
অনন্ত বাবুর কাহিনী এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শান্তি রাম বাকরুদ্ধ। কোনরকম ফোড়ণ কাটতেও সে ভুলে গেছে। এবার সে উৎকণ্ঠার সঙ্গে জিজ্ঞেস করে --"তারপর? কোন অঘটন ঘটেনি তো?" অনন্ত বাবু একবার শান্তিরামের দিকে তাকালেন, বললেন, "আরে বাবা শোনোই না"। তারপরের দিন খুব ভোর থাকতে কালুয়া বেরিয়ে পড়ে। পাইকারদের কাছ থেকে কিছু মাল ধরতে হবে। সে এখন দক্ষ ব্যবসায়ী। হবে নাইবা কেন? দুই তিন বছর বয়সে যার পেটে মদ পড়েছে, জন্মে থেকে যে মাতৃহারা এবং কার্যত পিতৃহারা, সে সার্ভাইবাল এর তাগিদে নিজেই অভিযোজনে সক্ষম। ... ...

কিছুক্ষণ আকাশ থেকে বালি খসে পড়ার পর আমরা নিজেরা নিজেদের সম্বিৎ ফিরে পাব। পিছনে তাকিয়ে দেখব যে পাহাড়- পরিখা আমরা পেরিয়ে এসেছি, দিগন্তে তারা কী প্রিয় অলংকারের মতো দাঁড়িয়ে আছে! যে ঘাসবন আমরা পেরিয়ে এসেছি, সেই ঘাসবন তখনো শিশুর মতো দুলছে। আমরা নিজেদের চুনে, হাড়ে ফিরে যাব। ফিরে যাব নিজেদের কঠিন কঙ্কালে। ... ...

রূপ গোস্বামীকে শিক্ষাদানের সময় চৈতন্যদেব বলছেন ‘স্বর্গ মোক্ষ কৃষ্ণভক্ত নরক করি মানে’। মোক্ষের মধ্যে শান্ত-দাস্য-বাৎসল্য-সখ্য-মধুর রসে কৃষ্ণসেবার আনন্দ নেই। ‘সে অমৃতানন্দে ভক্ত সহ ডুবেন আপনে/ কৃষ্ণভক্ত-রসগুণ নহে ঐশ্বর্য্যজ্ঞানিগণে।‘ এখানে ঐশ্বর্য্যজ্ঞানী অর্থে ব্রহ্মজ্ঞানী বা উত্তর-মীমাংসকদের কথা বলছে, যাঁরা বলতেন জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ ঈশ্বরসম অবস্থায় পৌঁছতে পারে। এই ব্রহ্মজ্ঞানকে নাকচ করে বলছেন ‘ব্রহ্মানন্দ হৈতে পূর্ণানন্দ কৃষ্ণগুণ’। একইভাবে পূর্ব-মীমাংসক বা কর্মকাণ্ডবাদীদেরও তিনি বিরোধিতা করছেন। ... ...

আসমা প্রচণ্ড বিরক্ত হলেন। মনে হল যেন গোটা টাওয়ার ভেঙে পড়ল। একটা কাজ ঠিক করে করার উপায় নেই। সব সময় ঝামেলা। ফিরনির গ্লাস ছেড়ে আসমা দৌড়ে বাইরে এলেন। এসেই হতবাক। ওকি কে পড়ে উঠোনে? সাদিয়া? সামনে একটা ছোটো জলের বোতল। গড়াগড়ি যাচ্ছে। মুখ খোলা। চারিদিকে সাদা সাদা জলীয় বস্তুও ছিটিয়ে পড়ে আছে। কী ওগুলো ? দুধ ? কয়েক মুহূর্ত আসমা থমকে গেলেন। তারপর চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "এসব কী হচ্ছে ওসমান? ও পড়ে গেলো কী করে? সাবধানে চলতে বলি। কথা তো শুনবে না।" ... ...

প্রাচীন লোকগাথার আমার প্রিয় দ্বিতীয় রত্নটি, বাস্তবিক একটি অদ্বিতীয় অতুলনীয় মহাজাগতিক চেতনা। সাড়ে চার হাজার বছর আগের এই সেই প্রসিদ্ধ নাসদীয় সূত্রটি। রিলিজন অর্থে যে কোন ধর্মের উদ্ভবের বহু আগে, ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২৯ তম স্তোত্রে উদ্ধৃত, যা স্তোত্রটির প্রথম ছত্রানুসারে নামাঙ্কিত। নাসদাসীন্নসদাসীৎ- না ছিল অনস্তিত্ব, না অস্তিত্ব। আধুনিক কালে যাকে আমরা বলি 'আদি মহাবিস্ফোরণ', সেই বিগ ব্যাং-এর পলমাত্র আগে, কেমন ছিল মহাবিশ্বের রূপটি, সেই জন্মলগ্নটি বুঝে নেওয়ার প্রচেষ্টায়, এই 'সূত্র' - একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ। ... ...

এই জিনিস বুঝার পরে আমার কাছে কেমন জানি লাগে এই উৎসব গুলোকে। এত নগ্ন হয়ে যায় সব কিছু অথচ এইটা এতদিন কেন মাথায় আসল না? ইদকে ঘিরে চলে কত হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য অথচ এর পুরোটাই লোক দেখানো কেন্দ্রিক! আমি পরব তোমরা দেখবা। তোমরা কত দামি পরতে পারছ আর দেখ আমরা কী করছি! আমি উৎসবের বিপক্ষে না, উৎসবের দরকার আছে। কিন্তু যদি শুধু এই অসুস্থ প্রতিযোগিতাটা বন্ধ হত! কেন ইলিয়নের একটা পাঞ্জাবির দাম হবে বিশ হাজার টাকা! কেন তা পরবে মানুষ? দেড় দুই লাখ টাকার লেহেঙ্গা! এইটা কোন লেবেলের অসভ্যতা? জাতি যখন নিশ্চিত একটা ক্রান্তিকালীন সময় পার করছে তখন সবাই ঝাঁপিয়ে পরে কাপড় কিনছে! এইটা একটু ভাবলেও তো কেমন লাগে না? ... ...

কমলদি টিঙ্কু পিঙ্কুকে হেঁকে বলেন 'ডাক দিকি ওই গুরুচন্ডা৯র ইয়াং ব্রিগেডকে। বল দেয়ালে, দোকানে, গাছে, মাঠে পোস্টার সেঁটে দিতে। যে যেখানে আছে সবাই যেন গল্প, কবিতা মুক্তগদ্য, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, উপন্যাস, অনুবাদ, ছবি, কার্টুন, রম্যরচনা আরো যা যা পারে সবরকম লেখাপত্র ঝপাঝপ জমা করে দেয় গুরুচন্ডা৯-র ইমেল বাক্সে। ইদবোশেখির ১৪৩৩ সংখ্যায় ধরা থাক সেই লেখারা, বাঁধা থাক জগৎজোড়া জালে।' ... ...

কমনরুমে জনা ছয়েক চুপচাপ বসে আছে। কিছুক্ষণ পরে কৌশিকবাবু গলা খাঁকারি দিলেন, ‘'তাহলে কী করা যায়? ডিআই অফিস থেকে তো কিছুই বলতে পারছে না।” এ ওর মুখের দিকে তাকায়, পলাশ আস্তে বলে আমরাই নাহয় মাসে মাসে কিছু করে দিয়ে মৃন্ময়দের আসতে বলি। কৌশিকবাবু চিন্তিত মুখে বলেন তাতে আবার আদালত অবমাননার দায়ে পড়ব না তো…। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে মৃন্ময় শ্রীলা তাহমিনাসহ ছয়জনের চাকরি গেছে এই স্কুল থেকে। ... ...

তিন বছর বাড়ি থেকে কাজ করার পর হঠাৎ অফিস সবাইকে ডেকে পাঠিয়েছে। সপ্তাহে দু দিন। কিন্তু লোকজনের গড়িমসি। অভ্যাস হয়ে গেছিল। ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে এতদিনে তাও তারা দুদিন করে আসতে শুরু করেছে। সামনের বছর থেকে শোনা যাচ্ছে সপ্তাহে তিনদিন আসতে হবে। অফিসে আরো অনেককিছু এতদিনে বদলে গেছে। সেখানে ঢোকার মুখে একটা ক্যামেরা। তার পাশে একটি পাতলা টিভি স্ক্রিনে যদি মাথার চারপাশে সবুজ একটা বর্গক্ষেত্র ফুটে ওঠে, অফিসে ঢোকা যাবে। লাল বর্গক্ষেত্র ফুটে ওঠা মানে শরীর ঠিক নেই, জ্বর, সেদিন বাড়ি ফিরে যাওয়া দরকার। ভেতরে দেওয়ালে দেওয়ালে স্যানিটাইজার ডিস্পেন্সার। চ্যাটচ্যাটে আঠালো তরলে জমে আছে বুদ্বুদ। হাত নিচে নিয়ে গেলেই একদলা ছ্যাত করে হাতে পড়ে। ভুল করে সেই সান্দ্র আঠায় ধোয়া হাতের আঙ্গুল ঠোঁটে বা জিভে লেগে গেলে তেতোভাব। ... ...

পকেট শূন্য। কোথা থেকে সেদিনের অন্ন জুটবে ভাবতে ভাবতে নিউ ইয়র্কের পথে হাঁটছেন, দেখেন রাস্তায় মাটি খোঁড়া হচ্ছে। শারীরিক পরিশ্রমে কখনো কুণ্ঠিত ছিলেন না, এগিয়ে গিয়ে বললেন তিনিও কাজ করতে চান। মজুরদের সর্দার টেসলার পরিচ্ছন্ন পোশাক দেখে অট্টহাসি হাসলেন, তারপর বললেন, ঠিক আছে, সাদা শার্টের হাতটা গুটিয়ে নিয়ে এই গাড্ডায় নেমে কোদাল চালাও। দিনের শেষে দু ডলার মজুরি পেলেন। দিন যায়। মজদুরদের সর্দার তাঁকে ঠিকই চিনেছিলেন। কদিন বাদে দুপুরে একপাশে ডাকলেন, নিজের খাবার ভাগ করে নিয়ে বললেন, ‘ তুমি তো এ কাজ করার জন্য জন্মাও নি। এখানে ভিড়লে কেন? অভাবে? চলো আমার সঙ্গে।’ ... ...

আমরা আপনাদের কাছে ডাক পাঠিয়েছিলাম তাদের খপ করে ধরে ফেলে, ঝপ করে লিখে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিতে। এসে গেছে তারা। আগামী কয়েকদিন ধরে রোজ দুটি-তিনটি করে তারা এসে হাজির হবে বুলবুলভাজার পাতায় - টাটকা ভাজা, গরমাগরম। পড়তে থাকুন। ভাল লাগলে বা না লাগলে দুই বা আরো অনেক লাইন মন্তব্য লিখে জানিয়ে দিন সে কথা। মন চাইলে, গ্রাহক হয়ে যান লেখকের। ... ...

আমাদের বাড়িতে সেহরি হোক বা ইফতার, আয়োজন খুব সামান্য। রাত্রের জন্য যে ভাত/রুটি ও তরকারি করা হতো প্রথমেই তার থেকে কিছু অংশ তুলে রাখা হতো সেহরির জন্য। ভোর রাত্রে সেই খাবার স্টিমে গরম করে নিতেন মা। কিন্তু গ্ৰামের আত্মীয়দের মুখে শুনতাম তাঁদের রাত্রি দুটো আড়াইটায় উঠে নতুন করে রান্না চাপাতে হতো। ভাত, রুটি, তরকারি যে যেমন খাবে সব টাটকা রান্না করে দিতে হবে বাড়ির বৌদের। এক সহকর্মীর মুখে শুনেছিলাম তাঁদের বাড়ির পুরুষরা নাকি এগরোল সহ মোগলাই, বিরিয়ানি ইত্যাদি খাবার খেতে চান। বান্ধবীর মা-দাদি তাই করে দেন রাত জেগে। অথচ রমজান সংযমের মাস। ... ...
আমনদীপ জানে, এখানকার সমস্ত গ্রামগুলোতে যারা উচ্চশিক্ষার বিপুল খরচ যোগাতে পারে না, খেতিবাড়ির কাজ শেখার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কাছে আর তিনটে পথ খোলা থাকে– বড় হলে আর্মিতে জয়েন করা, ড্রাইভারি, নয়ত টাকা কামাবার জন্য বিদেশ যাওয়া। তা শেষেরটা তো এখন প্রায় বন্ধ। এজেন্টকে প্রচুর টাকা দিয়ে যারা ভিনদেশী সীমান্ত পেরিয়েছিল, তাদের হাতে পায়ে শেকল পরিয়ে প্লেনে তোলার দৃশ্য গায়ের রক্ত ঠান্ডা করে দিয়েছে। ড্রাইভারির কথা সে আর কী বলবে! যত লোক ড্রাইভিং জানে, তত গাড়ি আছে নাকি এই জেলায়! নেই। তাহলে পড়ে রইল শুধু দেশের জন্য জান কবুল করা। কিন্তু এখন বাপ দাদার আমল পালটে গেছে। পুরোদস্তুর সোলজার নয়, লোকে এখন অগ্নিবীর বনতে পারে। চারা সালা দা সিপাহি, চার বছরের সেপাই। পাঁচ বছরে পা দিয়ে ঘরে ফিরে বসে গেলে দেশ কেন, নিজের বৌ-ও দেখবে কিনা সন্দেহ। তবু আর উপায় না দেখে আমনদীপ ঠিক করল সে অগ্নিবীরই হবে। যাই হোক না কেন বীর শব্দটা তো আছে পেছনে। ওটার আকর্ষণ তার বয়সী শিখ সর্দারের কাছে অমোঘ। আর হাত একেবারে খালি থাকার চাইতে, কিছু তো থাকা ভালো। ... ...

বিপাশাদের বাড়ী শ্যামলদের পাড়াতেই। বা বলা যায় বিপাশাদের বাড়ী ছিল শ্যামলদের পাড়াতেই। শ্যামলের মেজো বোন ইলার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত মেয়েটা। তখনও পাড়াগুলোয় বিভিন্ন রকম বাড়ীতেই থাকতো। তখনো পাড়ায় পাড়ায় বহুতলের চল হয়নি। কেউ ভাড়া বাড়িতে, কেউ নিজের বাড়িতে। কেউ নতুন বাড়িতে, আবার কেউ নতুন বাড়ি করার স্বপ্ন নিয়ে পুরনো ভাঙা বাড়িতে। তখনও নতুন, পুরনো, ভাঙা, আধাতৈরি বিভিন্ন প্যাটার্নের বাড়ি নিয়ে এক একটি পাড়া তৈরি হত। বিপাশাদের বাড়িটা ছিল শ্যামলদের পাড়ার একেবারে শেষ মাথায়। দাশগুপ্ত বাড়ী।। ... ...

এক ছিল বাগান আর সেই বাগানে ছিল একটা পুচকে ফুলগাছ। ফুলের গাছ বললুম বটে তবে সে গাছে আজও একটা ফুল ধরেনি। গাছ বেচারার তাই ভারি মন খারাপ। রোজ সকালে পূব আকাশে লাল রঙ ধরলেই গাছ শুধোয়, -“আলোদিদি! আমার ডালে কবে ফুল ধরবে বলতে পারো?” আলোদিদি গাছের পাতায় চুমো দিয়ে চুপিচুপি চলে যায় মাটির ওপর বিছনো সবজে ঘাসের গালচেয়। গাছ ফোঁস করে দম ছেড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আর করবেটাই বা কি? হেঁটে চলে যাওয়ার তো আর পথ নেই। না পথ তো আছে বটেই, পাতায় ঢাকা একফালি পথ ধরে বনের কোথায় যাবে যাও না, কেউ বাধা দেবেনাকো। মুশকিল হলো গাছ তো আর চলে ফিরে বেড়াতে পারে না। তাদের আঁকুনিবাঁকুনি শিকড়গুলো যে মাটির গভীরে চলে যায় জলের খোঁজ করতে। জল ছাড়া কি আর বাঁচা যায়? তোমরা যেমন বাড়িতে গেলাসে জল ধরে ঢকঢকিয়ে খেতে পারে গাছ তো আর অমন করে খেতে পারে না। তাই গাছেরা তাদের শিকড়গুলো দিয়েই পাইপের মতো করে চোঁ চোঁ করে জল খায়, ঠিক যেমন তোমরা কাচের বোতলে পাইপ দিয়ে সরবত খাও তেমনটি। সেই আঁকুনিবাঁকুনি শিকড়গুলোই তো এক জায়গায় ধরে রাখে গাছগুলোকে। ... ...