
উৎসবের সঙ্গে তখনও আমার সামনাসামনি ডেট হয়নি, তবু আমি তাকে চিঠি লিখতাম—পুরো অ্যানালগ সিস্টেমে! কারণ, উৎসব এলেই তো আমার কাচের চুড়ি, ফিতে, রঙিন জামার লেস, নাটক, কবিতা, আর কেরোসিন তেলের ঝকঝকে হ্যারিকেন। আমাদের উৎসব পছন্দ করত একদম স্মাইলি-ওভারলোডেড হাসি হাসি মুখ, তাই উৎসবকে বড় ভালো লাগত। ... ...

কলকাতায় শীত কমে আসছে। এমন বেমক্কা দিনে পার্ক স্ট্রিটে বেলুন শুকিয়ে যায়। একটা এমন দোকানের কথা, রাস্তার কথা মনে পড়ে যেখানে মনে হয় আমরা কোনদিন একসাথে গেলে ভালো হত। যেমন, জীবনদীপের পাশে Fire and Ice Pizzeria ; যেমন, থিয়েটার রোড বা লিটল্ রাসেল স্ট্রিট। তোমার অফিস পাশেই তো ছিল। আমিও কতবার এ পথে হাঁটব ভেবেও এখনও হাঁটিনি। ওই দোকানে ঢুকতে গিয়েও একদিন আমার দরজার কাছে পা পিছলেছে। বুঝেছি, এখনও হয়নি সময়। অন্য কোনদিন যাওয়া যাবে। ... ...

বোধির শরীর যায় নৈরঞ্জনাঘাটে। মায়ার ভিতর শম্বুক না থাকলে নির্বাণ নেই। এ মায়াকে বিরহ ও শব্দ দেবে বলে বোধি প্রাসাদ ছেড়ে বাঁধে পাতার কুটির। অশম্বুক ছন্দ খুঁজে যন্ত্রণায় নীল হলে নীলকুমার পদপল্লব রেখে যান বোধির শিরে। ... ...

রুহুগাঁওয়ের ফটো তুলতে তুলতে ঘুরে বেরিয়েছি আদিবাসী বসতির আশেপাশে। আদিবাসীরা আমাকে দেখেছে, কথা বলেনি। মাঝে মাঝে জল চেয়েছি ওদের কাছে। প্রথম প্রথম শুধু গেলাস এগিয়ে দিচ্ছিল, কথা বলছিল না, এমনকি চোখাচোখিও না। তারপর ইন্সট্যান্ট ক্যামেরা দিয়ে কয়েকজনের ছবি প্রিন্ট করে দিলে ওদের কী আনন্দ! মেয়েরা বিশেষ করে। সাত-আট জনের পোলারয়েড ছবি প্রিন্ট করে দেওয়ার পর প্রধান বাইরে এসে ধমক দিলে সুরসুর করে ঢুকে গেল বাড়ির বাইরে। প্রধান রোদের মধ্যে বসে রইল বাড়ির দাওয়ায়, আমার থেকে দেওয়াল হয়ে। ... ...

যে গাড়িটা হুড়মুড় করে অন্ধের মতো আমায় চাপা দিল দিনদুপুরে আবার যেসব আচমকা মিসাইল এসে মহল্লার চালু থিয়েটারটাকে স্থিরচিত্র বানায়। ... ...

"কোনো অঙ্ক শেখাও নি তো, তোমার অঙ্ক বিনা তারা।" ভাগের অঙ্ক শেখেননি নজরুল। তাই তাঁর ভক্তি এতো শুদ্ধ। সুর এতো প্রাণবন্ত। জগতজুড়ানি শ্যামার কাছে এক মাতৃহারা,সন্তানহারা প্রাণ। মা ছেলেকে মারে ধরে, কিন্তু কাছছাড়া করে না। চিরমাতৃহারা সন্তান আশ্রয় খুঁজছে ছোট শিশুর সারল্য নিয়ে। শব্দ চয়নে কী বিস্তার। "জুড়ানো" শব্দটি একান্ত বাঙালি। তার থেকে ' জুড়ানি', একেবারে ' জগতজুড়ানি'। তাকে বিদেশী ভাষায় ব্যক্ত করা মুশকিল। ... ...

নজরুলের যেই আধুনিকতার মোকাম, বাঙালি রক্ষণশীল মুসলমানরা তাতে উঠতে পেরেছেন, তা বলা যাবে না। কিন্তু আধুনিকতাবাদীরাও তো নজরুলকে নিয়ে অস্বস্তিতে থাকেন। মানুষ কবিতাটিতে এমন অনেক লাইন আছে, যা তারা পাতে তুলতে রাজি নয়। ... ...

খেয়াল করি, নজরুলের কবিতা ও গানে দুর্গা আনন্দময়ী দেশমাতৃকা হয়ে যান। যুদ্ধ থেকে ফিরে ইংরেজ তাড়ানোর ইচ্ছে ওর মনে প্রবল। ওঁর আগুন ঝরানো সম্পাদকীয়ের চোটে একের পর এক পত্রিকা নিষিদ্ধ হচ্ছে। আর নামগুলো কী—লাঙল, ধূমকেতু, নবযুগ আরও অনেক। ... ...

হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন? – না-হিন্দু না-মুসলমান অথবা হিন্দুও মুসলমানও – যাঁর একমাত্র পরিচয় শুধু বাঙালিই – বাঙালি এবং কবি – সেই কাজি নজরুল ইসলাম সারা জীবন এই সম্প্রদায়গত বিভাগ মেনেই নিতে পারেননি। তবুও একদিকে পাকিস্তান তর্ক আর অন্যদিকে উনিশশো বিয়াল্লিশের সাত আর আটুই জুলাই কংগ্রেসের বোম্বাই অধিবেশনে গান্ধীর ভারত ছাড় প্রস্তাব গৃহীত হবার পর কলকাতায় দাঙ্গা লাগল পরের দিনই, নয়ই জুলাই। ... ...

বর্তমানের বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক সময়ের দিকে তাকালে নজরুলের এই অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর সুরের ভুবনও বিস্ময়কর। শাস্ত্রীয় রাগ, কীর্তন, লোকসংগীত, মার্শাল রিদম, ইসলামী সুরধ্বনি—সবকিছু মিশিয়ে তিনি এমন এক সংগীতভাষা তৈরি করেছিলেন, যার আগে বাংলা সঙ্গীত জগৎ পায়নি। তাঁর গানের মধ্যে যেমন ভৈরবীর ধ্যান আছে, তেমনই আছে সৈনিকের পদশব্দ। ... ...
প্রসঙ্গ আসছে কারণ কয়েকদিন পরেই শুরু হবে বিভিন্ন পাতায় আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে উপলক্ষ্য করে নানান উৎসব উদ্দীপনা, উদযাপনের বচ্ছরকার ঢেউ। অথচ যে দিবসের সূত্রপাত শ্রমজীবি নারীদের অধিকারের লড়াইয়ে, সেই দিনে উপরোক্ত রিপোর্ট বা সেইসব তথ্য অনুযায়ী যে সমস্যাগুলি উঠে আসছে তা নিয়ে আলোচনা যথেষ্ট পরিমাণ হচ্ছে কি? সাম্প্রতিক কালে যেমনটা দেখা যাচ্ছে তাতে আরো অন্য কিছু দিবসের মত এই দিনটারও বাণিজ্যিকীকরণের ষোলোকলা প্রায় পূর্ণ হয়েছে। গত শতাব্দীতে এই দিনটি পালন করা শুরু হয়েছিল শ্রমজীবি নারীদের দাবিদাওয়ার কথা মনে করে, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অধিকারের লড়াইয়ের অংশ হিসেবে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই দিবস পালনের সূচনা, তার কতটা কী আজ বিশ্বসমাজের মনে আছে বা মনে রাখার দরকার আছে তা যেন হাল আমলের জমকালো সেলিব্রেশন দেখলে বোঝার উপায় নেই। তাই এই শতবর্ষের এপারে, ইতিহাস স্মরণ করার জন্যে একটু পিছনে তাকানো যাক। ... ...

উৎসব সংখ্যা ১৪৩২ -র সমস্ত লেখার হদিশ পাবেন এই পাতায় ... ...

যদি মরার হয় তবে আর না ভুগে তাড়াতাড়ি মরুক। যতদিন ভর্তি থাকবে,ততদিন জলের মতো টাকা যাবে। এতো জমিদারের সম্পত্তি নয়,বাপের সম্পত্তিও নয়। কষ্টের রোজগারের টাকা।মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রঙের মিস্ত্রি পরের ঘর রঙ করে। সেই টাকা বৌয়ের পেছনে যদি জলের মতো বেরিয়ে যায়,তবে কার না গায়ে লাগে? বাচ্চা পড়ে আছে ঠাকুমার কাছে। জন্ম হয়ে দেখেওনি মাকে। মাও দেখেনি ছা'কে। একদিন ভিডিওকল না কী করেছিল ছেলে। ফোনে ঐ লিকপিকে মেয়ে ছাওয়াল দেখে স্যালাইনের নল লাগানো মা কেঁদে আকুল। আর বাচ্চা তো ঘুমিয়েই থাকল। সারাদিন ঘুমাচ্ছে আর সারারাত জাগছে। খিদে পেলে তারস্বরে কাঁদছে। কৌটোর দুধে যেন তার খিদে মেটে না। ... ...

পাপানের কলেজ ঠনঠনিয়ায় হলে কি হবে, ও কলকাতার প্রায় কিচ্ছুটি চেনে না। তবে ও নিজেকে সান্ত্বনা দেয় এই বলে, সবে ফার্স্ট ইয়ারে ঢুকেছে, ফাইনাল ইয়ারে উঠতে উঠতে নিশ্চই চিনে যাবে। এই কলেজ স্কোয়ারে ও এতবার এসেছে, এখানে যে এরকম একটা ভূতুড়ে বাড়ি দিব্যি ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে, ও থোড়াই খেয়াল করেছে এদ্দিন। দাদা যখন ত্রিপুরা হলের ঠিকানাটা লিখে দিল চিরকুটে, তখন কি আর পাপান জানত, সামনে এসে শুধু ঢোকার দরজা খুঁজে পেতে এত নাকাল হতে হবে! ... ...

কোথায় কারা যেন খুব হইচই করছে। ঘুমের মধ্যে অস্পষ্ট একটা জড়ানো গোলযোগ শুনতে পাচ্ছিল মিতা। মাথা মুখ চোখ জড়িয়ে থাকা ঘন কুয়াশার মত ঘুম ওকে পুরোপুরি জেগে উঠতে দিচ্ছিল না। বোজা চোখের পাতায় কমলাচে আভা, তার মানে সূর্য রতনদের ছাদ টপকে এসে গেছে মিতার জানলায়। কোথাও থালা বাসন পড়ে যাওয়ার ঝনঝন আওয়াজে ঘুমের ঘোরটা পুরোপুরি ছিঁড়ে যায় এবার। পিটপিটিয়ে চোখ খুলতে খুলতে মনে পড়ে আজ লক্ষ্মীপুজো। কোজাগরি পূর্নিমায় মা সারা বাড়ি জুড়ে আলপনা দিত। তখন অবশ্য ওদের একতলায় ছোট্ট দুটো ঘর আর সরু একফালি বারান্দা। মা তাও ছাদের দরজা থেকে গোটা সিঁড়ি জুড়ে লক্ষ্মীর পা আঁকত। লক্ষ্মী ঠাকরুণ নাকি ছাদ দিয়েই নামবে। এই নিয়ে ওরা ভাইবোনে কম হাসাহাসি করেছে। ভাগ হওয়ার আগে ওদের এজমালি বাড়িতে গোটা পাড়ার লোকের ভোগ খাবার নেমন্তন্ন থাকত। ... ...

ইয়ে... ওপরের নামটা আমি কি বলে যেন... হ্যাঁ, একটু ধার করেছি। আজকাল পালিশিত ভাষা পলিসিতে 'অনুপ্রাণিত' দিয়ে অবশ্য সুন্দর কাজ চালানো যায়। কিন্তু ওলে-লুকৈয়ে আজ রাত্রে আমায় এসে চেপে ধরলে স্বীকার করা ছাড়া গতি থাকবে না যে নামটা আমি চুরি.... মানে ঐ যে ইয়ে... হ্যাঁ ধার করেছি। হুঁ, ওলে-লুকৈয়ে, লোকটার নাম। যে চোখে ধূলো দেয়। দেখুন, এই অনুপ্রেরণা-ধার-চুরি গত ঝামেলা গুলোর জন্য আমি মোটেই দায়ী নই। এই সমস্তটার জন্য দায়ী একমাত্র হ্যান্স ক্রিশ্চান অ্যান্ডারসন। ঐ বুড়ো ওলে-লোকৈয়ে কে যখন উনিই আমার ঘাড়ে চাপিয়েছেন তখন এই নাম টুকু ওঁর থেকে ধার নেওয়াতে আমি কিচ্ছু খারাপ দেখিনা। ... ...

হিমাংশুবাবু অবিশ্যি লাইন-এর দৈর্ঘ্যে বিচলিত ন'ন। রিটায়ারমেন্টের পর তাঁর আর কীই বা কাজ! সকালে বাজারটুকু নিয়মিত করেন, খবরের কাগজটা পড়েন খুঁটিয়ে, আর ব্যাঙ্কে যান। বাজারের পর বেশিক্ষণ বাড়িতে না-থাকাই ভালো। স্ত্রী যখন বাজার তুলবেন তখন তার সমালোচনা হবেই। তার থেকে বাকবিতণ্ডা, এবং অশান্তি। কী দরকার! ব্যাঙ্কে যাওয়াই ভালো। ব্যাঙ্ক থেকে ফিরে স্নান-খাওয়া সেরে দুপুরে নিয়মিত ঘুম, বিকেলে চা-পান, এবং সন্ধ্যেবেলা লাইব্রেরি খোলার সঙ্গে সঙ্গেই আগের দিনের বইটা ফেরৎ দিয়ে আর একটা উপন্যাস নিয়ে আসা! ... ...
না না, ভুল বুঝবেন না। আমার ছেলের নাম অ্যাডলফ হিটলার নয়। আর আমি কোন নর্ডিক আর্য নই, নেহাৎ ছাপোষা বাঙালি। একেবারে কালোকোলো। আমাকে দেখলে কেউ জার্মান বলে ভুল করবে না। কিন্তু দ্রাবিড় জাতি, মানে মদ্র বা মালয়ালি, ভাবতে পারে। একবার ছত্তিশগড়ের সায়েন্স কলেজে এক মালয়ালি ভদ্রলোক নিজের মেয়েকে ভর্তি করাতে এসে চেনাজানা লোক খুঁজছিলেন। আমাকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এসে ঝড়ের মত কী কী সব বলে গেলেন। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম –গাল দিচ্ছেন নাকি? দু’একবার তাঁর সঙ্গের লবঙ্গলতার দিকে তাকিয়েছি বটে, কিন্তু সেটা এমনকি অপরাধ? মেয়েটা বরং লাজুক হেসে প্রতিদান দিয়েছে। নিরুপায় হয়ে ভাঙা ইংরেজিতে ‘এক্সকিউজ মী, এবং পার্ডন পার্ডন কয়েকবার আওড়ালাম। সত্যিই কিছু বুঝতে পারছিলাম না। শেষে ওঁর ভেতরের টিউবলাইট জ্বলে উঠল। চোখ বড় বড় করে বললেন- নট ফ্রম কেরালা? - নো স্যার। ফ্রম ক্যালকাটা। ... ...

সারা বর্ষা গ্রীষ্ম বসন্তে কেউ দেখতে পায়না লোকটাকে। শুধু এই শীতের সকালে একটু একটু করে সূর্যের রশ্মি যখন ছড়িয়ে পড়ে সারা পাড়ায়, দরমার বেড়ার একপাশে উইধরা খয়াটে বাতার দরজাটা ঠেলে আস্তে আস্তে সে বাইরে আসে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত নানা কাপড়ে ঢাকা শরীর। ছেঁড়া শার্টের ওপর ময়লা ধূসর পাঞ্জাবি, মাফলার দিয়ে মাথা ঢেকে তার ওপর একটা শাড়ি পাগড়ির মত করে প্যাঁচানো। যা কাপড় যেখানে পেয়েছে তাই চাপিয়ে, একটা রিলিফের কম্বল সারা গায়ে জড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাইরের ধারিটায় এসে রোদে বসে। পেছন পেছন ছোট ছেলেটা আসে একটা এলুমিনিয়ামের তোবড়ানো পিকদানী আর চটের আসন নিয়ে। থুতু রাস্তায় ফেলত আগে, সারাবেলার শ্লেষ্মা ধুলোয় মাখামাখি হয়ে ছোপ ছোপ পড়ে থাকত সামনের চলাফেরার রাস্তা জুড়ে। ... ...

আমার বাল্যবন্ধু দাশু হিমালয় বেড়াতে গেছে। সেখান থেকে, সেই পর্বতের চুড়ো থেকেই, আমাদের এই অনেক দূরের এবং নিচের উপদ্রুত উপত্যকায় ছবি পাঠাচ্ছে এমার্জেন্সি ডিস্প্যাচের মত। সেইরকম একটা ছবিতে মেঘের উপর যাদুকরি বেলাশেষের আলো। ওঠার রাস্তায় দাশু বলেছিল, পাহাড়ে উঠতে উঠতে মেঘের রাজ্যে ঢোকার সময় মাথায় নাকি ক্রমাগত ঘাই মেরেছে শক্তির সেই দুই লাইন, আর মনে হয়েছে মেঘ যে গাভীর মত চরে সেটা হয়তো ঐ নিরুত্তাপ, নির্বিকার আকাশের রূপক, মন্থরতার নয়। কে জানে? "দ্য অথর ইজ় ডেড।" আর আমার মনে হচ্ছিল যেন আর কিছু পড়েছি কোথায়। ... ...