
পরমশত্রুর শিশুপুত্রদেরও হত্যা করে, তাদের নির্বংশ করাটা ভারতের যুদ্ধনীতি ছিল না। কিন্তু পরবর্তীযুগে বিধর্মীদের সঙ্গে যুদ্ধকালে এই নীতির কারণে সনাতনী যোদ্ধাদের বারবার মাশুল গুনতে হয়েছে। ... ...

সেকালে ভর্তৃহীনা নারীর প্রতিভাবান পুত্রদের সমাজবরেণ্য হতে কোন বাধা ছিল না, এখানে দেবর্ষি নারদের কথা শুনলাম, উপনিষদের ঋষি সত্যকামের কথা শুনেছি রবীন্দ্রনাথের কবিতায় - "জন্মেছিস ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে"। নারদ অবশ্য এখানে তাঁর মায়ের নামটি প্রকাশ করলেন না - "বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের দাসী" বলেই মায়ের পরিচয় পর্বটি সেরে ফেললেন। ... ...

মহর্ষি ভৃগুর চোখে চোখ রেখে বললেন, “এই আয়োজন ও অনুষ্ঠানের জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ, মহর্ষিঠাকুর। এমন রাজসিক আয়োজন মহারাজ অঙ্গের প্রাসাদের উপযুক্ত। কিন্তু মহর্ষিঠাকুর, আমি জানি পৃথু ও অর্চ্চি কোন অবতার নয়, ওরা আমার পুত্র বেণের মানসপুত্রও নয়। এ সমস্তই আপনার বানিয়ে তোলা, সাজানো ঘটনা”। মহর্ষি ভৃগু কোন উত্তর দিলেন না, মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ... ...

বাঃ, অতি বিচক্ষণ ও উত্তম বিবেচনা, মহামুনি কশ্যপ। আপনাকে আরেকবার প্রণাম। আমার অনুচরেরা গরুর গাড়িতে সোনার মুদ্রা আর নানান উপহার দিয়ে আপনাকে সঙ্গে নিয়ে আপনার আশ্রমে পৌঁছে দিয়ে আসবে। আর কাল সকালে, আপনার আশ্রমে পৌঁছে যাবে পাঁচশ’ সবৎসা তরুণী গাভী। তারপর আমার অনুচরেরা কাল সকালে আপনাকে কৃষিজমিও দেখিয়ে দেবে, সেখান থেকে পছন্দমতো, যতটা খুশি আপনি নিয়ে নেবেন। ও হ্যাঁ, ভালো কথা, এই দানেও যদি আপনি সন্তুষ্ট না হয়ে থাকেন, কোন সংকোচ করবেন না, মহামুনি। ... ...

বেদজ্ঞ ঋষি শৌণক, এই (ভাগবত) পুরাণ কথক সূত্রধর অর্থাৎ সূতকে বলছেন, "আপনি বেদ ছাড়া সকল শাস্ত্রেই পারদর্শী"। অর্থাৎ সূত্রধর যেহেতু অব্রাহ্মণ - তিনি সব শাস্ত্রে পারদর্শী হতে পারেন - কিন্তু বেদের বিদ্যায় তিনি 'লবডংকা'। ঋষি শৌণকের এই আত্মশ্লাঘা ও শ্লেষটুকু বেশ লক্ষ্যণীয় বিষয় সন্দেহ নেই। ... ...

অবশেষে শাস্ত্রবচনটি এইভাবেই রচিত হয়েছিল - "...প্রজাপিতা মহারাজ অঙ্গের পুত্র অরাতিমর্দন মহারাজ বেণের মানসপুত্র শ্রী পৃথু ভগবান বিষ্ণুর অংশ-অবতার এবং মানসকন্যা শ্রীমতী অর্চ্চি সনাতনী কমলার অংশ রূপে প্রবোধিণী একাদশীর পুণ্য তিথিতে ধরণীতে আবির্ভূত হইয়াছেন"। ... ...


বেদ কল্পবৃক্ষ, শ্রীমৎভাগবত সেই বৃক্ষের ফল। শুকপাখির চঞ্চু থেকে যেমন মধুর ফল খসে পড়ে, তেমনই এই সুধাময় শ্রীমৎভাগবত ফল মহাযোগী শ্রীশুকদেবের মুখ থেকে জগতে আবির্ভূত হয়েছে। আম ইত্যাদি ফলের খোসা ও বীজ ফেলে দিয়ে ফলের রস আস্বাদন করতে হয়, কিন্তু এই ফলের কোন অংশই পরিত্যাগ করার যোগ্য নয়, এই ফলের সমগ্র অংশই রসস্বরূপ। হে রসজ্ঞ, ভাবুকগণ, আপনারা এই গ্রন্থের সুধারস পান করতে থাকুন। ... ...

মহর্ষি বললেন, “সেই চিহ্ন দুই তিন মাস স্থায়ী হলেই আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে। রাজা হিসাবে পৃথু একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে, কেউ তাঁর শরীরের চিহ্ন পরীক্ষা করতে আসবে না, বৎস”! ... ...

গীতার শেষ শ্লোকটিতে সঞ্জয় বলেছেন, "যে পক্ষে যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর ও পরমভক্ত পার্থ রয়েছেন, সেই পক্ষেই রাজ্যলক্ষ্মী, বিজয়, উন্নতি ও ধর্মনীতিও অবিচল থাকবেন – এ আমার নিশ্চিত অভিমত"। মন্ত্রী সঞ্জয়ের এই বার্তাটি শুনেও রাজা ধৃতরাষ্ট্রের মনে কোন হেলদোল হল না... কে জানে মনে মনে হয়তো বললেন, "যত্তোসব বড়ো বড়ো কথা - যুদ্ধে আমার ছেলেরাই জয়ী হবে..."। ... ...


সমাজ ছেড়ে অরণ্যবাসী হয়ে কৃচ্ছ্রসাধন করাকেই তপস্যা বলে, এমনই জানতাম। কিন্তু গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলছেন - "ফলের কামনা শূণ্য, একনিষ্ঠ ব্যক্তিরা পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে, কায়িক, বাচিক ও মানসিক এই তিন প্রকারে যে তপস্যা করেন, তাকেই সাত্ত্বিক তপস্যা বলে"। অর্থাৎ অরণ্যে নয় এই নাগরিক সভ্যতার ক্রোড়ে বাস করেও তপস্যা করা সম্ভব - কীভাবে? ... ...

"গতানুগতিকতা ছেড়ে নতুন পরিবেশে গেলে অনেক সময় চমকপ্রদ ফল পাওয়া যায়। বিশেষ করে, ওই উদ্যানবাটিকা ছিল মহারাজ বেণের স্বপ্ন! অসুস্থ হওয়ার আগে তিনি অজস্রবার ওখানে গিয়েছেন, নির্মাণকাজের পর্যবেক্ষণ করেছেন। প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি তিনি নিজে হাতে সাজিয়েছেন! সেই স্বপ্নপূরণ নিজের চোখে দেখার অনুভূতি তাঁকে উদ্দীপিত করতে পারে”! ... ...

"হে পার্থ, এই জগতে দৈব এবং আসুর, এই দুই প্রকার স্বভাবেরই জীব ও মানুষ সৃষ্টি হয়েছে। দেবসুলভ মানুষের কথা তোমাকে আগেই সবিস্তারে আমি বলেছি, এখন অসুরসুলভ মানুষের কথা বলছি, শোন"। তাহলে দেবতা ও অসুর কি কোন আলাদা গোষ্ঠীর মানব প্রজাতি নয়? তারা কি প্রকৃতপক্ষে - আমরা যে মানুষ - সেই মানুষেরই দুই রূপ বিশেষ? ... ...

তিনি (মহারাণি সুনীথা) এখন এই রাজভবনের অন্দরমহলে সর্বময়ী কর্ত্রী এবং এর পরেও তিনি তাই থাকবেন! এ বিষয়ে মন্ত্রীমণ্ডলীর কোন নিয়ন্ত্রণ চলে না! অতএব অন্দরমহলের প্রতিটি বিষয়ে তাঁর হস্তক্ষেপ থাকবেই। তাতেও পরিস্থিতি ক্রমাগতঃ জটিল হয়ে উঠতে থাকবে! আমাদের নবীন রাজা ও নবীনা রাণির জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে খুব দেরি হবে না। খুব সংক্ষেপে যদি শুনতে চাও, বৎস, তাহলে বলি, আমি মহারাণি সুনীথাকে এই রাজভবনের অন্দরমহল ও বারমহলের সব কিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন রাখতে চাই! ... ...

ক্ষর ও অক্ষর এই দুইধরনের পুরুষ জগতে প্রসিদ্ধ। বিনাশী বিকার থেকে উৎপন্ন সমস্ত ভূতকে ক্ষর পুরুষ এবং কূটস্থ নির্বিকার পুরুষকে অক্ষর বলে। এই দুই পুরুষ ছাড়া আরেক জন শ্রেষ্ঠ পুরুষ আছেন, তিনিই পুরুষোত্তম নামে অভিহিত হন। ভূঃ, ভুবঃ আর স্বঃ -এই তিন ভুবনের মধ্যে অবস্থান ক’রে, তিনিই অব্যয় ঈশ্বররূপে সকলকে পালন করেন। [ক্ষর কথার অর্থ যার ক্ষরণ বা ক্ষয় হয় - অর্থাৎ বিনাশী, নশ্বর। আর অক্ষর হল তার বিপরীত, অর্থাৎ অবিনাশী, অব্যয়, অবিনশ্বর] ... ...

আপনিও কি রাজা বেণের প্রভাবে অধর্মে বিশ্বাসী হলেন? আপনি বৃদ্ধ, আপনি প্রজ্ঞাবান্ - আপনি কি জানেন না, ঈশ্বরের অবতারকেও আবাহন করে আনতে হয়? আর্তজনের আগ্রহেই তিনি ধরিত্রীতে অবতীর্ণ হন। ভক্তদের আন্তরিক ও একনিষ্ঠ আরাধনায় বিচলিত হয়েই তিনি এর আগেও এসেছেন, - চরম বিপন্ন সাহায্যপ্রার্থী দেবতা এবং নরকুলকে রক্ষা করতে! ... ...


হে কুন্তীপুত্র অর্জুন, দেব, পিতৃ, মানুষ, পশু ইত্যাদি যে কোন যোনিতেই যে দেহ জন্ম নিক না কেন, মহৎব্রহ্ম প্রকৃতি তাদের মাতা আর আমিই চৈতন্যস্বরূপ বীজপ্রদ পিতা। ... ...

মহর্ষি ভৃগু ভললেন, “এই মন্ত্রণা কক্ষে আসার পথে মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্রর মুখে একটি বার্তা শুনলাম! এই রাজ্যে অনেকের বিশ্বাস রাজাবেণের এই অসুস্থতার কারণ, বিষপ্রয়োগ এবং আমিই সেই বিষপ্রয়োগের ষড়যন্ত্রী! তখন শুনে মনে ক্ষোভের উদ্রেক হয়েছিল, কিন্তু...”। ... ...