এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • দানিয়ুব ও দ্বিচক্রযান

    sumana sengupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ২৪ নভেম্বর ২০২৩ | ৯৪০ বার পঠিত
  • দ্বিতীয় দিন ব্রাহ্ম মুহূর্তে শয্যা ত্যাগ করে গোড়ালি থেকে গলা পর্যন্ত ঠেসে ব্রেকফাস্ট করে জামা জুতো পরে বেরলাম পদব্রজে শহর পরিক্রমায়। আমাদের কিউটসা ট্যুর অপারেটর ধীরজ, যে তার নামের মতোই পরম ধৈর্যশীল কিন্তু করিত্কর্মা, আলাপ করিয়ে দিল ট্যুর গাইড রবার্টের সঙ্গে। Excellent guide, very thorough, কিন্তু জীগরকা টুকরা মুম্বাই শহরকে শুরুতেই দুটো গাল দিয়ে সারাদিন আমার বিরাগভাজন হয়ে রইলো।
    ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে প্রথমেই ট্রামে চড়ে ভ্লাটাভা ক্রস করে চলে গেলাম প্রাগ কাস্ল্ কমপ্লেক্সে। পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাচীন কাস্লটইর নির্মাণ শুরু হয় খ্রিষ্টীয় নবম শতকে। নানাবিধ পলিটিক্যাল উথ্থান পতনের ভিতর দিয়েও নিরন্তর দোর্দণ্ড প্রতাপ ক্ষমতার উত্স রয়ে গেছে এই দুর্গ প্রাসাদ। এর মধ্যে এর ছত্রছায়ায় রাজত্ব করেছেন বোহেমিয়ান রাজপুরুষেরা, হোলি রোমান এম্পেররবর্গ, এবং অতুলপরাক্রান্ত হ্যাবসবুর্গ রাজবংশ। পূর্বতন চেকোস্লোভাকিয়ার কমিউনিস্ট প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান চেক রিপাবলিকের প্রেসিডেন্টের অফিস ও এই সুপ্রাচীন কাস্ল। পরিখা ক্রস করে এই কাস্লে ঢোকার পথে সুসজ্জিত রয়্যাল ব্যাণ্ড সুশৃঙ্খল মার্চ পাস্ট করে আমাদের পেরিয়ে গেল, এবং প্যালেসের সিঙহদরোজা য় দেখা পেলাম আসমানী উর্দি তে চিত্রার্পিতবৎ প্যালেস গার্ড দের, যাদের পুরোভাগে রয়েছেন একজন মহিলা সেনানী।
    কাস্লের ভিতরে ঢুকে ই কোহ্লস ফাউন্টেন, এবং অতঃপর জগৎবিখ্যাত সেণ্ট ভাইটাস ক্যাথিড্রাল। মূল ক্যাথিড্রালটি প্রায় একশ বছর ধরে গথিক শৈলীতে গঠিত যাতে রয়েছে ভারী সুন্দর লাস্ট জাজমেন্ট র মোজেইক করা গোল্ডেন গেট এবং নেট ভল্টস সমন্বিত সেণ্ট ওয়েঙকেস্লস চ্যাপেল, যার ঈশানকোণে সাতটি তালার আগল দেওয়া এক দরজা আগলে রেখেছে চেক রাজবঙশের অসূর্যম্পশ্য রত্নভাণ্ডার। বাকি ক্যাথিড্রাল ঢেউ খেলানো রেনেসা এবং বারোক স্টাইলে বানানো, দুশ বছর পরে। এই পর্বে সঙযোজিত হয়েছে চোখ ধাঁধানো সাউথ টাওয়ার এবং বিপুলাকৃতি অর্গান। একাদশ শতাব্দীতে আরম্ভ হয়ে অবশেষে প্রায় হাজার বছর পরে বিঙশ শতকে এই ম্যাসিভ ক্যাথিড্রাল টি সম্পূর্ণ হয়।
    ক্যাথিড্রাল ঘুরে দেখে কাস্লের মূল দরজা দিয়ে বেরিয়েই সামনের চবুতরা থেকে লাল টুকটুকে রুফটাইলসে সাজানো লেসার কোয়ার্টারসের চমৎকার প্যানোরামিক দর্শন পাওয়া যায়। এখান থেকে সরু সিড়ি দিয়ে নেমে লেসার কোয়ার্টারস পেরিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় ভ্লাটাভা র ধারে যেখানে চার্লস ব্রিজ। মধ্য যুগ থেকে ১৮৪১ সন অবধি এই ব্রিজ ই ছিল প্রাগ কাস্ল এবং ওল্ড টাউনের মধ্যে একমাত্র সঙযোগের উপায়। পায়ে হাঁটা এই স্টোন ব্রিজ থেকে দিগন্ত জোড়া ভ্লাটাভা র ভিউ তো পাওয়া যায় ই তার সঙ্গে স্থানীয় আর্টিস্ট এবং গাইয়ে বাজিয়ে দের স্ট্রিট আর্ট ও বিলক্ষণ উপভোগ করা যায়। ব্রিজের দুধারে বালুস্ট্রাড জুড়ে সারি দিয়ে সাজানো খৃষ্টীয় সাধু সন্তের ৩০টি বৃহৎ স্ট্যাচু। অরিজিনাল মূর্তি গুলি কিছু ভ্লাটাভা র ফ্রিকোয়েন্ট বন্যা য় বিধ্বস্ত কিছু সযত্নে অন্যত্র সঙরক্ষিত, এখন যাদের দেখা যায় তারা সকলেই রেপ্লিকা, তবে তারাও রূপে গুণে আয়তনে নি:সন্দেহে ইমপ্রেসিভ।
    আর পাচটা আ্যসর্টেড ট্যুরিস্টদের মতোই দুলকি চালে চার্লস ব্রিজ ক্রস করে ওল্ড টাউনের কব্ল্ড স্ট্রিট এর উপর দিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে দিব্যি হাটছিলাম, হঠাৎই এক অতি বিচিত্র ঐতিহাসিক মুহূর্তের মধ্যে গোৎ খেয়ে ঢুকে পড়লাম। আমাদের সহযাত্রী মেজর জেনারেল ওমপ্রকাশ গুলিয়া vsm, retired from indian army, avid cyclist, শৌখিন, high on life, এবং কোনো এক অলৌকিক মন্ত্রবলে ঈর্ষণীয় ফিটনেসের বাঘের সঙ্গে অদম্য বিয়ার প্রীতির গরুকে সর্বদাই এক ঘাটে জল খাওয়ান। তিনি হঠাৎ করে "সুন তু মেরা এক ফোটো লে লে" বলে আমার হাতে নিজের আইফোনটি গুজে দিয়ে রাস্তা জুড়ে আকা LGBTQ solidarity রেনবো আল্পনা র উপরে শীর্ষাসনে লম্বমান হয়ে গেলেন।
    আমি ঘটনার আকস্মিকতায় দেড় ইঞ্চি হা হয়ে যাওয়া মুখকে খপ করে বন্ধ করে, পরস্মৈপদী দুর্মূল্য মোবাইল কে দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরে মাটি তে নীলডাউন হয়ে এই ত্রিকালজয়ী ছবিকে খচাখচ গুগল ক্লাউডে অমর করে রাখলাম। তারপরেই আৎকে উঠে আবিস্কার করলাম গাইডসমেত বাকি দলটা জনারণ্যে র ভিতর দিয়ে কোনো একটা বাক ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এই বিদেশ বিভুই য়ে এই অবেলায় হারিয়ে গেলে যে হাতে কিরকম হ্যারিকেন হয়ে যাবে সেই ভয়ভাবনায় দুরুদুরু বুকে সম্ভাব্য দুএকটা এপথ সে পথ খুঁজে হঠাৎ চোখে পড়ল প্রকাণ্ড এক পরমাশ্চর্য ঘড়ি। এই সেই প্রাগ শহরের মেডিয়াভাল আ্যস্ট্রনমিক্যাল ক্লক, তার সামনে আমার হারানিধি হামসফরের দল। হাপাতে হাপাতে এসে জয়াদিকে বললাম, " জানেন আরেকটু হলেই একা একা হারিয়ে যাচ্ছিলাম ! " উনি অবাক হয়ে বললেন, " ও মা, সে কি? জেনারেল গুলিয়া ছিলেন তো? " ছিলেন বটে, কিন্তু ওনার মাথা মাটির দিকে আর পা আকাশের দিকে ছিল বলে দিকদর্শনএর ব্যাপারে একদমই ভরসা করতে পারি নি। একথা আর জয়াদিকে বললাম না। উনি মনেপ্রাণে ফৌজী, মিছিমিছি আমার এই অনাস্থায় দু:খ পাবেন, ঘড়ির দিকে মন দিলাম। The Orloj নামে খ্যাত ওল্ড টাউন হলের দেওয়াল জোড়া পৃথিবীর প্রাচীনতম চলিষ্ঞু এই ঘড়ির বয়স পাচশ বছরের ও বেশী। ঘড়ির দুটি প্রকাণ্ড কারুকার্য খচিত ডায়ালের মধ্যে উপরেরটি মহাজাগতিক গ্রহ নক্ষত্রের প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর অবস্থান নির্দেশ করে, নীচের টি একটি গোলাকৃতি ক্যালেন্ডার, যাতে ১২টি মাস নামের বদলে সঙশ্লিষ্ট হার্ভেস্টিঙ আ্যক্টিভিটির ছবি দিয়ে চিত্রিত।
    এই ঘড়ির আ্যনিমেশন ও চমকপ্রদ। প্রতি ঘন্টায় মৃত্যু রূপী এক কঙ্কালের ঘণ্টা বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে কাম, মোহ, এবং লোভ এই তিনরকম পাপ দুপাশে মাথা নাড়ে আর দুদিকে জানালা খুলে গিয়ে টুয়েলভ আ্যপোসল্সের প্রতিকৃতি প্রকাশিত হন। বাবারে বাবা! যাকে বলে ম্যাকাবারের পরাকাষ্ঠা!!!
    The Orloj ছাড়াও ওল্ড টাউন সেন্টারে সুন্দর কালো পাথরের ফোয়ারার চারিপাশে দেখা যাবে প্রাচীন বণিক দের রঙীন ঘরবাড়ি, পুরাতন ট্যাক্স কলেক্টরট এবং সেযুগের গণিকালয়। আমাদের পরিক্রমা এখানেই শেষ হল।
    সকাল থেকে পায়ে হেঁটে গোটা শহর চষে ফেলে এমন খিদে পেয়ে গেছিল যে একাই একটা প্রকাণ্ড pizza আর একবাটি পর্ক সালাদ খেয়ে হোটেলে গিয়ে সটান ঘুম লাগালাম। কাল সক্কাল সক্কাল রওনা দেব ভিয়েনা র পথে, যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে দানিয়ুব। এবং দ্বিচক্রযান।

    Royal band



    Madame Castle Guard


    The Castle and the Cathedral


    Kohls Fountain

    St. Vitus Cathedral,


    Netted vaults and stained glass windows of St. Wenceslaus chapel


    Panorama of Lesser Quarters


    Charles Bridge


    Cartoon artist on Charles Bridge, my LM10 in red


    Charles Bridge থেকে ভ্লাটাভা

    সেই শীর্ষাসন


    The Orloj

    Old Town Centre


    নৈশভোজ
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ২৪ নভেম্বর ২০২৩ | ৯৪০ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ** - sumana sengupta
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে প্রতিক্রিয়া দিন