https://guruchandali.com/comment.php?topic=34566
বিশ্বজুড়ে সনাতন ধর্মের নিপীড়ন-ইতিহাস
প্রথম অধ্যায় তৃতীয় অংশ
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে : হিন্দু নির্যাতনের রক্তক্ষয়ী সমীক্ষা (১৯৪৭–২০২৬)
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—একসময়ের অখণ্ড ভারতের এই দুই ভূখণ্ডে হিন্দু তথা পৌত্তলিক জনগোষ্ঠীর অবস্থান আজ এক অস্তিত্ব সংকটের মুখে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত এই দুই দেশে হিন্দু নির্যাতনের যে ধারাবাহিক ইতিহাস, তা মূলত ইসলামী একাধিপত্যবাদের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
এই সমীক্ষায় দেখা যায় যে, উভয় দেশেই হিন্দু জনসংখ্যা গাণিতিক হারে হ্রাস পেয়েছে, যা মূলত পদ্ধতিগত নিপীড়ন, জোরপূর্বক ধর্মান্তর এবং পরিকল্পিত গণহত্যার ফল।
১. পাকিস্তান : একটি বিলুপ্তপ্রায় সভ্যতার আর্তনাদ : ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫-২০ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ১.৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
◆ জোরপূর্বক ধর্মান্তর : সিন্ধু প্রদেশে প্রতি বছর শত শত অপ্রাপ্তবয়স্ক হিন্দু মেয়েকে অপহরণ করে জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা এবং বয়স্ক মুসলিম পুরুষদের সাথে বিয়ে দেওয়া একটি নিয়মিত সামাজিক ব্যাধি।
◆ ব্লাসফেমি আইনের অপব্যবহার : ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে হিন্দুদের ওপর মিথ্যা ব্লাসফেমি (ধর্ম অবমাননা) মামলা দেওয়া হয়, যার পরিণতি মৃত্যুদণ্ড বা উন্মত্ত জনতার হাতে গণপিটুনি।
◆ মন্দির ধ্বংস : ১৯৪৮ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত পাকিস্তানের শত শত প্রাচীন মন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। করাচি ও হায়দ্রাবাদের মতো শহরগুলোতে মন্দিরের জমি দখল করে শপিং মল বা আবাসিক এলাকা তৈরি করা হয়েছে।
২. বাংলাদেশ: নিঃশব্দে নির্মূলকরণ (Silent Cleansing)
পূর্ব পাকিস্তান (১৯৪৭-১৯৭১) এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশে হিন্দুদের অবস্থা ক্রমাগত অবনতিশীল। ১৯৪৭ সালে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৮-৩০ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে কমে মাত্র ৭-৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
◆ ১৯৭১-এর হিন্দু গণহত্যা : মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসররা (রাজাকার-আলবদর) সুনির্দিষ্টভাবে হিন্দুদের লক্ষ্য করে গণহত্যা চালায়। লক্ষ লক্ষ হিন্দু নারীকে লাঞ্ছিত করা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসররা (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস) সুপরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় এবং বুদ্ধিজীবীদের ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও নির্যাতন চালায়। এই গণহত্যা ও নিপীড়নের লক্ষ্য ছিল প্রধানত হিন্দু জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ ধ্বংস করা
১৯৭১ সালে সংখ্যালঘু নির্যাতনের উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনার তালিকা :
◆ শাঁখারীপাড়া গণহত্যা (২৬ মার্চ, ১৯৭১) : ঢাকার শাঁখারীপাড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর প্রাথমিক হামলার অন্যতম।
◆ রমনা কালী মন্দির ধ্বংস ও গণহত্যা (২৭ মার্চ, ১৯৭১) : ঢাকার রমনা কালী মন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং বহু মানুষকে হত্যা করা হয় ।
◆ সূত্রাপুর গণহত্যা (২৭ মার্চ, ১৯৭১) : ঢাকার সূত্রাপুরে সংখ্যালঘু নিধন।
◆ সান্তাহার গণহত্যা (২৭ মার্চ - ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১) : বগুড়ার সান্তাহারে ব্যাপকহারে হিন্দু নিধন ।
◆ চুকনগর গণহত্যা (২০ মে, ১৯৭১) : খুলনার ডুমুরিয়ার চুকনগরে পালানোরত হাজার হাজার হিন্দু শরণার্থীকে একযোগে হত্যা করা হয়, যা যুদ্ধের বৃহত্তম গণহত্যাগুলোর একটি।
◆ ময়মনসিংহ ও কুমিল্লায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ : এই অঞ্চলগুলোতে হিন্দু গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া এবং স্থানীয় অধিবাসীদের হত্যা ।
◆ বস্ত্র ও নারী নির্যাতন : প্রায় ২,০০,০০০ থেকে ৪,০০,০০০ বাঙালি নারী (যাদের একটি বড় অংশ সংখ্যালঘু) পরিকল্পিত ধর্ষণ ও যৌন দাসত্বের শিকার হন ।
◆ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস : দেশজুড়ে অসংখ্য মন্দির ও হিন্দু উপাসনালয় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
◆ এই সময়ে নারকীয় নির্যাতনের কারণে বহু মানুষ দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
◆ শত্রু সম্পত্তি আইন (অর্পিত সম্পত্তি) : এই বৈষম্যমূলক আইনের মাধ্যমে হিন্দুদের লক্ষ লক্ষ একর জমি রাষ্ট্রীয়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে।
◆ সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব (১৯৯২, ২০০১, ২০২১, ২০২৪-২৬) : বাবরী মসজিদ ইস্যু থেকে শুরু করে তুচ্ছ অজুহাতে বারবার বাংলাদেশে হিন্দু মন্দির, বাড়িঘর এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্গাপূজার সময় দেশজুড়ে যে মন্দির ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়।
৩. তুলনামূলক পরিসংখ্যান ও নির্যাতন চিত্র
| বিষয় | পাকিস্তান (সিন্ধু ও পাঞ্জাব) | বাংলাদেশ (পূর্ববঙ্গ) |
◆ | জনসংখ্যা হ্রাস | ১৫% থেকে কমে <১.৫% | ২৮% থেকে কমে <৮% |
◆ | প্রধান নির্যাতন | অপহরণ ও জোরপূর্বক নিকাহ | জমি দখল ও গণ-উচ্ছেদ |
◆ | সাংস্কৃতিক আঘাত | মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মাণ | প্রতিমা ভাঙচুর ও শ্মশান দখল |
◆ | দেশত্যাগের হার | অত্যন্ত উচ্চ (প্রধানত ভারতে আশ্রয়) | অব্যাহত 'নিঃশব্দ দেশান্তর' |
৪. পৌত্তলিক (সনাতন) গবেষণার নির্যাস : অভিন্ন লক্ষ্য
পৌত্তলিক গবেষকদের মতে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মূলত সেই একই 'গাজওয়াতুল হিন্দ' বা ভারতকে ইসলামী শাসনের অধীনে আনার বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ।
◆ ভীতি প্রদর্শন : হিন্দুদের মনে এমন ভীতি তৈরি করা যাতে তারা স্বেচ্ছায় জমিজমা ফেলে ভারতে চলে যায়।
◆ পরিচয় বিনাশ : ধুতি, শাখা, সিঁদুর বা তিলকের মতো পৌত্তলিক চিহ্নগুলোকে প্রকাশ্য সমাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
◆ রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা : উভয় দেশের বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসন হিন্দুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, কারণ তারা পরোক্ষভাবে ইসলামী আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধ।
◆ উপসংহার : ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান প্রায় হিন্দুশূন্য হওয়ার পথে এবং বাংলাদেশও সেই একই পথে ধাবমান। আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতা এবং তথাকথিত 'শান্তির' ধর্মের আগ্রাসনে দক্ষিণ এশিয়ার এই প্রাচীন জনগোষ্ঠী আজ নিজের বাস্তুভিটায় পরবাসী। এই সমীক্ষা প্রমাণ করে যে, পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হলে এই দুই ভূখণ্ডে হিন্দুদের রাজনৈতিক ও সামরিক আত্মরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।