

অলংকরণ: রমিত
৯
- কাজীদা!
বারান্দার ধাপি থেকে হাঁক দিয়ে উত্তরের অপেক্ষা না করেই গোবিন্দ ঘরে ঢুকে পড়েছে। 'আপনি রেডি তো?'
সূর্য আড়ালে যেতেই নজরুল পোশাক বদলে মোটামুটি রেডি হয়েই বসে ছিলেন। ধুতিকে জড়িয়ে পরা তাঁর অভ্যাস, সঙ্গে গেরুয়া পাঞ্জাবি। তার উপরে শালটা জড়াতে জড়াতে নজরুল বললেন, 'কীরে? তোর তো আসার কথা ছিল না? মঘা কই?'
- সে একটা মড়া নিয়ে নবদ্বীপ গিয়েছে। দুপুরের আগেই রওনা দিয়েছে, এতোক্ষণ ফিরে আসবারই কথা। তবু নবদ্বীপ শ্মশান বলে কথা --- কত সময় লাগবে কে জানে। মঘার কথায় ভরসা নেই --- এই ভেবে তারকদাকে বলে আমিই চলে এলাম।'
'ভরসা নেই মানে? মঘা কাউকে কথা দিয়ে কখনো কথার খেলাপ করে না!' দুজনকেই রীতিমতো চমকে দিয়ে নাটকীয় ভাবে ঘরের মধ্যে প্রমোদরঞ্জনের আবির্ভাব।
মঘার আগমনে গোবিন্দ অনেকটা স্বস্তি বোধ করলেও খানিকটা যেন অপ্রস্তুত।
- আরে তা নয়। কিন্তু নবদ্বীপের শ্মশান বলে কথা। ভিড় তো লেগেই থাকে। তাই বলছিলাম।
- সে ভিড় তো আজও ছিল। তার উপর বাগদি-মেথরের মড়া হলে তো কাঠ-কুটোও দিতে চায় না। কিন্তু সে যতই বামুন-ঠাকুর আর ভদ্দর লোকের মড়া হোক --- কেশনগরের সৎকার সমিতির উপর কথা বলার সাহস ডোমগুলোর আছে?
নজরুল হো হো করে হেসে উঠলেন -- 'শ্মশানে যে মঘার আলাদা খাতির সে তো সেদিন হেমন্তদার কথাতেই বুঝেছি! সে যাই হোক, এসে তো পড়েছিস। হেমন্তদা কুষ্টিয়া চলে গেলেন, এরপর মঘাও যদি না থাকে --- তাহলে আমার সংবর্ধনা তো অপূর্ণ থেকে যাবে!'
গোলাপট্টি থেকে ছুতোরপাড়া সামান্যই পথ। দুজনের মাঝখানে যেতে যেতে নজরুলের কৌতুহল --- 'শ্মশানে সৎকার নিয়ে এতো সমস্যার কথা আগে শুনিনি। তোদের সৎকার সমিতি হবার আগে তাহলে কী অবস্থা ছিল ভেবে পাচ্ছি না। তাছাড়া নবদ্বীপ তো অনেকটা দূর, যা শুনছি চার-পাঁচ ক্রোশের ব্যাপার?'
- কেশনগরে জাতপাতের গোঁড়ামি অতুলনীয় কাজীদা! মঘা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল।
'এখানকার বামুনদের যেমন অহংকার, তেমনই গোঁড়া। উঠতে বসতে ছোঁয়াছুঁয়ি, ছোটো জাত বড়ো জাত --- এই নিয়েই ব্যস্ত।'
'ওদের দাপটও কম নয় দাদা। দ্বিজেন্দ্রলালের মতো মানুষকেও ছাড়েনি, একঘরে করে রেখেছিল' কথার মাঝখানে গোবিন্দ মন্তব্য করে।
- 'এই গোঁড়াদের নিয়ে তবু পারা যায় দাদা, কিন্তু মুশকিল বেশি এই শিক্ষিত পাতি-বামুন গুলোকে নিয়ে। মুখে এরা খুব প্রগতিশীল, কিন্তু ভেতর ভেতর সব গোঁড়ামির হাড়। ছোটো জাতের মড়া হলে শ্মশানে যাবার কেউ নাই। এদের ভণ্ডামি দেখলে ইচ্ছে করে জিয়ালার কচা দিয়ে এদের আচ্ছা করে পেটাই!' মঘা বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ে, পারলে যেন এক্ষুনি ধরে পেটাতে শুরু করে।
'বেশ বলেছিস তো! গোঁড়া লেবু আর পাতি লেবু!' হাসতে হাসতে নজরুল মঘার পিঠে একটা চাপড় দিলেন। 'ভারি আশ্চর্য লাগেরে মঘা, খারাপও লাগে। কোথাকার বিদেশীরা এসে দেড়শো-দু'শো বছর ধরে দেশটাকে লুটেপুটে খাচ্ছে, দেশের মানুষের সাথে কুকুর বেড়ালের মতো ব্যবহার করছে --- তা নিয়ে কোথায় ক্ষোভে ফেটে পড়বে, তা নয়তো সবাই জাতপাত নিয়ে ব্যস্ত! আরে, জেলের ভেতর গিয়েও মানুষের ছোঁয়াছুঁয়ির বহর দেখে তাজ্জব হয়ে গিয়েছি!'
ছুতোরপাড়ার মাঠে টেবিলের দুপাশে বাঁশের খুঁটিতে দু'খানা হ্যাজাক জ্বালিয়ে তারকদাস ইতিমধ্যেই মঞ্চ সাজিয়ে ফেলেছে। সামনে বেশ গোটাকতক বেঞ্চি। লোক সমাগম খুব যে বেশি তা নয়, হবার কথাও নয়। তবু হ্যাজাকের আলো এড়িয়ে আশেপাশে বেশ কিছু চাদর মুড়ি দেওয়া মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দু'জন বয়স্ক সম্ভ্রান্ত চেহারার মানুষ নজরুলকে অভিবাদন জানিয়ে চেয়ারে বসালেন। 'বিদ্রোহী কবির নতুন করে পরিচয় দেবার কিছু নেই' বলে শুরু করলেও তারকদাসের ভরাট কণ্ঠস্বরে নজরুল ইসলামকে নিজেদের মধ্যে পেয়ে কৃষ্ণনগরবাসী কতটা গর্বিত, কতটা সৌভাগ্যবান --- তার বিস্তারিত বর্ণনা শোনা গেল। তার প্রাণবন্ত পরিচালনায় জমে উঠল অনুষ্ঠান। সভার সভাপতি শামসুদ্দিন আহমেদ, শহরের নামী উকিল, নজরুলের গলায় একটা বড়ো আকারের রজনীগন্ধার মালা পরিয়ে দিলেন, কাঁধে ঝুলিয়ে দিলেন একটি নকশা করা কাশ্মীরি শাল। গোবিন্দপদ একটি কাচ বাঁধানো অভিনন্দনপত্র পাঠ করে শুনিয়ে তুলে দিল নজরুলের হাতে। একদিকে সম্প্রীতির অগ্রদূত, অপরদিকে বাংলার শোষিত-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষজনের হয়ে লড়াই করার অগ্রণী সৈনিক হিসেবে তুলে ধরে সে লেখার ছত্রে ছত্রে নজরুলের প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কৃষ্ণনগরবাসীর গভীর প্রত্যাশা। আবেগে অনেকটাই অভিভূত এবং উৎসাহিত হয়ে নজরুল কথা বলার জন্য উঠে দাঁড়ালেন।
ছড়িয়ে থাকা লোকজন সবাই ভিড় করে প্রায় ঘিরে ধরেছে সভার মঞ্চটিকে। তারকদাসের ঘোষণার রকম দেখেই তিনি অনুমান করেছেন --- লোকজন নজরুলের গান শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। সেজন্য টেবিলে রাখা হারমোনিয়ামটা টেনে নিয়ে আগে রীডের উপর একটু আঙুল বুলিয়ে নিয়ে কথা শুরু করলেন ---'কৃষ্ণনগরে এসে যে ভালোবাসা, যে সম্মান আমি পেয়েছি তার জন্য আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার আমার অন্ত নাই। চারিদিকে হতাশা, জাতপাতের বিবাদ, পরাধীন দেশের কথা, দরিদ্র সাধারণ মানুষের কথা ভাবার মতো মানুষের বড়ো অভাব। কিন্তু এই শহরে এসে, এখানকার যুবকদের আন্তরিক আবেগ দেখে আমার মনে নতুন করে জোয়ারের ঢেউ জেগে উঠছে। মুখের কথা নয় -- গানের কথা দিয়ে আমার কথা বলি।'
এই বলে গান ধরলেন --- জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত খেলছ জুয়া! দু'লাইন করে গান, তার ফাঁকে ফাঁকে কথা। আসার পথে মঘাদের কথার রেশ ধরে বলে চললেন -- লেবু দুই রকমের হয়, গোঁড়া লেবু এবং পাতিলেবু -- দুই লেবু গাছই সমাজ থেকে উপড়ে ফেলতে হবে। তা নাহলে জাতপাতের লড়াই নিয়েই থাকতে হবে, মাঝখান থেকে ইংরেজরা দেশটাকে লুটেপুটে খাবে। আমাদের নেতাদের মধ্যে একদল আছে ধামাধরা, যারা নেতা হতে চায়, কিন্তু ইংরাজদের বিরাগভাজন হতে চায়না। দেশের রাজা-গজা জমিদারেরা এই দলে, এরা ক্ষমতার ধামা ধরে থাকে। আরেকদল আছে জামা-ধরা --- শাসকের বিরুদ্ধে লোকদেখানো আন্দোলন করে, নরম ভাষায় প্রতিবাদ করে, আর ইনিয়ে বিনিয়ে এটা ওটা আবদার করে। এদের দিয়ে কিছু হবে না --- আমরা চাই টুঁটি ধরা দল --- যারা ইংরেজের টুঁটি টিপে ধরতে পারবে!
ঘন ঘন হাততালি। মানুষের মধ্যে উত্তেজনা উপছে পড়ছে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সেরে ঘরে পৌঁছে দেবার পথে তারকদাসের অকৃত্রিম উচ্ছ্বাস --- কাজীদা, আজ খুব ভালো বলেছেন। আমাদের ছেলেদের মনোবল দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে। শরীরে একটু নজর দিন, দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে হবে। ঠান্ডা লাগাবেন না, কেশনগরের ঠান্ডা কিন্তু খুব খারাপ।
নজরুল হেসে উঠলেন --- আজ ছেলেদের যা উৎসাহ দেখলাম -- তা শরীরে গরম ধরিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। আর এই যে --- জব্বর একখানা শাল দিয়েছ তোমরা --- ঠান্ডা ঢুকবে কোথা দিয়ে? একটা কাজের কাজ করেছ -- তোমার বৌদি দেখে বেশ খুশি হবে!
১০
কৃষ্ণনগরে এসে ক’দিনের মধ্যেই বেশ চাঙ্গা বোধ করছিলেন নজরুল। সাহেব ডাক্তারের সত্যিই হাতযশ আছে। মধ্যে আরও একবার ওষুধ নিয়ে আসা হয়েছে। গিরিবালা দেবীও শিবেনের সঙ্গে গিয়েছিলেন। ফরমুলা মাফিক কাশীনাথই মিক্সচার বানিয়ে দেন। কিন্তু গিরিবালা দেবী ডাক্তারের সাথে আলাদা করে কথা বলে এসেছেন। কথা বলে তিনিও খুশি। কিন্তু দু'দিন থেকে নজরুলের আবার জ্বর এসেছে। হয়ত ঠান্ডা লাগার কারণেই। কিন্তু নজরুলের ক্ষেত্রে জ্বর শুরু হলে আর সহজে যেতে চায় না। এইবেলা ছাড়ে তো ওইবেলা আবার জাঁকিয়ে ধরে।
ক'দিন বাদেই গফরগাঁওতে প্রজা সম্মেলন। মনের মধ্যে একটা অব্যক্ত উত্তেজনা অনুভব করছিলেন নজরুল। সেই ময়মনসিংহ, সেই ত্রিশাল --- কাজির শিমলা - দরিরামপুর গ্রাম -- যেখানকার মাঠ, পুকুর, কর্দমাক্ত গ্রামের পথ, বৃষ্টিঝরা রাত --- বাঁশের বাঁশি হাতে এক ভাবুক কিশোরের ছবি আজো দুখু মিয়াঁর গোপন কুঠুরিতে ভেসে বেড়ায়। সেই স্মৃতিঘেরা ময়মনসিংহে নজরুল যাবেন না? গান গাইবেন না? তাই কি হয়?
কিন্তু তাই হলো।
ময়মনসিংহে সম্মেলনে তাঁর আর যাওয়া হলো না। মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল। যখন থেকে গফরগাঁওয়ে ময়মনসিংহ জেলা সম্মেলনে যাবার কথা শুরু হয়েছে তখন থেকে নজরুলের মনটা কেমন চঞ্চল হয়ে আছে। এই ক'বছরে কত সভা- সম্মেলনে তিনি গিয়েছেন, অনেক জায়গায় যাওয়া হয়েও ওঠেনি -- কিন্তু এরকম অনুভূতি আগে হয়নি। মাত্র এক বছর আগে বগুড়ায় রাজনীতির বন্ধুরা মিলে গড়ে তুলেছেন নিখিল বঙ্গ প্রজা সম্মেলন। রাষ্ট্রীয় সমাজে যাদের কথা কেউ ভাবেনা, সেই দরিদ্র কৃষক-শ্রমিক আর ক্ষেতমজুরদের মতো সর্বহারাদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তোলার স্বপ্ন তাঁদের অনেকদিনের। এরা তো ট্যাক্স দেয়না, সুতরাং এদের ভোট নাই। আর যাদের ভোট নাই তাদের কথা ভাববার দরকারই পড়েনা দেশনেতাদের। এই এক বছরে দিকে দিকে যেরকম সাড়া পড়েছে, তাতে হেমন্ত সরকার আর তার সঙ্গী- সাথীরা রাশিয়ার বলশেভিক জাগরণের মতো স্বপ্ন দেখা শুরু করে দিয়েছেন। মাস খানেক পরেই কৃষ্ণনগরে বার্ষিক রাজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবার দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গিয়েছে। জেলে থেকেই উদ্দীপিত মুজফফর আহমদ --- ছাড়া পেয়েই কৃষ্ণনগরে চলে আসবেন বলে জানিয়েছেন। শিগগিরই তার ছাড়া পাবার কথা। এরকম সময়ে ময়মনসিংহ জেলা সম্মেলন নজরুলকে এক অদ্ভুত ভাবে আকর্ষণ করছিল।
শুধুই কি সম্মেলন? ময়মনসিংহ নামটির সাথে জড়িয়ে আছে তাঁর প্রথম যৌবনের স্মৃতি, আবেগের অস্থিরতা, হঠকারিতা, অভিমান, প্রেম, বিরহ --- নিজের কাছেই ব্যাখ্যা না পাওয়া কত অদ্ভুত যন্ত্রনা। নামাপাড়া, বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়ি, খিদির পন্ডিত, কৈলাস স্যার, শুকনির বিলের ধারে একটা বটগাছ, সেই নির্জন বটগাছের নিচে বাঁশি হাতে এক কিশোর --- আর চোখের সামনে সর্বক্ষণ ভেসে বেড়ানো ভীরু হরিণীর মতো দুটি চোখ। অতল সমুদ্রের তলদেশ থেকে ভেসে ওঠা সে চোখের ভাষায় মাত্র দুটি কথা --- কাজী, ফের আইবাম তো?
দরিরামপুর থেকে গফরগাঁও কতদূর? কেউ কি আসবে না সম্মেলনে? দরিরামপুর হাই স্কুলের ছাত্র নজরুল ইসলাম এখন বঙ্গবিখ্যাত বিদ্রোহী কবি, অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত তেজোদ্দীপ্ত তার ভাষণ - সে খবর কি পৌঁছায়নি ত্রিশালের নামাপাড়ায়? বীররামপুরে? খিদির পন্ডিত স্যার কি না এসে থাকতে পারবেন? আর নূরজাহান? নিশ্চয় এতদিনে সে গৃহিণী হয়ে গিয়েছে। নূরের জ্যোতিতে ভরিয়ে তুলেছে কারো ঘর। তার কানে কি পৌঁছয়নি এই খবর? গফরগাঁওয়ে নজরুল আসছে শুনে সে কি থাকতে পারবে ঘরে? একবার দেখতে ইচ্ছে করবে না? কিন্তু আসবে কার সাথে? পন্ডিত স্যার কি তাকে সঙ্গে নিতে রাজি হবেন?
যদি দেখাও হয় --- কী কথা হবে তাঁর সাথে? কোনোদিনই তো বলতে গেলে তেমন কোনো কথা হয়নি। ইংরেজি বাক্য গঠন আর ফারসি শব্দের অর্থ বুঝিয়ে বলার বাইরে আর কিছু কথা বলবার বা শোনবার অবসর ঘটে নি। বাংলার বুকে ফুটে থাকা অপরূপ সৌন্দর্য্যের একটি গোলাপ --- তার সাথে কি কথা বলা যায়? চোখ তুলে তাকানোটাও যেন অস্বস্তিকর।
শরীর জুড়ে কেমন একটা অস্থিরতা। ময়মনসিংহ সম্মেলনের জন্য একটা গান লিখতে হবে। অন্যদিন বারান্দার চেয়ারটায় বসলেই কলমে লেখা চলে আসে। কিন্তু আজ কোনও কিছুতেই যেন মন বসছে না। চোখমুখ ভারি, কেমন উদভ্রান্ত ভাব।
দোলন কিছু বলার জন্য বোধহয় বাইরে এসেছিলেন। নজরুলকে দেখে একটু ভয় পেয়ে গেলেন। "তোমার তো মনে হচ্ছে আবার জ্বর আসছে!" কপালে হাত দিয়ে দেখলেন -- "বেশ গরম তো! চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। এই ঠান্ডায় আর বাইরে বসতে হবে না, ভিতরে চলো।"
বাধ্য ছেলের মতো নজরুল বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন। দোলন থার্মোমিটার বার করে জ্বর দেখলেন। ১০২ ডিগ্রি পার হয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন এরকম জ্বর আসেনি। কাপড়ের টুকরো ভিজিয়ে এনে জলপটি লাগালেন। এমন সময় বারান্দায় গলা শোনা গেল -- কাজী কই? খবর-সবর কী?
"দোলন, হেমন্তদা এসেছেন!" নজরুল উঠে বসতে গেলেন।
- "তুমি শুয়ে থাকো, আমি দেখছি"। দোলন হেমন্ত সরকারকে ভিতরে ডেকে নিয়ে এলেন। বিছানার সামনে বসার জন্য একটা টুল এগিয়ে দিলেন।
- কদিন তো ভালোই ছিল। কাল থেকে দেখছি কেমন অস্থির। আজকে তো আবার জ্বর এসেছে। অনেকটা জ্বর। দোলনের কণ্ঠে স্পষ্ট একটা উদবেগের ছায়া।
হেমন্ত সরকার একটু চিন্তিত স্বরেই জিজ্ঞেস করলেন, "সাহেব ডাক্তারের ওষুধে কাজ হচ্ছে না কিছু? ওষুধ ঠিকঠাক খাচ্ছ তো?"
- কী করে হবে দাদা? সময়মতো তাকে পেলে তো ঠিকঠাক ওষুধ খাওয়াবো? সাতদিন পরে ডাক্তারবাবু তো দেখা করতে বলেছিলেন। তা উনি নিজে না গিয়ে শিবেনকে পাঠিয়ে দিলেন। মা গিয়েছিল, কথা বলে এসেছে। রেস্ট নিতে বলেছেন।
জলপট্টি নামিয়ে রেখে নজরুল বিছানায় উঠে বসেছেন। কিছু বলতে যাবার আগেই হেমন্ত সরকার বললেন, "এটা তো ঠিক করছ না কাজী! নগেন ডাক্তারের উপর আমার ভরসা আছে। ঠিকঠাক মেনে ওষুধপত্র খাও, চাঙ্গা হয়ে উঠতে হবে তো! সামনে অনেক কাজ।"
নজরুল কিছুটা জবাবদিহির সুরে বলার চেষ্টা করলেন, "ওষুধে তো ভালোই কাজ দিচ্ছিল দাদা। আজ আবার হঠাৎ জ্বরটা চলে এলো। ও ঠিক হয়ে যাবে।"
দোলন হেমন্ত সরকারের দিকে একটু অনুযোগের মতো করে বললেন, "দাদা, এর মধ্যে নাকি ময়মনসিংহ যাবার কথা আছে? সেখান থেকে আবার ঢাকা? এই শরীরে যাওয়া ঠিক হবে?"
"দোলন অযথা ভয় পাচ্ছে দাদা! এখনো তো কদিন আছে, ও আমি ঠিক হয়ে যাব। এতো গুরুত্বপূর্ণ জেলা সম্মেলন।"
দোলনের কথার মধ্যেই নজরুল বলে উঠলেন।
হেমন্ত সরকার বললেন, "না কাজী। দোলন ঠিকই বলেছে। তোমাকে আর গফরগাঁও যেতে হবেনা। তুমি কদিন বিশ্রাম নাও। সামনে অনেক কাজ আছে। বরং রাজ্য সম্মেলনের কথা ভাবো। তার আগে তোমাকে শরীরটা ঠিক করে নিতে হবে। তুমি বরং ময়মনসিংহ সম্মেলনের জন্য একটা চিঠি লিখে দিও, যাবার সময় নিয়ে যাবো। আর হ্যাঁ, একদম অনিয়ম কোরো না। আমি কিন্তু ঠিক খবর পেয়ে যাবো!"
হেমন্ত সরকার বেরিয়ে গেলেন। নজরুল কোনো কথা না বলে তাকিয়ে রইলেন দরজার দিকে। চুপচাপ। তারপর শুয়ে পড়লেন। বন্ধ চোখের পাতার উপর ভেসে উঠতে থাকল রফিজউল্লাহ দারোগার বাড়ি, সিঁড়ির নিচে দুই বন্ধু মিলে গান গাইতে গাইতে ঘুমিয়ে পড়া। কোথায় আসানসোল, আর কোথায় ময়মনসিংহ। রেল-বাস স্টিমার মিলে অনেক পথ পেরিয়ে ত্রিশাল, দরিরামপুর হাই স্কুল। প্রবল বর্ষায় ভেসে যাওয়া মাঠঘাট, খালবিল --- গ্রাম বাংলার এই চেহারা আগে কোনোদিন দেখা হয়নি। অদ্ভুত, অপরূপ! একহাঁটু কাদা রাস্তা পেরিয়ে এতোদূরে প্রতিদিন স্কুলে আসা --- সে কি সম্ভব? নজরুলের মতো ছাত্রের জন্য ব্যবস্থা হবেনা? পন্ডিত স্যারের শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয়। কিন্তু সেখানে তো ফুল ফুটে আছে --- বসরাই গোলাপ। তীব্র তার আকর্ষণ। এতো আকর্ষণ -- সে তো বন্দীত্ব! এই মায়ার বাঁধন থেকে পালাতে হবে।পালাতেই হবে! বাঁধনহারা ঘুড়ির মতো জীবন শুধু এক আকাশ থেকে আরেক আকাশ --- ভাসতে থাকা, ভাসতে থাকা।
কপালে হঠাৎ একটা শীতল স্পর্শ। চমকে চোখ মেললেন নজরুল।
দোলন।
জলপটিটা ভিজিয়ে এনে কপালে লাগিয়ে দিলেন।
Soumitra De | ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ২১:৪৭742978