
সিনেমার দৃশ্যটা মনে ধরে আছে। কারণ এখনো মাঝে মাঝেই যখন দেখতে পাই সেই খেলার ভিডিও হাইলাইটস। বাইরে থেকে খেলোয়াড় এসেছিলেন এলিতেলি নয় বড় মাপের কৈলাস বিজয় বর্গী। তিনি দেখেই বুঝে যেতেন কে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী। কারণ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা চিঁড়ে মুড়ি খায়। বুঝতে পারতেন, কারণ তার ওপরওয়ালা জমিদার মশাই মোদিজি লুঙ্গি পাজামা দেখে বুঝে যান কারা মুসলমান, অর্থাৎ জঙ্গি। সেবারে দুই বেলা জমিদার ও তার সর্দার অমিত শাহ এরোপ্লেনে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করতেন। তবুও বিশেষ ফল হলো না। মনে আছে জমিদার কলকাতা টিমের খেলোয়ারদের খাবারে জোলাপ মিশিয়ে দিয়েছিলেন। কলকাতার খেলোয়াড়রা সব পেট খারাপ নিয়ে দিশেহারা। তাদের বাঁ হাতের জল কিছুতেই শুকাচ্ছে না। এ রাজ্যেও শত খানেক তৃণমূলের নেতা বিধায়ক এবং কয়েক হাজার কর্মীকে সিবিআই ইডির ভয় দেখিয়ে, দল ভাঙিয়ে, বিজেপিতে আনা হলো। তারাও এলো, কারণ স্লোগান ছিল "অব কি বার, দোশো পার"। বলতে পারেন সরকারটা প্রায় তৈরি হয়ে গিয়েছিল। শপথ নেওয়াই খালি বাকি ছিল। লাভের লাভ হয়নি কিছু, পৌনে একশোর গণ্ডিতে আটকে যেতেই দলছুট দল বদলুরা অনেকেই আবার ফিরে এলো। আর যারা দলে ঘাপটি মেরে ছিল, সময় সুযোগ মতো দল বদলাবে বলে, তারা সুবোধ বালক হয়ে ফের অনুগত "অনুপ্রাণিত" হয়ে থেকে গেল । ... ...

সুধীরের সিভিতে আরও বড় বড় জিনিস আছে অবশ্য। তিনি বার দুই জেল খেটেছেন। একবার ফেক নিউজের জন্য। ২০০৮ সালে, তখনও সত্যযুগ আসেনি। কাজ করতেন লাইভ ইন্ডিয়া বলে একটা চ্যানেলে, বড়কর্তা হিসেবে। একটা 'স্টিং' অপারেশন করে সেই চ্যানেল। সেখানে দেখানো হয় উমা খুরানা নামের এক মহিলা স্কুলশিক্ষিকা দেহব্যবসার চক্র চালাচ্ছেন। মহিলার চাকরি যায়, হেনস্থা হতে হয়, তিনি পাল্টা মামলা করেন। সেখানে দেখা যায়, পুরোটাই ভুয়ো। যাকে দেহব্যবসা চক্রের শিকার বলে দেখানো হচ্ছিল, সে আসলে একজন সংবাদব্যবসায়ী (পুরোটাই নিউজ এজেন্সির রিপোর্ট থেকে লিখলাম)। তাঁর চ্যানেলের এই কান্ডের সুধীর চৌধুরি গ্রেপ্তার হন, এবং পরে ছাড়াও পান। ... ...

ডেমোগ্রাফি বদলে যাচ্ছে, শহরতলীর মুসলমান পল্লী ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে এসআইআর এর ভয়ে, সীমান্তে কোটি-কোটি লোকের ভিড়, সব এসআইআরের ভয়ে পালাচ্ছে, এর সবকটা ভিত্তিহীন। চ্যানেলে চ্যানেলে যাঁরা এই গুলবাজি করছিলেন, প্রত্যেককে চোখে চোখে রেখে কথাগুলো বলা দরকার। কারণ, দেখা যাচ্ছে, মুসলমানের মধ্যে নিখোঁজ বা স্থানান্তরিত নেই বললেই চলে। এই নিয়ে নাগাড়ে যাঁরা গুলবাজি করে চলেছেন, তাঁদের ছেড়ে দেবার মানে নেই ... ...


ন্যায়বিচার প্রদানের ক্ষেত্রে আদালত মনের আনন্দে নিজের ইচ্ছেমতো উদ্ভাবন করতে পারে না। আদালত ‘সৌন্দর্য বা নৈতিকতার স্বকপোলকল্পিত আদর্শের সন্ধানে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানো এক নাইট’-এর ভূমিকাও নিতে পারে না। বরং সর্বদা আদালতের প্রত্যাশা থাকে যে তারা ‘পবিত্র নীতিমালা থেকে প্রেরণা নেবে।’ [দেখুন বেঞ্জামিন কার্ডোজো, The Nature of Judicial Process]। ... ...

এটা আক্ষরিক অর্থেই আনন্দ-সংবাদ, কারণ গোদি-মিডিয়া, হিন্দুত্ববাদী শক্তি আর সোসাল-মিডিয়া কীকরম ভয়ানক গাঁটছড়া বেঁধে কাজ করছে, তার প্রমাণ পেল গুরুচণ্ডালি এবং পেলাম ব্যক্তিগতভাবে আমি, গতকাল। এদের এই যৌথ গোয়ালঘরে যে আমরা সাফল্যমন্ডিত ভাবে ধোঁয়া দিতে পেরেছি, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ ব্যাটারা নিজেরাই দিয়ে গেছে গতকাল। গোদি মিডিয়া নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখে আসছি, ভিডিও করে আসছি। কাল ছিল "সীমান্তে বাংলাদেশীদের ভিড়" নামক গুলবাজির মুখোশ খোলার ভিডিও। সকালে উঠে দেখি অভাবনীয় ব্যাপার। ক্ষেপে গিয়ে এবিপি আনন্দ, তার মিডিয়া এজেন্টদের দিয়ে খুঁজে খুঁজে বার করেছে গুরুচণ্ডালির কোন কোন ভিডিওয় এবিপি আনন্দের ক্লিপ আছে। তারপর কপিরাইট ক্লেম করে অনেকগুলো নামিয়ে দিয়েছে। ফেসবুক এবং ইউটিউব জুড়ে। বেশি ভিউ যেগুলোর সেগুলো নামিয়েছে, সবকটা পারেনি, অত অধ্যবসায় থাকলে তো হয়েই যেত। ... ...


অতিমারির ভয়ঙ্কর সময়টা হয়তো আমরা সবাই পার হয়ে এসেছি কিন্তু তার প্রভাব সবটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছি আমরা তা বোধহয় নয়। অতিমারি আমাদের জীবনের চেনা অভ্যস্ত ছন্দটাকেই বিলকুল বদলে দিয়েছে। মাস্ক, স্যানিটাইজার, সোশ্যাল ডিসটেন্সের পাশাপাশি কর্মজীবনের কাঠামোতেও বদল এসেছে। এই প্রবন্ধে সেই ফেলে আসা কালান্তক সময়ের কয়েকটি বিশেষ দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মোহন মুদীর মতো মানুষ একটা কঠিন সময়ের প্রতীক। ... ...




সমস্ত ইতিহাসের মধ্যে এই একুশে জুলাইয়ের ইতিহাসটাই একদম স্মৃতি থেকে বলতে পারি। তখন ৯৩ সাল। এক বছর আগে বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়ে গেছে, দাঙ্গা-টাঙ্গাও, হয়েছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কোথায় বিজেপি? লোকে বলত, ওসব তো গোবলয়ের অসভ্য কাণ্ডকারখানা, এখানে শুধু সিপিএম-কংগ্রেস। সিপিএম তখনও ৭২-৭৭ এর কংগ্রেসি গুণ্ডামি আর ১১০০ কর্মী খুন হবার কথা নিয়ে ব্যস্ত। এখন যেমন ৩৪ বছর, তখন ছিল ৭২-৭৭। আর কংগ্রেস ভাবত, এত খুন-জখম-ধর্ষণ-টর্ষনের পরেও, এই সিপিএম ব্যাটারা জেতে কীকরে। গনিখান সোজাসাপ্টা লোক ছিলেন। ভোট-টোটের চক্করে না গিয়ে স্টেনগান হাতে নিয়ে সিপিএমকে বঙ্গোপসাগরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে বলেছিলেন। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়ের ধারণা ছিল লোকে ভোট দিতে পারলেই তিনি জিতবেন। ওইজন্যই ৯৩ সালে বাধ্যতামূলক ভোটার কার্ডের দাবীতে মিছিল ডেকেছিলেন ২১ জুলাই। ... ...


বাঙালিকে মেরে তাড়ানো হচ্ছে গোটা গোবলয় থেকে, চারদিকে গোদি-মিডিয়া আর হিন্দুবীরদের মুখ দেখানোর জায়গা নেই, অতএব তাঁরা যেটা পারেন, সেটাই শুরু করেছেন, অর্থাৎ গুলবাজি। নেতৃত্ব দিচ্ছেন, অগ্রণী সৈনিক কর্নেল সুমন দে। কীরকম গুলবাজি, একটু মন দিয়ে পড়ুন। কাল দেখলাম, হাত-পা নেড়ে, গলায় আবেগ এনে টিভিতে বললেন, "২০০৪ সালে রাজ্যসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী শ্রীপ্রকাশ জয়সওয়াল বলেছিলেন, বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ২০০১ এর ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত, ১ কোটি ২০লক্ষ ৫৩ হাজার, যার মধ্যে শুধু পশ্চিমবঙ্গে অর্ধেকেরও বেশি, ৫৭ লক্ষ" (সংক্ষেপিত, এবং চোখ গোলগোল করাটাও দেখানো গেলনা) । তারপর প্রচণ্ড নাটক করে এর সঙ্গে যোগ করলেন, ২০০১ এই যদি সংখ্যা এই হয়, ভাবুন এখন সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। ... ...

এর একটা উত্তর হল বেশ করি। কষ্টিপাথরহীন জীবন কোনো জীবনই নয়। কিন্তু তার চেয়েও একটা বড় কারণ আছে, সেটা হল দেশভাগ। দেশভাগের ইতিহাস যত পড়েছি, তত চমকে চমকে উঠেছি, ভদ্রসমাজের কাণ্ড দেখে। দেশভাগের ইতিহাস বলছে, যথেষ্ট গৌরবোজ্জ্বল অতীতের পরেও বিশেষ বিশেষ সময় বঙ্গীয় ভদ্রলোকরা চোক করে গিয়ে নেহাৎই আকাটের মতো আচরণ করেন। শুধু আকাট হলে সমস্যা ছিলনা, ভয়ঙ্কর বিপজ্জনকও হয়ে উঠেন, ডিলিউশনের রোগি অনেকসময় যেমন নিজের জন্য নিজেই একটা বড় বিপদ, সেইরকমই। ... ...

শ্যামাপ্রসাদ বাংলার রাজনীতিতে নেহাৎই খুচরো একটা বিষয় ছিলেন, প্রভাব কখনোই তেমন বিস্তার করতে পারেননি। ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত, ১৯৪০ সালে যোগ দিলেন হিন্দু মহাসভায়। ঢুকেই নেতা। নেতা হয়েই কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনে গেলেন সুভাষের কাছে নির্বাচনী সমঝোতা করতে, এবং ঘাড়ধাক্কা খেয়ে ফিরলেন। সুভাষ বলেছিলেন, এইসব করতে গেলে, দরকারে গায়ের জোরে আটকাবেন। প্রাথমিক সাফল্য বলতে এই। ... ...

কালিগঞ্জে একটা উপনির্বাচন হল। তাতে খুব বেশি বদল হল তা নয়। কিন্তু কিছু জিনিস পরিষ্কার করে বোঝা গেল। টিভিতে দেখবেন, এই একটা উপনির্বাচন নিয়েই হইচই চলছে, সবাই ফেঁড়ে চেঁচাচ্ছেন, তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা গাদা গাদা কথা বলছেন। এইসব সঞ্চালক এবং বিশেষজ্ঞদের কোথা থেকে ধরে আনা হয় জানিনা, তবে এঁরাই কদিন আগে লাহোর করাচিতে জয়পতাকা উড়িয়ে দিয়ে জগৎসভায় ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। এছাড়াও একটা বড় কৃতিত্ব হল, আজ পর্যন্ত একটা নির্বাচনেও বিশ্লেষণ, এক্সিট পোল দিয়ে কিছুই মেলাতে পারেননি। তাই এইসবে কান দেবার কোনো কারণ নেই। শুধু ফ্যাক্ট দেখা যাক। ফ্যাক্ট হল বিজেপি গোহারান হেরেছে। ৫০ হাজারের বেশি ভোটে। শুধু তাই নয়, উপনির্বাচনেও, যেখানে ভোট একটু কম পড়ে, তাতেও মার্জিন বেড়েছে। মার্জিন এরকম... ... ...



এই বিভ্রান্তিমূলক তথ্যপ্রবাহের কিছু অংশ মূলধারার গণমাধ্যমেও প্রবেশ করে। এটা এমন একটা পরিবর্তন, যা বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে, কারণ ভারতের এমন কিছু সংবাদমাধ্যমের মধ্যে এই বিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যারা আগে নিরপেক্ষতার জন্য পরিচিত ছিল। খবর প্রকাশে প্রতিযোগিতা এবং অতিরঞ্জিত জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে রিপোর্টিং, এই চার দিনের সংঘাতকালীন সময়ে চরমে পৌঁছে যায়, যেখানে সংবাদ উপস্থাপক ও বিশ্লেষকরা পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত দুটি দেশের যুদ্ধের চিয়ার-লিডার হয়ে ওঠেন। কিছু পরিচিত টিভি চ্যানেল যাচাই না করা তথ্য প্রচার করে বা এমনকি সম্পূর্ণ ভুয়া গল্পও প্রকাশ করে, জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার এই প্রাবল্যে। সংবাদমাধ্যমগুলো একটি তথাকথিত পাকিস্তানি পারমাণবিক ঘাঁটিতে ভারতীয় হামলার খবর প্রচার করেছিল, যা নাকি তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার কারণ হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়েছিল। তারা হামলার স্থান চিহ্নিত করে বিস্তারিত মানচিত্রও শেয়ার করেছিল। কিন্তু এই দাবিগুলো সমর্থন করার মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ভারতীয় নৌবাহিনী করাচিতে হামলা চালিয়েছে—এই গল্পও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, কিন্তু পরে তা অস্বীকৃত হয়েছে। ... ...