প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষের মত হয়ে থেকে গেছে এই বাড়িগুলো। পিছন ফিরে বাড়িগুলোর দিকে বারবার তাকাতে তাকাতে গলি থেকে বেরিয়ে এল সে। বাস স্ট্যান্ডের ঠিক উল্টোদিকের গলিটাই নয় হয়তো, পাশে আরও কোনও গলি তো থাকতে পারে। সেইটাই হয়তো থার্ড লেন, সেখানে আরও একটা ২১০ নম্বর বাড়ি আছে। ফেলে আসা গলির ভেতরে আরেকবার তাকিয়ে দেখল, একটা বাড়ির দোতলায় আলো জ্বলছে কি? নাঃ পড়ন্ত সূর্যের আলো ঠিকরে আসছে বাড়িটির জানলা থেকে। গুগল চ্যাটে শমিতার নামের আইকনের দিকে সে এরকমই তাকিয়ে থাকত, সবুজ বাতি কি জ্বলে উঠল সেখানে? সারারাত হয়তো সে জেগেই কাটিয়ে দিতো যতক্ষণ না মাঝরাতে ফোনে এস এম এস ঢুকত- আজ আর নেটে ... ...
বি ব্লকটা সম্ভবতঃ উচ্চবেতনের কর্মচারীদের থাকার জন্যে ছিল। ঢোকার মুখেই বিশাল বাংলো বাড়ি- জেনারেল ম্যানেজারের বাংলো। এখন পোড়োবাড়ি হয়ে আছে। পুরো কমপ্লেক্সটাই জংলি গাছে ছেয়ে গেছে। সুন্দরবনে কিছু পুরোনো প্রাসাদ দেখা যায় এরকম, সে ফেসবুকে ছবি দেখেছে। সে এগিয়ে চলে থার্ড লেনের খোঁজে। এখানে রাস্তাগুলোর গায়ে আর কোনও দিকনির্দেশ নেই। শুধু রাস্তার ডানদিক দিয়ে গলি ঢুকে গেছে। একটা গলিতে ঢুকে সে দেখে সার সার জনহীন দোতলা বাড়ি। সব বাড়ি একরকম প্রায়। সবার সামনে একটু বাগান, কারুর কারুর বাগান তারের বেড়ায় ঘেরা, কোনও বাড়ির বেড়া টেড়া সব চুকে গেছে। বেশির ভাগই তালা বন্ধ, আবার দরজা হাট করে খোলা কোনওটায়। কোনটা থার্ড ... ...
উল্টোদিকে রাস্তার ওপরই সেই চমৎকার ফোয়ারাটা ছিল। ঐটা যে ফোয়ারাই ছিল, তা এখনও বেশ বোঝা যাচ্ছে। এর চারপাশে সুন্দর করে পাথরের আসন বসানো অনেকগুলো। অর্কুটে শমিতার অ্যালবামে একটা ছবি ছিল, মনে হয় এই পাথরের চেয়ারেই বসা, মায়ের সঙ্গে কোন-আইসক্রিম খাচ্ছে। সে দেখেছিল যে শমিতার চুলের ওপর দিয়ে রৌদ্রের একটা রেখা পড়েছিল সেই ছবিতে, এখনও ওখানে এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে বাসস্ট্যান্ডের শেডটার ওপার থেকে, রাস্তা পেরিয়ে। এই ফোয়ারাটা যদি চলমান থাকত, এইখানে শমিতাকে নিয়ে সে আসত। যে জিনিসগুলো এনেছিল তা ওর হাতে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ জায়গা ছিল এইটা। উপহার বলতে অবশ্য দামি কিছু সে সঙ্গে আনেনি। একটা বই এনেছে, অভিনন্দনের লেখা। ... ...
তার বাঁদিকে এখন একটা মাঠ পড়ছে, ডানদিকে বাগান ঘেরা একটা বাড়ি- মার্টিন নগর শহর পরিচালনার দপ্তর- দেওয়ালের রঙ চটে গেছে তার। বাগানটাও জঙ্গল হয়ে গেছে এখন। মাঠটা খুব বড়ো। প্রমাণ সাইজের ফুটবল মাঠের থেকে বড়োই। দুটো গোলপোস্ট আছে,মাঠের পরিধি বরাবর অ্যাথলেটিক্সের ট্র্যাক কাটা- একদিকে গ্যালারিও আছে। কিন্তু লোকজন নেই। ছেলেরা হয়তো স্কুল ছুটির পরে খেলতে আসে, এখন কেউই নেই। শমিতা খুব চিন্তিত ছিল ওর দাদাকে নিয়ে। দাদা ভালো ছাত্র আবার ওদিকে স্কুল লেভেলে সুব্রত কাপও খেলেছে। যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বাড়িতে ফিরে এল। সকালে মাঠে এসে বাচ্চাদের খেলার কোচিং দিত, আর তারপর সারাদিন বাড়িতেই বসে থাকত। শমিতা বলত ওর ... ...
স্টেশন থেকে বেরিয়ে প্রথমে টোটোর স্ট্যান্ডে গেল। এখান থেকে সাড়ে তিন কিমির মতন দূরত্ব দেখাচ্ছে। অবিশ্বাস্য বেশি ভাড়া হাঁকলো টোটোওলা। দরদাম করতে বলল ওদিক থেকে ফেরার প্যাসেঞ্জার জোটে না, দু-সাইডের ভাড়া দিতে হবে। ১৭-র বি রুটের বাসে পৌঁছনো যাবে এরকমটা সে জানত। শমিতার সঙ্গে যখন কথা হত, অনেকবারই স্টেশন থেকে বেরিয়ে শমিতা ওই বাসে উঠেছে, বাসে উঠে বসতে পেলে শমিতা আবার ফোন করেছে। বলেছিল বাস স্টপে নেমেই উল্টোদিকের রাস্তায় ওদের বাড়ি। স্ট্যান্ডে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে আজ। ১৭-র বি-এর দেখা নেই। বাস স্ট্যান্ডে একটা চায়ের দোকান। দোকানের পাশে দুটো দরমার ঘর আছে, ফাঁকা। এক কাপ চা নিল সে, গ্লাসের কাঁচটায় ... ...
আমার ভীষণ ইচ্ছে করছে, শিউলিদির হাতটা ধরে নিই, চেপে। আহ- সেই ঘ্রাণ যদি আবার পাই। আচ্ছা, শিউলিদির হাত ধরে নিলেই কি কফিনের ডালা খুলে যাবে? সেইখানে কি আমাদের মেলার মাঠটা আছে? ফ্ল্যাটবাড়ি ওঠার আগের খালি মাঠটা- সেখানে আছে? সেই কফিনের মধ্যে? ওইখানে পুজোর প্যান্ডেলে অঞ্জলির ফুল দুম করে ওর দিকে ছুঁড়ে দেওয়া যাবে? আধো অন্ধকার গলি ধরে হেঁটে ফেরা, সাইকেলের ক্রিং ক্রিং- এইসবই আছে? আমার আজকের ফ্ল্যাট, চাকরি,স্মার্টফোন, টুইটার হ্যান্ডেল, ইনভেস্টমেন্ট- এই সমস্ত কিছুই কি মুছে যাবে যদি ঝাঁপ দিই কফিনের ভেতর? আমি ওর চোখের দিকে তাকাই- পুকুরে ভাসছে চাঁদ… ... ...
আমাকে পবিত্র করে এই প্রিয় পংক্তিসমাহারএর ভালোবাসা আমি বলি দেব ঘাতকের পায়ে?বুকে ভর দিয়ে হেঁটে বেছে নেব পথ পালাবার-আরও দু-দিনের বাঁচা ঢেকে রেখে ভিখের থালায়!এ কোন পরীক্ষা বলো আল-আলিম রব- এই নামসাতটি আকাশ ঘুরে আলোর কম্পনে আসে কাছেআমি সাক্ষ্য দিয়ে যাই লা-শরিক প্রাণের আরাম-অজস্র তারার স্রোতের স্মৃতি যে মন্ত্রে গাঁথা আছেকত না তত্ত্বের শ্রেষ্ঠ মানুষের রূপ দরশনধ্বনিতে আখরে তাকে গেঁথেছে নবির যশোগীততা আমি প্রাণের মোহে বৃথা-অর্থ করি উচ্চারণ-জন্তুর নখরভয়ে পণ্ড করি প্রেমের তৌহিদ?অস্ত্র দেখে ত্রাস জাগে- সৃষ্টিতে বিলোপে ত্রাস দেখেআমি কি বান্তাশী হই? হিংসার সামনে নুয়ে যাই?তখনও কি ডাকছি না ওই নামে ওই মন্ত্র থেকে-সমস্ত ভয়ের ঊর্দ্ধে অজপা কলমা যেন ... ...
বিপ্লব থেমে গেছে কবেসেরকমই মুছে যাওয়া স্বদেশের প্রতিঅনুকম্পাটি ছুঁড়ে বাজারের হট্টগোলে, ভিসাপ্রার্থীর কলরবেশুধু শান্তি ও গতি, শান্তি ও গতি, শান্তি ও গতিপ্রগতির ময়দানে বিপ্লব কবে গেছে ঝুলেদেশের এই রাস্তাতে গা বাঁচিয়ে মূর্তির মাঠেএসেছে সেল্ফি তুলেরিল ছেড়ে, ফিরেছে এসির ঘরে, পুকুর বোজানো তার ফ্ল্যাটেতারপর মোবাইল অ্যাপে শেয়ারের দরওঠে, ওঠে, নেমে গেলে গণতন্ত্রের এত ঝাঁটবেমক্কা এসব খবরকেন আসে, কেন দেখি এত সংঘাতএই যে কদিন আগে জঙ্গলে মরে গেল কারাকারা কাকে সুরক্ষা দিতকারা কার অরণ্যসম্পদ দিয়েছে পাহারাএসব খবরে আসেনি তোতাই ভারি নিশ্চিন্তে এসো স্ক্রল করি বিদেশের খবরের পাতালাগে, তো বানিয়ে কিছু নিয়োপুঁজির অ্যালগো মেনে খাতালিখে দেবে কী কী করণীয়কীভাবে আবেগে জ্বলে ওঠাকীভাবে বা ... ...
(খড়গপুর বইমেলা স্মারকসংখ্যা ২০২৩)-এ প্রকাশিত১৯৪৮ সালের ২৬শে জানুয়ারি, গান্ধীজি তাঁর বক্তৃতায় বলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের দিশারী হিসেবে জাতীয় কংগ্রেসের যে সাংগঠনিক প্রাসঙ্গিকতা ছিল, তা ফুরিয়েছে। জাতীয় কংগ্রেসকে ভেঙে দেওয়ার সময় এসেছে। কংগ্রেসকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন যা তাঁরা সারা দেশের সাতলক্ষ গ্রামে ছড়িয়ে মানুষের জীবনযাত্রা উন্নয়নের কাজে নামুক। অধ্যাপক নির্মল কুমার বসুর ‘মাই ডেজ উইথ গান্ধী’ বইয়ে এই বক্তৃতার চুম্বকসার পাওয়া যায়। এইখানে অধ্যাপক বসু একটা আশ্চর্য বিষয়ের প্রতি নজরটান দেন- তা হল, এই সাতলক্ষ গ্রাম তো স্বাধীন ভারতে নেই। তা ছিল পরাধীন ব্রিটিশ ভারতে, অর্থাৎ, ভারত ও পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান ব্যাপী সমস্ত গ্রামের উন্নয়নে কংগ্রেসকর্মীদের অংশগ্রহণের কথা গান্ধীজি বলেছিলেন, স্বাধীনতার পরের প্রথম ২৬শে ... ...
পনের বছর ধরে সিংগুর নীতি আঁকড়ে থেকে, নিজেদের যাবতীয় ব্যর্থতার ভার 'নিচুতলার' একশ্রেণির কর্মীর ঘাড়ে ঠেলে দিয়ে সিপিএম ক্রমে জনবিচ্ছিন্ন এবং পরে বাংলার রাজনীতিতে অকিঞ্চিৎকর হয়ে উঠল। এই নির্বাচনে একঝাঁক তরুণ মুখ তুলে আনলেও, তাদের প্রায় সকলেই সিপিএমেরই নেতা-কর্মীরই বাড়ির সন্তান। তার বাইরে নতুন প্রজন্মের কাছে সিপিএমের গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। এমন কী নতুন করে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এরকম কোনও দিশাও দেখাতে পারে নি দল। এই নির্বাচনে সিপিএমের সম্পূর্ণ ডেসিমেশন বিভিন্ন সামাজিক পরিসর ও মিডিয়াতেও তাদের গুরুত্বহীন করে তুলবে। এই প্রেক্ষাপটে আশি বছরের বামপন্থী, কমিউনিস্ট রাজনীতির পরিসরে এক বিশাল শূন্যস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আমরা যদি ধরে নিই বিভিন্ন কারণে দেশের গরিব মানুষের সংকট ... ...