এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • বাজারের ডায়রি - ঝুঁকি মুনাফা এবং হতাশা

    আর্য্য ভট্টাচার্য্য লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ২৫ জানুয়ারি ২০১০ | ১১২৯ বার পঠিত
  • Justin Fox. The Myth of the Rational Market - A history of Risk, Reward, and Delusion on Wall Street (New York: Harper Collins Publishers, 2009). Pp.400, References and Further Readings. $15; ISBN - 978-0060598990

    বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ স্টিগলার সম্বন্ধে একটি গল্প প্রচলিত আছে। উনি একদিন শিকাগোর রাস্তায় হাঁটছেন, ওঁর এক বন্ধু বলেন 'ঐ দ্যাখো ২০ ডলার রাস্তায় পড়ে আছে", স্টিগলার উত্তর দেন 'হতে পারে না, যদি পড়েই থাকত তাহলে কেউ না কেউ তুলে নিত'। 'এফিশিয়েন্ট মার্কেট হাইপোথিসিস'ও বলে যেকোন মুহূর্তে যেকোন শেয়ারের দাম সঠিক, নইলে বাজার নিজেই তা ঠিক করে নিত। জাস্টিন ফক্স-ও ওনার বইতে 'এফিশিয়েন্ট মার্কেট' বোঝাতে গিয়ে খানিকটা রসিকতার সুরেই এই গল্পটি ব্যবহার করেছেন। খুব কূট তর্ক করতে গেলে 'স্ট্রং ফর্ম' এবং 'উইক ফর্ম এফিশিয়েন্ট মার্কেট হাইপোথিসিসের' পার্থক্য কি এবং কতটা তাই নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। কিন্তু গতবছরের বিপর্যয়ের পরে এই উদাহরণ অনেকেই এফিশিয়েন্ট মার্কেট হাইপোথিসিস সম্পর্কে রসিকতা করতে বলে থাকেন।

    নাম শুনে যা মনে হচ্ছে, বইটি কিন্তু আসলে বর্তমান অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আরও একটি অতিপরিচিত বিশ্লেষণ নয়। বইটির লেখক হলেন জাস্টিন ফক্স - ফরচুন ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও লেখক। ফক্স দীর্ঘদিন ধরে টাইম পত্রিকায় অর্থনীতির কলাম লেখেন। ওঁর মতে এই বইটি আসলে একটি সাংবাদিকতা, ফাইনান্স ও অর্থনীতির বিখ্যাত লোকেদের সম্বন্ধে লেখা। আমার মনে হয়েছে বহু বছর ধরে বহু পরিশ্রমে লেখা একটি ইতিহাস, বহু পণ্ডিতের অজানা গল্প ও তাঁদের কোন একটি বিশেষ তত্ত্বের প্রতি পক্ষপাতের মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণ, যা প্রায় গোয়েন্দা গল্প পড়ার মতন গতিতে পড়ে ফেলা যায়।

    যেমন আরউইন ফিশারের গল্প। ১৯২৯ সালের ১৫ই অক্টোবর উনি ঘোষণা করলেন যে স্টকের দাম চিরকালীন সর্বোচ্চ মানে পৌঁছেছে এবং সেখান থেকে সহজে কমবে বা বাড়বে না। অর্থাৎ যাই ঘটুক না কেন বাজার একইরকম থাকবে। তার ঠিক দুই সপ্তাহ বাদে শুরু হল গ্রেট ডিপ্রেসন। আরউইন ফিশার - আধুনিক গাণিতিক অর্থনীতির জনক - বুঝতে ভুল করেছিলেন বাজারের গতিবিধি। ফিশারের পিএইচডি গবেষণাপত্রটি সম্বন্ধে পল সামুয়েলসন বলেছেন অর্থনীতির ইতিহাসে সবথেকে ভাল ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা, ফিশার কুখ্যাত হলেন ১৯২৯ সালের তাঁর করা এই ভুল ভবিষ্যতবাণীর জন্য। বইটি পড়লে আরও জানা যাবে যে ফিশারের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র একবার চুরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু উনি হাল না ছেড়ে টিবির ও ভাগ্যের সাথে লড়াই করেছেন, আবার নতুন করে লিখেছেন চুরি যাওয়া গবেষণা।

    জানা যাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার অ্যান্টি এয়ারক্রাফট সেলের সংখ্যা বড় বড় কুড়িটি হবে না ছোট ছোট ছশোটি - সেই সিদ্ধান্ত কেমন ভাবে নেওয়া হয়েছিল। আকারে বড় হলে সেলের ধংসাত্মক ক্ষমতা অনেক বাড়বে কিন্তু অন্যদিকে ছোট হলে বাড়বে নিশানায় নির্ভূল ভাবে আঘাত করার ক্ষমতা। সেই সিদ্ধান্ত নিতে দুঁদে সৈনিকরা দ্বারস্থ হয়েছিল এক সংখ্যাতত্ত্ববিদের, যাঁর নাম মিলটন ফ্রিডম্যান। অপারেশন রিসার্চের এই সমস্যার সমাধান থেকেই পরবর্তীকালে তৈরি হল আধুনিক কালের 'পোর্টফোলিও থিওরি'।
    খুবই সহজ বোধ্য ভাষায় ব্যাখ্যা করা আছে 'M&M Propositions' যার মূল বক্তব্য হল পিজার টুকরো ১৬ ভাগই কর আর ৮ ভাগই কর পরিমাণ সেই একই থাকে। শুনতে অবাক লাগলেও ঠিক এই কাজের জন্যই পরবর্তীকালে নোবেল পান মডিজিলিয়ানি এবং মিলার।

    এরকম বহু ঘটনা, পণ্ডিতদের মানসিক অবস্থার আলোচনা ও দীর্ঘ কয়েকবছরের গবেষণার ফসল হল বইটি। বইটি শেষ হয় অ্যালান গ্রীনস্প্যানকে দিয়ে। মূল যে প্রশ্নটি ফক্স করেছেন তাহল - অর্থনীতি ও ফাইনান্সের বহুবিধ তত্ত্ব রয়েছে, ক্রমাগত আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন তত্ত্ব ও পরিশীলিত হচ্ছে পুরনো ধারণা, কিন্তু তাও মাঝেমাঝেই দেখা যায় অর্থনীতির আকাশে বিভিন্ন বুদবুদ, কখনো তার নাম 'ডট কম', কখনো বা 'রিয়েল এস্টেট'। কেন এতদিনেও কোন তত্ত্ব আবিষ্কৃত হল না যা দিয়ে গ্রীনস্প্যান বুঝতে পারতেন আসলে সামগ্রিক উন্নয়নের বদলে ফুলে ফেঁপে উঠছে এক বিশাল বুদবুদ? প্রশ্নটা নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন জায়গায় এই নিয়ে অর্থনীতিবিদরা গবেষণা চালাচ্ছেন, কিন্তু তাও আজ অবধি 'অধরা' বুদবুদের রহস্য।

    এছাড়াও বইটিতে রয়েছে সমস্ত বিখ্যাত লোকেদের গবেষণার নাতিদীর্ঘ বিবরণ, রয়েছে অসংখ্য নোট, সমস্ত পেপার ও বইয়ের তথ্যসূচী। শুধুমাত্র এই পরিশ্রম ও সংকলিত তথ্যের জন্যই আধুনিক কালের গাণিতিক অর্থনীতির একটি মূল্যবান দলিল হিসেবে বইটি অমূল্য। সবথেকে বড় কথা হল বিদগ্ধ পণ্ডিত বা আপামর জনগণ কারুরই বুঝতে বা পড়তে একটুও অসুবিধা হবে না, এমনই সাবলীল বইটির ভাষা। তাই যাঁরা 'এফিশিয়েন্ট মার্কেট হাইপোথিসিস'কে গালি দেন তাঁরাও বুঝে নিতে পারেন যে বাজারে শেয়ারের দাম যে 'র‌্যাণ্ডম ওয়াক' ফলো করে বলে অনেকে দাবী করেন সেটা কোন রাজনৈতিক চক্রান্ত নাকি বিকল্প গাণিতিক তত্ত্বের অভাব। অন্যদিকে যাঁরা 'এফিশিয়েন্ট মার্কেট হাইপোথিসিসে' 'বিশ্বাস করেন' তাঁরাও জেনে নিতে পারবেন কোথায় কখন তাঁদের বিশ্বাস নড়িয়ে দেবার মতন ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে সুন্দর বই, দিব্য একটি সংগ্রহ।

    ২৫ জানুয়ারী, ২০১০
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ২৫ জানুয়ারি ২০১০ | ১১২৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন