুলে রাখতে পারে। এই পদার্থ নিয়ে কাজ করেছিলেন লেল্যান্ড ক্লার্ক নামের এক গবেষক, যিনি নিজেও এককালে সিনসিনাটিতেই ছিলেন। ষাটের দশকে তাঁর সেই বিখ্যাত পরীক্ষার ছবি অনেকেই দেখেছেন হয়ত, অক্সিজেন-ভরা তরলে ডুবিয়ে রাখা একটা ইঁদুর দিব্যি বেঁচে আছে, তরলের মধ্যেই 'শ্বাস' নিচ্ছে।
তাকেবের দল সেই তরলকে অক্সিজেনে ঠাসা করে ইঁদুর, ধেড়ে ইঁদুর আর শূকরের মলদ্বার দিয়ে ঢুকিয়ে দিলেন। ফলাফল সত্যিই চমকপ্রদ, অন্ত্রের দেয়াল সেই অক্সিজেন শুষে সরাসরি রক্তে পৌঁছে দিল, কৃত্রিমভাবে শ্বাসকষ্টে ফেলা প্রাণীগুলো বড় কোনও জটিলতা ছাড়াই বেঁচে গেল, চাঙ্গা হয়ে উঠল। পদ্ধতিটার নাম দেওয়া হল 'এন্টেরাল ভেন্টিলেশন', সংক্ষেপে ইভিএ। গবেষণাপত্রটি ২০২১ সালে ছাপা হয় 'মেড' পত্রিকায়, শুধু ছাপাই হয়নি, প্রচ্ছদেও জায়গা পায়। পরে কানাডার জনপ্রিয় বিজ্ঞান-অনুষ্ঠান 'দ্য নেচার অফ থিংস'-এও এই কাজ নিয়ে অনুষ্ঠান হয়। এবং তারপর, ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর, এমআইটি-র মঞ্চে ইগ নোবেল। পুরস্কার নিতে উঠে অধ্যাপক তাকেবে একটুও ভড়কে না গিয়ে যা বলেছিলেন, সেটাই সেই বছরের সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত বাক্য হয়ে দাঁড়ায় - তিনি সবার আগে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন পায়ুর সম্ভাবনায় বিশ্বাস রাখার জন্য!
এই গল্পের শেষ অধ্যায় এখনও লেখা হচ্ছে, আর সেটা কোন মজার ব্যাপার নয়। তাকেবে এই প্রযুক্তি এগিয়ে নিতে একটি কোম্পানি খুলেছেন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে মানুষের উপর প্রথম ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল। জাপানে সাতাশজন সুস্থ পুরুষ স্বেচ্ছাসেবক নানা পরিমাণে সেই তরল ষাট মিনিট ধরে ধরে রেখেছিলেন, কারও কারও ক্ষেত্রে পরিমাণটা দেড় লিটার পর্যন্ত গিয়েছিল। কুড়িজন পুরো ষাট মিনিটই ধরে রাখতে পেরেছিলেন। সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পেটফাঁপা আর অস্বস্তির কথা জানিয়েছিলেন অংশগ্রহণকারীরা, কিন্তু গুরুতর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি, তরলটা রক্তে মিশেও যায়নি।
গবেষকরা কিন্তু অতিরিক্ত কিছুই দাবি করছেন না। তাঁরা স্পষ্ট বলেছেন, এটাই মানুষের উপর প্রথম তথ্য, এবং এটা শুধু দেখাচ্ছে যে পদ্ধতিটা নিরাপদ। কার্যকর কিনা, সেটা এখনও দেখানো হয়নি। পরের ধাপ হবে অক্সিজেন-ভরা তরল দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা সত্যিই বাড়ে কিনা, বাড়লে কতটা তরলে আর কত সময়ে।
যদি এটা সফল হয়, তাহলে ছবিটা কেমন দাঁড়ায় একবার ভাবুন। দুর্ঘটনায় বা প্রদাহে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে গেছে, কিংবা সংক্রমণে ফুসফুস প্রায় অকেজো - এমন রোগীকে তুলনায় সহজ, কম-প্রযুক্তির একটা উপায়ে অক্সিজেন পৌঁছে দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা যাবে, যতক্ষণ না ভালো ব্যবস্থা করা যায়। প্রত্যন্ত হাসপাতালে, দুর্যোগের সময়, যুদ্ধক্ষেত্রে - যেখানে ভেন্টিলেটর নেই, সেখানেও।
এইখানেই ইগ-নোবেলের মূল সুর - ২০২৪ সালে যে বাক্যটা শুনে সেই দিনের পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে থাকা বারোশো মানুষ হেসে গড়িয়ে পড়েছিলেন, সেটাই হয়তো একদিন হাসপাতালের প্রোটোকলে লেখা থাকবে।
আরও যে কয়েকটা গল্প না বললেই নয়
তাহলে যেটা আগে বলছিলাম – ইগ নোবেলের প্রায় সব বিভাগ ঘুরে কয়েকটা আকর্ষণীয় গল্প তো বলার চেষ্টা করলাম। তার পরেও পরেও কয়েকটা গল্প থেকেই যায় যেগুলো না বললে নিজেরই আফসোস হবে। তাই ছোট করে আরো গোটা তিনেক গল্প বলে ফেলাই যাক -
বিয়ারের বোতলের প্রেমে পড়া গুবরে
এই গল্পটা আমার বেশ লাগে কারণ এতে প্রেমে পড়া, ভুল মানুষকে বেছে নেওয়া আর চকচকে মোড়কে ভুলে যাওয়ার একটা চিরন্তন ট্র্যাজেডি ঢুকে আছে। শুধু চরিত্রগুলো মানুষ নয়, পোকা – এই যা পার্থক্য!
অস্ট্রেলিয়ার শুষ্ক অঞ্চলে পাওয়া যায় 'রত্ন-গুবরে' বা জুয়েল বিটল যার বৈজ্ঞানিক নাম জুলোডিমরফা বেকওয়েলাই। প্রায় চার সেন্টিমিটার লম্বা, চকচকে সোনালি-বাদামি রঙের। এদের গোত্রে প্রায় পনেরো হাজার প্রজাতি আছে, আর তাদের গায়ের ঝিলিক দেখেই 'রত্ন' নামটা এসেছে। এদের সমাজে একটা বিশেষ ব্যবস্থা আছে যে স্ত্রী-পোকা আকারে বড়, কিন্তু উড়তে পারে না, মাটিতেই থাকে। পুরুষরা মাটি থেকে এক-দুই মিটার উপরে উড়ে উড়ে স্ত্রী-পোকা খোঁজে, খুঁজে পেলে নেমে আসে।
১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বরে দুই কীটতত্ত্ববিদ, কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যারিল গুইন আর অস্ট্রেলিয়ার সিএসআইআরও-র ডেভিড রেন্টজ, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ডোংগারা শহরের কাছে মাঠপর্যায়ের কাজ করছিলেন। রাস্তার ধারে তাঁরা যা দেখলেন, তা তাঁদের গোটা সফরের পরিকল্পনা বদলে দিল। একটা পুরুষ গুবরে উড়ে এসে নামল একটা বাদামি বিয়ারের বোতলের উপরে এবং সঙ্গমের চেষ্টা শুরু করল!
অস্ট্রেলিয়ায় এই বেঁটে, মোটা বিয়ারের বোতলকে আদর করে বলা হয় 'স্টাবি'। গবেষণাপত্রে গুইন আর রেন্টজ পরিস্থিতিটার বর্ণনা দিয়েছেন কীটতত্ত্বের নৈর্ব্যক্তিক ভাষায় - পুরুষটির জননাঙ্গ উদ্গত অবস্থায় ছিল এবং সে প্রবেশের চেষ্টা করছিল। বৈজ্ঞানিক গদ্যের এই ভদ্র নির্লিপ্তি মাঝে মাঝে যে কী পরিমাণ কৌতুক তৈরি করতে পারে, এটা তার আদর্শ উদাহরণ।
একটা হলে কাকতালীয় বলা যেত। তাঁরা আশপাশে খুঁজে আরও তিনটে স্টাবি পেলেন এবং তার দুটোতেই বসে আছে একেকটি পুরুষ গুবরে, একই কাজে নিমগ্ন। গোটা এলাকায় মাত্র একটা বোতল পাওয়া গেল যার কোনও প্রেমিক জোটেনি।
এবার তাঁরা ছোট্ট একটা পরীক্ষা করলেন। খোলা জায়গায় চারটে স্টাবি সাজিয়ে রাখলেন। ত্রিশ মিনিটের মধ্যে দুটো বোতল প্রেমিক জুটিয়ে ফেলল। সব মিলিয়ে ছটি পুরুষ গুবরেকে তাঁরা বোতলে চড়ে বসতে দেখলেন।
কারণটা কী? বোতলের রংটা ঠিক স্ত্রী-পোকার মতো বাদামি। সেটাই আসল কথা - বোতলের গোড়ার দিকে যে ছোট ছোট খাঁজকাটা দানা থাকে (যেগুলো আসলে বসানো হয়েছিল যাতে হাত থেকে বোতল পিছলে না যায়), সেগুলো আলো প্রতিফলিত করে ঠিক স্ত্রী-গুবরের ডানা-ঢাকনার মতো। ফলে পুরুষের চোখে বোতলটা স্ত্রী-পোকাই, শুধু অনেক, অনেক বড়। কীটতত্ত্বে এই ঘটনাটার নাম 'সুপারনর্মাল উদ্দীপক' - স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়াবাড়ি রকমের একটা সংকেত, যা আসলের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
গবেষকরা নিশ্চিত হওয়ার জন্য যাচাই করেছিলেন যে ব্যাপারটা মদের গন্ধের নয়, বোতলগুলোয় এক ফোঁটাও তরল অবশিষ্ট ছিল না। পুরুষরা বেছে বেছে শুধু স্টাবির প্রতিই আকৃষ্ট হচ্ছিল; বিয়ারের ক্যান বা সামান্য অন্য শেডের বাদামি ওয়াইনের বোতল তাদের টানছিল না।
এবার সেই বেদনার অংশটা। বোতলে একবার চড়ে বসার পর পোকাগুলো আর নামত না - গবেষকরা জোর করে সরিয়ে না দিলে নয়। তারা সেখানেই বসে থাকত, রোদে পুড়ে মরে যাওয়া পর্যন্ত। একটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বোতলের গায়ে বসে থাকা একটি পুরুষকে একদল পিঁপড়ে আক্রমণ করে তার উদ্গত জননাঙ্গের নরম অংশ কামড়ে খাচ্ছে। আর সেই একই বোতলের কয়েক সেন্টিমিটার দূরে পড়ে আছে আর একটি মৃত পুরুষ, পিঁপড়েয় ঢাকা।
গবেষণাপত্রের উপসংহারটা কিন্তু নিছক মজার নয়, রীতিমতো পরিবেশ-সচেতন। গুইন আর রেন্টজ লিখেছিলেন যে যেখানে-সেখানে ফেলে দেওয়া বিয়ারের বোতল শুধু পরিবেশে একটা প্রত্যক্ষ ও 'দৃশ্যগত' বিপদই নয়, একটা গোটা পোকা-প্রজাতির প্রজনন-ব্যবস্থাতেও মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। পেপারটা ছাপা হয় ১৯৮৩ সালে, অস্ট্রেলিয়ান এন্টোমোলজিক্যাল সোসাইটির পত্রিকায়। ইগ নোবেল আসে ২০১১ সালে, মানে আটাশ বছর পরে। গুইন সেই সময় হাসতে হাসতে বলেছিলেন, তিনি সম্মানিত বোধ করছেন, খানিকটা। গত কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁরা ফোনের পাশে বসে এই ডাকটারই অপেক্ষা করছিলেন - এত দেরি হল কেন?
শেষে একটা সতর্কবার্তা, কারণ ইন্টারনেটে এই গল্পের একটা সুন্দর লেজুড় খুব ঘোরে। বলা হয়, এই গবেষণার পরে অস্ট্রেলিয়ার বিয়ার কোম্পানিগুলো নাকি বোতলের নকশা বদলে ওই দানাগুলো তুলে দিয়েছে। গল্পটা এত পরিপাটি যে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু খোদ ইগ নোবেল আয়োজকরাই বলেছেন, এই দাবির পিছনে কতটা সত্যি আছে বা আদৌ আছে কিনা সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন। তাই আমিও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না। ইন্টারনেটের সব সুন্দর গল্প সত্যি হয় না, এটুকু মনে রাখাই ভালো।
ভরা মূত্রথলি আর ভালো সিদ্ধান্ত
দ্বিতীয় গল্পটা একেবারে দৈনন্দিন, এবং একটু বিব্রতকরও বটে। ২০১১ সালে চিকিৎসায় ইগ নোবেল পেলেন মিরিয়াম টুক, ডেব্রা ট্রাম্পে আর লুক ওয়ারলপ, তাঁদের গবেষণাপত্রের নাম 'ইনহিবিটরি স্পিলওভার', অর্থাৎ 'সংযমের উপচে পড়া'। ছাপা হয়েছিল সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স পত্রিকায়।
তত্ত্বটা বুঝতে হলে আগে জানতে হবে, মনোবিজ্ঞানে অনেকদিন ধরেই দেখা গেছে যে শারীরিক তাড়না আমাদের আত্মসংযম নষ্ট করে। খিদে পেলে আমরা হুটহাট কিনে ফেলি, ক্লান্ত থাকলে রেগে যাই। কিন্তু টুক আর তাঁর সহকর্মীরা একটা অন্যরকম প্রশ্ন তুললেন। প্রস্রাব চেপে রাখা তো নিছক তাড়না নয়, ওটা তাড়নাকে আটকে রাখার কাজ, অর্থাৎ সংযমের কাজ। তাহলে এই সংযমটা কি অন্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে?
তাঁরা চারটে আলাদা পরীক্ষা করলেন। প্রথমটায় দেখা গেল, প্রস্রাবের বেগ যত বেশি, মানুষ স্ট্রুপ পরীক্ষায় তত ভালো করছে। স্ট্রুপ পরীক্ষা জিনিসটা মজার, আগের একটা প্রবন্ধে লিখেছিলাম, আপনাকে দেখানো হয় 'নীল' শব্দটা, কিন্তু লাল কালিতে লেখা, আর আপনাকে বলতে হয় কালির রংটা, লেখাটা নয়। মাথা স্বাভাবিকভাবেই শব্দটা পড়ে ফেলতে চায়, আর সেই ইচ্ছেটাকে চেপে রাখতে হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয়, উন্নতিটা দেখা গিয়েছিল ঠিক সেই অংশেই যেখানে চেপে রাখার দরকার, শব্দের অর্থ পড়ার অংশে নয়।
পরের দুটো পরীক্ষায় তাঁরা গেলেন টাকাপয়সার সিদ্ধান্তে। অংশগ্রহণকারীদের বেছে নিতে বলা হল যে আজ অল্প কিছু টাকা নেবেন, নাকি অপেক্ষা করে পরে বেশি? দেখা গেল, মূত্রথলিতে চাপ যত বেশি, মানুষ তত বেশি অপেক্ষা করতে রাজি, তত বেশি বড় পুরস্কারের জন্য তাৎক্ষণিক লোভ সামলাতে সক্ষম। চতুর্থ পরীক্ষায় দেখা গেল, স্রেফ প্রস্রাব-সংক্রান্ত ইঙ্গিত সামনে থাকলেও কিছুটা একই প্রভাব পড়ে।
পরীক্ষার পদ্ধতিটাও বেশ চতুর। এই ধরনের গবেষণায় সাধারণত একদল অংশগ্রহণকারীকে পরপর পাঁচ গ্লাস জল খাইয়ে দেওয়া হয়, মোট প্রায় সাতশো মিলিলিটার, আর অন্য দলকে পাঁচটা গ্লাস থেকে সামান্য চুমুক দিতে বলা হয়, সব মিলিয়ে পঞ্চাশ মিলিলিটার। তারপর পঁয়তাল্লিশ মিনিট অপেক্ষা। ওইটুকু সময়ে প্রথম দলের অবস্থা ঠিক কী দাঁড়ায়, তা আন্দাজ করতে বিজ্ঞানের ডিগ্রি লাগে না!
তাঁদের ব্যাখ্যা ছিল যে মস্তিষ্কে সংযমের সংকেত সম্ভবত বিষয়-নির্দিষ্ট নয়। অর্থাৎ যখন আপনি একটা জিনিস চেপে রাখছেন, তখন সংযমের গোটা ব্যবস্থাটাই চাঙ্গা হয়ে থাকে, আর সেই বাড়তি সংযম অন্য, সম্পূর্ণ অসম্পর্কিত ক্ষেত্রেও উপচে পড়ে। মজার ব্যাপার, পরবর্তী গবেষণায় এই একই প্রভাব খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, ভরা মূত্রথলি নিয়ে মানুষ নাকি আরও ভালো মিথ্যেও বলতে পারে - কারণ মিথ্যে বলাটাও সত্যি চেপে রাখার একটা কসরত।
অতএব পরের বার কোনও জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এক গ্লাস জল খেয়ে নেওয়াটা হয়তো বুদ্ধিমানের কাজ মনে হচ্ছে :)
নাক ডাকা থামাতে ডিজেরিডু
শেষ গল্পটা আমাদের আবার শান্তি বিভাগে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এবং এবারের শান্তি একেবারে ঘরোয়া, শোবার ঘরের শান্তি। অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া বলে একটা রোগ আছে। ঘুমের মধ্যে গলার উপরের দিকের পেশি এতটাই ঢিলে হয়ে যায় যে শ্বাসনালী খানিকক্ষণের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। রোগী নাক ডাকেন, হঠাৎ শ্বাস আটকে যায়, তারপর ধড়ফড় করে আধা-জেগে উঠে আবার শ্বাস নেন - রাতভর এই চক্র চলে। ফলে সারাদিন ঝিমুনি, মনোযোগের অভাব, দুর্ঘটনার ঝুঁকি, আর দীর্ঘমেয়াদে হৃৎপিণ্ডের সমস্যা। চিকিৎসা বলতে আছে সিপ্যাপ যন্ত্র, মুখে মুখোশ পরে ঘুমোনো, যা অনেকেই সহ্য করতে পারেন না।
এবার আসুন ধারণাটায়। শ্বাসনালীর পেশি যদি ঢিলে হয়ে যাওয়াই সমস্যা হয়, তাহলে সেই পেশিগুলোকে ব্যায়াম করিয়ে শক্তপোক্ত করলে কেমন হয়? আর এমন কোন ব্যায়াম আছে যা মানুষ আনন্দ নিয়ে করবে?
উত্তরটা এসেছিল অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের হাজার বছরের পুরনো বাদ্যযন্ত্র ডিজেরিডু থেকে। এই লম্বা কাঠের নলটা বাজাতে গেলে একটা বিশেষ কৌশল লাগে, যার নাম 'বৃত্তাকার শ্বাস' - নাক দিয়ে শ্বাস নিতে নিতেই গালে জমানো বাতাস দিয়ে অবিরাম আওয়াজ চালিয়ে যেতে হয়। সঙ্গে থাকে ঠোঁটের কম্পন। এই গোটা প্রক্রিয়ায় মুখ, গলা আর উপরের শ্বাসনালীর পেশিগুলোর যে পরিমাণ কসরত হয়, তা যে কোনও ফিজিওথেরাপির চেয়ে কম নয়।
ধারণাটা যাচাই করতে সুইজারল্যান্ডে একটা রীতিমতো এলোপাথাড়ি-নিয়ন্ত্রিত ট্রায়াল হয়েছিল যা কিনা বিজ্ঞানের সবচেয়ে কড়া মানদণ্ড। মিলো পুহান আর তাঁর সহকর্মীরা পঁচিশজন রোগী বাছলেন, যাঁদের মাঝারি মাত্রার স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে এবং যাঁরা নাক ডাকার অভিযোগ করেন। গবেষণাটার 'কেন্দ্র' হিসেবে ছিল দুটো জায়গা - একটা ঘুম-চিকিৎসার কেন্দ্র, আর একজন ডিজেরিডু-শিক্ষকের ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণকক্ষ। একটি দল চার মাস ধরে ডিজেরিডুর পাঠ নিলেন আর বাড়িতে নিয়মিত অভ্যেস করলেন; অন্য দল অপেক্ষমাণ তালিকায় বসে রইলেন। অংশগ্রহণকারীরা সপ্তাহে প্রায় ছদিন করে অভ্যেস করেছিলেন, এবং নিজেদের অভ্যাসের হিসেব খাতায় লিখে রাখতেন।
ফলাফল স্পষ্ট - দিনের বেলার ঝিমুনির মাপকাঠিতে (এপওয়ার্থ স্কেল) ডিজেরিডু-দলের উন্নতি হল উল্লেখযোগ্য, আর ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে যাওয়ার হারও ঘণ্টায় প্রায় ছটি ঘটনা কমে গেল। অপেক্ষমাণ দলে এমন কোনও উন্নতি হয়নি। এবং রোগীদের সঙ্গীরাও জানালেন, তাঁদের ঘুমের ব্যাঘাত কমেছে।
গবেষণাপত্রটি ছাপা হয় ২০০৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে। ইগ নোবেল শান্তি পুরস্কার আসে ২০১৭ সালে। আর পুরস্কারটা যে 'শান্তি' বিভাগে দেওয়া হয়েছিল, সেটা নিছক রসিকতা নয়। যে দম্পতির একজন রোজ রাতে অন্যজনের নাক-ডাকার শব্দে জেগে ওঠেন, তাঁদের কাছে এই আবিষ্কার নেহাত মজার খবর নয় - রীতিমতো পারিবারিক সন্ধিচুক্তির সম্ভাবনা। যদিও ভোর পাঁচটায় পাশের ঘর থেকে ডিজেরিডুর গমগমে আওয়াজ ভেসে এলে সেই সন্ধি আবার কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে কোনও গবেষণা এখনও হয়নি বলেই জানি!
শেষ কথা
এতগুলো গল্প বলে ফেলার পর একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মাথায় আপনাদের আসতেই পারে - এইসব 'হাস্যকর' গবেষণা নিয়ে এত মাতামাতির দরকার কী? গবেষণার টাকা তো সীমিত, কাজের অভাব তো নেই; বিড়াল তরল কিনা তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কার আছে?
উত্তরটা ইগ নোবেলের সেই মন্ত্রেই লুকিয়ে - প্রথমে হাসাও, তারপর ভাবাও। আমরা বড় হয়েছি এই ধারণা নিয়ে যে বিজ্ঞান মানেই গম্ভীর মুখ, ধবধবে অ্যাপ্রন আর দুর্বোধ্য সমীকরণ। বিজ্ঞানের ছবিটা আমাদের মাথায় এমনভাবে আঁকা যে সেখানে হাসির কোনও জায়গা নেই। অথচ ইতিহাস বলছে উল্টো কথা। বহু বড় আবিষ্কারের গোড়ায় ছিল একটা নিতান্ত ছেলেমানুষি প্রশ্ন - 'আচ্ছা, এমনটা হয় কেন?' আব্রাহামস নিজেই বলেন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-চিকিৎসার গোটা ইতিহাসটাই আসলে এমন সব জিনিসের মিছিল, যা প্রথমে মানুষকে হাসিয়েছে, তারপর ভাবিয়েছে।
আর লক্ষ করুন, এই পুরস্কার কিন্তু রায় দেয় না। কমিটি বলে না কোনটা ভালো বিজ্ঞান আর কোনটা খারাপ। তারা বেছে নেয় সেই কাজগুলো, যেগুলো ঠিক ওই অস্বস্তিকর, প্রাথমিক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে - যেখানে এখনও বলা যায় না জিনিসটা ভালো, না খারাপ, না নিছক অকালপক্ব। বোকিলা লতা সত্যিই দেখতে পায় কিনা, আমরা জানি না। কিন্তু প্রশ্নটা তোলা হয়েছে, আর সেটাই যথেষ্ট। ২০২২ সালে ইগ নোবেল নিজেই একটা পুরস্কার পেয়ে যায় - বিজ্ঞানকে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার স্বীকৃতিতে। ব্যঙ্গের পুরস্কার শেষমেশ সম্মানের পুরস্কার হয়ে উঠল।
এই লেখার গল্পগুলোর দিকে আরেকবার তাকান। আন্দ্রে গাইম ভাসমান ব্যাঙ নিয়ে খেলা করতে করতে একদিন গ্রাফিন পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। কারাওকের বেসুরো গানের ভেতরে ইনোউয়ে খুঁজে পেয়েছিলেন মানুষে-মানুষে সহনশীলতা। ওয়াসাবির ঝাঁঝের আড়ালে ছিল কানে-না-শোনা মানুষের প্রাণ বাঁচানোর ভাবনা। পায়ু দিয়ে শ্বাসের রসিকতার নিচে চাপা ছিল অতিমারিতে ভেন্টিলেটরের অভাবে মরে যাওয়া মানুষগুলোর কথা। রোলার কোস্টারের হুল্লোড়ের মধ্যে লুকিয়ে ছিল অস্ত্রোপচার এড়ানোর একটা সহজ উপায়।
আর একটা জিনিস খেয়াল করেছেন কি? এই গল্পগুলোর বেশির ভাগই কোনও বিশাল ল্যাবরেটরি বা কোটি টাকার অনুদান থেকে আসেনি? উপকরণ বলতে ছিল একটা কফির কাপ, একটা বিড়াল, একটা বিয়ারের বোতল, একটা প্লাস্টিকের গাছ, একটা থিম পার্কের টিকিট, আর একগাদা কয়েন। আর মানুষগুলো? একজন স্কুলপড়ুয়া, একজন শখের গাছ-পালক, একজন স্বরলিপি-না-জানা ড্রামার, একজন পলাতক জাদুকর। ইগ নোবেল চুপিচুপি এই কথাটাও বলে যায় যে কৌতূহলের কোনও ন্যূনতম বাজেট নেই, আর প্রশ্ন করার অধিকার কোনও ডিগ্রির উপর নির্ভর করে না।
তবে আমার কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা অন্য জায়গায়। এই পুরস্কার আসলে আমাদের একটা অস্বস্তিকর সত্যির মুখোমুখি দাঁড় করায় - কোনটা গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা তুচ্ছ, তা আগেভাগে বলে দেওয়া ভয়ানক কঠিন। আজকের হাসির খোরাক কালকের পাঠ্যবই হয়ে উঠতেই পারে; আবার আজকের গম্ভীর গবেষণা কাল বিস্মৃতিতে হারিয়ে যেতে পারে। যিনি হাসছেন, তিনি হয়তো জানেনও না কীসের দিকে তাকিয়ে হাসছেন!
সেই কফি-উপচানো সকালে ফিরে দেখা যাক। এখন জানি, আমার হাতের ছ্যাঁকাটার পিছনেও একটা ভদ্রস্থ বিজ্ঞান ছিল, দুটো গবেষণাপত্র ছিল, দুটো আলাদা ইগ নোবেল ছিল, আর কোরিয়ার এক স্কুলপড়ুয়ার নিষ্ঠা ছিল। ভাবলে ভালো লাগে যে আমাদের রোজকার তুচ্ছ, বিরক্তিকর, হাস্যকর মুহূর্তগুলোও কারও না কারও কাছে একেকটা গবেষণার বিষয়। যে জিনিসটা আপনাকে বিরক্ত করছে, সেটা নিয়ে কেউ না কেউ কোথাও একটা কাগজ লিখছেন।
জীবনটাও বোধহয় তেমনই - যতক্ষণ হাসতে পারছি, ততক্ষণ হয়তো ভাবতেও পারছি। আর যেদিন হাসি আর ভাবনা দুটো একসঙ্গে এসে হাজির হয় - সেদিন বুঝবেন, আপনি ইগ নোবেলের মেজাজটা ধরে ফেলেছেন। আজ রাতে বাড়ির বিড়ালটাকে একবার সিঙ্কের দিকে যেতে দেখলে ঘড়িটা দেখে নেবেন। কে জানে, হয়তো আপনিই পরের বিজয়ী!
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।