
এতদিন পর্যন্ত কোন অচেনা অজানা কারবারে কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করতে যে আম জনতা ইতস্তত করছিলেন তাঁরাও ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টের খাতায় নাম লেখালেন; রোজ সকালে বিকেলে ডাউ জোনস/ নাসডাক ইনডেক্সের ডলার সাইন দেখা শুরু করলেন। নিতান্ত তথ্যের খাতিরে বলা ভালো ১৯২৯ সালের গ্রেট ডিপ্রেশন বা ওয়াল স্ট্রিট ক্র্যাশের সময়ে মাত্র ৭ শতাংশ আমেরিকান সরাসরি শেয়ার কিনেছিলেন, তাতেই সেই মহা সঙ্কট। ১৯৯৪ সালে চল্লিশ শতাংশ আমেরিকান শেয়ার বাজারে সরাসরি খেলছেন, মাত্র সাত বছরের ভেতরে তাদের সংখ্যা বেড়ে হল ষাট শতাংশ বা আট কোটি। ... ...

সুজান বললে, নতুন দিগন্তে পাড়ি দিচ্ছি। গত দু বছরে বাণিজ্যের চাল চলন বদলে গেছে, দেখতে পাও না? এই যে এক সময়ে আমরা কনটিনেনটাল ব্যাঙ্ক ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে আইরিস মেল পাঠিয়েছি কোরিয়ার সেউল ব্রাঞ্চে, মুহূর্তের মধ্যে খবর বিনিময় হয়েছে; অথচ বোকেনহাইমার লানডস্ত্রাসেতে আমাদের অফিসের উলটো দিকে ড্রেসনার ব্যাঙ্কে কি সিবা গাইগিকে টাইপ করা চিঠি পাঠিয়েছি মেসেঞ্জার মারফত। শুধু মেল নয়, ইন্টারনেট আমাদের পৃথিবীকে ছোট করে দিয়েছে –কম্পিউটারের বোতাম টিপলে সম্পূর্ণ নিখরচায় একই প্লাটফর্মে ক্রেতা বিক্রেতা, মিস্ত্রী মজুর একত্র হতে পারে, একটা বিশাল মার্কেট প্লেস, এখানে আসতে যেতে কোন খরচা নেই, তেল পুড়িয়ে গাড়ি চালাতে হয় না, ফ্রি এন্ট্রি ফ্রি একজিট। ধান্দা যাই হোক না কেন। আর ওই টেলিফোন নম্বর স্টাইলের কম্পেনসেশান? বোনাসের কথা ভুলে যাও, এরা শেয়ার অপশন দিচ্ছে, আই পি ও (ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং)-র প্রথম দিনেই শেয়ারের দাম ডবল হচ্ছে, কাগজে দেখো না? ... ...

ব্যাঙ্কার ও ইনভেস্টরদের যৌথ কমান্ড ফার্স্ট ব্র্যান্ডসের অফিসে অবতীর্ণ হওয়া মাত্র ডিরেক্টরদের আইনি প্রতিরক্ষা বাহিনী যুদ্ধে নামলেন- তাঁরা জানালেন সম্মুখ সমর নয় , কোন ডিরেক্টরের গায়ে হাত দেওয়া দূরের কথা, ডেকে পাঠানো যাবে না,। তাঁরা কেউই সরাসরি বাক্যালাপ করবেন না। জে পি মরগান বা ব্ল্যাকরকের ব্যাঙ্করাপটসি লইয়ারদের আপাতত আলোচনা করতে হবে ফার্স্ট ব্র্যান্ডের সিনিয়র অফিসারদের সুরক্ষা দলের সঙ্গে - তাঁদের মধ্যে প্রধান সুবিখ্যাত আইনি সংস্থা ব্রাউন রাডনিক এবং কোল শোলৎস । জে পি মরগান , জেফরিজের ঋণ উদ্ধারকারী উকিলেরা চমকে গেলেন – ওহাইওর এই প্রাইভেট কোম্পানির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন আমেরিকার এতগুলি খ্যাতনামা আইনজ্ঞ যাদের একদিনের ফি লক্ষ ডলার । এ টাকা আসে কোথা হতে ? এমনও দিন আসতে পারে ভেবেই কি ফার্স্ট ব্র্যান্ডের পরিচালক বৃন্দ তাঁদের অস্ত্রাগারে তূণীর সঞ্চয় করে রাখছিলেন? ... ...

অ্যাসেট ব্যাকড ফাইনান্সিংএ দুটো সমস্যা: ব্ল্যাকরক হেন অ্যাসেট ম্যানেজার ছ মাস, ন মাসের জন্য দু, দশ হাজার ডলার ধার দিয়ে ছুঁচো মারেন না, তাঁরা খোঁজেন গণ্ডার, যার ওজন অন্তত একশ মিলিয়ন এবং আয়ু পাঁচ বছরের। এই সমস্যাটির সমাধান- সহস্রটি ইনভয়েস জুড়ে আঁটা দিয়ে সেঁটে এক ভারি ওজনের কাগুজি গণ্ডার বানানো। কিন্তু তার পরেও আরেক সমস্যা থেকে যায় – যেমন যেমন একটা ইনভয়েসের দাম চুকিয়ে দেওয়া হবে তেমনই আরও নতুন ইনভয়েস জুড়ে গণ্ডারের ওজনের ভার সাম্য বজায় রাখতে হবে। আগে আমার হামবুর্গ সেমিনারের অভিজ্ঞতার গল্প লিখেছি - ক্রেদি সুইসের বন্ডগুরু বলেছিলেন আমরা পাঁচ বছরের জন্য একশো মিলিয়ন ডলারের বন্ড বানাতে রাজি, তার জন্য আমাদের চাই হাজার ইনভয়েসে ভরা এমন একটা বাকসো যার মোট মূল্য আজ একশো মিলিয়ন ডলার, কালও একশো মিলিয়ন। যোগ বিয়োগ লেগেই থাকবে, কিছুর পেমেন্ট হবে তার জায়গা নেবে আরও কিছু, কিন্তু যে কোন সময়ে বাকসোর মূল্য হতে হবে সেই একশো মিলিয়ন ডলার। ... ...

ড্যানিয়েল চু হিসেব করে দেখলেন নিচের তলার এই মানুষদের সংখ্যা আমেরিকান নাগরিকের বিশ শতাংশ -ওয়াল স্ট্রিট কেন, মেন স্ট্রিটের কোন ব্যাঙ্ক এঁদের দু পয়সা ধার দেবেন না কারণ এঁদের ক্রেডিট রেকর্ড নেই। ড্যানিয়েল বললেন, আরও কিছু তো খুঁটিয়ে দেখা যেতে পারে, যেমন কেউ হয়তো ভালো গোছের কাজ করেছিলেন, প্যানডেমিকে বেকার, এতদিন ঠিক চলছিল আচমকা বিবাহ বিচ্ছদের কারণে সংসারে টানাটানি, দশ বছর নিয়মিত বাড়ি ভাড়া দিয়ে এসেছেন কিন্তু সে সব তথ্য ক্রেডিট ব্যুরোর খাতায় উঠবে না কেন না এঁদের কাগজপত্র বা সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর নেই। তাহলে একটা জলজ্যান্ত মানুষের কর্ম বা আয় ক্ষমতার একমাত্র নির্ণায়ক ক্রেডিট ব্যুরো? ... ...

ব্রিটিশ অর্থনৈতিক উদ্যোগে অসামান্য অবদানের পুরস্কারস্বরূপ রাজকুমার চার্লস সি বি ই ( কমান্ডার অফ দি ব্রিটিশ এম্পায়ার ) খেতাব দিলেন গ্রিনসিলকে। ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে এলে প্রধানমন্ত্রিত্ব পদত্যাগ করলেন ডেভিড ক্যামেরন। এবার গুরু ঋণ চোকানোর পালা , লেক্স গ্রিনসিল বার্ষিক দশ লক্ষ পাউনড সাম্মানিকের বিনিময়ে ক্যামেরনকে গ্রিনসিল কোম্পানির পরামর্শদাতার পদে প্রতিষ্ঠিত করলেন মাসে দু দিন হাজিরা দিলেই যথেষ্ট , কাজটা আসলে লবিইং , একে ওকে দুটো কথা বলা, সুপারিশ সিফারিশ করা। এত বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সরকারের যে কোন দফতরে চেয়ার টেনে বসতে পারেন। গ্রিনসিল ক্যাপিটালের ভ্যালুয়েশন সত্তর বিলিয়ন ডলার, আসন্ন আই পি ওর সুবাদে ডেভিড ক্যামেরনের সাত কোটি ডলার পকেটে আসার পথ সুপ্রশস্ত। ... ...

ততক্ষণে এটুকু বুঝেছি এই বন্ড গুরুর স্ট্র্যাটেজির নাম অ্যাসেট বেসড সিকিউরিটি। সলোমন ব্রাদার্সের লু রানিয়েরি (আগের পর্ব পশ্য) বাজারে তখন হাজার হাজার মর্টগেজ অ্যাসেট জুড়ে বন্ড বানিয়ে, বেচে বাজার কাঁপাচ্ছেন। সেখানে আমার প্রশ্ন ছিল – বিভিন্ন মর্টগেজের আয়ু, ই এম আই আলাদা। আজ কেউ বাড়ি কিনল আরেকজন বেচল, ইতিমধ্যে মর্টগেজ সুদের হার, ই এ এম আইয়ের পরিমাণ বদলে গেছে; তবু বাজার যখন এটাকেই ‘সিকিউরিটি ‘বলে মাথায় চড়িয়েছে, সেখানে আমি কোথাকার হরিদাস পাল যে এই মহান উদ্যোগে সংশয় জানিয়ে আমার বরানগরী নির্বুদ্ধিতা জাহির করবো? কিন্তু এই ট্রেড, বিলস, কালেকশানের বিষয়টা বোঝার অহংকার আমার আছে সঙ্গত কারণেই। ১৯৭৭ সালে এই দিয়েই ষ্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া ফ্রাঙ্কফুর্টে আমার হাতেখড়ি, তার পর কনটিনেনটাল ব্যাঙ্ক, সিটি ব্যাঙ্কের প্রথম দু বছরের কার্যকলাপ। ... ...

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ঘর ফেরত আমেরিকান সৈন্যরা আর্মি কমিশন শেষে হাতে যে থোক ডলার পেলেন সেটা বিনিয়োগ করার কাজে এগিয়ে আসেন জে আর হুইটনির মতন দু চারটি ফান্ড। প্রাইভেট ইকুইটির ব্যবসা এই ভাবেই শুরু হয়েছিল। তবে একদা সেটা ছিল একান্ত প্রাইভেট, দুটি পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ক্রমশ দেখা গেল কিছু ব্যাঙ্ক বা ফান্ড তাঁদের টাকার ছোট একটি পোঁটলা এঁদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, সামান্য কিছু দিলাম। দেখে শুনে লাগান। নয়ের দশকে যখন এই ব্যবসা কাছে থেকে শুরু হতে দেখেছি, তখন আমার প্রথম চেনা সেই প্রাইভেট ইকুইটির পিছনে সিটি ব্যাঙ্কের অভয় আশীর্বাদ ছিল। ১৯৪৬ থেকে ১৯৯০ অবধি সারা পৃথিবীতে প্রাইভেট ইকুইটির কারবারি সংস্থার সংখ্যা ছিল দেড় হাজারের কম, মোট ফান্ড ভ্যালু মেরে কেটে ছয় বিলিয়ন। ... ...