এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অন্তরালে

    Manali Moulik লেখকের গ্রাহক হোন
    ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭১ বার পঠিত
  • শ্রাবণের ড্রয়িংরুমটি তার নিজস্ব ব‍‍্যক্তিত্ব ও সাজসজ্জার মতোই রুচিশীল। ছিমছাম বড়ো ঘরটিতে অনেকগুলো ডানলোপিলোর গদি দেওয়া ডিভান, নতুনত্ব নকশার কার্পেট আর মধুবনী পেন্টিংয়ের ময়ূর। রবীন্দ্রনাথের সাদা-কালো ছবিটির নীচে কাঠের নীচু টেবিলে সোনালী-রঙা গ্রামাফোনের মডেল। তার জীবনের সাফল‍্যের বিভিন্ন স্মারক। তবে সবচেয়ে দেখার বিষয় হলো ওর বইয়ের সংগ্রহ। অত্রি বলে, "স্পিরিচুয়াল ইন্সট্রুমেন্ট : বই যন্ত্র"। কাঠের প‍্যালেটের পরিশীলিত র‍্যাকে একের পর এক রবীন্দ্র-পরবর্তী সাহিত‍্য, কল্লোল যুগ, মার্ক্সীয় সাহিত‍্য, লাতিন আমেরিকান অনুবাদ, ইহুদি পৌরাণিক সাহিত‍্য, বাংলার লোককথা এ লোকশিল্প, রিফর্মেশন অফ ইউরোপ...আরো অজস্র নির্বাচিত সংকলন। বেতের চেয়ারটা টেনে নিয়ে ইরাবতী বলে,
    --- "তাহলে কী হলো শ্রাবণদা? তোমার অন্ধভক্ত সেই ছেলেটির কাকার গুপ্তবিদ‍্যা খুঁজে বের করা গেলো?"
    শ্রাবণের চোখ চিন্তিতভাবে মধুবনী পেন্টিংটার দিকে নিবদ্ধ। ডানহাতের সুললিত দুটি আঙুলের একটিতে মুক্তো, একটিতে মনভালো করা নীল রঙের একটি পাথর। মেরুন-রঙা সোফাটায় আধশোয়া হয়ে আড়মোড়া ভাঙছিলো অত্রি। এবার খেঁকিয়ে উঠলো, "আরে না না, তোর হিরো এবারে ঘাবড়ে গেছে। ওই ধ্রুবর কাকার একটা তেকেলে বই, সেই প‍্যারালাইসিস না কার লেখা সেটা দেখে ইস্তক ভোম্বল হয়ে বসে আছে।"
    --- "প‍্যারাসেলসাস। উচ্চারণ বিকৃত করিস না বাঁদর।" শ্রাবণ কেটে কেটে বললো।
    ইরাবতী দুজনের মাঝে একটা হাত এগিয়ে দিয়ে বলে, "অ‍্যাটেনশন! ওর কথা বাদ দাও তো দাদা! তুমি বলো ওই ম‍্যানুস্ক্রিপ্টে কী পেলে?"
    --- "খোদায় মালুম!" অত্রি আবার ফুট কেটে সোজা হয়ে শোয়। ইতিমধ‍্যে ইরা উঠে গিয়ে একপ্লেট কুকিজ এনে সামনের টেবিলে রাখে।শ্রাবণ বলে, "আনলি? ভালো করেছিস মা, উদ্ধার করেছিস। ব্রাউনিস্ আর চিকেন নাগেটস্ আছে, বাড়িতে রাখি। হনুমান - জাম্বুবান এলে অফার করি এই আর কী...."
    --- "আহা, টপিক থেকে সরছো কেন?" ইরা কপাল থেকে চূর্ণ চুলগুলো সরিয়ে বলে।
    শ্রাবণ গম্ভীরমুখে সোজা হয়ে বসে। বলতে শুরু করে, "হ‍্যাঁ, যা বলছিলি ওই প‍্যারাসেলসাসের পুঁথির ব‍্যাপারে তো? ওখানে যেটা দেখলাম তাতে আমি সত‍্যিই চমৎকৃত। অন্ততঃ ডিমনোলজি বা টক্সিওলজির এইসব দিক নিয়ে অতোবছর আগে ভারতে কেউ চর্চা করেছেন, এটা ভেবেই আশ্চর্য একটা গর্বে মন ভরে গেলো। তোদের হয়তো বলেছি, প‍্যারাসেলসাস কথিত ট্রিয়া প্রাইমাস বিষয়টা নিয়ে? ওনারা সেযুগে বিশ্বাস করতেন, সালফার, পারদ আর জল এই তিনটে মানবদেহের সঙ্গে কম্পারেটিভলি দেহ, আত্মা আর বুদ্ধির কাজ করে।সঙ্গে ডকট্রিন অফ সিগনেচার -- সিগনেচার কার? অবশ‍্যই প্রকৃতির। সেখানে ধর, একটা গাছের কোনো অংশের আকৃতি আঙুলের মতো। সেটা আঙুলের কোনো অসুস্থতাই সারাতে সেরা ওষুধ। এগুলো যা কাজ করে, তা হলো মানুষের শারীরিক অসুস্থতা সারানো যার লিংক প্রকৃতি নিজেই দিয়ে রেখেছে।"
    ইরা বলে, "বেশ। সব তো বুঝলাম। কিন্তু আগে বলো, এই যে পুঁথিটা ১৬৪৩ সালে রচিত এর মধ‍্যে তো ইউরোপে ছাপাখানা এসে গেছে ভালোভাবে। তাহলে? হাতে অনুলিপি করা হলো কেন?"
    -- "গুড কোয়েশ্চেন।" শ্রাবণ উত্তর দেয়, "দ‍্যাখ, ছাপাখানা ওইসময়ের মধ‍্যে ইউরোপে ছড়িয়ে গেছে এটা যেমন ঠিক তেমনই এও ঠিক, ক‍্যাথোলিক চার্চ এসময়ে সারা ইউরোপে আধিপত‍্য বিস্তার করেছিলো। আর জানিসই তো, ওরা যে কোনো ধরণের অপবিজ্ঞানের চর্চা মানে ধর ডিমনোলজি, ডাকিনীবিদ‍্যা এসব নিষিদ্ধ করে দেয়। তাই সেই সংক্রান্ত বইপত্রও নিষিদ্ধ হয়। "
    -- "বুজলুম" অত্রি মাথা নাড়ে। -- "তাহলে এর মধ‍্যে ধ্রুবর কাকার দত‍্যি-দানবের কেস আর তোর হাতে আসা কেসটার সম্পর্ক কী?"
    শ্রাবণ কিছু বলার আগেই সশব্দে ফ্ল‍্যাটের কলিংবেলটা বেজে ওঠে। এমন দ্রুত আর কর্কশ শব্দে ওটাকে বাজতে কেউ অনেকদিন শোনেনি। যেন বৈদ‍্যুতিন যন্ত্রটার গলা টিপে ধরেছে কেউ নিজেকে বাঁচানোর দুর্বার প্রতিজ্ঞায়। শ্রাবণ দ্রুত গিয়ে দরজা খুলতেই যাকে দেখা গেলো, তাতে সবার চক্ষুস্থির। ধ্রুবর মা, শকুন্তলা দেবী! সেই সাদা গরদের থান আর প্রতিমার মতো মুখমন্ডল ঘামে ও ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত। চূর্ণ চুল কপালে ছড়িয়ে পড়ে আরো কাতর দেখাচ্ছে। শ্রাবণের হাতদুটো চেপে ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, "শ্রাবণ, বাবা বাঁচাও....পারলে একমাত্র তুমিই..."
    ইতিমধ‍্যেই শ্রাবণ একপলকে দেখে নিয়েছে ওনার গমরঙা হাতের সেই মোটা সোনার বালাদুটো উধাও। ইরা দ্রুত ওনাকে সোফায় বসিয়ে একগ্লাস জল নিয়ে এলো। এসির পরিবেশে আর এদের সাহচর্যে উনি কিছুটা সুস্থ হতে শ্রাবণ ওনার পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে বললো
    --- "মাসীমা, কোনো ভয় নেই। শুধু নিঃসংকোচে বলুন, 'প‍্যারাডাইস পাব ' তো? "
    অত্রি আর ইরাবতী হতভম্বের মতো একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। শকুন্তলা দেবী মুখে আঁচল চেপে ধরে হু হু কান্নায় ভেঙে পড়েন। জড়িতকন্ঠে বলেন, "ওই ম‍্যানুস্ক্রিপ্টটাও কোন্ এক জোচ্চোরকে দিয়ে দিতে যাচ্ছিলো.....আমি কোনোভাবে..."
    -- "থাক মাসীমা। " অপরিসীম কোমল কন্ঠে শ্রাবণ বলে, "ওসব কথা থাক। আমি সেদিনই বুঝেছি, থাক। ইরা, ওনাকে প্লিজ দ‍্যাখ একটু। আমরা আসছি। কোনো চিন্তা করবেন না, আমার এই বোন খুব বুদ্ধিমতী। যা যা দরকার ওকে বলবেন। আমি আসছি। অত্রি আয়।"
    শ্রাবণ আর অত্রির দ্রুত চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শকুন্তলার চোখে আরো একবার জল ভরে আসে।


    পার্কিং লট থেকে গাড়িটা বের করেই একটু বেশী স্পিড তুললো শ্রাবণ। অত্রি দীর্ঘক্ষণ পর কথা বলার সময় পেয়ে ফুট কাটলো, "শ্রীল শ্রীযুক্ত কম‍্যান্ডান্ট, এই গাধাবোটকে পশ্চাতে বেঁধে নিয়ে কোন পথে চলেছেন?"
    শ্রাবণ একমনে ষ্টিয়ারিং আর রাস্তায় খেয়াল রাখে।
    -- "আরে কিছু তো বল্!" অত্রি অধৈর্য হয়ে ওঠে।
    শ্রাবণ সাবধানে একটা সিগন‍্যাল কাটিয়ে আবার গতি বাড়ায়, "তাস পাশা নেশা / তিন সর্বনাশা। এই গুরুবাক‍্য মনে রেখো। বাকি কথা প‍্যারাডাইস পাবে গিয়ে। এখন কানের কাছে প‍্যাঁকপ‍্যাঁক করলে এক থাবড়া দেবো।"
    কল্লোলিনী কলকাতার বুকে যে কতশত ব্ল‍্যাকহোল আছে, যেখানে সময়, আলো, দৃষ্টি সব থমকে যায় তার খবর সাধারণ লোকে খুব একটা রাখে না। দিনের আলোয় যে ফেরেব্বাজি চলে না একথা ভাবাও পাপ। কিন্তু জঠরজ্বালায়, চাকরির সন্ধানে, অফিসে - কলেজে ছোটা মানুষদের তেজস্বী জনধারায় তা কিছুটা আবছা হয়ে যায়। রাতের কলকাতা দেখলেই শঙ্খ ঘোষ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন, 'এ কলকাতার মধ‍্যে আছে আরেকটা কলকাতা।' প‍্যারাডাইস পাব তেমনই। মায়াবী নীল-গোলাপী আলোয় নামটা জ্বলজ্বল করছে, কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নেই কাঁচের ভারী দরজার ওপারে কী চলছে। শ্রাবণ গাড়িতেই প্রয়োজনীয় ছদ্মবেশ সেরে নিয়েছে। এখন ব্রাউন টি শার্ট, ব্ল‍্যাক জিন্স আর ফ্রেঞ্চ কাট নকল দাড়ি সম্বলিত এই ছ ফুটিয়া বাঙালিকে দেখে দুঁদে সাংবাদিক বলে কেউ ভুল করবে না। অত্রির পরণেও ব্ল‍্যাক ডেনিম আর কটকটে টম‍্যাটো লাল ফুলস্লিভ শার্ট। দরজার পাল্লা ঠেলতেই এক দমকা হাওয়া এসে নাকে ঝাপটা মারলো। অ‍্যালকোহল, নিকোটিন আর নানান মাদকদ্রব‍্যের তীব্র গন্ধের মিশেল। প্রায়-অন্ধকার কোণে একটা টেবিলে টাকা আর তাস ছড়ানো। জ‍্যাজ আর গিটারের তীব্র মিউজিক, আলোর লাল-নীল ছটা মাঝে মধ‍্যে এসে পড়লেও খুব একটা খেলোয়াড়দের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটছে না। পায়ে পায়ে টেবিলটার দিকে এগিয়ে হাতের একটা আংটি খুলে রাখে শ্রাবণ। হিন্দিতে বলে, "হোক একদান?"
    নতুন এই খেলোয়াড়ের দিকে সবাই চোখ তুলে তাকায়। অবাঙালি দুজন আর একজন অ‍্যাংলো ইন্ডিয়ান। পাবে কখনো আগে না দেখা ব‍্যক্তিকে কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল‍্যের চোখে দেখে। তবে নতুন মুর্গী রোষ্ট করার উৎসাহও ঝিকমিক করে তাদের চোখে। নতুন যখন, খেলার নিয়মও জানবে না।
    ধ্রুব রক্তজবার মতো চোখ সিকিভাগ খুলে বলে, "নো টার্ণ। গোল্ড রিং? নো নো। উইদাউট ক‍্যাশ নো প্লে।"
    টেবিলে ঝুঁকে পড়ে শ্রাবণ। কয়েকটি তাস হাতে নিয়ে সাজাতে সাজাতে বলে, "দেন সিলভার রিং?"
    অ‍্যাংলো ইন্ডিয়ান লোকটি চেহারায় দুবলা-পাতলা হলে কী হয়, নেশায় চুরচুর আর দারুণ রগচটা। শ্রাবণের কলার খামচে ধরে বলে, "হেই ম‍্যান, আর ইউ জোকিং?'
    অ‍্যালোকোহলের তীব্র গন্ধের সঙ্গেই তার হাতটা একঝটকায় ঝেড়ে ফেলে শ্রাবণ।
    হঠাৎ সোজা দাঁড়িয়ে ওদের টেবিলটায় সশব্দ চাপড় মারতে মারতে বলে, "হেই অ‍ল, অ‍্যাটেনশন ! আমি সোনা বানাতে পারি। আ ভেটেরান রিসার্চার ইন অ‍্যালকেমি। "
    মুহূর্তে থেমে গেলো গিটার আর জ‍্যাজের কান ঝালাপালা করা চটুল মিউজিক। মদ‍্যপ যুবক, বৃদ্ধ আর স্বল্পবসনা নারীরা হতবাক হয়ে তাকালো এই দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ মানুষটির দিকে। ওদিকে আধা-সাহেবের রাগ তখন সপ্তমে। কবজির অসম্ভব ব‍্যথা সামলে টলতে টলতে এগিয়ে আসতেই শ্রাবণ কয়েকপা পিছিয়ে যায়। ফলতঃ সে আছড়ে পড়ে মেঝেতে। বিয়ারের ক‍্যান ছত্রখান। মেয়েরা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।
    ধ্রুবর হতবাক মুখের সামনে গিয়ে শ্রাবণ ধীরে ধীরে বলে, "ডু ইউ নো দ‍্যা নেম অফ প‍্যারাসেলসাস?"
    রক্তজবা চোখ মেলে কয়েকসেকেন্ড সে বুঝে নিতে চাইলো ব‍্যাপারটা। তারপরেই নেশা ছুটে যায়। চেয়ারের পায়া আর শূন‍্য বিয়ার ক‍্যানে হোঁচট খেতে খেতে দৌড়ে গিয়ে পড়ে কালো টিশার্টের এক প্রৌঢ় অথচ কঠিন চেহারার ব‍্যক্তির উপর।
    হল কাঁপানো গলায় সে গর্জে ওঠে, "ইয়োর ম‍্যানেজার ইজ আন্ডার অ‍্যারেষ্ট। পাব ঘিরে রেখেছি আমরা। পালাবার চেষ্টা বিফল হবে। "
    কখন যে চারিদিকের কোলাহলে মিশে থাকা নানা পোশাক, নানা চেহারার পুলিশ এখন সমস্ত জায়গাটা ঘিরে দাঁড়ায় তা বুঝতে পারা যায় না। দেখা গেলো, দ্বিতীয় অবাঙালি লোকটি মহা গোঁয়ার। সবদিক জেনেশুনেও পিছন থেকে শ্রাবণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। জুডো চ‍্যাম্পিয়ন অত্রির চপেটাঘাতে সশব্দে ধরাশায়ী হয়।
    প্রায় বেহেড ধ্রুবকে বুকে জড়িয়ে আর অত্রির সাহায‍্যে ধরে বেরোতে বেরোতে শ্রাবণ বলে, " যা বুঝছি, রিহ‍্যাব সেন্টারে পাঠাতেই হবে। সে না হয় হলো, আগে একবার ওর মায়ের কাছে নিয়ে যেতে হবে। উনি অপেক্ষায় আছেন আমার ফ্ল‍্যাটে।"
    কালো শার্টের ইন্সপেক্টর বলেন, "বেশ। তবে তারপর আমাদেরও কিছু করণীয় আছে। জুয়া, নারকোটিক্স, প্রতারণা চার্জ নেহাৎ কম নয়। আর কী বলবো শ্রাবণবাবু, কলকাতার বুকে এই বিষবৃক্ষগুলো যে এতো গজিয়ে উঠছে....অবশ‍্যই আরো সতর্ক হবে পুলিশ।"
    -- " হবেন?" শ্রাবণ খুব মিষ্টি করে জিজ্ঞাসা করলো।
    লজ্জায় অধোবদন ইন্সপেক্টর বললেন, "সবটা কি আমাদের হাতে বলুন তো? আপনি আগুন ছোটাবেন জানি...."
    -- "কী করবো? আমার হাতেও তো শুধুমাত্র কলম।" স্নিগ্ধ হেসে শ্রাবণ এগিয়ে চলে।

    *****************************

    চন্ডীগঢ় থেকেই ড্রাগ, সুরা আর জুয়ার চক্রে জড়িয়ে পড়া হতভাগ‍্য ছেলেটি সুস্থ, স্বাভাবিক হয়ে মায়ের কাছে ফিরেছিলো ছয়মাস পর। এখন ছোটো একটা ব‍্যবসা সফলভাবে চালাচ্ছে। আজ কলকাতার টাউন হলে দেশ ও বিদেশের বিশিষ্ট গবেষক, অধ‍্যাপক ও বিজ্ঞানীদের সমাবেশে ধ্রুবর কাকাবাবু অমরেন্দ্রর অ‍্যালকেমি নিয়ে গবেষণা ও সুইডিশ সাহেবের দেওয়া অমূল‍্য গ্রন্থটির প্রকাশ হলো। হোক না কিছুটা অবাস্তব, কিছুটা বা অবৈজ্ঞানিক। অন্ততপক্ষে এক ভারতীয়ের নিঃশব্দ সাধনা তো অন্তরালে নিভে গেলো না। অ‍ন্তরাল থেকে সম্মানের আলোর প্রকাশে এলো এক আশ্চর্য ও রহস‍্যময় গবেষণা। সাম্মানিকের অর্থ গ্রহণ করেছিলো ধ্রুব। তারপর শ্রাবণের সঙ্গে গিয়েছিলো কোথাও একটা। এখন শ্রাবণের ড্রয়িংরুমে অত্রি, ইরাবতী, ধ্রুব আর শকুন্তলা দেবী।
    ইরা স্তব্ধতা ভঙ্গ করে, "সবই বুঝলাম শ্রাবণদা, শুধু ওই 'সোনার মানুষ' জিনিসটা কী? মানে যেটার জন‍্য ধ্রুববাবু কোটিপতি হবার আশা নিয়ে তোমার কাছে এসেছিলেন?"
    শ্রাবণ সোফায় সোজা হয়ে বসে।
    -- "অ‍্যালকেমিষ্টদের সর্বরোগহরা প‍্যানাসিয়ার খোঁজ বা ডকট্রিন অফ সিগনেচারের কথা তো বলেছি। এবার ওনারা ভাবতেন, একধরনের গাছের শিকড় আছে যার গঠন অবিকল মানুষের মতো। রঙ গাঢ় হলুদ বা কাঁচা সোনা। হ‍্যাঁ, যেহেতু বিভিন্ন অঙ্গের মতো দেখতে গাছপালা নির্দিষ্টভাবে সেই অঙ্গেরই রোগ সারাতে পারে, তাই সম্পূর্ণ মনুষ‍্য আকৃতির গাছ পারে সব রোগ সারাতে। ওনার সুইডিশ বন্ধুর বই আর ডায়েরিতে সেই সন্ধানের কথাই লিখেছিলেন। তৎকালীন ধ্রুববাবু ভাবলেন, এ জিনিস পেলে রাতারাতি কোটি টাকা মেলে। জুয়ার ধার আর বিলাসিতা দুই-ই মেটানো যায়। অথচ আমি সেদিক দিয়েই যাচ্ছি না। ওদিকে পাওনাদার আর আড্ডা দুই-ই দাঁত খিঁচিয়ে হাতছানি দিচ্ছে। অগত‍্যা....."
    লজ্জিত ধ্রুব মাথা নীচু করে। শ্রাবণ তার কাঁধে হাত রেখে বলে, "নেভার মাইন্ড ডিয়ার। তুমি অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে এসেছো এই তো চাই। আর তোমার কাকার অতবড়ো কাজটা অন্তরাল থেকে সামনে এলো, এটাই বড়ো কথা নয় কি?"
    ধ্রুব নীরবে সম্মতি জানায়।
    শ্রাবণ উঠে গিয়ে একটা গিফ্ট প‍্যাক নিয়ে আসে। মোড়ক খুলতে খুলতে বলে, "তবে একটা অমার্জনীয় অপরাধ তুমি করেছো, ধ্রুব। তার প্রায়শ্চিত্ত আজই করতে হবে।"
    মোড়ক থেকে বেরোয় লাল টুকটুকে ভেলভেটে মোড়া একটা জুয়েলারির বাক্স।
    -- "সেদিন নেশা আর জুয়ার অন্ধ আকর্ষণে মাসীমার লক্ষ্মীপ্রতিমার মতো হাতদুটি নিরাভরণ করেছিলে। আজ বই প্রকাশের প্রাইজ মানি সঙ্গে নিয়ে তাই তোমার অন‍্যায়ের শূন‍্যস্থান ঘোচাতে তোমাকেই নিয়ে গেলাম। নাও, মাকে পরিয়ে দাও এই নতুন বালাদুটি।"
    মকরমুখী সোনার বালাদুটো ধীরে ধীরে শকুন্তলা দেবীর হাতে পরিয়ে দিয়ে ধ্রুব মাকে প্রণাম করে। চোখে জল। শকুন্তলাকে জড়িয়ে ধরেছে ইরাবতী। শ্রাবণকে জড়িয়ে ধরলো অত্রি। কিছুক্ষণ পর ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙেন শকুন্তলা দেবী। বলেন,

    "তোমরা সোনার মানুষ খুঁজতে বিস্তর মাথা ঘামালে, তদন্ত করলে, আমি কিন্তু তোমাদের ফাঁকি দিয়ে সে জিনিসের খোঁজ পেয়ে গেছি"
    সবাই চমকে তাকায় ওনার দিকে। চোখে জল মুখে হাসি নিয়ে শ্রাবণ, ধ্রুব, অত্রি আর ইরাবতীকে বুকে টেনে নেন উনি।
    বলেন,
    "এইত্তো, এতোগুলো সোনার ছেলেমেয়ে আমার। মায়ের শূন‍্য বুক ভরিয়ে দিয়ে, আতঙ্ক মুছে দিয়ে, নতুন আলো যারা দেখাতে পারে। আর অন‍্য কোনো সোনার মানুষে আমার দরকার কীসের?"

    (শেষ)


    .......
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Debanjan | ১১ অক্টোবর ২০২৬ ২২:৪৭743194
  • বেশ হয়েছে l তবে শেষটা যেন খুবই তাড়াতাড়ি হলো l আরেকটু টুইস্ট দিলে ব্যাপক হত l
  • Manali Moulik | ১১ অক্টোবর ২০২৬ ২২:৫৬743196
  • ধন‍্যবাদ।
    নেক্সট টাইম অবশ‍্যই টুইস্টের চেষ্টা করবো।
  • বিন্দুবাসিনী | ১১ অক্টোবর ২০২৬ ২৩:১৫743197
  • মানালি অনুমতি দিলে আমার পাঠপ্রতিক্রিয়া/ক্রিটিসিজম জানাবো।
  • Manali Moulik | ১১ অক্টোবর ২০২৬ ২৩:২৫743198
  • নিশ্চয়ই দিদি। যা যা মনে হয়, মন খুলে জানান। আমার চরিত্র সৃজন ও সম্পূর্ণ একটা সিরিজে সেটাকে রূপ দেওয়া এই প্রথম। ভালোমন্দ, পজিটিভ-নেগেটিভ জানালে খুবই ভালো হয়।
  • বিন্দুবাসিনী | ১১ অক্টোবর ২০২৬ ২৩:৫৯743200
  • ফ্রম চাড্ডি পারসপেকটিভ আমার মনে হয়েছে কিছু জিনিস।
    ১) বেশভুষা ঘরের ইন্টেরিয়রের ডিটেইলস এই গল্পে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে, যেন বুটিকের বর্ণনা পড়ছি। গল্পের জন‍্য সাজ দরকার বৈকি, কিন্তু বেশি সাজগোজ হয়ে গেল মনে হলো।
    ২) ডিটেকটিভ গল্পের মেজাজ তখনই জমে ওঠে যখন আঁচ করা যায় না, কে কালপ্রিট। গল্পের শেষ পৃষ্ঠা অবধি টানটান উত্তেজনা থাকে — সেটা অনুপস্থিত।
    ৩) বাঙালি মায়ের অবাঙালি পুত্র প্রথম দিকে তেমন ভালো বাঙলা বলতে পারেনি কিন্তু শেষের দিকে বেশ সড়োগড়ো।
    ৪) অ‍্যালকেমিবিদ‍্যা কাকে বলে সেটা পাঠককে জানাতে গিয়ে বড্ড বেশি থিওরি এসে পড়েছে, মনোযোগ টেনে রাখা ডিটেকটিভ গল্পে আরও অনেক কম রাখা যায় এটা। কারণ পাঠক সবাই, সে গল্প এনজয় করতে চাচ্ছে।
    ৫) যত ভালো বই ই হোক না কেন, প্রথম ধাপেই এত টাকা রয়‍্যালটি ও পুরস্কার বাবদ হয় নাকি? সোনার একজোড়া বালার দাম জানো? গানের কথা বেচে তিরিশ লাখ তো নয়, বোরিং পুঁথি বিক্রির প্রাথমিক লাভের একটা অংশমাত্র।
     
    খুব ভালো, খুব ভালো বলে মিষ্টি মিষ্টি মনভোলানো কথা বলতে পারতাম। কিন্তু বিশ্বনিন্দিত বাবু ধরা চাড্ডিনি এইরকমই। বেশ‍্যার ফিডব‍্যাক বলতে পারো।
  • Manali Moulik | ১২ অক্টোবর ২০২৬ ০০:২২743201
  • ডটদি, দুঃখিত যে আমি আপনার শেষ কথাগুলির সঙ্গে কোনোভাবেই সংযোগ স্থাপনে অক্ষম কারণ আমার গুরুতে আসা এই দেড় বছরটাক হবে হয়তো। তাই যে বিষয়গুলি কদর্য বা কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির তাতে আমার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ নেই। লেখাটির নিবিষ্ট পঠন ও সমালোচনা আমাকে সমৃদ্ধ করলো। এই বিষয়গুলি খেয়াল করেছেন, এতে আমার কৃতজ্ঞতা জানবেন ও আমারও লেখা মেরামত করতে সুবিধা হবে। ধন‍্যবাদ।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন।