এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ভিখারি

    পাগলা গণেশ লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৪ মার্চ ২০২৬ | ১৫৪ বার পঠিত
  • প্রতিদিন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি।একটা বাচ্চা ছেলে বিকৃত মুখ,বিকলাঙ্গ শরীর নিয়ে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করছে।তার পাগুলো সরু সরু,কাঠির মতো,হাঁটুর কাছে ভেতরের দিকে মোড়া।হাতদুটোর অবস্থা তার থেকেও খারাপ।কাঁধ থেকে শীর্ণ হাতদুটি নেমে এসে কনুইয়ের কাছে পাগলা বাঁক নিয়েছে,তারপর কব্জির কাছে আবার একবার।
     
    এরূপ শ্রীর জন্য সে কাছে যেতে চাইলেই লোকেরা নাক মুখ শিঁটকে দূর দূর করে তাড়াত।তাতে সে কিন্তু হতোদ্যম হতো না,বরং একই ঘ্যানঘ্যানে নাকি গলায় বলত,"বাবু,কিছু দ্যান,কিচ্ছু খাইনি।" বা "দিদি কিছু দ্যান,কিচ্ছু খাইনি।"এর বাইরে সে একটি কথাও বলত না।কিন্তু তার এই রূপের জন্য রোজগার তার ভালোই হতো।অন্তত ওই এলাকার আর দশজনের থেকে বেশিই হতো।আর যে রূপের জন্য তার এই পোড়ার তার প্রতি সে বেশ যত্নবান ছিল।কত বছর সে গা ধোয়নি তার হিসেব কেউ জানে না, সেও জানে কিনা সন্দেহ।সারাদিন সুযোগ পেলেই ধুলোয় গড়াগড়ি দিত।
     
    তার যা রোজগার ছিল চাইলেই সে ভালো জমা কিনতে পারত,কিন্তু লোকের ফেলে দেওয়া জমা কাপড় সে সযত্নে তুলে এনে বাইরে রোদজলে ফেলে রাখত,যাতে সেগুলো আরো দুর্দশাগ্রস্ত হয়,প্রতিদিন সেগুলোতে ধুলো মাখাত।এরকম করার পর সেগুলো যখন অঙ্গে চড়ত,তার ফল হতো,লোক ওরকম,"দূর!দূর!" করে তাড়াত।
     
    ওকে কিন্তু আমি কখনও ওকে হাসতে দেখিনি।এই ব্যাপারটা হঠাৎই একদিন খেয়াল করি।সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা অন্ধকার হয়ে আছে,মেঘ গুড়গুড় করছে থেকে থেকে,কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে না।চারিদকের গাছপালা,ঘরবাড়িগুলো থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে,যেন কোনো কিছু অঘটনের আশঙ্কা নিয়ে প্রহর গুনছে।আগেরদিন সকালে ঘণ্টাদুয়েক মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে টানা।আর এরকম ঘিঞ্জি জায়গায় যেমন হয়,জল জমে তার সাথে আবর্জনা পচে সে এক উৎকট গন্ধ সৃষ্টি করেছে।আমার মতো যারা একটু সৌখিন লোক তাদের অসুবিধা হচ্ছে,যারা হয়তো সর্বসাকুল্যে আধঘন্টা এখানে কাটায়।কিন্তু যারা এখানে সর্বক্ষণ থাকে,তাদের খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে বলে তো মনে হয় না।তারা বেশ হাসছে,কথা বলছে,গল্প করছে,মাঝে মাঝে ঝগড়াও।
     
    ছেলেটা অন্যদিনের মতো সেদিনও একইভাবে পায়ে-হাতে হামাগুড়ি আর হাঁটার মাঝামাঝি একধরণে চলে চলে ভিক্ষা করতে লাগল। একজনের কাছে গিয়ে একবার ছুঁয়ে দিতে চেষ্টা করল,সে ঘৃণায় ছিটকে গিয়ে দূরদূর করে একটা কয়েন ছুঁড়ে দিল তার দিকে,সে দুঃখী মুখে তুলে নিয়ে পরের জনের দিকে এগিয়ে গেল।সেখানেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি,আমি ভাবলাম,"কম টাকা পেয়েছে,তাই মন খারাপ।"
     
    কিন্তু পরের জন কত টাকা দিল সেটা বুঝতে না পারলেও দেখলাম,একটা নোট দিল।যত কমই হোক দশ টাকার কম তো হবে না!আর তাতে একটু খুশি হওয়া তো উচিত।আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম,ওই মিনিট দশেক মতো হবে।ওই সময়ের মধ্যেই সে আরও পাঁচজনের কাছ থেকে যে পরিমাণ টাকা আদায় করল, তা পঞ্চাশ টাকার কম হতেই পারে না।কিন্তু তাতেও সে হাসল না।আমার বাস চলে এসেছিল,তাই আমি উঠে পড়লাম।
     
    কিন্তু আমার মাথার মধ্যে ছেলেটা ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করতে লাগল।আমি অফিসে গিয়ে খাতায় দুবার 'কিছু ভিক্ষা দাও গো!" লিখে ফেললাম,কফি আনতে গিয়ে কফি ডিসপেন্সার ভদ্রলোককে "কফি দিন " না বলে "ভিক্ষা দিন।" বলে ফেললাম।সে বেশ অবাক চোখে আমার দিকে তাকাল।আমি তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে কফি না নিয়েই চলে এলাম।চলে আসার ওই সামান্য সময়টাতে আমি বুঝতে পারলাম উনি আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন,একদৃষ্টিতে।
     
    সেই দিনটা আমার খুব অস্বস্তির মধ্যে কাটল।রাতে শুতে চেষ্টা করলাম,কিন্তু কিছুতেই ঘুম এল না।এরকম সাধারণত হয় না আমার।আমি বাঁধা নিয়মে চলি।সকালে প্রতিদিন ছটার সময় উঠি,ব্যয়াম করি দুঘন্টা,তারপর ব্রাশ করে খেয়ে একটু পড়াশোনা করি।নটার সময় স্নান করি,তারপর খেয়েদেয়ে সাড়ে নটায় বেরিয়ে যাই অফিসের জন্য।অফিস পৌঁছাই সাড়ে দশটা থেকে পৌনে এগারোটার মধ্যে।তারপর অফিস ছুটি হয় সাতটার সময়,বাড়ি ফিরি সাড়ে আটটার মধ্যে।এসেই হাতমুখ ধুয়ে নৈশাহার সেরে নিই।তারপর একটু বই পড়ি,সাড়ে নটায় বিছানায় যাই,দশটার আগেই ঘুমিয়ে পড়ি।গত কুড়ি বছরে এই নিয়মের ব্যত্যয় হয়নি।
     
    কিন্তু আজ,কিছুতেই ঘুম আসছে না।ঘড়ির দিকে তাকালাম,রাত আড়াইটা বাজে।আমি জানি না ঘুম না এলে কী করতে হয়,কারণ আমার পঁয়ত্রিশ বছরের জীবনে এই প্রথমবার রাতে ঘুম আসছে না।ছেলেটা আমার মাথার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে,কপালের দুপাশে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে আমার।যেন আমার মাথাটা একটা আধার,আর কপালটা তার ঢাকনা।আমি ভেতর থেকে আবার আওয়াজ শুনতে পেলাম,"দুটো টাকা ভিক্ষা দিন না বাবু!"
     
    সেই বিরস,দুঃখী,উদাস মুখ।আমার প্রচণ্ড অস্থির লাগছে!ও হাসে না কেন?মুখের পেশী বুঝি পক্ষাঘাতপ্রাপ্ত!
     
    এর একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে।ওকে আমি জিজ্ঞেস করব,ও হাসে না কেন?আমি আলনা থেকে আমার শার্টটা নিলাম, আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।পেশীবহুল বুক,হাত,চওড়া কাঁধ একটা তৃপ্তির হাসি হাসলাম।হাত বোলালাম,আমার অনেক কষ্ট,অধ্যবসায় আর নিয়মানুবর্তিতার ফল।সবাই ফিরে ফিরে তাকায়, তারিফ করে,হিংসা করে।ঠিক তখনই মাথার ভেতর থেকে ছেলেটা বলে উঠল,"বাবু দুটো টাকা ভিক্ষা দিন,কিছু খাইনি!"আমার মগজ আর মেনিনজেসের মাঝখান দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে যেতে লাগল।প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আবার আমার কপালের দুপাশে ফেটে যেতে লাগল।আমি মাথা চেপে বসে পড়লাম।
     
    কিছুক্ষণ পরে যন্ত্রণাটা একটু কমতে আমি জামাটা গায়ে চড়িয়ে বেরোলাম।কোথায় যাব জানি না,তাই পা দুটোকে সে দায়িত্ব দিলাম,যেখানে নিয়ে যাবে,যাব।আমি নানা কথা ভাবার চেষ্টা করতে লাগলাম,একটু সফল হয়েছিলাম,কিন্তু তখন চারিদিকে চেয়ে অবাক হয়ে দেখলাম,আমি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি,ছেলেটার আস্তানার সামনে।একটা ত্রিপল দিয়ে ঘেরা, ছাওয়া তাঁবুর মতো ঘর,ভেতর থেকে গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ আসছে।আমার খুব লোভ হল ছেলেটাকে দেখি,কিন্তু বহুকষ্টে সেই লোভ সংবরণ করলাম।কেউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে,আমি তাড়াতাড়ি সরে এলাম সেখান থেকে।
     
    তারপর সকাল হওয়া পর্যন্ত উদ্দেশ্যহীনভাবে চারিদিকে ঘুরে বেড়ালাম।কিন্তু দুবার যখনই একটু আনমনা হয়েছি,দেখছি আমার পা দুটো সেই বাস স্ট্যান্ডের দিকে টেনে নিয়ে চলেছে আমার অজান্তে।
     
    আর এখানে ঘুরে বেড়ানো ঠিক হবে না।একটা কেলেঙ্কারি কান্ড হয়ে যাবে।ঘুম না ধরুক,ঘরে থাকলে অন্তত মার খেতে হবে না।অবশ্য একদিনের পাগলামিতে কেউ মারবে না,কিন্তু দ্বিতীয়বারে নিশ্চয় মারবে।আমি দ্রুতপায়ে ঘরের দিকে এগোতে লাগলাম,মনে নানা কথা আসতে লাগল।কিন্তু তাদের কিছুতেই প্রশ্রয় দিলাম না।ঘরে গিয়ে যখন পৌঁছলাম,প্রায় ভোর পাঁচটা।এবারে ঘুম লাগছে,শরীর খুব ক্লান্ত, নাহ একটু ঘুমিয়ে নিই।
     
    সেদিন গত কুড়ি বছরে প্রথমবারের মতো সকালে উঠতে বেলা নটা বেজে গেল,ব্যয়াম করলাম না,কোনোমতে স্নান করে,খেয়ে বাস স্ট্যান্ডে দৌড়লাম।বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে আবার দেখতে পেলাম ছেলেটাকে।একইভাবে ভিক্ষা করছে।ওর বিকৃত শরীর,বিষন্ন মুখ আমাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতে লাগল।যেন আমি লোহা আর ও দশ টেসলা চুম্বক।কোনোমতে নিজেকে আটকে রাখলাম।
     
    সেদিন অফিসে ভূতগ্রস্থের মতো কাজ করলাম।বুঝতে পারলাম সবাই আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।আমার লজ্জা লাগল তাতে,তারপর প্রবল অস্বস্তি হতে লাগল,শেষে প্রচণ্ড রাগ।যেন মনে হচ্ছিল সবগুলোর মুখ ভেঙে দিই ঘুঁষি মেরে।একেবারে ওই পঙ্গু ভিখারির মতো করে দিই মুখগুলো।কিন্তু আমি ভদ্রলোক,নামি দামী স্কুলে পড়েছি,উচ্চশিক্ষিত;সারাজীবন আমাকে ভদ্র,শান্ত,বাধ্য,শালীন হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।আমি নিজেকে সামলে নিলাম।কষ্ট হল,কিন্তু নিলাম।কারণ,আমি ভদ্রলোক।
     
    সেদিন রাতে ফিরে আবার সেই একই অস্বস্তি।আমার মনে হল ওই ভিখারি আমাকে ডাকছে।"বাবু,ও বাবু,একবার আসবেন,আমি সব বলব,একবার আসুন।"
    প্রচণ্ড অস্থির লাগল আমার।আজকে খেতেও পারলাম না ভালো করে।যেসব খাবার আমি খাই,সেগুলো স্বাস্থ্যকর,পুষ্টিকর।ওগুলোতে শরীর সুস্থ থাকে,বৃদ্ধি পায়।কিন্তু আমার এসব করা উচিত নয়,আমারও হাত পা যদি ওই ভিখারি ছেলেটার মতো হতো,তাহলে আমি এসবের থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস জানতে পারতাম - 'ও হাসে না কেন?'
     
    এমন নয় যে আমি চাই ও হাসুক,আমার ওর ওরকম বিষন্ন,দুঃখী মুখ আমাকে বেশি আকর্ষণ করে,কিন্তু আমি চাই ওর না হাসার কারণ জানতে।আমাকে জানতেই হবে।তার জন্য আমি যা খুশি করতে পারি,ব্যয়াম ছাড়তে পারি,ঘর,খাওয়া,মা - বাপ, নিজের সযত্নে লালিত শরীর - সব!
     
    ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত লাগছে,তাই না!কিন্তু বিশ্বাস করুন,আমি সত্যিই জানতে চাই।কোনো যুক্তিতেই এটা স্বাভাবিক নয়,কিন্তু তবু আমি বেরোতে পারছি না।আমি জানতে চাই,ও কেন হাসে না। 
     
    এভাবে ওই অস্বস্তি আর ঘোরের মধ্যে একটা সপ্তাহ কাটল।আমি আমার পুরোনো সমস্ত অভ্যাস,নিয়ম ত্যাগ করেছি।বাড়ির লোক ব্যাপারটা খেয়াল করেছে,ওরা বেশ চিন্তিত।এর মধ্যেই কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে,"কী ব্যাপার?কেন এমন করছি?" "কারো প্রেমে পড়ে আঘাত পেয়েছি কিনা?" " এরকম করা উচিত নয়,আমি বড়ো,বুদ্ধিমান!", " আমি ঘরের একমাত্র উপার্জনক্ষম অ্যাডাল্ট।" ইত্যাদি ইত্যাদি।কিন্তু আমি যে কারণে এরকম হয়ে যাচ্ছি, তা ওরা ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছে না।পাবেও না।কেউ কি পারে?
     
    এখন রাত্রে ঘুম প্রায় হয় না বললেই চলে।বেশিরভাগদিন ওই বাস স্ট্যান্ড চত্বরে ঘোরাঘুরি করি।ঘোরাঘুরি করি বললে ভুল বলা হয়,ওই ভিখারির তাঁবুসুলভ বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।আমার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা হয়,ত্রিপল সরিয়ে দেখি ভেতরে,কিন্তু ভিতরের সেই সযত্নে পালিত ভদ্রলোকটা এখনো মরেনি।সে জেদ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আমার আর ভিখারির মাঝখানে ।আমি ওর ওপর প্রচণ্ড বিরক্ত হচ্ছি।আমি যদি জানতাম ও শরীরের কোন জায়গায় বাস করে,আমি ছিঁড়ে বের করে আনতাম ওকে।ইতিমধ্যে মাথাটা অনেকবার ঠুকেছি দেওয়ালে, খাটের কোণায়।তাতে ভালো লেগেছে কিন্তু আমার।সুন্দর শরীরটা ক্রমে ক্রমে একটু বিকলাঙ্গ হচ্ছে,আমি ক্রমশ ওই ভিখারির ভিখারিত্ব পাচ্ছি।
     
    আমিও ওর মতোই ভিখারি হচ্ছি।বলা ভালো ও হচ্ছি।যখনই আয়নায় নিজেকে দেখি,একটা আত্মতৃপ্তির ভাব আমাকে পেয়ে বসে।কিন্তু পরক্ষণেই একটা বিষাদ ছেয়ে যায়,এখনো অনেক পথ বাকি।এত দেরি হচ্ছে কেন?কালকেই কেন নয়?কিংবা আজকেই!
     
    এরপর একদিন আমি অফিস যাওয়া বন্ধ করলাম।ঘরে কিন্তু সে কথা বহুদিন জানেনি।কারণ আমি অফিস যাওয়ার পোশাক পরে বেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা।ওর ভিক্ষা করা দেখতাম,আমার খুব ইচ্ছা হতো ওর মতো আমিও ভিক্ষা করি, ওইভাবে আমিও বলি,"বাবু,দুটো টাকা ভিক্ষা দিন না?কিচ্ছু খাইনি।"
    ওরকম আমাকে দেখেও লোক ওরকম ঘৃণায় ছিটকে যাক,আমিও ওরকম দুঃখী দুঃখী মুখ নিয়ে,না হেসে ভিক্ষা করে বেড়াই।
     
    খুব ধীরে কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আমার মধ্যে হতে থাকল।আমার কথাবার্তার মধ্যে ছেলেটার প্রভাব স্পষ্ট।আমি ক্রমশ ঝুঁকে চলতে আরম্ভ করলাম।প্রতিদিন একটু,আর একটু ঝুঁকে যেতে লাগলাম ক্রমশ।কিন্তু তাতেও ওর মতো হতে পারছিলাম না।আমি ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলাম।
     
    গত মাস দুয়েকের মতো আজকেও রাতে ঘুমাইনি।কিন্তু আজকে বাইরে যাইনি আমি।শেষে বুঝতে পারলাম,আমার হাত-পা গুলো বড্ড বেশি পুষ্ট।ওগুলোর ব্যবস্থা করা দরকার।একটা ছুরি দরকার।
     
    আমাদের পাড়ার কুকুরগুলো কয়েকদিন আমার জানালার নিচে ভিড় জমাচ্ছে।জমাবেই না বা কেন?এরকম তাজা,কাঁচা,সুস্বাদু মাংস কি ওরা খেয়েছে কোনোদিন?লোকের বোধহয় সন্দেহ হয়েছিল,তাই এখন দেওয়া বন্ধ করেছি,কিন্তু ঘরে রাখলে সমস্যা হচ্ছে,পচে গন্ধ ছড়ায়।আচ্ছা কুকুরকে কি ঝাড়ুদার প্রাণী বলা যাবে না?ওরাও তো পরিবেশকে পরিষ্কার রাখে!
     
    আমার একটু কুকুর পোষার দরকার হয় পড়েছে এই কারণে।কিন্তু আমি যখন বাড়ি ছেড়ে চলে যাব,তখন ওটাকে কে রাখবে? কী খেতে দেবে?মানুষের মাংস খেয়ে অভ্যাস হয়ে গেলে অন্য খাবার খেতে চাইবে কি?হয়তো একদিন আমাকেই ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে!
    তাতে আপত্তি নেই,এমন কিছু মায়া আর অবশিষ্ট নেই এই শরীরের প্রতি,এমন কিছু মহার্ঘ্য নয় আমার শরীর।তবে ওই ছেলেটা হাসে না কেন, তা জানার আগে এই শরীরকে কিছু করতে চাই না আমি।
     
    এখন আমি আর আমার কামরা থেকে বের হই না।বাড়ির লোক দরজার তলা দিয়ে খাবার গলিয়ে দেয়,যেদিন খেতে ইচ্ছে করে খাই,নাহলে ওখানেই পড়ে পড়ে পচে,গন্ধ ছড়ায়।আমি এখন আর গন্ধে বিরক্ত হই না,মাঝে মাঝে ওইগুলো শরীরে মাখি,বেশ লাগে।
     
    আগে আম্মা জোরাজুরি করত দরজা খোলার জন্য,কিন্তু এখন আর করে না।একবারও খুলিনি দরজা গত তিন মাসে।ঘরের লাগোয়া বাথরুম আছে,তাই বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।কাজ ছেড়েছি আগেই,সমাজে আমার কেউ ছিল না কোনোদিন।আর সম্পর্ক, হা হা হা!
     
    এখন মাঝে মাঝে রাতে উঠে নিজের চেহারাটা আয়নায় দেখি।খুব ভালো লাগে,একটা অপার্থিব,দৈব তৃপ্তিতে আমার বুকটা ভরে উঠে।সেই ভদ্রলোকটা মরে গেছে।
     
    আমি মহাপরিক্রমণের পরিকল্পনা করতে লাগলাম। তোমরা বললে বিশ্বাস করবে না,কিন্তু অভিসার এর থেকে বেশি আনন্দদায়ক হতে পারে না,মিলনের প্রতিশ্রুতি না,এমনকি মিলনও না।ওই কদিন আমি সুখের সাগরে ভাসছি।আমার ভেতরে যা সুখ আছে আমি যদি বের করে একমুঠো ছড়িয়ে দিই,সারা পৃথিবী সুখে পাগল হয়ে যাবে।আমি এখন পুরো ওর মতো দেখতে।
     
    শেষে সেই দিন এল।আমি রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে এলাম বাড়ি থেকে।আমার গন্তব্য আমার শরীরের প্রতিটি অনু-পরমাণু জানে।আমাকে কিছু ভাবতেই হলো না।হামাগুড়ি আর ঝুঁকে হাঁটার মাঝামাঝি একরকমভাবে চলে যেতে লাগলাম।আগেরবার যখন এসেছিলাম তার থেকে অনেক বেশি সময় লাগল।কিন্তু তবু আমি খুশি,শেষে আমি জানতে পারব,ও হাসে না কেন।
     
    আমি হঠাৎ খেয়াল করলাম,আমি ভেতরে ভেতরে এত খুশি হওয়া সত্ত্বেও আমার মুখের পেশীগুলো শক্ত হয়ে আছে,কিছুতেই তারা ভেতরের খুশিটাকে বেরোতে দেবে না।তার মানে এই নয় যে ভেতরের খুশিটা বিন্দুমাত্র কম হয়েছে,শুধু বেরোতে পারছে না।কিন্তু ওই করুণাটুকু ওর দরকার,লালায়িত ওর জন্য।
     
    যখন পৌঁছলাম বেশ অনেকক্ষণ কেটে গেছে। তা হয়তো ঘণ্টাখানেক হবে।আগে যখন ভদ্রলোক ছিলাম,এই পথ আসতে মিনিট দশেক লাগত।তারপরেও একটুও খারাপ লাগছে না।যেন এটাই আমার গন্তব্য ছিল, এটাই নির্বাণ।আর ওটা মায়া;কাটিয়ে ফেলতে কী আরাম যে লাগছে!
     
    আমি ধীরে ধীরে সেই ত্রিপলের তাঁবুর দিকে এগিয়ে গেলাম।আজকে আর কোনো বাধা নেই।সবকিছু কাটিয়ে এসেছি আমি,নিজেকে তৈরি করেছি গত কয়েক মাসে।ত্রিপলটা তুলে ঢুকতে গিয়ে একটু থমকালাম,কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম।কোনো আওয়াজ নেই ভেতরে।আগের কয়েকবার যে নিঃশ্বাসের শব্দটা শুনতে পেয়েছিলাম সেটা শোনার চেষ্টা করলাম।কিন্তু না, কিছু নেই।একটু অবাক লাগল,আগে যতবার এসেছি পরিষ্কার শুনেছি নিঃশ্বাসের শব্দ।তাহলে...?
     
    আমি একটু ইতঃস্তত করে পর্দাটা সরালাম,আশ্চর্য!ভেতরে কেউ নেই।কেউ যে ছিল,তার কোনো চিহ্ন নেই।ভাবলাম হয়তো বাইরে গেছে,পেচ্ছাব পেয়েছে তাই।আমি একটু পিছিয়ে গিয়ে তাঁবুর একপাশে অন্ধকারে লুকোলাম।প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল,কিন্তু কোনরকম সাড়া পেলাম না।ঘরটা(তাঁবু) আমাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতে লাগল।কেউ যেন আমার কানে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,"ওখানে যা,ওখানে যা।"ক্রমে সে আওয়াজ বাড়তে লাগল,শেষে যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি আমাকে ঠেলতে লাগল পেছন থেকে।আমি একরকম উড়ে গিয়ে তাঁবুর পাশ থেকে বেরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম।ঢুকেই ধাক্কা লাগল, আরে !এ তো আমারই ঘর,সেই পরিচিত ঘরটা।এর প্রতিটা কোণা আমি চিনি।শুয়ে পড়লাম শ্রান্তিতে,আনন্দে।সে কি আরাম যে লাগল, কি আপন মনে হল সবকিছুকে!
     
    কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না।সকালে লোকের আওয়াজ পেতে ঘুম ভাঙ্গল।আমি তড়িঘড়ি উঠে পড়লাম।মনে প্রচণ্ড আনন্দ আর উত্তেজনা।পর্দাটা সরিয়ে বেরোলাম।সেই ভিখারি ছেলেটার মতো বললাম,"বাবু,কিছু দ্যান না,কিছু খাইনি!" লোকটা ঘৃণায় মুখ কুঁচকে আমার দিকে তাকাল,তারপর ভয়ে চমকে উঠল আমাকে দেখে।একটা দশ টাকার নোট ছুঁড়ে দিল আমার দিকে।যেন আমি তাকে ছুঁয়ে ফেলব!আমি ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড আনন্দিত,কিন্তু মুখে তার বিন্দুমাত্র ছাপ পড়ল না।সেই দুঃখী মুখ নিয়ে আমি বলে বলে বেড়াতে লাগলাম,"বাবু,কিছু দ্যান,কিছু খাইনি।","দিদি,কিছু দ্যান,কিছু খাইনি।"বেশিরভাগ দিল।যারা দিল না,তাদের পা জড়িয়ে ধরতে গেলাম,তারা নোট,কয়েন ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিল।
     
    খুব মজায় কাটল কয়েকদিন।তারপর একদিন দেখলাম,একটা লোক!দূরে বাস স্ট্যান্ডের বাঁধানো উঁচু মেঝেটায় দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
     
    লোকটা পুরো আমার মতোই দেখতে! 

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Manali Moulik | ০৪ মার্চ ২০২৬ ১৫:৪০738962
  • ভালো লাগলো। মনস্তাত্ত্বিক মোড় আছে লেখাটিতে।
  • . | ০৪ মার্চ ২০২৬ ২১:১১738969
  • এইত্তো গণশাদাদা এসে গ‍্যাছে, এসে গ‍্যাছে।
  • . | ০৫ মার্চ ২০২৬ ০০:২২738973
  • হ‍্যাঁয়েস
  • Srimallar | ০৫ মার্চ ২০২৬ ০০:৩৫738974
  • পাগলা গণেশ, তোমার এই লেখাটা বুকমার্ক ক’রে রেখেছি। কেমন আছো? অনেকদিন তোমাকে গুরুতে দেখিনি। 
  • পাগলা গণেশ | ০৫ মার্চ ২০২৬ ০১:৩৯738976
  • অত ভালোও কিছু হয়নি।তাহলে গু-গোবর সবকেই সোনা বলে ভ্রম হবে।
     
    ভালো আছি।তুমি কেমন আছো?(আর একটু হলে আপনি লিখে ফেলেছিলাম।)
     
    লিখতেই পারছিলাম না কিছু।তারপর একজন একটু জোর করল,চেষ্টা করতে এটা বেরুলো।আমার তো একটুও ভালো লাগেনি,তবু দিলাম,রেকর্ড থাকা দরকার,সেজন্য।
  • Srimallar | ০৫ মার্চ ২০২৬ ০১:৪১738977
  • পাগলা গণেশ, আমি অনেক ভাল আছি। আবার অনেক খারাপও আছি। ভালখারাপ মিশিয়েই আমার রোজকার সংসার। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন