এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বই

  • অক্ষয় মালবেরি - প্রথম পর্ব মণীন্দ্র গুপ্ত

    ইন্দ্র
    আলোচনা | বই | ০২ জুলাই ২০০৭ | ২০৩৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • আজ আমাকে শহরের বৃষ্টি বড় কাহিল করেছিল। পাঁচতারা হাসপাতালটি থেকে বেরিয়ে যাকে দেখলাম, তাকে হুমায়ুন আহমেদ বলেন ঝুম- বৃষ্টি। ঝুম জলেরা সরু-মোটা নালে আকাশ থেকে নামতে নামতে মাঝ-আকাশে অথবা মাটির মধ্যস্থতায় একে-অন্যে মেশে নিলাজ। এই জল-চালাচালিতে বাহিরদেয়ালটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে গেলে আকাশজল মাথায় নিয়ে আমি কেন যে ছুটে যাই, বোধের অগম্য।

    প্রকৃতপ্রস্তাবে আমাকে কাহিল করে রেখেছিল মালবেরি-শব্দমালা। ভিতর থেকে যেন পাকিয়ে উঠছে প্রাকবিজ্ঞান ময়াল সাপটি, আমাকে সে তার অনিবার্য জারক রসে নরম করে এনেছে। শেষ আঁটিটি হল পোড়া শহরের এই প্রতীক্ষার জল।

    তারপর থেকে আমি জল ডিঙিয়ে, জল মাড়িয়ে, জল মাথা-বুক-কাঁধে শরের মত গেঁথে, যেন ভিখিরি পদাতিক সৈন্যটি, মহাকুরুক্ষেত্রে রণোন্মাদ পেকে উঠলে রথীগণের হেলাবাণে যারা অগণন মরে-হাঁটছি ঝুব্বুস ভেজা কলকাতা শহরের আঘাটা দিয়ে। কেননা রাস্তাময় পুকুর। জল ছিটিয়ে পিছলচাকা মানুষের বাস-ট্যাক্সি চলে যায়। তারা আমার দিকে ফিরেও তাকায় না, কেননা আমি সংঘের যুক্তিকে ফিরিয়ে দিয়েছি। বৃষ্টি, এই শহরের সোদর বারিধারা বড় রুদ্র হয় আমার প্রতি, কেননা আমি শহরকে পথকুকুরের মত শহরের সীমানায় ফেলে রেখে এলাম।

    আঘাটায় বনজ কাদা। গু। আমার চাকা ডুবে যায়। আমি মহামন্ত্র ভুলেছি এই মালবেরি-বইয়ের জন্য, অসহায় ক্রোধ জাগে। ছি মণীন্দ্রবাবু।
    শেষমেশ অনেক প্রাবৃট পেরিয়ে যে বাসাশহরে এসে পৌঁছই, সেটি বাবুইবাসার মত শুখা। যেন জলমহালের সিক্ত ভোঁদড়টি, ঘাই মেরে উঠেছি মরুপাথরের দেশে। উঠে আর জল পাই না।
    এই সবই ঘটে আজ বিকেলে। যখন আমি পড়ে উঠলাম অক্ষয় মালবেরি।

    অক্ষয় মালবেরি একটি জীবনলেখা। বস্তুত:, এমন কাব্যবিভাময় জীবনকথা আমি আর দুটি পড়িনি। তার একটা গৌণ কারণ এ হতে পারে যে জীবনকথা খুব বেশী আমি পড়ি-ই নি। কিন্তু রসিক পাঠক, আপনি? আপনারা কেউ পড়েছেন এমন জলটুপি বেঁচে-থাকা কথা, মানুষের কথা বলার ভাষাসমূহে, ইংরেজী-ফরাসী-বাংলায়?
    বইটির ব্লার্বে লেখা আছে : "অক্ষয় মালবেরি উপন্যাস নয়, প্রচলিত আত্মজীবনীও নয়, একজন দু:খী-না সুখী-না মানুষের চিহ্নপত্র। কাঁচা কঞ্চির কলমে বনের সবুজ কালিতে হোগলার পাতায় লেখা উঙ্কÄল দুরন্ত দু:খী ক্ষণমধুর অতীত যেন স্তব্ধতা থেকে এসে আবার স্তব্ধতায় ফিরে গেছে।''

    অথবা এ এক ঘুর্ণনকথা। হ্যাৎক্যাৎহীন পাঁচপেঁচি ঘোরা, নিতান্ত মেটে, মহাবিশ্বে-মহাকাশে -গ্রহে-তারকায়-সৌরবলয়ে যার দোসর হবে না। পেছনের উঠোনে ভেজা পেয়ে মালবেরি ঝোপ গজিয়ে উঠলে আমরা , পৃথিবীর চিকন শিশুরা তাকে ঘিরে গাঢ় ঘুরি। নিজভোলা।

    Here we go round the mulberry bush
    The mulberry bush the mulberry bush
    Here we go round the mulberry bush
    On a cold & frosty morning.

    জন্মকিস্যাখানি এইরকমে শুরু হয় -

    "শরৎশেষে , কার্তিকের শুরুতে, আমাদের ভাঁড়ারের দেশে পেকে আসা ধানের উপর যখন শেষরাতে শিশির আর সন্ধ্যায় হিম জমে , যখন খালের জল স্বচ্ছ, গাছপালা গাঢ় সবুজ, আবহাওয়ায় একটু একটু শ্লথ বিষণ্নতা তখন একদিন আমার ঠাকুরদা সুখী মনে তাঁর ডালিমগাছটির পাশে হলুদ রঙের হোগলাপাতা, সবুজ রঙের বাঁশ আর বাদামী রঙের বেত দিয়ে একটি আনকোরা আঁতুড়ঘর একাহাতে বানিয়ে ফেললেন। আমি খুব পৌরাণিক আদরের মধ্যে ভূমিষ্ঠ হলাম। ডাক্তার নেই, দাই নেই, ছুরি-কাঁচি নেই। শুধু একদল পাড়াগেঁয়ে অভিজ্ঞ বর্ষীয়সী যেন হুল্লোড় করে হাতে হাতে আমাকে নামিয়ে নিলেন। ডাক্তারী ছুরির বদলে আমাদের পশ্চিমপুকুরপারের নির্জন বাঁশঝাড় থেকে কেটে আনা কাঁচা বাঁশের চোঁচ দিয়ে আমার নাড়ি কাটা হয়েছিল , একথা জেনে নিজেকে খুব অন্যরকম লাগে। কাঁচা বাঁশের চোঁচ ব্লেডের চেয়েও ধারালো, তাতে টিটেনাসের বীজ না থাকলেও বনের সবুজ বিষ ছিল।''

    বনের সবুজ বিষে মাখামাখি এই ৭৮ পাতার ছোট বইখানি, যাতে ধরা আছে লেখকের স্টোয়িক থাকাথাকির প্রথম আট বছর।

    আগাগোড়া দিকচিহ্নহীন এই লেখার কিছু ইত:স্তত রেফারেন্সে (অশ্বিনীকুমার দত্ত, মুকুন্দদাস, কীর্তনখোলা নদী) আমরা বুঝে পাই, দেশটির নাম বরিশাল। পাঠকের মনে আসতে পারে তপন রায়চৌধুরীর "রোমন্থন ...'' অথবা ঘটমান "বাঙালনামা''-র কথা। কিন্তু তপনবাবুর পঠনসুখ রচনাদুটি জীবনালেখ্যর স্বাভাবিক রীতি মেনেই তথ্যময়। সেখানে আমাদের গোধূলীমেঘের মালবেরি-মঙ্গল নিজের চারদিকে কেবলই ঘনিয়ে তোলে শটি-বোহর-গাব-জামরুলের নীল অন্ধকার। মৌল খনিজ বিষাদে (আমি যেন নিজের মুদ্রাদোষেই বিষাদ খুঁটে আনি) কষটা হয়ে থাকে মুখ। এখানে স্থান নেই, সময় স্থির ও দ্রবকৌতুকে অপ্রকট। পাত্রী এক জলজঙ্গল মা-পৃথিবী। কদাচ তাঁর বনশান্ত ছেলে-মেয়েরা।

    এ সেই দেশ, "যেখানে মুসাফির এসে বোঁচকা নামিয়ে বসে, একা একা হাড়ের পাশা খেলে, তারপর বোঁচকাটি রেখে শেষবেলার রোদে খানিকক্ষণ কাচের গুঁড়োর মত ঝাপসা হয়ে থেকে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।'' বুকটা ছাঁৎ করে ওঠে , অলীক লাল মেঘ পাঁশুটে হয়ে যায়, তবু রাস্তা চিনে গেলে পর মুনশীবাড়ি তো বারবার ফিরে যেতেই হয়। যেখানে ইঁটের পাঁজার পাশে বনঝিঙে ফুল আপনি ফুটে ওঠে। বিশল্যকরণীর সবুজ রসে কাচের ধমনী টলমল করে ওঠে। রংয়ের তেষ্টা পায়, রংয়ের ঘন লাবণ্যের মধ্যে ক্রুরতা, পেলবতা, তেজ, অন্ধকার-যেন পাত্রে পাত্রে আদিবীজ টইটুম্বুর হয়ে আছে। আমি পাগলের মত বুড়ো কার্তিক কুমোরকে মিনতি করি, "কারিগরমশায়, জয়ার শাড়িতে ঐ বেগুনী রংটা দাও।" -আমি কি অবচেতনায় চাই ঐ গভীর স্তন মোহের অন্ধকারে ডুবে থাকুক! "কারিগরমশায়, সাপের গায়ে ঐ গোলাপী রংটা দাও।" - আমি কি কল্পনা করি ঐ সাপ দুর্গার জঠর থেকে বেরিয়ে এসেছে, পিচ্ছিল, সদ্যনির্মোকহীন!
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ০২ জুলাই ২০০৭ | ২০৩৪ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    মাংস - অরিন
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন