
এখানেই পুরনো ও নতুন পকেটমারের তফাত। পুরনো ওস্তাদের অলিখিত নিয়ম ছিল — যার আছে তার থেকে নেওয়া, যার নেই তার থেকে নয়। এক ধরনের শ্রেণিবোধ। নতুন কর্পোরেট পকেটমারের নিয়ম উল্টো — যার থালায় কম ভাত, তার থালা থেকেই তুলে নেওয়া হয়, আর তাকে উন্নয়ন বলা হয়। আগে পার্স, ঘড়ি নেওয়া হত, এখন ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব, প্রশ্নপত্র নেওয়া হয়। আগে পুলিশ ধরত, এখন পুলিশ পাহারা দেয়। ... ...

পুরনো নিয়ম ছিল, থানা স্তর থেকে উপরের প্রতিটি অফিসারকে মাসে অন্তত কয়েকটি রাত নিজের এলাকায় কাটাতে হবে। কারণটা সরল। গ্রামে এক রাত না কাটালে অভাব-অভিযোগ নিজের চোখে দেখা যায় না, নিজের কানে শোনা যায় না। আর মানুষ মন খুলে কথা বলে কেবল তখনই, যখন সে বুঝতে পারে আপনার সহানুভূতি আছে কি নেই। সেটা বুঝতে সময় লাগে, আর চলন্ত গাড়ির জানলা থেকে সেটা হয় না। নিয়মটা কেউ তুলে দেয়নি। জিপ আসার পর সেটা নিজেই অপ্রয়োজনীয় মনে হতে লাগল। অফিসারের নাগাল বাড়ল, সংযোগ কমল। প্রতিটি উন্নতি যা আমাদের দ্রুততর করে, তা সাধারণত এমন একটা ধীর ফিডব্যাক লুপ কেটে দেয় যা চলত শরীরী উপস্থিতির উপর। সেটা লেখা থাকে না কোথাও, তাই হারিয়ে যাওয়ার পরেও কেউ টের পায় না, যতক্ষণ না সিদ্ধান্তগুলো ভুল হতে শুরু করে। ... ...

যে মানুষটা গোটা জীবন হিংসা থামিয়ে মানবতার বার্তা দিতে চেয়েছেন, সেই মহাত্মার জন্মদিনেই শুরু হল শান্তির জন্য, ভালোবাসার জন্য পথচলা। কলকাতার পর উত্তর ২৪ পরগণা, হুগলি, বর্ধমান হয়ে এই পথ মিশবে বীরভূমে কবিগুরুর শান্তিনিকেতনে ১৬ই অক্টোবর। দিনটা ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে রবিঠাকুরের ঐতিহাসিক রাখিবন্ধন উৎসবের দিন। রবীন্দ্রনাথ আর মহাত্মা গান্ধী - ভারতের এই দুই মহান মানবতাবাদীর পথই হোক আগামীর পথ। তাঁদের শান্তির বার্তাতেই গড়ে উঠুক হিংসামুক্ত পৃথিবী। ... ...

আবার, সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক দুটি আদর্শের মধ্যেও সংঘাত বাধতে পারে। নিচা (Nietzsche)-র ‘নায়ক’-এর সঙ্গে একজন খ্রিস্টান সন্তের কোনো মিলই নেই, অথচ দুজনেই নৈর্ব্যক্তিকভাবে পূজিত হ্রা প্রথমজন নিচাপন্থীদের কাছে, দ্বিতীয়জন খ্রিস্টানদের কাছে। নিজেদের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ছাড়া আর কোন নিক্তিতে মেপে আমরা এই দুইয়ের মধ্যে কোনো একজনকে বাছবো? অথচ, এর বাইরে যদি অন্য কোনো উপায় না থাকে, তবে নীতিগত বিরোধের মীমাংসা হতে পারে কেবল ভাবাবেগের কাছে সওয়াল করে, গায়ের জোরে, নয়তো শেষ অস্ত্র হিসেবে যুদ্ধের মাধ্যমে। খাঁটি তথ্যের প্রশ্নে আমরা বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির দরবারে আপিল করতে পারি; কিন্তু নীতিশাস্ত্রের চরম প্রশ্নগুলির ক্ষেত্রে তেমন কোনো মানদণ্ড খুঁজে পাওয়া ভার। বাস্তবিকই যদি তা-ই হয়, তবে নীতি সংক্রান্ত যাবতীয় বিতর্ক শেষ পর্যন্ত পর্যবসিত হয় ক্ষমতাদখলের নগ্ন প্রতিযোগিতায়—যার মধ্যে প্রচারের (propaganda) ক্ষমতাও পড়ে। ... ...

১৮৭৬ সালে বাংলায় কোনও নিজস্ব সরকার ছিল না, টাকা ছিল না, শিল্প ছিল না। তবু মহেন্দ্রলাল সরকার চাঁদা তুলে একটা বিজ্ঞান গবেষণার প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্র রায় সাতশো টাকা দিয়ে একটা রাসায়নিক কারখানা শুরু করেছিলেন। তারকনাথ পালিত আর রাসবিহারী ঘোষ নিজেদের সম্পত্তি দান করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান কলেজ বানিয়েছিলেন। এঁদের কারও হাতে ক্ষমতা ছিল না। প্রথম দুই পর্বে লিখেছি কী ভেঙেছিল আর কেন। এই শেষ পর্বে প্রশ্নটা অন্য। যা একবার শূন্য থেকে গড়া গিয়েছিল, তা দ্বিতীয়বার গড়া যায় কি না। এবং সেটা শুরু করার জন্য সরকারের অনুমতির দরকার আছে কি না। ... ...

‘পাত্র-পাক্ড়ানো’-র প্রথা এখন আর গারো-সমাজে নেই। কুমার-ভবন প্রতিষ্ঠানটিও একেবারেই উঠে গেছে। বলাই বাহুল্য, গারো-সমাজের এই বৈশিষ্ট্যগুলি বিলোপের প্রধান কারণ গারো সমাজে খ্রিস্টীয়করণের ব্যাপকতা এবং আধুনিক তথা পাশ্চাত্য শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রচলনসহ নানা ক্ষেত্রের আধুনিকীকরণ। স্বাভাবিকভাবেই, সময়ের সঙ্গে তাল রেখে সে-সবের ছাপ পড়েছে বিয়ের প্রস্তাব-ধরনেও। ... ...

১৯৪৭ সালে চার ভাই উদ্বাস্তু হয়ে প্রায় শূন্য হাতে লুধিয়ানায় পৌঁছে সাইকেলের যন্ত্রাংশের কারবার শুরু করেন। ১৯৮৬ সাল নাগাদ হিরো সাইকেলস পৃথিবীর বৃহত্তম সাইকেল নির্মাতা। Around the same time আসানসোলের কাছে চালু হয় সেন র্যালে, ব্রিটিশ অংশীদার নিয়ে, ভালো প্রযুক্তি নিয়ে, ভারতের প্রিমিয়াম সাইকেল হয়ে। শেষে সেটি রুগ্ণ সংস্থা হিসেবে রাজ্যের হাতে যায়। একই দেশভাগ, একই বছর, উল্টো ফল, আর পার্থক্যটা প্রতিভার নয়, পুঁজির নয়, দুর্ভাগ্যেরও নয়। দ্বিতীয় পর্ব দেখছে পরের চল্লিশ বছরে বাংলা কী করল: ফ্রেট ইকুয়ালাইজেশন আর বাঙালি ব্যাঙ্কের নিঃশব্দ পতন, ঘেরাওয়ের বছরগুলি, একদা নোবেলজয়ী গবেষণার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিতর থেকে ফাঁকা হয়ে যাওয়া, আর এমন এক নিষ্ক্রমণ যা উদ্বেগের বিষয় হওয়া ছেড়ে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। ... ...

গুজরাতে নথিভুক্ত ছয়টি রাজনৈতিক দল। আম জনমত পার্টি, সত্যবাদী রক্ষক পার্টি, স্বতন্ত্রতা অভিব্যক্তি পার্টি, নিউ ইন্ডিয়া ইউনাইটেড পার্টি, ভারতীয় ন্যাশনাল জনতা দল এবং গরিব কল্যাণ পার্টি। নির্বাচন কমিশনের পরিভাষায় এরা "রেজিস্টার্ড আনরেকগনাইজড পলিটিক্যাল পার্টি" (RUPP), অর্থাৎ, নথিভুক্ত, কিন্তু স্বীকৃত নয়। অর্থাৎ এমন দল যারা হয় কখনো নির্বাচন লড়েনি, অথবা লড়লেও রাজ্য বা জাতীয় দলের স্বীকৃতি পাওয়ার মতো ভোট বা আসন পায়নি। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে এই ছয়টি দল অনুদান পেয়েছে প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকা! সংখ্যাটার মাপ বোঝার জন্য একটা তুলনা জরুরি। ওই একই অর্থবর্ষে সেই সময়ের পাঁচটি জাতীয় দল, যাঁদের আপনি নামধাম জানেন - কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি, সিপিআই(এম) এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, এরা সবাই মিলে অনুদান পেয়েছিল ১,৪৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গুজরাতের ঐ ছয়টি অখ্যাত দল একসাথে দেশের পাঁচটি জাতীয় দলের চেয়ে দুশো কোটিরও বেশি টাকা তুলেছে। এদের চেয়ে বেশি অনুদান পেয়েছে শুধু একটি দল, যার নাম গ্যেস করার জন্য কোনো প্রাইজ নেই। বিজেপির ঘোষিত অনুদান ছিল ২,৬০৪.৭৪ কোটি টাকা। ছয়টির মধ্যে সবচেয়ে বড় নাম আম জনমত পার্টির ভাঁড়ে একাই ৬২০ কোটি টাকা। আগের বছর, ২০২২-২৩-এ, এই দলটির অনুদান ছিল ২১৬ কোটি। এক বছরে প্রায় তিনগুণ। তুলনায় ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের ২০২৩-২৪-এর অনুদান ছিল ২৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ যে দলের নাম আপনি আজকের আগে শোনেননি, তার তহবিল কংগ্রেসের দ্বিগুণেরও বেশি। বাকিদের হিসাব: সত্যবাদী রক্ষক পার্টি ৩৩০.৫৫ কোটি, স্বতন্ত্রতা অভিব্যক্তি পার্টি ২১৯.৬৯ কোটি, নিউ ইন্ডিয়া ইউনাইটেড পার্টি ২০০.৬৯ কোটি, ভারতীয় ন্যাশনাল জনতা দল ১৯১.৬১ কোটি, গরিব কল্যাণ পার্টি ১৩৮ কোটি। ... ...

১৯৪৩ সালে কুড়ি থেকে ত্রিশ লক্ষ বাঙালি অনাহারে মারা যান। বৃষ্টি হয়েছিল, খাদ্য ছিল, মানুষ তবু মরেছিল। অথচ হলোকস্ট নিয়ে ছবি হয়েছে পাঁচশো, আর মন্বন্তর নিয়ে দশটা, তাতেও খলনায়ক মজুতদার, কোনও ঔপনিবেশিক প্রশাসক নন। একই সঙ্গে আমরা নায়কের তালিকা গুটিয়ে এনেছি গুটিকয় নামে, আর যাঁরা প্রতিষ্ঠান (Institution) আর কারখানা (Factories) আর শহর (Infrastructure) গড়েছেন তাঁদের রেখে দিয়েছি এক প্যারাগ্রাফে। এই লেখা সেই দুটো ভুল নিয়ে: যে অভিযোগপত্র পরের প্রজন্মের কাছে পৌঁছয়নি, আর যে উত্তরাধিকার আমরা নিজেরাই ছেঁটে ফেলেছি। ... ...



আসলে এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক,প্রযোজক, শিল্পী কলাকুশলীরা একটা গভীর সত্যকে তুলে ধরেছেন আমাদের সকলের কাছে – মানুষের লোভ আজ আমাদের মনুষ্যত্বকে ছাপিয়ে যাচ্ছে অবলীলাক্রমে। এই চলচ্চিত্র আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে অনিয়ন্ত্রিত লোভ আর মুনাফা অর্জনের তাগিদ তিল তিল করে মানুষের মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম দিকগুলোকে নষ্ট করে ফেলেছে, কীভাবে আমরা সমস্ত নীতি নৈতিকতা আর মানুষী অনুভূতিগুলোকে হেলায় দূরে সরিয়ে রেখে ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছি। ... ...

টুইটার এবং তাকে কেন্দ্র করে এবারের লেখা, সামাজিক মাধ্যম ওয়েব আশ্রয়ী ঠিকই কিন্তু ওয়েব যে কারণে মুক্ত এবং সার্বজনীন তাকে সে বেঁধে ফেলেছে কারাগারের মতন করে | এই ব্যাপারটা যারা ব্যবহার করেন তাঁদের দৃষ্টিগোচর হয় কি হয় না জানি না, বা হলেও তাঁরা হয়তো মানিয়ে নেন | এই পর্ব আমরা শুরু করব টুইটার কে নিয়ে এবং শেষ করব পরবর্তী পর্বে আসার আগে উন্মুক্ত সার্বজনীন মাধ্যমের সূত্রপাত করে ... ...


বিকেন্দ্রিকৃত সামাজিক মাধ্যমের কি কোন নিয়ে দু চার কথা। সাম্প্রতিক আরশোলা বিপ্লব বিশেষ করে তার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ইনস্টাগ্রামের প্রতি ফতোয়া জারি নিয়ে যারা বিচলিত, তাদের জন্য সুখবর যে অন্য রকম ব্যবস্থাও আছে। তাই নিয়ে লেখা। ... ...


রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নীতি, আদর্শ ও দর্শন বিস্তারের ক্ষেত্রে যে স্বল্পপঠিত বইটি এক গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে, সেই বইটির বিষয়বস্তু নিয়ে দুচার কথা ... ...


রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন শুধু সংসদ বা বিধানসভার আসনের হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রকৃত আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় সুপারস্ট্রাকচার-এর মধ্য দিয়ে: বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠ্যপুস্তক, বুদ্ধিজীবী সমাজ, সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান এবং দৈনন্দিন সাধারণ মানুষের চেতনায়। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রামশিয়ান কৌশল সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কেন্দ্রে ক্ষমতায় থেকে তারা আইসিএআর, ইউজিসি, এনসিইআরটি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্য নিয়োগ পর্যন্ত — প্রতিটি স্তরে একটি সুচিন্তিত সাংস্কৃতিক হেজেমনি প্রতিষ্ঠার প্রকল্প চালিয়ে গেছে এবং সামাজিক গণমাধ্যমে নিজস্ব বয়ান নির্মাণকে একটি অন্য স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। ... ...
