( ৪১ ) রাত প্রায় এগারোটা বাজে। অনিন্দ্যবাবু একটা বই পড়ছিলেন। বইটা বন্ধ করে, চশমাটা খুলে রেখে অনিন্দ্যবাবু শোবার জন্য প্রস্তুত হলেন। শিঞ্জিনী ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে রাত্রিকালিনত্বক পরিচর্যা করছিলেন। মুখে একটা ক্রিম লাগিয়ে আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আলতোভাবে দুদিকের গালে ঘসতে লাগলেন। আয়নার দিকে তাকিয়ে গালে ক্রিম ঘসতে ঘসতে বললেন,' বাবানের সঙ্গে আর কোন কথা হয়েছে নাকি ? 'অনিন্দ্যবাবু বললেন, ' না... রিসেন্টলি হয়নি। কিছুদিন আগে হয়েছিল। ওর সঙ্গে কথা বলে মনে হল জেন জি-র মুভমেন্টে ওর ইনক্লিনেশান গ্রো করেছে... '----- ' ... ...
( ৪০ ) আজ আবহাওয়া বেশ পরিষ্কার আছে। অতীশ প্রায় পনের দিন বাদে সোমনাথের বাড়িতে এসেছে। রাত আটটা বাজে। সোমনাথ টিভি তে খবর দেখছিল। নিউজ চ্যানেলগুলোয় এখন টক শোয়ের ভরা জোয়ার। একটা করে বাজারের গরম খবর ধরে আর স্টুডিওয় আলো ছড়িয়ে সাজগোজ করে বসে থাকা দিগগজ ভদ্রলোকেদের একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলায় সঞ্চালক মশায়। তারা বলেই যেতে থাকে তাদের পার্টির পক্ষ নিয়ে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, ঝালিয়ে আসা রেডিমেড স্ক্রিপ্ট মেনে। সঞ্চালক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে উস্কে যেতে থাকে যতক্ষণ না তুমুল হৈ হট্টগোল সৃষ্টি হয়। মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে হিসেবমতো খানিক হৈ চৈ তৈরি না ... ...
( ২ ) দোতলার ঘরে বসে থাকা গৌরীশঙ্করবাবুর বুকের রক্ত চলকে উঠল। তিনি হুড়মুড় করে নীচে উঠোনে নেমে এলেন। উঠোনে বহু লোকজন আত্মীয়স্বজনের ভিড়। একচালার একপাশে চারটে ঢাকি ঢাক বাজাচ্ছে। তার মধ্যে একটা নুয়ে পড়া অথর্ব বুড়ো। চোখ বুজে মাথা নীচু করে মাটিতে দাঁড় করানো ঢাকে কাঠি মারছে। ঢাক কাঁধে নেবার মতো বল বোধহয় শরীরে নেই। কাঠির বোলগুলো ঢাকের চামড়ায় না, গৌরীবাবুর হৃদপিন্ডে গিয়ে আছড়ে ... ...
( ১ ) বশিষ্ঠ নিমগাছটা থেকে একটা কচি ডাল ভাঙল দাঁতন করার জন্য। দাঁত আর কটাই বা আছে। ছিয়াত্তর বছর বয়েস হল। হাতে পায়ে তেমন বল নেই। শুধু ঢাকের দুটো কাঠি হাতে নিলে কি যেন ভর করে হাতে পায়ে। সাত পুরুষের ঢাকির পরিবার। তিন পুরুষ আগে তার কে যেন কলকাতায় রাজা নবকৃষ্ণের শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় ঢাকের বোল তুলতে যেত। তার নাম ছিল দুর্গাচরণ। সেই অষ্টমীপুজোর সকাল সন্ধেয় আরতির সময়ে দুর্গাচরণের ঢাকের বোলে রাজবাড়ির আনাচ কানাচ দুলতে থাকত ভাবের দোলায়। এইসব শোনা কথা অবিশ্যি। ভোরবেলায় সাদা সাদা শিউলি ফুলের মতো দুর্গাচরণের ঢাকের বোল ঝরে পড়ত রাজবাড়ির উঠোনময়। আশপাশের লোকজন ... ...
( ৩৯ ) বিজয়রা কাঁকাসিতে পৌঁছল অনেক কষ্ট করে। এই দুর্যোগে কোন ভ্যান বা রিক্শা বেরয় নি। রাস্তায় একবার ঝেঁপে বৃষ্টি এল। দাঁড়াবার তেমন কোন জায়গা নেই। মাথা বাঁচাবার জন্য একটা তেঁতুলগাছের তলায় দাঁড়াল ওরা তিনজন। প্রায় আধঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হল ওখানে। বৃষ্টিটা একটু ধরলে আবার হাঁটতে শুরু করল। জঙ্গলের ভিতর পৌঁছে বিজয় দেখল বিশ্রী অবস্থা। কাল রাত থেকে লাগাতার ... ...
( ৩৮ ) অনুমিত সব শুনে বলল, ' কী করবে এখন ? '---- ' মিডিয়াতে ডিসক্লোজ করব ভাবছি... কিন্তু তার আগে একটু দেখে নিতে চাইছি... '----- ' কী দেখবে ? '----- ' দেখতে চাইছি কিভাবে রিট্যালিয়েট করে... 'অনুমিত বেশ পরিণতমনষ্কের মতো বলল, ' সব হাউসই তো সোল্ড হয়ে গেছে। আদারওয়াইজ সারভাইভ করা ডিফিকাল্ট এই ফ্রেমওয়ার্কে.... '----- ' তা ঠিক। কিন্তু তবু তো কিছু হাউস এসব ম্যালপ্র্যাকটিস এক্সটেনসিভলি পাবলিক করছে। সেটা তো অস্বীকার করা যায় না... ', অনিন্দ্যবাবু অনুমিতের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দিলেন। অনুমিত কথাটা নিল। বলল, ' তা ঠিক। তবে তুমি একটা কাজ করতে পার। সোশ্যাল ... ...
( ৩৭ ) গৌরীশঙ্করবাবু অনেকদিন পর অনিন্দ্য বসুর কাছে এসেছেন। নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় তেমন সময় পান না। আর অনিন্দ্যবাবুরও গৌরীশঙ্করকে বিশেষ প্রয়োজন হয়নি অনুমিত মনোমিতার ঘটনার উত্তাপটা আপাতত জুড়িয়ে যাওয়ায়। রবীন্দ্রনাথবাবু আর যোগাযোগ করেননি তার মেয়ের ব্যাপার নিয়ে। তার নিজে থেকে খোঁচাখুঁচি করার ইচ্ছে জাগে না এইসব ব্যাপার নিয়ে। সে যাই হোক, সন্ধেবেলায় গৌরী চক্কোত্তির দেখা পেয়ে বেশ প্রসন্ন ... ...
( ২ ) কোন গাইড আর নিতে হল না মাঝপথে। পনেরশ একাত্তর থেকে পনেরশ পঁচাশি পর্যন্ত এই দূর্গ তথা প্রাসাদের খাঁজে খাঁজে লেগে থাকা ইতিহাসের রোমাঞ্চ নিঙড়ে বার করে নিপুনভাবে ছড়িয়ে দিতে লাগলেন সিদ্ধার্থ দত্ত। সম্পূর্ণ পরিক্রমা শেষে আবার বুলন্দ দরজার পিছনে এসে পৌঁছল সতীনাথদের দল। শম্পালি উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল, ' কাকু কিন্তু দুর্দান্ত ডেলিভারি দিলেন। উঃ... দারুন, চিন্তাই করা যায় না। তারপর টানা হিন্দীতে, একটাও বাংলা না বলে... সুপার্ব ! 'সোমনাথ বলল, ' আমার তো মনে হয় গাইডের রেমুনারেশানটা কাকাবাবুরই প্রাপ্য। অসাধারণ একটা সেশান উপহার দিলেন উনি এটা মানতেই হবে... 'সতীনাথবাবু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ... ...
( ১ ) সতীনাথ হালদার প্রায় বাহান্ন বছর আগে আগ্রায় গিয়েছিলেন একটা দলের সঙ্গে। চেনা অচেনা, আত্মীয় অনাত্মীয়ের সাত আট জনের একটা দল। সতীনাথের তখন একুশ বছর বয়স। আগ্রা থেকে ওরা গেল ফতেপুর সিক্রি দেখতে। না, কোন গাড়ি ভাড়া করে যাওয়ার রেস্ত ওদের দলের ছিল না। মানে দলের বেশির ভাগেরই ছিল না। আগ্রা থেকে ফতেপুর সিক্রি যাবার বাস ছাড়ে। সেই বাসে চড়ে ওরা ফতেপুর সিক্রিতে এসে পৌঁছল। বুলন্দ দরওয়াজা পেরিয়ে ভিতরে পা রাখতেই সতীনাথেরকেমন গা ছমছমে অনুভূতি হল। যেন ... ...
জগু... এই জগু শিগ্গীর বাড়ি যা। তোর মা মরে গেছে। জগু বা জগা বা জগাই বা জগ্গু— মুখের ফেরে নামের ফের। নাম যাই হোক হাফ প্যান্ট আর হাফ শার্ট পরা শ্যামবর্ণ ছেলেটার বয়েস মোটে পাঁচ। ঘোষেদের পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে মাছ ধরা দেখছিল। জনা চারেক লোক ফাতনার দিকে চোখ রেখে ধ্যানমগ্ন মুনির মতো বসে আছে। ফিরফির করে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। কার্তিক মাস পড়ল। হাওয়ায় বেশ টান লেগেছে। নীরব আশপাশ। তীরবেগে ছুটে আসা বাকুলির মুখ থেকে বাতাসে আছড়ে ... ...