কী বুঝবে তার একটুখানি মাত্র রয়েছে আমার মনের ভিতরে। বাকি পুরোটাই তোমার মধ্যে, সে সাকিনটির মধ্যে আর তার সাথে তোমার রসায়নের মধ্যে। শেষটা তো এখুনি বোঝা যাচ্ছেনা ---গেলেই বুঝবে!
যাবেটা কোথায়? তাইতো?
হ্যাঁ সেটাই বলছি। ছুটি তেমন নিতে হবেনা। একটি বেলা হলেই যথেষ্ট। বাকিটা তোমার ব্যাপার। তবে সক্কাল সক্কাল বেরোনোই ভালো। কাঁচা রোদটি কেমন কুয়াশার গায়ে পড়ে পড়ে ঝিলিমিলু খেলছে দেখতে হবেনা? একটু মুড়িসুড়ি দিয়ে বেরিয়ে পড়ে ট্রেনে উঠে বসে পড়ো। জানলা পেলে তো কথাই নেই। ডান দিক না বাঁ দিক ----করার দরকার নেই, রোদ এখন মিঠে। তারপর ট্রেন চলতে শুরু করলে আবার মোবাইল খুলে বসোনা যেন! তাই যদি কর, তাহলে আর বেরোলে কেন? কী বললে? চেনা রাস্তা? প্রতিদিনের? কী করে হয় সেটা? রাস্তা তো প্রতি মুহূর্তে বদলায়! বদলে যাচ্ছে দেখো লোকজন, রোদের রেখাটি। তুমিও তো!
আচ্ছা, ঠিক আছে! একটু না হয় মোবাইল খেলে নাও। কিন্তু কখন যে চেনা রাস্তা পেরিয়ে অচেনা রাস্তায় ঢুকে পড়বে আর কী কী জিনিস তুমি দেখতে পাবেনা ---তার খবর কিন্তু আমি দিতে পারবোনা।
এক সময় দার্জিলিং মেইল তো এই পথেই চলতো! মনে আছে সেই মেয়েটির কথা? কি একঘেয়ে জীবন তার! কতই বা বয়স! স্বামী খুইয়ে অনাদরে বাপের ঘরের এঁদো পুকুরে বাসন মেজে আর মায়ের গঞ্জনা শুনে দিন কাটে!ভাই কে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি গেলে তার ফেলে আসা গয়নাগুলি আনতে। তা তারা কি আর দেয়? দিলে দূর দূর করে তাড়িয়ে। সে মেয়ে ---মনমরা, অপমানে নীল, বাড়ি ফিরে আবারো গঞ্জনার ভয়ে গলা তার শুকনো! ইস্টিশনে এসে বসে ফিরতি পথে। বসে থাকে তার রেলগাড়ির অপেক্ষায়।
এমন সময় সেখানে ঢোকে এসে ডাকগাড়ি ---দার্জিলিং মেইল। ডাক যেত কিনা তখন! আর কে না জানে, ওই রেলগাড়িটা লোকজনকে নিয়ে যায় পাহাড়ে! কাদের নিয়ে যায়? নিশ্চই তার মতো লোকদের নয়! যাদের সঙ্গতি আছে, প্রতিপত্তি আছে ---তাদের। জীবনের নানান রঙ তো তারাই উপভোগ করে! তাই ডাক গাড়ি নিজেই এক আশ্চর্য জগৎ! সে মেলে ধরে আনন্দের নানান রূপ আর উপাদান! জীবন যে এমনও হতে পারে সে মেয়ে তো আগে জানতোনা! বাইরে দাঁড়িয়েও তার আকর্ষণে সেও বাঁধা পড়ে। যেটুকু আছে সেইটুকু উপকরণ দিয়েই জীবন উপভোগের তীব্ৰ বাসনা জাগে তার! হিসেবের কড়ি গুনে সে খায় এক কাপ চা! বিবর্ণ জীবনকে রঙিন করে তোলে সেই ইচ্ছে যাপন! বিভূতি বাবু না!! কি যে বলি! সত্যিই মনের চোখে লিখতেন।
তা তুমিও খাওনা এক কাপ। খেলেই তো হয়! আর তো ঘন্টাখানেক। এক ঘন্টার পথ কিন্তু একদম বাইরে থেকে চোখ সরাবেনা ! সুবাবুল এর শোভা দেখতে হবেনা? মানে ওই ললিপপ গাছ বলে যাকে অনেকে! সরু ঢ্যাঙ্গা মতো গাছ উঠে গেছে আকাশে আর সেখানে গিয়ে গোল গোল পাতা দিয়ে ললিপপ এর মাথা বানিয়েছে। এ সময় নিচটা সবুজ, তার উপরে লাল, তার উপরে হলুদ! নাকি উপরে লাল, নিচে হলুদ? যাচ্ছ যখন, দেখেই তো নিতে পারবে! ওটা কোনো ব্যাপার?
কি সুন্দর ছায়া ছায়া ইষ্টিশনগুলি। আবার দেখো, এদের কোথায় নাকি যুগল কিশোরের মেলা বসে! আমি জানলেও এখন বলবোনা। ইচ্ছামতীর ওরা সেই কবে এ মেলা দেখতে এসেছিলো। আরে! পানের দোকানগুলি দেখো! কোথাও 'পান স্টল', নয়, লেখা আছে 'পানের আসর'! তাইতো! পান কি কেবল বিকিকিনির ব্যাপার? নাকি গপ করে মেরে দেওয়ার ব্যাপার? সে নিজেই এক মজলিশ। বুঝতে পারছ? একলা ছোটার পথ থেকে ঢুকে পড়েছো জড়ানোমড়ানো যাপন রাজ্যে? নীল এক হ্রদ এর পাশে ইসটিশন , সে নাকি ময়ূরের হাট? সত্যি? তারপর যখন তুমি দেখবে সুবাবুলের ফাঁক দিয়ে বাঁয়ের নদী ডাইনে গিয়ে আবারো বাঁক খেয়ে কোথায় যেন চলে গেছে, তখন আস্তে আস্তে দরজার দিকে এসে দাঁড়াতেও পার। এরপর নামবেতো!
লম্বা ইস্টিশন । যেদিকে নামবে সেই দিকেই না হয় সকাল সকাল একটু ভাত খেয়ে নিও । সকালে তো খাওনি তেমন কিছু। কাঠের জ্বালে রান্না করে ওরা। ভারী যত্ন করে ভাত বাড়ে। কথাগুলি মিষ্টি, রান্নাতেও একটু মিষ্টি দেয়। শাক ভাজা, ডাল তরকারি, মাছ ---খেতেই পার। ভারি স্বাদ। খেয়ে ওই চত্ত্বর থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় ওঠো। ডানদিকে গেলে শিবচন্দ্রের আবাস। কৃষ্ণচন্দ্রের ছেলে। বাঁ দিকে গেলে লম্বা রাস্তাটা তোমায় দেখাতে দেখাতে নিয়ে যাবে কত পুরোনো সব বাড়ি, সামনে মাঠ, পাঁচিল নেই। আম গাছ এতো এখানে যে রাস্তার ধারে আম পড়ে থাকে! এখন তো আমের সময় নয়। তবে নাকে এসে লাগবে তাজা গুড়ের গন্ধ। খেজুর গাছের গোড়ায় নখ চালিয়ে ছেলেপুলেরা এখানে রসের ধরণ বলে দিতে পারে! গুড় নিয়ে যাবে নাহয়। মাখা সন্দেশ ও নেবে। স্টেশন এর মুখেই পাবে। এখন সোজা চল ভাজন ঘাট পর্যন্ত ঘুরিয়ে আনি। ডানদিকে মস্ত মাঠের ওই পারে বাড়িটা? ওটা কলেজ। যাবে? সেই ইচ্ছামতীর পারে দিয়ে তার হাতা শেষ হয়েছে। ধনে, জিরে, সর্ষে, গুড় --- ইত্যাদির সম্ভার তার মধ্যেই। আচ্ছা, ভাজন ঘাটেই চল।
বেলা পড়ে আসছে। একবার ইস্টিশন এর উলটো দিকটায় যাবে? দেখ, ওদিকের পুরোনো বাড়িগুলি ---লোহার শিক বসানো তাদের জানালাগুলি, ছাদে কাপড় মেলা, পাশে ভাঙা মন্দির আর দীঘি নিয়ে রোদ মেখে কেমন জানি তোমার দিকে চেয়ে আছে। যাবে? আসলে ওরা তো অনেক কিছুর সাক্ষী। সেই কবে থেকে মহাপ্রভুর পদধূলিধন্য নয়টি দ্বীপের মধ্যমণিটি হয়ে এ সাকিন নিরুচ্চার ভালোবাসার ডালপালা মেলে বসে আছে। এখান থেকে আর একটু গেলেই তো লালন ফকিরের কাছে চলে যাওয়া যেত। আহা! সেদিন ইসটিশন এর মুখে সেই রোগাসোগা খেটেখাওয়া চেহারার মলিন বসন মা! কার মা জানিনা। অমুকের বা তুসুকের, কারোর একটা হবে হয়তো। কারুর না হলেও ক্ষতি কী? কি মাতৃস্নেহে কোঁচড়ের ভিতর থেকে একটি বিবর্ণ কমলালেবু বের করলো আর কি মমতায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলা মেয়েটির হাতে তুলে বললো "খা মা "!
অথচ দেখো এ পথেই একদিন কিছুদূর গিয়ে বন্ধ হলো পথ! মাঠ ঘাট আকাশ বাতাস ভাগ হয়ে গিয়ে মাঝখানে উঠলো কাঁটা তারের বেড়া! চোরা চালানের বর্ডার এলাকায় পাতাল লোক তৈরী হলো কী ভাবে! স্টেশন বাজারে তাই রেড হয়। সোনার বিস্কুট ও পাওয়া গেছে!
যাকগে! তাতে কী? আমাদের তো চা আর খাবার বিস্কুট হলেই হলো। সাদা কালোয় আলোয় আলোয় পথ।
নাইবা থাকলো দূর পাল্লার রেলগাড়ির রিজার্ভেশান, উড়োজাহাজের টিকিট! ছোটখাটো আয়োজনের মধ্যে দিয়েও তো অচেনার আনন্দ লওয়া যায়! এ রাস্তায় বিভূতি বাবু আর পিছু ছাড়বেননা! আমার তো মাঝেমাঝেই মনে হয়----গেলেই তো হয়!
আমি না হয় আগে গেছি। তুমি?
গেলেই বুঝবে!
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।