এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • বলি নিয়ে যেটুকু যা বলার

    Swarnendu Sil লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২১ অক্টোবর ২০১৭ | ২৮৩৮ বার পঠিত
  • কালীপূজোর ভাসান মিটে গিয়ে আজ দ্বিতীয়া। প্রতিবারের মত এবারেও গাদা গাদা জায়গায় গাদা গাদা 'সেন্সেটিভ' বলিবিরোধী স্ট্যাটাসেরও পালা শেষ হয়ে গেছে। তাই বলি নিয়ে দুচার কথা লিখে যাওয়ার এখন প্রকৃষ্ট সময়।
    বলি প্রথাটিকে অনেকেই গোঁড়া ধর্মবিশ্বাস, কুসংস্কার ইত্যাদি ভাবেন ও লেখেন, বলা বাহুল্য তাঁদের সবাইই শিক্ষিত। ফলত না জানার বা না বোঝার কোন অজুহাত তাঁদের নেই। তবুও তাঁরা জানেন না বা বোঝেন না যে প্রথাটির মূল বিষয়টির বয়স আসলে যেকোনরকম অর্গানাইজড রিলিজিয়নের চেয়ে বহু বেশী।
    বিগ গেম হান্টিং-এর প্রচলন হোমো স্যাপিয়েন্স স্পিসিসটার ঊষালগ্ন থেকেই, বস্তুত স্পিসিসের বয়সের চেয়ে বেশী, হোমো ইরেক্টাসও শিকার করত। দলবদ্ধভাবেই শিকার করত, শিকার করে আনা পশুর কারকাস সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে কাটা, বাঁটোয়ারা করে নেওয়া সার্বিকভাবেই একটা আনন্দের বিষয় ছিল, তাই সেইটাকে নানান ফর্মে উদযাপন আমাদের স্পিসিসের ঊষালগ্নে একদমই ইউনিভার্সাল (হ্যাঁ, স্পিসিসের ঊষালগ্নে মাংস খায়না এমন গরুর বাচ্চারা আক্ষরিক অর্থেই গরুর বাচ্চা হত, হোমো স্যাপিয়েন্স মাংস খায় না শুনলে সে যুগে শিম্পাঞ্জিও হেসে ফেলত)। তখন তাতে অর্গানাইজড রিলিজিয়ন তো দুরের কথা, কোনরকম ধর্মভাবনারই লেশমাত্র ছিল না, যা ছিল তা শুধুই কম্যুনিটি রিচুয়াল, সম্মিলিতভাবে কম্যুইনিটির উৎসব উদযাপন (বলির ঠিক যে জিনিসটায় আজকের 'সভ্য' মানুষদের বেশিরভাগের ভারী আপত্তি, 'খাচ্ছ খাও, এভাবে ঘটা করে কেন?' -জাতীয় যুক্তি যেখান থেকে আসে। পৃথিবীতে প্রাণের ইতিহাসে সবচেয়ে সমাজবদ্ধ প্রজাতিটার কিছু সদস্যের এহেন উক্তিতে হাসব না কাঁদব জানি না)।
    পশুপালন শেখার পরে মিট সোর্সের জায়গা পালটে গেল, শিকার করা পশুর মাংসের বদলে পোষা প্রাণীর মাংসই খাদ্যের প্রধান উৎস হল। তখন থেকেই দেবতাকে উৎসর্গ করে পোষা প্রাণীর মাংস খাওয়াও শুরু হল, অর্থাৎ বলি 'বলি' হল বলা চলে। দেবতাকে উৎসর্গ কেন? সেই অনুপ্রেরণাটা কৃষি থেকে, বস্তুত কৃষি ও পশুপালনের ( মাংসের জন্যে পশুপালন, কুকুর পোষা তার কিছু আগে থেকে রয়েছে) প্রথম উদ্ভাবনের সময় বেশ কাছাকাছি, স্থানিকভাবেও কাছাকাছি। পরবর্ত্তীতে নিওলিথিক কালচারাল প্যাকেজের এক্সপানশনের ক্ষেত্রে দুটোই একইসাথে ছড়িয়েছে। আধুনিক অর্থে ঈশ্বরভাবনারও জন্মলগ্ন সেই সময়েই, প্রকৃতির fecundity উর্বরা মহিলা, জগন্মাতা আদ্যাশক্তি হলেন তখনই। বীজ তুলে সংগ্রহে রাখার ধারণা আসার আগে চাষে ফসল তোলার সময়ই কিছু ফসল মাঠেই রেখে দিত মানুষ, পরের মরসুমে ওই থেকেই আবার চারা বেরোবে বলে (আজ্ঞে হ্যাঁ, সাস্টেনেবিলিটির ধারণা আমাদের স্পিসিসের ও তাদের কম্যুইনিটি লিভিং-এর সহজাত প্রবৃত্তি, স্বাভাবিক প্রতিফল)। হয়ত সেইটাই কালক্রমে 'দেবতাকে উৎসর্গ'-এর মূল অনুপ্রেরণা, যা খাচ্ছি তার কিছুটা 'ফিরিয়ে দেওয়া', প্রকৃতিতে।
    যেকোন অর্গানাইজড রিলিজিয়ন রঙ্গমঞ্চে আবির্ভুত হতে তখনো বেশ কয়েক হাজার বছর দেরি। ফলত বলি আর যাই হোক ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়।
    এইবার আসি ঘটা করে উদযাপনের প্রশ্নে, খাদ্যের উদযাপন-এর থেকে সহজ, স্বাভাবিক, সুন্দর কিছু আমি অন্তত ভেবে উঠতে পারি না। নবান্ন-ও খাদ্যের উদযাপন, তাই বলি শুধু উদযাপন বলেই খারাপ হলে নবান্ন-ও তাই।
    আর যে যুক্তি খুবই বহুলব্যবহৃত তা হল নিষ্ঠুরতার প্রশ্ন। না মেরে মাংস খাওয়া যায় না, তাই একটা মাংসাশী(*) স্পিসিসের প্রাণীহত্যা নিষ্ঠুরতা এটা হাস্যকর যুক্তি। আর মাংসের ব্যবসা করা কোম্পানীদের প্রাণীহত্যার ভিডিও না দেখে থাকলে দেখে ফেলুন, ইলেকট্রিক স্টানার আদৌ প্রাণীহত্যার সদয় পদ্ধতি নয়। বস্তুত বৈদ্যুতিক শকে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া একটা প্রাণীর গলা ও শরীর প্রাণীটা জীবন্ত (কিন্তু অজ্ঞান) অবস্থায় যান্ত্রিক অটোম্যাটিক করাতে কাটতে যদি আপনার একটুও আপত্তি না থাকে, তাহলে এক কোপে ঘাড় কাটা পড়ে মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ডের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় তাৎক্ষণিক মৃত্যু আলাদা করে নিষ্ঠুর কেন?
    শেষত, বীভৎসটার প্রশ্নে বলি, দৃশ্যটা বীভৎস লাগলে না দেখার স্বাধীনতা তো আপনার সর্বদাই রয়েছে, দেখবেন না। আমি নিজে হাতে মাছও কাটি, দেখতেও অসুবিধে হয় না, বলি দেখতেও না। আপনার অসুবিধে হলে দেখবেন না, কেউ কোথাও জোর-জবরদস্তি কাউকে দেখতে বাধ্য করে না। পুজোর মাইকের আওয়াজ তার চেয়ে বহুগুণ বেশী জবরদস্তি।
    (*) আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনার ভেগান সেন্সিবিলিটি ভারী আহত হলেও মানুষ মাংসাশী প্রাণী, মানুষের অন্ত্রের দৈর্ঘ্য, প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড নিজদেহে সংশ্লেষ করতে না পারা ইত্যাদি বহু প্রমাণ আছে। আর যে সমস্ত স্বল্পবুদ্ধি দাঁত কেন কার্নিভর স্পিসিসের মত নয় বলে চেঁচান, তারা ভেবে দেখেন না যে স্পিসিসের ঊষালগ্ন থেকেই মানুষ মাংস কেটে আনছে অস্ত্র দিয়ে ও মাংস প্রসেস করে খাচ্ছে। আগুন ব্যবহার শেখার আগে পাথর দিয়ে পিটিয়ে নরম করে নিয়ে, পরে ঝলসে, রান্না করে ইত্যাদি। বাঘ-সিংহ ধারাল অস্ত্র দিয়ে মাংস ছিঁড়তে শিখলে ও রান্না করতে শিখলে তাদেরও বিবর্তনের পথে ক্যানাইন ছোট হয়ে আসত আর পাকস্থলীতে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের তীব্রতাও কমে যেত।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ২১ অক্টোবর ২০১৭ | ২৮৩৮ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    বয়স - Swarnendu Sil
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • dc | unkwn.***.*** | ২১ অক্টোবর ২০১৭ ০১:৩৭61721
  • বলি টলি নিয়ে সেভাবে কিছু ভেবে দেখিনি, তবে পাঁঠার মাংস না হলে এ জীবনই বৃথা। তা সে পাঁঠাটাকে যেভাবেই মারা হোক না কেন। একই কথা বিফ স্টেকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
  • sswarnendu | unkwn.***.*** | ২১ অক্টোবর ২০১৭ ১২:১১61720
  • এখানেও দিয়ে গেলাম, যদিও ফেসবুকে আলোচনাটা জমে উঠেছে।
  • Arghya Mukherjee | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০১:৩৬97583
  • এতদিনে বলিপ্রথা নিয়ে সঠিক একটা মতামত দেখলাম 

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন