এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • সিনেস্থেশিয়া

    শুভংকর ঘোষ রায় চৌধুরী লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ২৫ জুলাই ২০২১ | ২৪৬৫ বার পঠিত | রেটিং ৪.৩ (৩ জন)
  • এলেবেলে (পর্ব - ৪) : সিনেস্থেশিয়া



    কেন এরকম জড়িয়ে যায় সব স্বাদ, রঙ, গন্ধ, আলো, সাজ আমার স্মৃতিতে? কেন স্মৃতির চেয়েও বেশি ভাস্বর হয়ে ওঠে গ্রন্থি ছুঁয়ে থাকা এক-একটি সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়া সুতো?


    প্রথম গরমের ফুল গন্ধরাজ, সন্ধেবেলা ফোটে। হালকা সবুজ বোঁটায় ল্যাতপ্যাতে, থুপকো মতো সাদা পাঁপড়ি; ক'দিন ঘরে রাখলে কলকে ফুলের মতো হলুদ হয়ে ওঠে। মাঝে বহু, বহু বছর এই ফুলের গন্ধ পাই নি, এতদিনই যে ফুলটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। পরশু বাড়ির পিছনের এক চিলতে মাটিতে গন্ধরাজ ফুটেছে; সে থেকে একটা ফুল নিয়ে আজ, এখন অব্দি গন্ধ নিচ্ছি। প্রতিবারই মনে হচ্ছে, আমি একটা ঘরে গিয়ে ঢুকছি যে ঘরে সব জিনিসই আমার চাই, কিন্তু কোনটা আগে চাই বা বেশি চাই, বুঝতে পারছি না। এর মধ্যে আছে গোলাপ খাস আমের বোঁটা ছুলে খোসা ছাড়ানোর পরের গন্ধটা, আছে গরমের সন্ধে পৌনে ছটা, মশা, আছে আমাদের পুরোনো তুলসীতলা, তার মাথায় ঝাঁকড়া হয়ে থাকা পুরোনো গন্ধরাজ গাছ, বাড়ির পিছনের দেওয়ালে রাবারের বল মারার ভোঁতা শব্দ, দক্ষিণ-পূর্ব কোণে জবাগাছে ফুটে থাকা গোলাপি জবা দেখে বিড়বিড় করে নেওয়া "হিবিস্কাস রোজাসাইনেন্সিস", কালবৈশাখীর বৃষ্টির শেষে ছুটে যাওয়া পাশের বাড়ির গাছ থেকে পড়া আম কুড়োনোর জন্য, আমাদের সিমেন্টের বাঁধানো চাতাল থেকে তখনও ভেজা, গরম ভাপ উঠছে, আর তুলসীতলা ভরে আছে সাদা থুপো থুপো গন্ধরাজ ফুলে।


    এই লেখা থামিয়ে শুকিয়ে যাওয়া হলুদ ফুলটা আবার শুঁকলাম। এবারেও বুঝলাম না, কোন সুতোটা সবার আগে মনে পড়লো, বা ধরে রইলাম। কারণ পথের দেবতা যেমন অপুকে বলেছিলেন পথ কি তোমার শেষ হয়েছে কেবল এটুকুতেই, আমার স্মৃতির পথ আসলে এই সবকিছু পেরিয়ে হয়তো একটা সময়ে ছড়িয়ে গেছে, যে সময়ে দাদু ছিলেন আর বিকেল পেরিয়ে গেলেই জানলায় এসে আমাকে ডাকতেন খেলা থামিয়ে পড়তে বসার জন্য, যে সময়ে সপ্তাহে দু'বার করে বড়পিসি আসতো রিকশায় চেপে মনসা মিষ্টির দোকানের রসগোল্লা নিয়ে, আর পুরোটা সময়েই একটা ছাই রঙা চৌকো ঝোলাব্যাগ কাঁধ থেকে ঝুলিয়ে কেমন জড়িয়ে বসে থাকতো, যে সময়ে কালবৈশাখী বেশি রাতে এলে প্রার্থনা করতাম কাল যেন রেনি ডে হয়ে যায়, যে সময়ে বড়দের "ভাওয়েল ছাড়া কোনও শব্দ হয় না"-র উত্তরে "sky" বলে মজা পেতাম, যে সময়ে দু' সপ্তাহে একবার করে বাবা বাইরে থেকে ফিরতো যখন, গেট খুলে ঢুকে কাঁচের জানালায় দু'বার টোকা মেরে আমার ডাকনামে ডেকে তারপর বেল দিত দরজায়। 


    গরমের বিকেল শেষ হয়ে আসছে; আজ কিছু কাজে যে জায়গায় গিয়েছিলাম, ফিরছি তখন। হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়লাম এমন এক রাস্তায় যে পথে শেষ এসেছিলাম আট বছর আগে, আমার এক মাস্টারমশায়ের বাড়িতে। তার দিন দুয়েক আগে প্রয়াত হয়েছিলেন মাস্টারমশাই, দেখা করতে এসেছিলাম জেঠিমা (তাঁর স্ত্রী) ও তাঁদের মেয়ের সঙ্গে। তারপর আর যাওয়া হয়নি। আজও অমনোযোগে হাঁটতে হাঁটতে যখন বুঝলাম এটা সেই রাস্তাই, খুঁজে-পেতে এপার্টমেন্টটা বার করে, গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সিকিওরিটি গার্ডকে জিজ্ঞেস করলাম, ও বাড়িতে কেউ আছেন এখন? অনেক ভেবে সে আরেকজনকে ডাকলো। তিনি হয়তো এপার্টমেন্টের পুরোনো বাসিন্দা। এসে বললেন, জেঠিমা, দিদি --- দুজনেই প্রয়াত হয়েছেন এই আট বছরের মধ্যে। সি ব্লকের ওই ফ্ল্যাটটি এখন বন্ধ। 


    আবার হাঁটা শুরু করলাম বড় রাস্তার দিকে। একটু এগিয়েই একটা আড়াআড়ি রাস্তা পেরোতে গিয়ে মনে পড়লো, বৃদ্ধ মাস্টারমশাই প্রতিদিন আমাকে উনার বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় বলতেন, এই রাস্তাটা দেখে পেরোই যেন। হঠাৎ করে গাড়ি এসে পড়ে। দেখেই পেরোলাম। বড় রাস্তার কাছে দোকানঘরগুলো বদলে বদলে গেছে, দুটো নতুন এপার্টমেন্ট উঠেছে। একটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, এরই মধ্যে দেওয়ালে নোনাও ধরেছে। অসংখ্য ছোট ছোট জানলা, গ্রিলে ঢাকা বারান্দা, অনেক জামা কাপড়, অল্প মানুষ। একবার মনে হলো, এঁরা কেউ চিনতেন আমার মাস্টারমশাইকে? না বোধ হয়। তাঁর স্ত্রী বা মেয়েকেও নয়, স্বাভাবিকভাবেই। মাস্টারমশাই এখানে দীর্ঘ বহুকাল কাটিয়েছেন। কিন্তু এখন বোধ হয় আর কেউই কিছু চেনে না --- পরিচয়, শরীর কিছুই চিনে রাখার মতো দীর্ঘদিন কারো থাকে না। অনিশ্চিত আকাশে বাতাস বয় খুব জোরে।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ২৫ জুলাই ২০২১ | ২৪৬৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Anindita Roy Saha | ২৭ জুলাই ২০২১ ২১:২২496145
  • শুভঙ্কর , আমি দিল্লিতে থাকি। গন্ধরাজ এখানে স্বাভাবিক ফুল নয়। আমার কোয়ার্টারের বাগানে একটা গাছ আছে। সম্প্রতি তাতে ফুল আসছে ঝেপে। আমার কলকাতার গন্ধ , আমার ছোটবেলার গন্ধ এনে দিচ্ছে মুঠো ভরে। 


    আমাদের সকলেরই কিছু হারিয়ে যাওয়া গন্ধের খোঁজ রয়ে গেছে। 


    ভালো লাগলো। 

  • kk | 68.184.***.*** | ২৭ জুলাই ২০২১ ২৩:১৬496146
  • শুভংকর, আপনার লেখা ভালো লাগলো। সেন্স পারসেপশন আর অ্যাসোসিয়েটেড মেমোরি আমার খুব পছন্দের বিষয়। আপনার লেখার ওয়ে ভালো লাগলো। কিন্তু 'সিনেস্থেশিয়া' এই লেখায় আমি ঠিক ধরতে পারলামনা। সেটা আমার অপারগতা অবশ্য। আমার কিছুটা সিনেস্থেশিয়া আছে। হয়তো সেই জন্য পার্সোনাল বায়াস এসে যাচ্ছে। নিজের অভিজ্ঞতার পয়েন্ট থেকে দেখছি বলে হয়তো আপনার সিনেস্থেশিয়ার পার্স্পেক্টিভটা এখানে ধরতে পারছিনা। সিনেস্থেশিয়া একজনের আরো বেশি আছে। তিনি হলেন 'একক'। জানিনা এ লেখা তিনি পড়েছেন কিনা।

  • শুভংকর ঘোষ রায় চৌধুরী | ২৭ জুলাই ২০২১ ২৩:২৫496147
  • অনিন্দিতা দি, খুব আশ্চর্য আমাদের স্মৃতিরা। তাদের এসে উপস্থিত হওয়ার ধরণ ধারণ আরোই অদ্ভুত। সত্যিকারের অতিথি তারা।


    কলকাতার বা ছোটবেলার কথা মনে করায় গন্ধরাজ আপনাকেও, শুনে বেশ লাগল। ভালো থাকবেন অনিন্দিতা দি। আপনার মতামত পেলে ভালো লাগে।

  • শুভংকর ঘোষ রায় চৌধুরী | ২৭ জুলাই ২০২১ ২৩:২৮496148
  • kk, না আপনার অপারগতা নয় একদমই। সিনেস্থেশিয়া বোঝাতে আমারও ঘাটতি হয়েছে এই লেখায়। যে রজনীগন্ধার কথা বলেছি, বা পরবর্তীতে, একদম শেষদিকে যে উঁচু উঁচু বাড়ির ফাঁকে আকাশের কথা বলেছি, এগুলি আমাকে একভাবে শান্ত করে, কিছুটা embalming effect বলতে পারেন। সেটা এত ব্যক্তিগত, এবং এতই ক্ষণিকের, যে তাকে সম্পূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারিনি আমি।


    আপনার মতামত পেয়ে খুব ভাল লাগল। ভালো থাকবেন। 

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন