যে বিপুল বেগে ছিটকে পড়েছিল নীচে, বাঁচার আশা একদম ছিল না। কিন্তু বেশ কিছুটা সময় পর জ্ঞান ফিরে এল তার, একটু একটু করে চোখ খুললো, তখনো ব্যথাটা পুরো বিদায় নেয়নি, নিজের গায়ে চিমটি কাটলো সে… যাদুমাখা সেই জগৎ যা তার মর্মে মর্মে জাগিয়ে তুলেছিল অজানা শিহরন, নিজেকে আবিষ্কার করল তার কুসুম-কোমল পিঠে। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠেছিল প্রথমে, পরে সামলে নিয়ে চারধার ভাল করে দেখতে শুরু করে সে, খুটিয়ে খুটিয়ে লক্ষ্য করতে থাকে প্রতিটা বস্তু, শেষমেষ আশু বিপদের কোন সংকেত না পেয়ে ফের হাঁটা শুরু করে। ... ...
ধরা যাক, রাস্তার ধারে একটি কৃষ্ণচুড়া আপাদমস্তক সিঁদুর মেখে দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও এতটুকু জায়গা ফাঁকা নেই আর। মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে থাকবে নাইম। ধ্যানমগ্ন মুনীর মত সে চোখ দুটো জড়ো করে জড় হয়ে পড়বে! আবার, কোন অপূর্ব নকশাকাটা দালান, তাও টানবে তাকে জন্মজন্মান্তরের বাঁধন ছাড়িয়ে! বলতে কী, পাতা বা পাথর দুই-ই সমান করে টানে তাকে। কিন্তু এখানেও সে এক দর্শক, তার কাজ যেন শুধু দেখে যাওয়া, আর ভাল লাগা! এভাবেই হয়ত তার ভাল লাগত ফুটফুটে কোন মেয়েকে। সে দেখত আর চলে যেত। কিন্তু একজন জীবন্ত মানবী পাথরের মত নয়; সেখানে জীবন্ত সাড়া থাকে, বিধি বিধান থাকে – আর এসব যেন অজানাই ছিল নাইমের। তাকে কখনো যেচে আলাপ করতে দেখা যায়নি কোন মেয়ের সাথে। অথচ সেও তো একজন জীবন্ত প্রাণী, সেও তো একটি মেয়েকে নিজের করে নেয়ার জন্য যত প্রকার বুজরুকি আছে, প্রয়োগ করতে পারত। কিন্তু নিজে থেকে মন্ত্র পড়া, তাকতুক তো দূরের কথা, কোন মেয়ে তার প্রতি আকৃষ্ট হলেও সেই সংকেত কখনোই পৌঁছুতো না তার বন্দরে। আসলে সে তো একজন দর্শক, সে তো চলচ্চিত্রটি উপভোগ করতে এসেছে, অ্যাক্টিং করতে নয়! ... ...
একটা বিষয় খেয়াল করার মত - মোরসালিন মারুফের মধ্য কেমন যেন সংকোচ, লোকলজ্জার ভয়! আর আছে এক ধরণের সীমাহীন আকুলতা! দিন নেই, রাত নেই, সমানে নক করে যাচ্ছে সম্পাদকের ইনবক্সে। রুম্পার ধারণা, লোকটা যারপরনাই নিঃসঙ্গ। কেউ কি এসেছিল তার জীবনে, আর মিলিয়ে গেছে কোন জানান না দিয়েই? হঠাৎ বিগলিত স্বরে ডেকে উঠলো ফোনটা, নিশ্চয়ই সুব্রত, কোথাও আটকে গেছে…অনেক বড় বড় অফিসিয়াল অ্যাসাইনমেন্ট তার হাজবেন্ডের চওড়া কাঁধে… উঠতে যাচ্ছিল রুম্পা ল্যাপটপ ছেড়ে, কিন্তু পর্দায় কিছু একটা ভেসে উঠতে দেখে থমকে দাঁড়াল, ‘প্রিয় সম্পাদক, ভালবাসা নেবেন। আমার লেখাটা একটুখানি পড়ে দেখার সময় পেয়েছিলেন? যদি বিব্রত করে থাকি…...বিনীত, মোরসালিন মারুফ।’ শুরু হয়ে গেছে ... ... ...
সেই দিন কাজ শেষে রনি এসে দাঁড়ালো আমার সামনে, এক সাথে যাবে বলে। ওর সেই নখগুলো সাঁড়াশির মত খামচে ধরেছিল আমার ডেস্কের উপরের স্টেইনলেস পাতটা! নখগুলো ভীষণ রকমের কাঁটা দিয়ে গেল আমার গায়ে, যেকোন দিনের থেকে ধারালো দেখাচ্ছিল সেগুলোকে, মনে হচ্ছিল মরুভূমির বালিতে শান দিয়ে আনা হয়েছে!। আমি একবারই তাকিয়েছিলাম ওর দিকে, আর টেবিলের উপর গাদা গাদা ফাইলের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে মাথা নেড়ে সাংকেতিক বিদায় জানিয়েছিলাম। এরপর বাক্য ব্যয় না করে সে যখন সিড়ি দিয়ে নেমে যেতে শুরু করল, আমি এক লাফে পশ্চিম দিকের উইন্ডো ওয়ালের ধারে চলে গেলাম। যেদিকটা দিয়ে রনি বেরুবে, তার সাথের রাস্তার ডান ও বাম বাহু বেশ কিছুটা ধরতে পারে এই উইন্ডো। এমনকি গতকাল যেখানে রনির সাথে দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয়েছিল, সে জায়গাটাও ছোট করে হলেও মিস্ হওয়ার কথা না! আমি প্রবল উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম লাগলাম। ... ...
এরকম একটা অনুভূতি থেকেই হয়ত সেদিন রাজ্যের সব সামগ্রী সদাই করে বাসায় ঢুকেছিলাম মৌসুমের প্রথম ইফতারটার জন্য। কিন্তু ডাইনিং রুম ও রান্নাঘরের সংযোগস্থলে যে এক চিলতে জায়গা আছে, সেখান থেকে একজন বৃদ্ধার মুখ ভেসে উঠতেই পিত্তি জ্বলে উঠল আমার! এমন নয় যে, ঐ বৃদ্ধার গায়ে ঘা-পাঁচড়া-পুঁজ লাগানো! বা, তার চেহারায় ভয়ঙ্কর কিছু বিদ্যমান! বা, তার সাথে আছে পূর্ব কোন অমধুর স্মৃতি! একান্তই নিরীহ গোছের একটি চেহারা, আর কাঁচুমাচু বসার ভঙ্গি! ... ...
বলতে কী, একটা নিশ্চিত ধ্বংসের প্রতীক্ষা করছিলাম যেন আমি! কিন্তু সুখনকে কোন ঋণের দরখাস্ত জমা দিতে দেখা গেল না আমার টেবিলে। উল্টো অফিসে তার কাজের মনযোগ ও গতি দুই-ই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগল। আর এরই মাঝে একদিন বদলী আদেশ চলে এল আমার। ... ...
সেলিমকে কড়া ধমক লাগিয়ে ভেবেছিলাম, এতেই কাজ হবে। তাছাড়া, চাইলেই কি আর ম্যানেজ করতে পারবে! বিশেষত কোম্পানির হিসেবনিকেশ এসব ক্ষেত্রে যখন খুবই কড়া! কিন্তু সপ্তাহখানেকের মধ্যেই বিশাল পলিপ্যাকে করে একটি সদ্যোজাত হাতি হাজির হল আমার টেবিলে। সারাদিন ছুঁয়ে না দেখলেও দিনশেষে বাসায় নিয়ে গিয়েছিলাম জিনিসটা, সেলিমের কাঁদো কাঁদো মুখের দিকে আর তাকানো যাচ্ছিল না! ... ...
এবার আর ভুল হয়নি, গেল শীতেই তো ডেকে এনেছিলেন, আর হ্যান্ডশেক করতে করতে বলেছিলেন, “কঠিন রাজনৈতিক কলাম বাদ দিয়ে ভূতের গল্পও তো লিখতে পার!“ ... ...
তাহলে ছেলের অনুরোধটা রাখছেন না কেন – এ কথা আর আমি জিজ্ঞাসা করতে গেলাম না তাকে। কারণ এখন মনে হচ্ছে, মরণের আগ পর্যন্ত এই ব্যবসা ছাড়বেন না তিনি। জমিগুলো যেমন সবসময় এক রকম না – কখনো তৃণের দখলে চলে, কখনো পুড়ে যায়, কখনো ঝুরঝুর করে পড়তে থাকে, আবার, কখনো দুফাঁক হয়ে যায় বুক চিরে, উঁচু পাহাড় হয়… তেমনি জমির ক্রেতা-বিক্রেতার জীবনেও আসে পরিবর্তন, তারাও জলে বা বাতাসে এক সময় প্রস্তর হয়। জমির সাথে যেন তার ক্রেতা-বিক্রেতার একটা সমান্তরল জীবন, যা অন্তহীন ও অনিঃশেষিত। আর জগতদা মনে করেন, পৃথিবীতে তিনিই একমাত্র জমির ব্যবসাটা বোঝেন এবং তিনি না থাকলে ব্যবসাটা যখন আর থাকবেই না, ... ...
এলাকাটা ইতিমধ্যেই ভুতুড়ে আকার ধারণ করেছে! এই দাবদাহেই বিদ্যুতটা দরকার সব থেকে বেশী, অথচ প্রতি বছর এই সময়েই লোডশেডিংয়ের ভূতটা চেপে বসে! কর্তৃপক্ষ অবশ্য হরহামেশাই ‘সীমিত সম্পদ’ কার্ডটা ছেড়ে দেয় বাজারে! কিন্তু মাটির নীচে ও উপরে এত সম্পদ আছে আর কয়টা দেশে? ... ...