এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • রূপালি ডানা,  মুহাম্মদ ফজলুল হক

    Fazlul Huque লেখকের গ্রাহক হোন
    ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ৩৫ বার পঠিত
  • রূপালি ডানা
    মুহাম্মদ ফজলুল হক

    সেই কখন থেকে সুমনা উড়ছে তো উড়ছেই। নীল আকাশে হাত-পা মেলে ওড়ার অনুভূতি আলাদা। উড়তে উড়তে সে একটি গাছের মগডালে গিয়ে বসে। পাখিরা তাকে স্বাগত জানায়। পাখির ছানারা আনন্দে কিচিরমিচির করে ওঠে। সুমনা বড় বড় চোখে তাকিয়ে ছানাদের উদ্দেশে বলে, "ধৈর্য ধরো বাছারা, তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছি।" সুমনা হাত মেলে খাবার তুলে ধরে। পাখিরা তার হাত থেকে ছানাদের জন্য খাবার নিয়ে যায়। দুটি শালিক ও একটি বুলবুলি সুমনার কাঁধে বসে অভিমানের সুরে বলল, "কত দিন পর এলে! তোমার কথা আমাদের প্রতিদিন মনে পড়ে।"
    ​"সে তো আমি জানি। কিন্তু বলো, আমার অবসর কোথায়? ঘরের কাজ শেষ করে মাকে ফাঁকি দিয়ে আসতে হয়। আজ তো স্কুল কামাই করে এসেছি! যদি প্রতিদিন তোমাদের কাছে চলে আসি, পড়াশোনা করব কী করে?"

    টিয়া, ময়না ও দোয়েল একসাথে চিৎকার করে উঠল, "মানি না, মানি না! আমরা চাই প্রতিদিন তুমি আস।" সুমনা হেসে উঠল, "আমিও তো আসতে চাই। মনটা সবসময় তোমাদের কাছেই পড়ে থাকে। তোমরা কত ভালো! আমাকে তোমাদের ভাষা শিখিয়েছ, উড়তে শিখিয়েছ। কী সুন্দর গান করো তোমরা! তোমাদের গান না শুনলে কি আমার ভালো লাগে?"

    দোয়েল পাখিরা যেন অপেক্ষায় ছিল, তারা সুর করে গান গাইতে শুরু করল। সুমনা চোখ বন্ধ করে পাখিদের গান শুনতে লাগল। কাক, সারস ও ঘুঘু নীরবে এসে গাছের ডালে বসল। গান শেষ হলে সুমনা হাততালি দিয়ে বলল, "শোনো সবাই, আমি এখন চলে যাব। তোমরা তো জানোই আমার কত কাজ!" সবাই একযোগে বলে উঠল, "না! না! আরেকটু বসো। তুমি থাকলে আমাদের খুব ভালো লাগে, নিজেদের নিরাপদ মনে হয়।" সুমনা খুশি হয়ে বলল, "তোমরা অনেক ভালো। ভেবো না, আমি আবার আসব।"
    ​
    এ কথা বলে সে ডানা মেলে আকাশে উড়াল দিল।
    ​তার নদীর কথা মনে পড়ল। সেখানে মাছের দল অপেক্ষা করছে। ওপর থেকে তিতাস নদীকে সরু খালের মতো দেখাচ্ছে। সে নদীর শেষ মাথায় পৌঁছে গেল। এদিকটা বেশ নীরব, পানি স্বচ্ছ। সুমনা ধীরে ধীরে নিচে নেমে তিতাসের বিশাল জলরাশি ছুঁয়ে উড়তে লাগল। পানি ছুঁয়ে যেতে যেতে সে নদীর শেষ প্রান্তে একটি বাঁশের ওপর গিয়ে বসল। তাকে দেখেই দুটি শুশুক এল। এসেই তারা বলল, "তুমি এতক্ষণে এলে! সেই সকাল থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।" "আর বোলো না," সুমনা বলল, "পাখিদের সাথে দেখা হয়েছিল। ওরা তো আসতেই দিতে চায় না!" বোয়াল মাছ বলে উঠল, "তা তো করবেই! পাখিরাই তো তোমার আপন, আমরা তো কেউ নই।" "আরে না! তোমরা সবাই আমার আপন।" একথা শুনে পুঁটি, খলসে ও চিংড়ি মাছের ঝাঁক আনন্দে নেচে উঠল। সুমনা একটি শুশুকের পিঠে চড়ে বসল। শুশুকটি সুমানাকে নিয়ে পানির ওপর-নিচ দিয়ে ছুটে বেড়াতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ ছোটাছুটি করার পর সুমনা নদীর তীরে ফিরে এসে বলল, "এবার যাই, আবার দেখা হবে।" এই কথা বলে সে উড়াল দিল।

    উড়তে উড়তে সুমনা বাড়ির পেছনে চুপিচুপি একটা জাম গাছের ডালে এসে বসল। পাখিরা তাকে দেখে ডেকে উঠতে চাইলে সে ইশারায় তাদের থামিয়ে দিল। গাছে বসে রসালো জাম খেতে খেতে সে কিছু জাম জমা করল। জমানো জাম নিয়ে সুমনা আস্তে আস্তে গাছ থেকে নেমে ঘরে ঢোকার আগেই মায়ের গলার আওয়াজ শুনতে পেল, "দস্যি মেয়েকে নিয়ে আর পারি না! সকাল থেকে উধাও। আসুক, দেখাচ্ছি মজা!"
    তখনই সুমনা পেছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "এই তো আমি! দেখো, তোমার জন্য জাম নিয়ে এসেছি।" মায়ের মন আনন্দে নেচে ওঠে। কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে মা বলল, "জাম খেতে হবে না, নাস্তা খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো!" সে মাকে না ছেড়েই বলল, "তুমি না খাইয়ে দিলে আমি খাবই না।" অবাক হওয়ার ভান করে মা বলল, "আমার তো কোনো কাজ নেই, নবাবজাদীকে খাইয়ে দিতে হবে!"

    ​সুমনা খাটে বসলে মা তাকে খাইয়ে দিতে দিতে বলল, "সারাক্ষণ আকাশ-বাতাস, নদী আর বন-জঙ্গলে উড়ে বেড়ালে চলবে রে মা? কখন কোন বিপদ আসে কে জানে!" মায়ের কথা শুনে সুমনা বিষম খেল। মা সব জানেন! সুমনা মায়ের কোল ঘেঁষে বলল, "কী করব মা, আমার যে উড়তে খুব ভালো লাগে! ভালো লাগে মাছ, পাখি, ফুল আর ফলের সাথে কথা বলতে।" "জানি রে মা, সবই জানি" মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল। সাবধানে থাকিস। কেউ যেন এইসব জানতে না পারে। "মায়ের বুকে মাথা রেখে সুমনা বলল, "কিচ্ছু হবে না, মা। তুমি দেখো!"

    ​বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। আকাশে ফুটে উঠেছে লালচে রঙের আভা। সুমনা মায়ের কোল ঘেঁষে বসে থাকলেও তার মন জানালার বাইরে ডানা মেলছিল। দূরে বাঁশঝাড়ের ফাঁক গলে দেখা যায় অসীম নীল আকাশ। যা তাকে এক অদৃশ্য টানে ডাকছে। মা পরম মমতায় তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। সুমনার ভেতর অস্থিরতা শুরু হয়েছ। মায়ের কথা ভাবাচ্ছে তাকে। "কেউ যেন এইসব জানতে না পারে"। হঠাৎ সে খেয়াল করল, উঠানের পাশে কাঁঠাল গাছের নিচে অনিক দাঁড়িয়ে। সে তাদের বাড়ির দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই অনিক দ্রুত সেখান থেকে সরে যায়। সুমনার বুক ধক করে উঠল। অনিক কি কিছু দেখেছে?

    ​সন্ধ্যা নেমে আসতেই চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুরু হলো। প্রকৃতির এই চেনা সুরও সুমনার মনে শান্তি আনতে পারল না। মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের ওপার থেকে কেউ তাকে অনুসরণ করছে। রাতে খাবার শেষে মা ঘুমিয়ে গেলে সুমনা চুপিচুপি জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। বাইরে পূর্ণিমার আলো। মেঠোপথ রুপালি চাদরে ঢাকা, বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ। সে মনের ভেতর এক তীব্র টান অনুভব করল। ভীষণ ইচ্ছে হলো সুমনের সাথে দেখা করতে। তার সাথে সাঁতার কেটে নদীর গভীরে চলে যেতে, নানা রঙের মাছদের সাথে ভেসে থাকতে, অজানা পথে ঘুরে বেড়াতে।

    সুমনও তার মতো। সে মুক্ত আকাশে ওড়ার চেয়ে নদীর গভীর জলে সাঁতার কাটতে পারদর্শী। সুমনা যে উড়তে পারে, এ কথা সুমন ছাড়া কেউ জানে না। মায়ের মুখে বিপদের আভাস শুনে সে বেশ ভাবনায় পড়ে গেছে। সুমনকে এই কথা জানাতেই হবে। অনেকক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকার পর, সুমনা ধীরে ধীরে জানালার চৌকাঠে এসে দাঁড়াল। মুহূর্তে তার পিঠের দুপাশে নরম আলোর মতো ডানা ফুটে উঠল। ডানা দুটি সামান্য নড়তেই পুরো ঘরজুড়ে রুপালি আভা ছড়িয়ে পড়ল। সুমনা ঘুমন্ত মায়ের দিকে তাকাল, তারপর নিঃশব্দে রাতের আকাশে ভেসে উঠল।

    রাতের আকাশ গভীর, রহস্যময়। গ্রামের মানুষ ঘুমে মগ্ন। ফসলের মাঠ কালো চাদরে ঢাকা। পুকুরের পানি চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে। দূরে কোথাও কুকুর ডেকে উঠল। সুমনা যত ওপরে উঠতে লাগল, বাতাস তার চুল তত এলোমেলো করে দিল। তার ভয় কেটে গেল। আকাশে ডানা মেলতেই মনে হলো, পৃথিবীর কোনো দুঃখ-বেদনা তাকে ছুঁতে পারবে না।
    ​হঠাৎ নিচ থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
    ​"দেখ, দেখ! ওই দিকে কিছু একটা উড়ছে!"
    ​সুমনার বুক কেঁপে উঠল। নদীর ঘাটে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। একজন আঙুল উঁচিয়ে আকাশের দিকে দেখাচ্ছে।
    ​"মানুষ নাকি রে!"
    ​"না রে... পাখির মতো দেখতে!"
    ​"জিন-পরী কিছু হবে হয়তো!"
    ভয়ে সুমনার গলা শুকিয়ে গেল। সে দ্রুত মেঘের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করল। কেউ চিৎকার করে উঠল, "আমি পরিষ্কার দেখেছি! ওটা একটা মেয়ে!"

    ​সুমনার বুকের ভেতর ভয় যেন বরফের মতো জমে গেল। এতদিন সে সাবধানে থেকেছে। আকাশের মেঘ, রাতের অন্ধকার, গাছের আড়াল, নদীর নির্জনতা তাকে আড়াল করে রেখেছে। আজ! আজ সে ধরা পড়ে গেলো! তার ডানা কাঁপতে লাগল। সে আরও ওপরে উঠতে চাইল, বাতাস ভারী হয়ে উঠল। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করল। ঝোড়ো হাওয়া বইতে লাগল, সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। বিদ্যুৎ চমকে উঠল। তার মনে হলো, মেঘের আড়াল থেকে কেউ তাকে দেখছে। সে নদীর দিক ছেড়ে বনাঞ্চলের দিকে ছুটে চলল। তার হৃৎপিণ্ড ধুক ধুক করছে। মায়ের কথা মনে পড়ল। "সব আকাশ নিরাপদ নয়।" সুমনা প্রাণপণে ডানা ঝাপটাতে লাগল। বাতাস শোঁ শোঁ শব্দ করছে। বনভূমি কালো ছায়ার মতো পেছনের দিকে ছুটে যাচ্ছে। মেঘের বুক চিরে বিকট গর্জন হলো। সুমনার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এল।

    এমন সময় নিচের বন থেকে একটি চেনা সুর ভেসে এল, দোয়েল পাখির ডাক! "সুমনা! নিচে নেমে এসো!" সে বিস্ময়ে নিচে তাকিয়ে দেখল, বিশাল বটগাছে অনেক পাখি জড়ো হয়েছে। তাদের চোখে-মুখেও ভয়ের ছাপ। সুমনা দ্রুত নিচে নেমে এল। সে তখনো হাঁপাচ্ছে। একটি পাখি বলে উঠল, "এসে ভালো করেছ। তুমি এখন নিরাপদ।" "তোমরা না ডাকলে আমার যে কি হতো।" "তুমি শুধু মানুষ নও। তোমার মধ্যে উড়ার বিরল ক্ষমতা আছে।" আবাক হয়ে সে পাখির কথা শুনল। চারপাশ নিস্তব্ধ। বাতাস থমকে দাঁড়িয়েছে। চেনা পৃথিবী এক নিমেষে বদলে গেছে। সে শুধু উড়ার আনন্দটুকুই চিনত। প্রথমবার সে উপলব্ধি করল, আকাশ শুধু মুক্তির আনন্দ দেয় না, বিপদও ডেকে আনে।

    নদীর ঘাটের মানুষের কথা মনে হতেই তার শরীর শিউরে উঠল। তারা যদি এ কথা বলে দেয়! মানুষ কি তাকে আপন ভাববে? যদি তার ডানা ভেঙ্গে দেয়! অলক্ষুণে বলে যদি খাঁচায় বন্দি করে! সে আর ভাবতে পারছে না। তীব্র একাকীত্ব এসে তাকে গ্রাস করল। ফিসফিস করে সুমনা বলল, "আমি কি তাহলে আর কোনোদিন উড়তে পারব না?" পাখিদের মাঝে দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল। টুনটুনি পাখি এসে তার কাঁধে বসে নরম গলায় বলল, "আকাশ তোমাকে ভালোবেসে ডাকে, নিশ্চয়ই তুমি উড়বে।" সব পাখি সমস্বরে বলে উঠল, "অবশ্যই উড়বে, অবশ্যই উড়বে।" দূরে বিদ্যুৎ চমকালো। সুমনার বুকে ভয় থাকলেও সে ভয়কে ছাপিয়ে এক নতুন সংকল্প জন্ম নিল। সুমনের কাছে যেতেই হবে। সব জানাতে হবে। সে বুঝতে পারছিল তার জীবন সাধারণ মানুষের মতো নয়। এই ডানার সাথে হয়তো কোনো রহস্য জড়িয়ে আছে! রুপালি আভা ছড়িয়ে সে আকাশে উড়াল দিল।

    ​নদীর গভীর জলে সাঁতার কাটছিল সুমন। তার ইন্দ্রিয় সংকেত দিল সুমনা বিপদে পড়েছে! সে দ্রুত পানির ওপর ভেসে উঠে আকাশের দিকে তাকাল। দূরের আকাশে রুপালি আলোর রেখা দেখে সে সুমনাকে চিনে নিল। সুমনাকে স্বাগত জানাতে সুমন পানি থেকে তীব্র গতিতে শূন্যে লাফিয়ে উঠল। সুমনার কাছাকাছি পৌঁছে তার হাত ধরল। সুমনকে দেখে সুমনা খুশি হয়ে উঠল।
    সব ভয় ভুলে দুজনে রাতের আকাশে ডানা মেলে মেঘের রাজ্যে হারিয়ে গেল। কখনো মেঘ ভেদ করে নিচে নেমে আসছিল, কখনো ওপরে উঠে যাচ্ছিল। ওড়াউড়ি শেষে নেমে এল নদীর বুকে। নদীতে মাছের সংস্পর্শে সুমনার সব ভয় ও ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। অবশেষে ভেসে উঠল দুজন। সুমনা শক্ত করে সুমনের হাত ধরে রাখল। ভাসতে ভাসতে তারা নদীর পূর্ব প্রান্তের এক বিশাল পাথরের ওপর এসে বসল। ক্লান্ত সুমনা পাথরের ওপর গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল। চাঁদের আলোয় অপরূপ সুমনাকে সুমন মুগ্ধ চোখে দেখছিল। সুমনা উঠে বসতে চাইলে সুমন মৃদু হেসে বলল, "শুয়েই থাকো না...।" সুমনা খিলখিল করে হেসে উঠল। তার জাদুকরী হাসির তরঙ্গে মাছ ও রাত জাগা পাখির দল খুশীতে নেচে উঠল।

    সুমনা ধীরে ধীরে উঠে বসে ভেজা চুল একপাশে টেনে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চাঁদের আলো তার চিন্তিত মুখে এসে পড়ল। সুমন তার দিকে তাকিয়ে বলল, "কী হয়েছে সুমনা? যখন আকাশ থেকে নেমে আসছিলে, তখন তোমার ডানা চেনা ছন্দে ছিল না। মনে হচ্ছিল অজানা ভয় তাড়া করেছে। আকাশ আর মেঘ তো কখনো তোমাকে এভাবে তাড়ায় না!।" সুমনা সুমনের দিকে ফিরল। তার চোখে রাতের আতঙ্ক। সে ফিসফিস করে বলল, "নদীর ঘাটের মানুষ আমাকে দেখে ফেলেছে। তারা আঙুল উঁচিয়ে বলছিল, আকাশে নাকি কোনো পরী উড়ছে! একজন তো স্পষ্ট চিনে ফেলেছে আমাকে। মা-ও বলছিল, "আমার ওড়াউড়ির কথা যেন কেউ জানতে না পারে।" একটু থেমে দম নিয়ে সে আবার বলল, "আচ্ছা সুমন, তুমি জলের নিচে দূরন্ত, আমি আকাশে স্বাধীন, এটা কি কোনো অপরাধ?" সুমন হাসল। হাসিতে গভীর সান্ত্বনা। সে নদীর জলে পাথর ছুড়তে ছুড়তে বলল, "পাখির আকাশে ওড়া, মাছের জলের গভীরে ভেসে বেড়ানো যদি অপরাধ না হয়, আমাদের এই চলাচলও কোনো অপরাধ নয়। সুমনার হাতে হাত রেখে সুমন বলল, "ভয় পেও না। এই বলে সে সুমনার আরো কাছে এসে বসল।"

    ​"পাখিরা বলছিল অন্য কথা"। সুমনা সুমনের হাতটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল, "ঝড়ের মুখে যখন বটের ডালে আশ্রয় নিলাম, তখন বনের দোয়েল বলল, "আমার মধ্যে নাকি বিশেষ ক্ষমতা আছে। আকাশ নাকি আমাকে ভালোবেসে ডাকে। আমি বুঝতে পারছি না সুমন, এই ডানা দুটোর আসল রহস্য কী? সুমন সুমনার আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুল রেখে চাপ দিতে দিতে বলল, "হয়তো আছে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত, সময় হলে নিজেই প্রকাশিত হবে। আকাশ তোমাকে ভালোবেসে ডানা দিয়েছে, পানি আমাকে তার রহস্য ভেদ করতে শিখিয়েছে। প্রকৃতি আমাদের যে রহস্যে বেঁধেছে, মানুষের সাধ্য নেই তা সহজে কেড়ে নেওয়ার।" সে সুমনার দিকে আরেকটু ঝুকে বলল, "আজ থেকে তুমি যখন আকাশে ডানা মেলবে, সাবধানে মেলবে। মেঘের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখবে। যদি কখনো আকাশ ভারী হয়ে ওঠে, ঝড় তোমাকে তাড়া করে, সোজা নেমে আসবে তিতাস নদীর বুকে। আকাশের নীল ফুরিয়ে গেলেও তিতাসের স্বচ্ছ পানি তোমায় আগলে রাখার জন্য সবসময় প্রস্তুত।"

    সুমনের আশ্বাসে সুমনার বুকের ভেতরের পাথর যেন এক নিমিষে নেমে গেল। তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত, নিষ্পাপ হাসি ফিরে এল। সে সুমনের কাঁধে মাথা রেখে বলল, "জানি, তাইতো ঝড়ের রাতেও ডানা দুটো অবশ হয়ে পড়ার আগেই তোমার ঠিকানা খুঁজে নেয়। সুমন কোনো কথা বলল না। সুমনার হাতে নিজের হাত রেখে চোখ বুজল। তাদের পায়ের নিচে তিতাস নদীর পানি ছলাৎ ছলাৎ শব্দে বয়ে যাচ্ছিল।যেন দুই জাদুকরী প্রাণের মুহূর্তকে পাহারা দিচ্ছিল।

    রাত ফুরিয়ে আসছে। আকাশে ভোরের আলো ফোটার মুহূর্তে অস্বাভাবিক শোরগোলে কেঁপে উঠল চারপাশ। পেছনে ফিরতেই স্তব্ধ হয়ে গেল তারা। অস্ত্র হাতে একদল মানুষ ধেয়ে আসছে এদিকে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তারা পরস্পরের দিকে তাকাল। মুহূর্তেই হাতের বাঁধন ছিন্ন করে উঠে দাঁড়াল সুমনা। পিঠের রুপালি ডানা জোড়া মেলে সে সুমনের চোখে চোখ রাখল। সে চাহনি যেন নির্বাক এক ভাষা, যাতে মিশে আছে বিদায়ের করুণ সুর, ভয় নেই, আছে কেবল অতল ভরসা। এক পলক হেসে সুমনা ডানা মেলল আকাশে। সুমন সুমনার চোখের ভাষা পড়তে পড়তে ধীরলয়ে তলিয়ে গেল তিতাসের শান্ত, শীতল পানির গভীরে। আকাশ ও নদী থমকে রইল তাদের অপার্থিব নিজস্ব জাদুতে।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Fazlul Huque | ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:২৮743632
  • পড়ে মতামত দেন।
  • Aditi Dasgupta | ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ১১:২৬743636
  • কি আরামের কোলটি। মরিচ তোলার দিন ভুলিনি।
  • Fazlul Huque | ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০৮743638
  • ধন্যবাদ, Aditi Dasgupta.
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন।