এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অন্তরালে

    Manali Moulik লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪০ বার পঠিত
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩
    কলকাতার ঠিক কেতাদুরস্ত-ঝকমকে অভিজাত যাদের বলা হয়, এ বাড়িটা সেই গোত্রের না। বরং স্মার্ট, আধুনিক যুবকসদৃশ অ‍্যাপার্টমেন্টদের সামনে একে বেশ জেন্টলম‍্যান প্রৌঢ়-প্রৌঢ় লাগে। লোহার বৃহৎ কালো গেট ঠেলে ঢুকলে ডানদিকে গ‍্যারেজ, একটি টয়োটা গাড়ি ও গোটা তিনেক বাইক দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটির গঠন দোতলা হলেও বেশ সুবিশাল বলা যায়। সাবেক কালের গঠন, নিয়মিত পরিচর্যার ফলে রূপটা ধরে রেখেছে। ক্রিম রঙের দেওয়াল, কোল‍্যাপসেবল গেট আধখোলা। অত্রি আর শ্রাবণ প‍্যাসেজ পেরিয়ে সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে ধ্রুবর নাম্বার ডায়াল করলো। কিছুক্ষণের মধ‍্যেই পরিচিত দামী পারফিউমের সৌরভ আর ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে শোনা গেলো। একগাল হেসে হাত বাড়িয়ে দিলো সে,
    -- "মোষ্ট ওয়েলকাম, ডক্টর চ‍্যাটার্জী অ‍্যান্ড অত্রি ভাইয়া, আপ দোনো কো। আজকে এই বাড়িতে আসায় আমি যে কী হ‍্যাপি হয়েছি বোঝাতে পারবো না। শ্রাবণ স‍্যার, যে প্রবলেমের জপ‍্য আপনাকে ডাকা, তার সমাধান পরের কথা। আপনি আজ যে এসেছেন এতেই আমি নিজেকে ব্লেসড্ মনে করছি। উপরে চলুন।" দুপুরের রোদ-আঁধারি সিঁড়ি বেয়ে ওরা ধ্রুবকে অনুসরণ করে উঠতে থাকে দোতলায়। অত্রি শ্রাবণের কানের কাছে মুখ এনে চাপা গলায় একবার ফুট কেটে নেয়, "ভক্তি উথলে পড়ছে!"

    দোতলার বারান্দা পুরোনো ধাঁচের, রোদের ফালি দুপুরের আবহ বহন করে ছড়িয়ে পড়েছে। এক পরিচারিকা ঘরমোছা বালতি নিয়ে একবার তাকিয়ে দেখেই পাশের কোন একটা ঘরে ঢুকে গেলেন। ধ্রুবর মায়ের ঘরটা বেশ কেতাদুরস্ত। হালকা সবুজ দেওয়ালে হিন্দু দেবদেবীর অজস্র ফটো, প্রত‍্যেকটাতেই সেদিনের তরতাজা মালা দেওয়া। বার্মা সেগুনের বড়ো খাটে বসেছেন ধ্রুবর মা, শকুন্তলা দেবী। পরণে তসরের সাদা থান। দুহাতে মোটা সোনার বালা। কাঁচাপাকা চুল তালের মতো খোঁপা করা। রুপবতী বলতে যা বোঝায়, ঠিক তাই। নরম একজোড়া জুতো পাপোষের উপরেই রাখা। শ্রাবণ ওনার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে, দেখাদেখি অত্রিও। দুজনের চিবুক ছুঁয়ে বললেন, "কল‍্যাণ হোক। শ্রাবণবাবুর কথা আমি সেই আজব গাছের বীজ নিয়ে ঘটনাটায় শুনেছি। কাগজেও পড়েছি। বাব্বা, প্রোফেসর রায়ের ঘটনা নিয়ে কলকাতায় যা সাড়া পড়েছিলো! ভাবি বুঝি একলা থাকা বয়স্কদের নিরাপত্তা বলে আর কিছুই নেই--"
    ওনাকে কথার মাঝখানেই শ্রাবণ থামিয়ে বলে ওঠে, "মাসীমা, আমাকে শ্রাবণবাবু বলাটা কিন্তু আইনবিরুদ্ধ কাজ! আর আপনার আমি ছেলের মতো, বাবু টাবু বলতে পারেন, বা শুধু শ্রাবণ। দুটো একসঙ্গে বললে আমি এ কেস হাতেই নেবো না।"
    অত্রি আর ধ্রুব দুজনেই না হেসে পারে না। অত্রি বলে, "হ‍্যাঁ মাসীমা, ও পেশা থেকে শুরু করে নেশা - সব জগতেই দাদা। বাবু যোগ করলে মহা ক্ষেপে যায়, বলে, 'ফিটনে চড়ে হাওয়া খেতে বেরিয়েছি নাকি রে?"
    ধ্রুবর মায়ের মুখের আদলটি ধরতে গেলে অপরূপ। বাংলার স্তব্ধ দুপুরে শিশুকে আদর করতে করতে স্নেহসুধারসে পূর্ণ যে মাতৃমুখ দেখা যায়, তা যেন স্থায়ীভাবে ওনার মুখে খোদাই করা। একেবারে মায়েদেরই মতো। হাসতে হাসতে বললেন, "তা এতো সুন্দর বাবু হাওয়া খেতে বেরোলে সবাই তাকিয়ে দেখবে বইকি! বিবিও নিশ্চয়ই দেখারই মতো?"
    অত্রি খাটেই ওনার পায়ের কাছে বসে পড়ে বলে, "না না মাসীমা। ওসবের পাট নেই ওর। সেই যাকে বলে, 'আমি আপনার তালে নেচে নেচে যাই মুক্ত জীবনানন্দ, ' অথচ বনলতা সেন বা কারো জন‍্য ডিপ্রেসনের ছিটেফোঁটা পাবেন না।"
    শ্রাবণ ওর দিকে একটা বজ্রকটাক্ষ হেনে বললো, " তা ঠিক মাসীমা। এক্ষেত্রে আমি অনেকটা আপনার দেবরের অনুসারী।"
    ধ্রুব যেন হঠাৎ সচল হয়ে ওঠে। - "হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ, এবার একটু কাজের কথায় আসি। মা, মানে ওজন‍্যই তো এসেছেন ওনারা। কাকাবাবুর গুপ্ত বিষয়টা --- কী হলো বলো কিছু?"
    প্রবল ব‍্যক্তিত্বময়ী মহিলা যেন কিছুটা নিস্পৃহভাবে বললেন, "হ‍্যাঁ, সে মানুষটা ছিলো সৃষ্টিছাড়া। নিজের মনে কী করতো, কেন করতো তা কে জানে! বাবা বল না তুই, আমি কী বুঝি ওসবের...."
    ধ্রুব লাল গদি আঁটা চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে। বলতে শুরু করে,
    "শ্রাবণবাবু, আপনার মনে থাকার কথা আমার কাকার প্রেতচর্চা নিয়ে আমাদের অনেকটাই কথা হয়েছিলো --"
    --- "নো, অ‍্যাবলিউটলি নট, "শ্রাবণ ধ্রুবকে মাঝপথে বাধা দেয়। -- "ওটাকে প্রেতচর্চা বলে না ধ্রুব, দ‍্যাট ইজ কলড্ ডিমনোলজি। আপনাকে গতকাল বিস্তারিত তথ‍্য দিয়ে পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইড শেয়ার করেছি।"
    -- "হ‍্যাঁ, ঠিক। ওই হলো, " ধ্রুব কথাটাকে বিশেষ গুরুত্ব দিলো বলে মনে হলো না। বলে চললো, "তো আমার বড়োরাও এটা মোটামুটি সবাই জানতেন যে কাকাবাবু ওই বিদ‍্যার চর্চা করেন। গত আট-দশবছরে ওনার সঙ্গে প্রায় সবারই একটা দূরত্ব তৈরী হয়েছিলো। সেটা ওনার বিসদৃশ আচরণ, লোককথা, ভয় অনেককিছু থেকেই হতে পারে। তবে উল্লেখ‍্য যেটা, এরও আগে কাকার কাছে এক সাহেব আসেন। সম্ভবতঃ সুইডিশ মানুষ। নাকি কোনোসময়ে জম্মু কাশ্মীরের কোনো এক গ্রামে কাকাবাবুর সঙ্গে ওনার বন্ধুত্ব হয়েছিলো। উনি কাকাবাবুকে একটা হাতে লেখা বই, আই মিন পান্ডুলিপি টাইপের, সেটা দিয়ে যান। কাকা তারপর থেকে আরো নিবিষ্টভাবে এইসব কাজে ডুবে যান। বলা চলে, বাইরের জগতের সঙ্গে ওনার সম্পর্কই চুকে যায়। মৃত‍্যুর আগে এই বই আর ওনার একটা ডায়েরি আমাদের হাতে এসে পড়ে। আমার মনে হয় সেটা ধরে আপনার পক্ষে খুঁজে বের করা মুশকিল হবে না যে কাকা আসলে কী খুঁজতেন।"
    টেবিলের বোতল থেকে জল খায় ধ্রুব। তারপর লালচে চামড়ার মোড়কে মোড়া একটা পুরোনো পুঁথি জাতীয় বই এগিয়ে ধরে শ্রাবণের দিকে।
    --- "এটা দেখুন। কাকাকে সাহেবের দেওয়া সেই বই। "
    অত্রিও ঝুঁকে আসে বইটার উপর। খুব সাবধানে হলদেটে তন্তুর মতো পাতা উল্টে চলে শ্রাবণ। কিছু জ‍্যামিতিক চিত্র আঁকা পাতায় পাতায়, জটিল ত্রিভুজ আর বৃত্তের বিন‍্যাস। অদ্ভুত, অজানা জীবজন্তুর ছবি, সংখ‍্যা লেখা আর দুর্বোধ‍্য ভাষায় কিছু লেখা। সাবধানে সেটা বন্ধ করে ফেরত দিয়ে শ্রাবণ বললো, "ভেরি, ভেরি মাচ ইন্টেরেষ্টিং! ধ্রুববাবু, আমি জানি না আপনার কাকার নাম, দেখিনি তাঁকে। তবে যদি সত‍্যি হয়, তো ভারতে এই জিনিস নিয়ে কাজে উনিই প্রথম। ভাবা যায় ! এই পুঁথি অ‍্যালকেমিষ্ট প‍্যারাসেলসাসের বইয়ের অনুলিপি। যেটা আসলে ১৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দের! এটা কতোতম অনুলিপি জানি না। তবে ওনাকে বলা হয়, ফাদার অফ টক্সিওলজি। আজকের কেমিষ্ট্রি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অ‍্যালকেমির অবদানকে অস্বীকার করা যায় না। তবে ভারতে কেউ প‍্যারাসেলসাসের পুঁথি নিয়ে কাজ করেছেন অতো বছর আগে, অবাস্তব হোক বা বাস্তব, ভেবেছেন এই নিয়ে, সাধনা করেছেন। ইমপসিবল্! সত‍্যি কী উদাসীন আমরা আমাদের এইসব জ্ঞানী মানবসম্পদ নিয়ে!"
    অত্রি হামলে পড়ে, "আরে আত্মসমালোচনা পরে করবি। আগে বল ওই প‍্যারাসাইট না প‍্যারাবোলা কী বললি?"
    -- "চোওওপ! ভাট বকিস না অত্রি।" শ্রাবণ হালকা করে ধমক দেয়। "হ‍্যাঁ, ক্লিয়ার করেই বলি। আপনাদের যে অ‍্যালকেমি বা ডিমনোলজির কথা বলেছিলাম, প‍্যারাসেলসাস ছিলেন নিজেও এর একজন প্রবক্তা ও গবেষক। আসল নাম থিওফ্রষ্টাস ব্রমব্রাষ্টাস ভন পিয়ের কস্তট্রোসাস। প‍্যারাসেলসাস নামেই সমধিক পরিচিত। ১৪৯৩ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি অবধি জীবনকাল। উদ্ভিদবিদ‍্যা, জীববিজ্ঞান, বিষ সম্পর্কে গবেষণা, রোগের কারণ নির্ণয়, মৌল ও যৌগিক পদার্থ নিয়ে গবেষণা ইত‍্যাদি অজস্র কাজ রয়েছে ওনার। তো যে ডিমনোলজি নিয়ে বলেছিলাম, বায়েল, আগারাস, সিত্রি, নিম্ফ, পিগমি এরা সেই আর্সে গোয়েটিয়ার অন্তর্ভুক্ত। ওনাদের বিশ্বাস ছিলো, এইসব ডিমনরা রোগ সারাতে পারে, মানুষকে তার প্রার্থিত বস্তু দিতে পারে তবে তাদের সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা চাই। এই দ‍্যাখ অত্রি, ধ্রুব দ‍্যাখো ভাই, এই যে বৃত্তের ছবি, যিনি ডিমনকে ডাকবেন কার্যসিদ্ধির জন‍্য তাকে বসতে হয় এর মধ‍্যে। আর বৃত্ত ঘিরে এইযে ত্রিভুজ, হ‍্যাঁ এই অংশটা -- এখানে ডিমন আবদ্ধ থাকে। এরপর এদের স্তর অনুযায়ী আছে ধাতব প্লেটের ব‍্যবহার। রাজার জন‍্য সোনা, যেমন Bael, ডিউক ডাকার জন‍্য রুপো, মার্কুইসেরও তাই। কাউন্ট বা অন‍্য ডেমন ডাকতে তামার প্লেট ব‍্যবহার করতে হতো। এই দ‍্যাখ, নির্দিষ্ট চিত্র বা সংকেত আলাদা আলাদা স্পিরিটের জন‍্য। একে বলা হয় সিজিল (sigil)...আর এই যে..."
    ধ্রুবকে অত‍্যন্ত অধৈর্য দেখায়, "স‍্যার, এসব তত্ত্বকথা জেনে এখন কী লাভটা হবে? না মানে, আমরা তো আর ডিমন ধরতে যাচ্ছি না....! আমি বলছি..."
    শ্রাবণ বইটা সযত্নে টেবিলে রাখে। নিজের কোমল, গভীর ও আচ্ছন্নতাময় ঈষৎ নীলাভ চোখদুটো ধ্রুবর মুখের উপর সরাসরি রেখে বলে, "আপনি ঠিক কী ধরতে চাইছেন ধ্রুববাবু? জানলে আমার কাজটা এগোতে একটু সুবিধা হতো।"
    -- "আমি -- আমরা মানে কাকাবাবুর কাজের পদ্ধতিটাই জানতে চাই আরকী...মানে আর কী...উনি মানে নিজে যা খুঁজছিলেন তা পেয়েছিলেন কিনা... সেই আর.."ধ্রুব তোতলাতে শুরু করে। ইতিমধ‍্যে একটি বছর বারোর ছেলে একথালা ভর্তি মিষ্টি, সামোসা আর দুকাপ চা রেখে গেছে। অত্রি খেতে খেতে শুনছিলো। শ্রাবণ একটা সন্দেশ শুধু মুখে ফেলে চায়ে চুমুক দেয়।
    -- "দেখুন, প্রথমেই বলি ধৈর্য‍্য রাখুন। আপনারা যে কুয়াশায়, আমিও সেই কুয়াশায়। উভয়েই দ্বীপ খুঁজছি কিন্ত আপনারা মিনিমাম দ্বীপের দিকনির্দেশনাটাও আমায় দিচ্ছেন না। আসলে আপনারা আমার থেকে কী হেল্প চান এখনো তা স্পষ্ট নয়, যদি বলেন আপনার কাকার কাজ সম্পর্কে তথ‍্য, তো ডিমনোলজি নিয়ে আমি একটা ওয়ার্কশপই অ‍্যারেঞ্জ করতে পারি। জানুন, পড়ুন, বুঝুন। কিন্তু সেটা তো নয় ভাই ধ্রুব। তুমি যে নির্দিষ্ট কিছু একটা টার্গেট হিসাবে খুঁজতে চাইছো তা বুঝছি। অথচ খুলে বলছো না। এভাবে অন্ধাকারে হাতড়ানো তো খুব মুশকিল।" শ্রাবণের পরিশীলিত কন্ঠে শান্তভাবে বলা কথাগুলি ঘরের পরিবেশে যেন চাবুকের শাণিত শব্দে শব্দে গেঁথে যায়। ধ্রুব মাথা নীচু করে মূর্তিসম দাঁড়িয়ে থাকে। বহুক্ষণ পর শকুন্তলা দেবী নীরবতা ভঙ্গ করেন। ঈষৎ করুণ কন্ঠে বলে ওঠেন, "বাবা শ্রাবণ, তোমার মুখেই তো শুনলাম ঠাকুরপোর কাজটা যা নিয়ে, তা নাকি ভরতে প্রথম। তা এরকম জটিল কাজ যখন মানুষটা করেছেই, তোমার খবরের কাগজে এ নিয়ে প্রতিবেদন বেরোয় না? তোমার দেশে বিদেশে লেখার নাম, তুমি এ নিয়ে লিখবে বাবা? অবিশ্বাস‍্য মেধাবী মানুষটা যে চিরকাল অন্তরালে থেকে গেলো...."
    শ্রাবণ কোমল গলায় বলে, "মাসীমা, আপনি বড়ো দামী কথা বললেন। এরকম কাজ ভারতে এতোগুলো বছর আগে আপনাদের পরিবারের কেউ করেছে, এ অবশ‍্যই আমি পৃথিবীর আলোয় আনবো। সে লেখা হবেই। কিন্তু তার আগে আপনার ছেলে কী বলতে চান, সঠিক না জেনে...."
    সবাইকে চমকে দিয়ে হঠাৎ ধ্রুব একটু যেন কড়া গলায় ভলে ওঠে, "আমার আর কিছু বলার নেই শ্রাবণবাবু। আপনারা আসতে পারেন।"
    অত্রি শ্রাবণের দিকে একবার, শকুন্তলা দেবীর দিকে একবার তাকায়। শ্রাবণের মুখের ভাব দুর্বোধ‍্য, আর শকুন্তলার দেবীপ্রতিমার মতো মুখে যেন কেউ কালি লেপে দিয়েছে। শ্রাবণ কিন্তু খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠে দাঁড়ায় ও নিজের ব‍্যাগ তুলে নেয়।
    --- "বেশ। তাহলে এলাম মাসীমা। আসি ধ্রুব ভাই। ডিমনোলজি নিয়ে আর কিছু জানার থাকলে আশা করি আমাকে জানাতে ভুলবেন না। নমস্কার। অত্রি আয়।"
    ধ্রুব তাদের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেও এলো না। আলগোছে একটা নমস্কার করে দাঁড়িয়ে রইলো। নীচে নেমে গাড়ি ষ্টার্ট দেওয়ার সময়ে শুধু শোনা গেলো মাতা পুত্রের কলহপূর্ণ গলার আওয়াজ।..
    " কী 'সোনার মানুষ ', 'সোনার মানুষ' করছিস? ওসব ছাড় বাবিন, ওসব হয় না।"
    -- "একশোবার হয়, তোমার দ‍্যাওর বহুত চালু জিনিস ছিলো। সে এমনি এমনি লিখে গেছে? না না, এ আঁতেল শ্রাবণ চ‍্যাটার্জীর কাজ নয়। আমি...আমি শালা চন্ডীগড় গিয়ে যেভাবে হোক..."
    -- "চুপ, বাবু একদম চুপ। মানুষটাকে তোর বাবা, তোরা অনাদরে অবহেলায় ফেলে রেখে...এখন মরার পর এসব কী খোঁজাখুঁজি? আমার ভাইটার আত্মাকে শান্তি পেতে দে....আমি আর একটা বাজে কথা শুনতে চাই না...."


    শ্রাবণের ষ্টিয়ারিঙের উপর কন্ট্রোল অসাধারণ। নিপুণ হাতে কলকাতার কোলাহলমুখর পথে এগোতে থাকে। অত্রি পুরো রাস্তা চুপ করে বসে কর্ণেটো আইসক্রিম খাচ্ছিলো। এবার শ্রাবণের একটা হাত ধরে চিমটি কাটে, "তোকে আঁতেল বললো।"
    -" সে তো আমিও তোকে বলি মাঝে মাঝে।" ষ্টিয়ারিঙে শ্রাবণের মনোযোগ নিবদ্ধ।
    অত্রি আইসক্রিমের শেষটুকু মুখে চালান করে। --" আরে সে তো ঝগড়া হলে। এমনি এমনি কেন বলবে? প্রেসক্লাব অবধি তোর জন‍্যে হত‍্যে দিলো, মুখে একেবারে ডাবর মধু ঢালা, তবুও..."
    --"মনরে কৃষিকাজ জানো না। এমন মানবজমিন রইলো পতিত / আবাদ করলে ফলতো সোনা। সোনা, বুঝলি অত্রি? মানুষই সোনা। তাকে অনাবাদী রেখে এখন সোনার মানুষ খুঁজলে কোনো আঁতেলই কিছু করতে পারবে না। সে যতোই পায়ে তেল মাখাও।" শ্রাবণ স্থিরভাবে গাড়ি চালাতে থাকে।
    জানালার কাঁচ নামাবার চেষ্টা করতে করতে অত্রি বলে, "ধুৎ, তোর কথা কিছু বুঝতে পারছি না।"
    --- "বেশ। ওবেলা ইরার সামনে বোঝাপড়া হবে।ততোক্ষণ--- অ‍্যাই বাঁদর, অ‍্যাইইই--আইসক্রিমর ষ্টিকটা জানলা দিয়ে ফেলছিস কেন? ধেড়ে খোকার বুদ্ধি দ‍্যাখো! চল ফ্ল‍্যাটে গিয়ে ডাষ্টবিনে ফেলবি। " গাড়ির দরজা লক করে অত্রির হাত ধরে টেনে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে শ্রাবণ।

    (ক্রমশ)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Debanjan Banerjee | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:০১742874
  • অসাধারণ হচ্ছে মানালী | লিখতে থাকুন | অনেকদিন পরে একটা এরকম ফিকশন পড়ছি |
  • Manali Moulik | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭:১৩742877
  • অনেক অনেক ধন‍্যবাদ
  • Debanjan | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮:১২742880
  • মনে হয় ধ্রুব আসলে গুপ্তধন জাতীয় কিছু একটা পেতে চাইছে l এমন একটা demon যেটাকে আহ্বান করলে প্রচুর সোনাদানা পাওয়া যায় এবং যেটাকে ধ্রুবের জ্ঞানতপস্বী কাকা নামিয়ে এনেও ফেলেছিলেন l এখন নিজের আর্থিক অনটন মেটাবার জন্যে ধ্রুবও সেই ডেমোনের আহ্বান করে গুপ্তধন পেতে চায় l ঠিক বলছি তো ! প্রশ্ন হলো ধ্রুবের জ্ঞানতপস্বী কাকা নিজে কেন সেই ডিমনকে ডেকে বড়লোক হয়ে উঠলেন না ?
  • Ranjan Roy | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯:০৯742881
  • জমে গেছে।
  • Manali Moulik | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:১৭742886
  • Debajan দা, দেখা যাক।wink
    রঞ্জন স‍্যার, আমার প্রণাম ও ধন‍্যবাদ জানবেন। আপনারাই এগোতে সাহায‍্য করেন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন।