এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • 'জলাভূমিটা বোজানো যেন সত্যিই বন্ধ হয়'

    প্রতিমা দত্ত লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ০৬ জুন ২০১১ | ৭৩৫ বার পঠিত
  • আমি প্রতিমা দত্ত, স্বর্গীয় তপন দত্তর ওয়াইফ। গত ৬ মে আমার স্বামীকে নৃশংস ভাবে গুলি করে মারা হয়েছে। বালি লেবেল ক্রসিং-এর ধারে। গত সাড়ে তিন বছর যাবৎ তিনি একটি জলাভূমি নিয়ে লড়াই করছিলেন। যদিও তার সঙ্গে আরও অনেক কিছু নিয়েই লড়াই করছিলেন। বালি কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক --- তার গ্রাহক সমিতি বানিয়ে উনি লড়াই করছিলেন। যাতে, গ্রাহকরা যে টাকা জমা রাখছে, সে টাকা ফেরত পায়। ইলেক্‌ট্রিক সাপ্লাই-এর জন্য গ্রাহক সমিতি বানিয়ে সেখানে উনি লড়াই করছিলেন। জলাভূমি বাঁচাও কমিটি বানিয়ে সেখানে লড়াই করছিলেন। উনি একটা কথা বলতেন, আমি একটা রাজনৈতিক দলের কর্মী, কিন্তু সেখানে থেকে আমি উপলদ্ধি করছি, রাজনৈতিক দলে থেকে, একটা ব্যানারের তলায় থেকে সব মানুষের জন্য সব কাজ করা যায় না। তাই জন্য নাগরিক মঞ্চ দরকার হয়। আর তাই জন্যই তিনি সিটিজেনস সায়েন্স ফোরাম বানিয়েছিলেন। জলাভূমি রক্ষা কমিটি বানিয়েছিলেন। যাতে বেশি সংখ্যক মানুষকে সাথে নিয়ে এই আন্দোলনগুলো করা যায়।

    জলাভূমি বাঁচাও কমিটি গড়ে উনি যখন প্রথম দেখাশুনো শুরু করলেন, পঞ্চায়েত অফিস থেকে শুরু করে, পঞ্চায়েত সমিতি, বিডিও, ডিএম --- সমস্ত জায়গায় ঘুরেছেন। তিনি দেখলেন, কোনও জায়গায় কোনও কাজ হচ্ছে না, সবাই যা রিপোর্ট দিচ্ছে, উলটো রিপোর্ট দিচ্ছে। তখন তিনি হাইকোর্টে গেলেন। জলাভূমি বোজানোতে স্টে অর্ডার চেয়ে কেস করলেন। যেদিন তিনি স্টে অর্ডার পেলেন, সেদিন ওই জলাভূমিতে যে মাছের ভেড়ি ছিল, সেগুলো সব লুঠ হয়ে গেল। তখন লিলুয়া থানায় উনি কমপ্লেন করলেন, দেখা গেল, কী একটা কারণে লিলুয়া থানা কোনও কথা বলল না। উনি যখন আন্দোলন চালিয়ে যেতে লাগলেন, তখন বিভিন্ন ভাবে ওনার কাছে হুমকি আসতে লাগল। যে এখানে তুমি ছেড়ে দাও, এখানে তুমি এসো না, এখান থেকে তুমি চলে যাও। তখন তাঁর মনে একটা জিদ চেপে বসল, যে করেই হোক, এই জলাভূমিটা বোজানো আমি বন্ধ করবই। এই জলাভূমি থেকে ষাট বছর আগে কিছু পয়সার বিনিময়ে জল সরবরাহ করা হত। একসময় এই জলাভূমিতে নৌকো চলত। এইসব ঐতিহাসিক তথ্য তিনি জোগাড় করেছিলেন।

    আস্তে আস্তে আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম, যত দিন যাচ্ছিল, তত যারা জলা ভরাট করছিল, তারা আরও রেগে যাচ্ছে। শেষে একদিন উনি একটা মিটিং করলেন, বোম্বে রোডের ওপর। বাইরে থেকে কে একজন ফোন করে বললেন, তোমরা ওখানে মিটিং কোরো না, বোমা পড়বে। যদি প্রাণে বাঁচতে চাও, এখান থেকে চলে যাও। সেসময় আমরা আস্তে আস্তে ওখান থেকে বেরিয়ে পড়ি। আরেকবার দেখেছি, প্রায় ১০০ টা বড়ো বড়ো ডাম্পার নিয়ে এসে মাটি ফেলে দিল। আমি ওনার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজগুলো করতাম। আমরা রাস্তা অবরোধ করেছিলাম, কেন হাইকোর্ট অর্ডারের পরেও মাল পড়ছে। তখন সেখানে লিলুয়া থানা হঠাৎ উপস্থিত হয়ে গেলেন। এবং আমাদের আশ্বাস দিলেন, আপনারা বাড়ি চলে যান, আমরা দেখছি ব্যাপারটা। পড়ে শুনলাম, আমাদের সবার নামে একটা কেস হয়ে গেছে সেখানে। একটা রাস্তা অবরোধের জন্য কখনও কেস হয় না। কিন্তু আমরা সমন পেলাম। এইভাবে প্রশাসনের মাধ্যমেও আমাদের হ্যারাস করার চেষ্টা করা হচ্ছিল।

    উনি একটা কথা বলতেন সবসময়, 'এইখানে যারা কাজ করছে, তাদের মাসল পাওয়ার আছে, মানি পাওয়ার আছে। আমার মাসল পাওয়ারও নেই, মানি পাওয়ারও নেই। ওরা আমাকে শেষ করে দেবে'। আমি মাঝে মাঝে বলতাম, যদি এইরকমই হয়ে থাকে অবস্থাটা, তবে আমাদেরও তো একটা সংসার আছে, তুমি আস্তে আস্তে সরে এসো। বলত, 'না, আমি যেখানে পা বাড়িয়েছি একবার, তার শেষ না দেখে ছাড়ব না, তার জন্য যা হয় হবে। ওরা আমাকে শুইয়ে দিতে পারে, কিন্তু ওরা আমাকে বসিয়ে দিতে পারবে না'। আর এই ঘটনাটাই ৬ তারিখে ঘটে গেল। ওরা, যারা জলা বোজাই করছে, তারা তাঁকে শুইয়ে দিল, কিন্তু বসাতে পারেনি। তাই আপনাদের কাছে আমার আবেদন, আপনারা সবাই মিলে আমাকে সহযোগিতা করেন। তপন দত্ত অনেক আশা নিয়ে স্বপ্ন নিয়ে জলাটা রক্ষা করতে গিয়েছিলেন। অনেক পরিশ্রম তিনি করেছিলেন। তিনি এর জন্য অনেক সম্মান পেয়েছেন। তিনি কখনও আর্থিক সচ্ছ্বলতা দেখেননি, তিনি রোজগার করতেন ভালোই, কিন্তু তার বড়ো অংশ খরচ হত এইসব কাজ করতে গিয়ে। তাই আপনাদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ, আপনারা এগিয়ে আসুন, যাতে তাঁর স্বপ্নটা সার্থক হয়। সে মানুষটা জলাটার জন্য প্রাণ দিয়ে গেল, সেই জলাটা বোজানো যেন সত্যিই বন্ধ হয়।

    ২৮ মে ২০১১ কলকাতার স্টুডেন্টস হলে সভায় বালি জগাছা জলাশয় রক্ষা আন্দোলনের শহীদ তপন দত্তের স্মৃতিচারণায় তাঁর স্ত্রী প্রতিমা দত্ত।

    সংবাদ মন্থনে পূর্বপ্রকাশিত

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ০৬ জুন ২০১১ | ৭৩৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন