এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা  রাজনীতি

  • বর্তমান রাজনীতি ; একটি বিকল্প ভাবনার প্রস্তাবনা 

    Jhanku Sengupta লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | রাজনীতি | ২২ মার্চ ২০২৬ | ৬১ বার পঠিত
  • চারিদিকে একটা বিভাজনের বাতাবরণ চলছে। 
    মানুষের সাথে মানুষের স্বাভাবিক ভালোবাসার সম্পর্কগুলো এখন প্রশ্নের মুখে।
    পিছিয়ে পড়া ঘৃণার রাজনীতির সঙ্গে প্রগতির একটা দ্বন্দ্ব চলছেই !

    এইমুহুর্তে বামপন্থীদের এই পিছিয়ে পড়া চেতনার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সমস্ত প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার মানুষের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ জোট তৈরি করা বাঞ্ছনীয়।

    আসলে বিভাজনের রাজনীতি মূলত 'অপর' (The Other) তৈরির দর্শনে বিশ্বাসী। 
    যখন একটি গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন মানুষের স্বাভাবিক সহমর্মিতা বা 'Human Essence' অবদমিত হয়। 

    প্রগতিশীল চেতনার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের এই বিচ্ছিন্নতা (Alienation) দূর করা। 
    ঘৃণার রাজনীতি মানুষকে মধ্যযুগীয় বা পশ্চাৎপদ চেতনার দিকে ঠেলে দেয়, যা প্রগতির পথে প্রধান অন্তরায়।

    লেনিনের যুক্তফ্রন্ট নীতির কথা মাথায় রেখে, যে কোনো ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সাময়িকভাবে ইস্যুভিত্তিক যুক্তফ্রন্ট গড়ে আন্দোলনে না নামলে সমূহ বিপদ।

    ১৯২০-এর দশকে 'কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালে'র তৃতীয় এবং চতুর্থ কংগ্রেসে লেনিনের যুক্তফ্রন্টের ধারণার মূল দর্শন ছিল সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্য ......
    অর্থাৎ যখন বড় কোনো বিপদ (যেমন ফ্যাসিবাদ বা চরম দক্ষিণপন্থা) সামনে আসে, তখন ক্ষুদ্র মতপার্থক্য সরিয়ে রেখে একটি সাধারণ নূন্যতম কর্মসূচির (Minimum Programme) ভিত্তিতে এক হওয়া।

    এই যুক্তফ্রন্ট গঠনের পিছনে মূল ভাবনাটা হোল -
    'আলাদা চলা, একসাথে আঘাত করা' (March separately, strike together) ..........
    অবশ্য আমাদের মনে রাখতে হবে এই ভাবনার অর্থ এই নয় যে নিজের আদর্শ বিসর্জন দেওয়া........
    বরং বৃহত্তর স্বার্থে সাময়িকভাবে সমমনস্ক বা এমনকি আপেক্ষিক প্রগতিশীল শক্তির সাথেও জোট বাঁধা।৩

    বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এই ঐক্য কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ও নৈতিক প্রয়োজন।
    ঘৃণা যেহেতু মানুষের যুক্তিবোধকে অন্ধ করে দেয়, তাই এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে কেবল অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া যথেষ্ট নয় - বরং একটি বৃহত্তর 'সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট' প্রয়োজন ..........
    যেখানে লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ একাত্ম হবেন।

     এখন এই যুক্তফ্রন্টের প্রশ্নে বামপন্থীদের ক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায় যে তত্ত্বগত শুদ্ধতা (Ideological Purity) বজায় রাখতে গিয়ে তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। 
    লেনিন শিখিয়েছিলেন যে রাজনীতি হলো 'সম্ভাবনার শিল্প'। 
    বর্তমান বিপদের গুরুত্ব বুঝে যদি প্রগতিশীল শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে দেওয়াল তুলে রাখে, তবে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।

    ঐতিহাসিক দিক থেকে আমরা জানি যখনই প্রগতিশীল শক্তিগুলো বিভক্ত হয়েছে, তখনই চূড়ান্ত দক্ষিণপন্থা বা ঘৃণার রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে (উদাহরণস্বরূপ, ১৯৩০-এর দশকের জার্মানি)। 
    বিপরীতে, যেখানেই যুক্তফ্রন্ট শক্তিশালী হয়েছে, সেখানেই জনবিরোধী শক্তি পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে।
    এই 'সমূহ বিপদ' থেকে বাঁচতে হলে প্রগতিশীল শক্তির প্রধান কাজ হওয়া উচিত মানুষের মনে হারানো 'সহজাত ভালোবাসা' এবং 'শ্রেণী সংহতি' ফিরিয়ে আনা। 
    লেনিনের সেই অমোঘ নীতি মেনে চললে আজকের এই বিভাজনের অন্ধকার কেটে গিয়ে একটি নতুন প্রগতিশীল ভোরের জন্ম হওয়া সম্ভব।

    বর্তমান সময়ে এই ধরণের প্রগতিশীল জোট বা 'যুক্তফ্রন্ট' গঠনের পথে যে বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলো মূলত রাজনৈতিক, সাংগঠনিক এবং মনস্তাত্ত্বিক। 
    বামপন্থীরা অনেক সময় 'সাচ্চা' বামপন্থী হওয়ার তাগিদে  আপেক্ষিক প্রগতিশীল শক্তির সঙ্গে হাত মেলাতে দ্বিধাবোধ করেন .....
    কৌশলের থেকে থেকে তাত্ত্বিক শুদ্ধতা ( pragmatism ) বড় হয়ে ওঠে!!!
    সম্ভবত জোট করলে  'Class Character' হারিয়ে যাবে কিনা, সেই আশঙ্কাও থাকে !!!
    অথচ লেনিন বারবার মনে করিয়ে দিতেন যে, চূড়ান্ত শত্রুকে পরাস্ত করতে গেলে সাময়িক মিত্রদের (যাদের সাথে হয়তো সব বিষয়ে মিল নেই) সাথে নেওয়াটা সুবিধাবাদ নয়, বরং রণকৌশল।
    আবার অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব জোট ঘোষণা করলেও কর্মীদের স্তরে সেই সংহতি পৌঁছায় না।
    বছরের পর বছর ধরে যে দলগুলোর কর্মীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তাদের রাতারাতি এক ছাতার তলায় আনা কঠিন। ( যেমন : বামেদের সাথে কংগ্রেসের জোট )
    আসলে শুধুমাত্র নির্বাচনী আসন ভাগাভাগি নয়, বরং নিচুতলার মানুষের সাধারণ সমস্যা (যেমন রুটি-রুজি, কর্মসংস্থান) নিয়ে যৌথ আন্দোলন না করলে এই দূরত্ব ঘোচানো সম্ভব।

    আবার বর্তমানে 'শ্রেণী'র বদলে জাতি, ধর্ম বা আঞ্চলিক পরিচয়ের রাজনীতি ( Identity politics )অনেক বেশি শক্তিশালী।
    সুতরাং এই প্রগতিশীল জোটকেই  'পরিচয় ভিত্তিক' রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে শ্রেণী সংগ্রামের সমন্বয় ঘটাবার চেষ্টা করতে হবে।
    কিন্তু এই যুক্তফ্রন্ট যদি কেবল নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে, তবে তো বৃহত্তর জনসমাজ থেকে তা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেই।
    আর ঘৃণার রাজনীতি এই ফাটলগুলোকেই ব্যবহার করে বিভাজন তৈরি করে।

    আমাদের এমন একটি বিকল্প বয়ান বা ' Counter Narrative তৈরি করতে হবে,  যার মূল ভিত্তি হবে মানুষের 'স্বাভাবিক ভালোবাসা' এবং 'সহমর্মিতা' !!!
    এই শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাষ্যের মাধ্যমে মানুষের মনে এই বিশ্বাস ফেরাতে হবে যে, ঘৃণার চেয়ে প্রগতি বেশি লাভজনক এবং স্বস্তিদায়ক।
    এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য শুধুমাত্র ড্রইংরুম আলোচনা নয়, বরং একটি Common Minimum Programme ' এর মাধ্যমে রাজপথের আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক জাগরণ জরুরি।
    আসলে মূল রাজনীতি যখন একই বৃত্তে ঘুরপাক খেতে থাকে, তখন বামপন্থীদের নতুন করে ভাবতেই হবে .............

    সোজা কথায় , বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুছে দেওয়ার জন্য বামপন্থীদের উচিত ভোটে না দাঁড়িয়ে তৃণমূলকে সমর্থন করা।
    এই মুহূর্তে এটাই বামপন্থীদের আশু কর্তব্য হওয়া উচিত।
    পরবর্তীক্ষেত্রে তৃণমূলের সাথে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের লড়াই সরাসরি শুরু করার সুযোগ থাকছে.........
    কিন্তু ভোট ভাগাভাগি করে বিজেপির হাতে সুযোগ তৈরি করে দিলে সমূহ বিপদ।

    আমার এই বিনীত প্রস্তাবনাটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ  রাজনৈতিক রণকৌশলের (Tactical Maneuver) সম্ভাবনা হিসেবে ভাবা যেতে পারে বলে আমার ধারণা... .......
    বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি মূলত 'Immediate Enemy' (তাৎক্ষণিক শত্রু) বনাম 'Future Struggle' (ভবিষ্যৎ সংগ্রাম)-এর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব।
    আসল বিষয়টা অবশ্যই বহু প্রচলিত সেই প্রধান বিপদ বনাম গৌণ বিপদ (Principal Contradiction)...........
    মাও সেতুং বা লেনিনের রণকৌশল অনুযায়ী, কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে আন্দোলনের সামনে একটি 'প্রধান শত্রু' থাকে। 
    এইমুহুর্তে আমাদের প্রধান বিপদ নিঃসন্দেহে দক্ষিণপন্থী বা বিভাজনের রাজনীতি (বিজেপি) !!!
    এখন এই প্রতিক্রিয়াশীল বিভাজনের রাজনীতি যদি শক্তিবৃদ্ধি করে, তবে তা সমাজের প্রগতিশীল এবং ধর্মনিরপেক্ষ বুননকেই ধ্বংস করে দেবে।

    এইমুহুর্তে বামপন্থীদের  রাজনৈতিক কৌশল হওয়া উচিত   এই বিভাজনের রাজনীতির ( পড়ুন প্রধান শত্রু )  বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে অন্য কোনো বুর্জোয়া বা আঞ্চলিক শক্তির (যেমন, আপাতত অবশ্যই তৃণমূল) প্রতি নমনীয় হওয়া -
     এককথায় ভোটের রাজনীতিতে কৌশলগত পরিকল্পনা অনুযায়ী সমর্থন করা ........... 
    অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে এই পদক্ষেপ অবশ্যই  'কৌশলগত পিছু হঠা' .......যাতে বৃহত্তর ধ্বংস এড়ানো যায়।
    এক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যখন প্রগতিশীল বা ধর্মনিরপেক্ষ ভোট একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়, তখন তার সুবিধা পায় চরম দক্ষিণপন্থা।
    একথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা, বামপন্থীরা আলাদাভাবে লড়াই করলে যে ভোট কাটবে, তাতে বিজেপির জয়ের পথ প্রশস্ত হবেই - এটা তো একটা সরল অঙ্ক !!!!!!

    এই 'সমূহ বিপদ' এড়াতে বামপন্থীদের ভোটের ময়দান থেকে সরে দাঁড়িয়ে লড়াইটাকে ময়দানে বা চেতনার স্তরে নিয়ে যেতে হবে .........
    এইমুহুর্তে এই প্রস্তাবটি একটি তাত্ত্বিক অবস্থান হিসেবে গণ্য করা যেতেই পারে ।
    একথা অনস্বীকার্য যে তৃণমূলের সঙ্গে 'মূল্যবোধের লড়াই' অবশ্যই চলবে .......
    কারণ ....
    তৃণমূলের সঙ্গে বামপন্থীদের আদর্শগত এবং মূল্যবোধের (Corruption or Values) লড়াইটি অনেক গভীর।
    সোজা কথায় - 
    আগে বড় বিপদকে রুখে দিয়ে ময়দান পরিষ্কার করা .....
     তারপর অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করা।

    এখন প্রশ্নটা হোল —
    ভোটের ময়দান থেকে সম্পূর্ণ সরে দাঁড়ালে বামপন্থীদের নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি বা কর্মীদের মনোবল কি তাতে ভেঙে পড়বে না? 
    কারণ, রাজনৈতিক অস্তিত্ব অনেক সময় নির্বাচনী উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
    কিন্তু সামগ্রিকভাবে সমস্ত বামপন্থী মানুষদের মনে রাখতে হবে, এটাও একটা বিরাট লড়াই .....

    এখানেই  গ্রামসির 'ওয়ার অফ পজিশন'  - এর কথা মাথায় রেখে সমস্ত বামপন্থী শক্তিকে,  ভোটে না দাঁড়িয়ে, শুধুমাত্র  সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে (মগজের লড়াই) মন দিতে হবে।
    গ্রামসির প্রস্তাবিত 'Counter-Hegemony' বা বিকল্প আদর্শ ' তৈরি করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
    এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা যাবে যে, বামপন্থীরা ক্ষমতার জন্য নয়, বরং আদর্শ বাঁচানোর জন্য ত্যাগ করতে প্রস্তুত। 
    এটি দীর্ঘমেয়াদে তরুণ প্রজন্মের কাছে বামপন্থার হারানো নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব (Moral Superiority) ফিরিয়ে আনতে পারে।

    এখন প্রশ্ন হোল বামপন্থী নেতৃত্ব আদৌ এই ধরণের বাস্তববাদী (  pragmatic ) কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন ? 
    নাকি তাঁরা এখনও সেই বিজেমূল তত্ত্ব নিয়ে পুরোনো সংসদীয় গন্ডিতেই আটকে থাকবেন? 
    তবুও বিতর্কটা তৈরি হোক, আলোচনা চলুক।

    আমার প্রস্তাব,
    বামপন্থীরা ভোটে দাঁড়াবেন, 
    মানুষকে বলবেন-
    কেন বামপন্থীরা সাময়িকভাবে তৃণমূলকে ভোট দেবেন .....
    পরবর্তী আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ভোটের ময়দানে নেমে নতুন আদর্শের কথা বলবেন ...........
    মগজের লড়াইটা কি সেটা বোঝাবেন........

    এই প্রস্তাবটি, আমার ধারণায় , রাজনৈতিক রণকৌশলের ইতিহাসে এক অভিনব মাত্রা যোগ করতে পারে।
    এটি আদতে একটি 'সক্রিয় পিছু হঠা' (Active Retreat)-এর কৌশল, যেখানে ভোটের ময়দানকে কেবল আসন জেতার জন্য নয়, বরং মানুষকে শিক্ষিত করার একটি 'রাজনৈতিক ক্লাসরুম' হিসেবে ব্যবহার করা যেতেই পারে।

    বামপন্থীরা যদি প্রার্থী দিয়েও মানুষকে তৃণমূলকে ভোট দিতে বলেন, তবে তা হবে একটি নজিরবিহীন রাজনৈতিক সৎসাহস।
    বার্তাটুকু পরিষ্কার: মানুষকে বোঝানো যে .......
    "আমরা আসছি না, কারণ বড় বিপদকে রোখা এখন প্রথম কাজ।" 
    এর ফলে বামপন্থীদের প্রতি মানুষের যে 'ক্ষমতা-লোভী' বা 'অপরিণামদর্শী' তকমা মাঝে মাঝে লাগে, তা মুছে গিয়ে এক বিশাল নৈতিক উচ্চতা (Moral High Ground) তৈরি হবে।

    গ্রামসির মগজের লড়াইয়ের তত্ত্ব অনুযায়ী, এটি হবে বুর্জোয়া রাজনীতির চক্রব্যুহ ভেঙে ফেলার একটি কৌশল। 
    মানুষ বুঝতে পারবে যে বামপন্থীরা কেবল ভোট কাটাকাটির অঙ্ক নয়, বরং বৃহত্তর সমাজ রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী।
    আদর্শগত কারণেই বামপন্থীরা তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির লড়াই, তা চালিয়ে যাবেন।
    কিন্তু ভোটের দিনে বিজেপিকে রুখতে তৃণমূলকে সমর্থনের যে 'সাময়িক কৌশল', তা তরুণ প্রজন্মের কাছে বামপন্থাকে এক নতুন আঙ্গিকে চিনিয়ে দেবে।
    মানুষ দেখবে বামপন্থীরা সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে 'প্রগতি' রক্ষা করতে জানে।
     এতে করে তৃণমূলের ভেতরকার অবক্ষয়ে বীতশ্রদ্ধ মানুষগুলো বিকল্প হিসেবে বিজেপিকে না বেছে ভবিষ্যতে বামপন্থীদের দিকেই ফিরে আসার মানসিক প্রস্তুতি নেবে।

    লেনিন বলেছিলেন, "দুটি রাস্তার মধ্যে যদি একটিতে শত্রু থাকে আর অন্যটিতে বড় শত্রু, তবে ছোট শত্রুর রাস্তা দিয়ে গিয়ে বড় শত্রুর ওপর পেছন থেকে আঘাত করাই বুদ্ধিমানের কাজ।" 
    বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রস্তাবটি লেনিনীয় তত্ত্বেরই আর এক আধুনিক রূপ। 
    ভোটের ময়দানকে ব্যবহার করে পরবর্তী আন্দোলনের জন্য ক্যাডার ও গণভিত্তি তৈরি করা—এটাই হতে পারে আসল রণকৌশল।
    এই পথটি কঠিন এবং অনেক বামপন্থী কর্মী হয়তো একে শুরুতে মেনে নিতে পারবেন না।
    কিন্তু রাজনীতি যখন বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খায়, তখন বৃত্তের বাইরে থেকে কোনো এক 'বিপ্লবী বিচ্ছিন্নতা'ই পারে নতুন মোড় আনতে।

    ভোটের ময়দানে দাঁড়িয়ে অন্যকে সমর্থনের আহ্বান জানানো আসলে নিজেদের 'আদর্শিক আধিপত্য' বা Ideological Hegemony প্রতিষ্ঠারই নামান্তর।
    বর্তমানের এই 'ডিজিটাল যুগে' অ্যালগরিদমের তৈরি করা ডিজিটাল ডিস্টোপিয়ার দেয়াল ভেঙে সাধারণ মানুষের কাছে এই ঐক্যের বার্তা পৌঁছানোর  জন্য
    আন্তোনিও গ্রামসি ' প্রদর্শিত ' মগজের লড়াইটা ' লড়তেই হবে!!!
    আন্তোনিও গ্রামসি (Antonio Gramsci) ' র মতে শুধুমাত্র রাষ্ট্রক্ষমতা বা পুলিশ-প্রশাসন দখল করলেই বিপ্লব সফল হয় না; আসল লড়াইটা চলে মানুষের মনের ভেতরে, যাকে তিনি বলেছেন 'War of Position'।
    গ্রামসির 'হেজেমনি' (Hegemony) ' র তত্ত্ব অনুসারে আমাদের মনে রাখতে হবে, শাসকগোষ্ঠী কেবল লাঠি বা বন্দুক দিয়ে শাসন করে না, তারা তাদের চিন্তাধারাকে (যেমন বিভাজন বা ঘৃণা) সাধারণ মানুষের 'Common Sense' বা স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিতে পরিণত করে।
    মানুষ যখন নিজের অজান্তেই শোষকের প্রতি আত্মসমর্পণ করে, তাঁদের সমর্থনে ঐ শোষকের ভাষা বলতে শুরু করে, সোজা কথায় তাঁদের সমস্ত কাজকর্মে  ' সম্মতি ' প্রদান করে,  তখন ভোটের লড়াইটা গৌণ হয়ে যায়।

    প্রগতিশীলদের কাজ হলো এই 'Common Sense'-কে ভেঙে 'Good Sense' বা বৈজ্ঞানিক ও মানবিক চেতনা তৈরি করা। 
    এটি ভোটের বাক্সে নয়, বরং  পাড়ার  মোড়ে,  চায়ের দোকানে এবং মাঠে - ময়দানে  দীর্ঘস্থায়ী আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব।
    গ্রামসি মনে করতেন, সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন কিছু বুদ্ধিজীবী মানুষ তৈরি হওয়া দরকার ( গ্রামসি তাঁদের অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল ( Organic Intellectual ) বলবেন) , যারা কেবল তাত্ত্বিক কথা বলবেন না, বরং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের সাথে একাত্ম হবেন।
    যখন একজন বামপন্থী কর্মী বা প্রগতিশীল মানুষ কৃষকের জমিতে বা শ্রমিকের কারখানায়  দাঁড়িয়ে তাদের অধিকারের কথা বলেন, তখন তিনি একজন 'অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল' হিসেবে কাজ করেন।
    এইসব অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল ' দের লক্ষ্য থাকবে মানুষের চেতনার স্তরে আমূল পরিবর্তন আনা, যাতে তারা বিভাজনের রাজনীতিকে ঘৃণা করতে শেখে।

    আমাদের আরও একটা কথা মনে রাখতে হবে, এই ভোটের রাজনীতি অনেক সময় সুবিধাবাদ বা আপোসের জন্ম দেয় ........   
    কিন্তু মাঠের আন্দোলন আপসহীন ; অর্থাৎ ভোটের বাইরে একটি বিকল্প পরিসর তৈরি করতে হবে।
    এই বিকল্প পরিসর তৈরি করতে হবে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের মধ্যে দিয়ে , যেমন - গান, নাটক, চলচ্চিত্র , সাহিত্য ইত্যাদি মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে মানুষের মগজে গেঁথে থাকা পশ্চাৎপদ চিন্তাকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
    এই লড়াইয়ে কোনো দলের ঝাণ্ডা বড় হয়ে উঠবে না, বরং প্রগতিশীল 'চিন্তা-চেতনার' ঐক্যই হবে আসল অস্ত্র।

    বর্তমান বিচ্ছিন্নতা ও ডিজিটাল ডিস্টোপিয়ার বিরুদ্ধে মানুষের সাথে আরও বেশি বেশি করে সংযোগ তৈরি করতে হবে। 
    অ্যালগরিদম যেভাবে মানুষের মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করছে (Filter Bubbles), সেখানে সরাসরি মানুষের কাছে যাওয়া বা 'Physical Presence' আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।
    আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে ক্ষমতা দখলের  তাড়াহুড়ো নয়, বরং চেতনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনই আজকের প্রধান কাজ। 
    মানুষের মনে যদি প্রগতির বীজ বপন করা যায়, তবে ভোটের ফলে একদিন না একদিন তার প্রভাব পড়বেই। 
    কিন্তু মগজের লড়াইয়ে হেরে গেলে ভোটের জয়ও হবে সাময়িক।
     
    আমরা জানি যে, শিল্প এবং সাহিত্য শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি হলো চেতনার প্রধান গবেষণাগার। 
    গ্রামসি যাকে 'সাংস্কৃতিক আধিপত্য' (Cultural Hegemony) বলেছেন, তার পাল্টা লড়াই বা 'কাউন্টার-হেজেমনি' গড়ে তুলতে হলে শিল্প-সাহিত্যের ময়দানে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
    বড় বড় করপোরেট মিডিয়া হাউসগুলো যখন পুঁজি এবং ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, তখন বিভিন্ন স্বাধীন ' গ্রুপ থিয়েটার ',  ' লিটল ম্যাগাজিন ' বা ছোট ছোট সৃজনশীল গোষ্ঠীগুলোকেই প্রধান দায়িত্ব নিতে হবে।
    মুক্ত চিন্তার জন্য কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ ছাড়াই এখানে সত্য কথা বলার সাহস রাখা সম্ভব।
    গ্রামে-গঞ্জে, মফস্বলে যে পাঠাগার বা ক্লাবগুলো আছে, সেখানে এই লিটল ম্যাগাজিনগুলোকে পৌঁছে দিয়ে মানুষের 'মগজের লড়াই'-এ রসদ জোগাতে হবে।
    বিভিন্ন স্বাধীন গ্রুপ থিয়েটারকে মাঠে ময়দানে নেমে ' থার্ড থিয়েটার বা অঙ্গন মঞ্চে ' র  আঙ্গিকে ' মানুষের জন্য  থিয়েটার ' নিয়ে মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে এই চেতনার লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

    ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রগতিশীল শিল্পীদের সমস্ত রকম তাত্ত্বিক জটিলতা বর্জন করে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের ভাষায় কথা বলতে হবে। 
    মোদ্দা কথা শিল্পের মাধ্যমে মানুষের মনের গভীরে থাকা সহমর্মিতার আবেগকে জাগিয়ে তুলতে হবে।
    আজকের এই 'বিপজ্জনক পরিবেশে' বিভিন্ন শিল্পী ও সাহিত্যিকদের মধ্যে ছোটখাটো বিভাজনের দেওয়ালগুলো ভেঙে ফেলে একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট ( Cultural Front )  - এর মাধ্যমে যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ করে মানুষের মধ্যে বিভাজনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জনমত গড়ে তুলতে হবে।

    ডিজিটাল ডিস্টোপিয়ার  অ্যালগরিদম আমাদের যে 'ফিল্টার বাবল'-এর মধ্যে আটকে রাখছে, শিল্পই পারে সেই বাবল ভেঙে দিতে।

    ঘৃণা ছড়ানোর জন্য যে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, তাকেই ব্যবহার করে প্রগতিশীল সিনেমা, ছোট ছবি বা পডকাস্টের মাধ্যমে সত্যকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার বিকল্প বয়ান তৈরি করতে হবে।

    লেনিন বা গ্রামসি—উভয়েই জানতেন যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে মানুষের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রয়োজন। 
    শিল্পী-সাহিত্যিকরা যদি আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মানুষের চেতনার পাহারা না দেন, তবে প্রগতিশীল রাজনীতি বেশিদিন টিকতে পারবে না।

    যাইহোক প্রগতির রাজনীতির  জন্য আমার এই বিনীত প্রস্তাবটি লেনিনীয় তত্বেরই এক আধুনিক রূপ। 
    ভোটের ময়দানকে ব্যবহার করে পরবর্তী আন্দোলনের জন্য ক্যাডার ও গণভিত্তি তৈরি করা—এটাই হতে পারে আসল রণকৌশল।
    এইমুহুর্তে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ভাবনার মানুষদের কাছে এই আলোচনা বা বিতর্কটি শুরু হওয়াটাই সম্ভবত বাস্তব চ্যালেঞ্জ ...........
    তবুও -
    এই আলোচনা বা বিতর্কটি শুরু হওয়া প্রয়োজন !!!!!

                              .............
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন