
এই জন্যই বাংলায় চাই সর্বাত্মক ঐক্য। কে লাভ করে ফেলল পরে ভাবা যাবে। আগে অ্যাজেন্ডায় একমত হতে হবে, যে, যা চলছে, সেটা গণতন্ত্র না। সেটা ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি। এবং বাকি সবাইকে এক জায়গায় জড়ো হতে হবে। পতাকা ফেলে হোক, সবার পতাকা নিয়ে হোক, একসঙ্গে। জয়প্রকাশ নারায়ণের সময় এভাবেই লড়া হয়েছিল। নৌবিদ্রোহের সময়, কংগ্রেস, বাম আর লিগের পতাকা একসঙ্গে নিয়ে মানুষ প্রাণ দিয়েছে। এইভাবেই লড়াই হয়। আশা করব, এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক নেতারা দেবেন। ক্রান্তিকালের যা কর্তব্য। নইলে, আর কি, অন্য কেউ কবে এগিয়ে আসবে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ... ...

সরকার এবং শাসক দলের নেতারা কোথায় আছেন, এখনও খবর পাওয়া যায়নি। শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য নিয়মমাফিক 'এসব বিজেপির সংস্কৃতিতে নেই' বলে বিবৃতি দিয়েছেন। আরও বলেছেন, পুলিশ সব কিছু পারেনা। ডিম ছোঁড়া আটকাতে পারেনি, পকেটে-পকেটে হাত দিয়ে ডিম খুঁজবে? সবশেষে জানিয়েছেন, এসবই তৃণমূল করছে। অর্থাৎ তারাই নিজেদের পার্টি অফিস ভাঙছে। নিজেদের লোকের উপর হামলা করছে। খুব সম্ভবত পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীও তারাই চালাচ্ছে, ফলে তারাও এসে পৌঁছতে পারছেনা। ... ...

এছাড়া আছে স্কুল-কলেজের কর্মসূচি। তার মধ্যে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল 'নমো-সেবা' নাটক। অর্থাৎ, উনি কেমন সেবা করেন, সেই নিয়ে একটি বিশেষ নাটক মঞ্চস্থ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা হয়তো ভালো করে লিখতে পারবেনা, তাই নাটকটা লিখেও দেওয়া হয়েছে। নাটকের নাম, 'নমো সেবা: অজানা কাহিনী'। তাতে নরেন্দ্র মোদির জীবনের নানা দুর্ধর্ষ জিনিসের কথা বলা হয়েছে। একটি চরিত্র হিসেবে মোদিজি স্বয়ং উপস্থিত আছেন। পুরো নাটকটা তো এখানে লেখা যাবেনা, শেষ দৃশ্যটা বলা যাক। ... ...

সব মিলিয়ে আমার দিব্য লাগল। কোনো হিন্দুত্বের বালাই নেই। এমনকি দুগ্গাপুজোর কার্নিভালও নেই, সেটা অবশ্য এবার হবে কিনা জানিনা। বরং নকু-মাকু-লিবুদের সাম্য-মৈত্রীর ইন্টারন্যাশানাল জাতীয় একটা ভাব আছে। বানানো অবশ্য এআই দিয়ে, তবে একটু সস্তা এআই। যিনি বানিয়েছেন, তিনি ভালো মার্জিন রেখেছেন মনে হয়। বানাতে কত টাকা লেগেছে অবশ্য জানিনা। কোন কোম্পানি বরাত পেয়েছিল তাও না। গুজরাত-টুজরাতের হতেই পারে, কারণ যিনি বানিয়েছেন, তিনি কখনও পশ্চিমবঙ্গ দেখেননি। ... ...

এরপর আবার দুগ্গাপুজো। কয়েকবছর ধরে শুনছিলাম, পশ্চিমবঙ্গে পুজো করতে দেওয়া হয়না। অনেকেরই সন্দেহ ছিল, যে, আমরা কি তাহলে সবাই ভুল দেখছি? সবই মায়া? এই যে ইউনেস্কো হেরিটেজ, এটাও কি জাল সার্টিফিকেট? কদিন আগে দিলীপ ঘোষ সেটাও পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। কিছু একটা হত ঠিকই, কিন্তু সেটা শারদোৎসব। দুগ্গাপুজো না। ... ...

ফলে যাদবপুরে এ জিনিস চলবে। প্রেসিডেন্সিতে হবে। আশুতোষে হবে। সারা বাংলা জুড়ে হবে। এর আগে যাদবপুরের প্রাক্তনীরা ছাত্রছাত্রীরা হোককলরব করেছিলেন। তখন তো এরকম হামলা ছিলনা। হামলার সগর্ব সম্প্রচার ছিলনা। এখন রাজ্যজুড়ে এই জিনিস চলছে। এই হামলা নিয়ে কি কিছু করবেন? শুধু এই হামলা না, রাজ্যজোড়া হামলা, গণতন্ত্রের সগর্ব হত্যাকান্ড নিয়ে? করলে ভালো হবে। ... ...

তো, সে যাই হোক, এই ধরণের দাবী-দওয়ার ফল যা হবার তাইই হয়েছে। পুলিশি হেফাজতে একটি রাজনৈতিক মৃত্যু। তারপর যা ঘটল সে আরও ন্যক্করজনক। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ঘটনাস্থলে গেলেন, তাঁর উপর আক্রমণ হল। মিডিয়ায় প্রথমে ব্ল্যাকআউট হল, তারপর 'জনরোষ' বলে চালানো হল। এবং এই পুরোটার নিন্দে করতে দেখলাম স্রেফ দুইজনকে। একজন বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিন্দে করলেন। দ্বিতীয়জন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। ... ...

এই পুরোটাকে যদি জনতার রায়ের নিরিখে দেখেন, তো দুটো জিনিস দেখবেন। এক, জনতা শুধু বিজেপি-বিরোধিতা করেনি। একজন বিরোধীকে জিতিয়ে ছেড়েছে। রীতিমতো ব্লক ভোটিং করে। দুই, এলাকাটা শহুরে। ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব নিঃসন্দেহে বেশি। তারা বেছে নিয়েছে প্রশান্ত কিশোরকে। আন্দাজ করতে পারি, ভবিষ্যতে এইভাবেই বিজেপি-বিরোধী দলকে বেছে নেবেন ভোটাররা। ... ...

কিন্তু এসবের কিছুই হলনা, তার একটা কারণ হল, যেটা আমরা বহুদিন ধরে বলে আসছি, যে, কটা আধবুড়ো লোক ছাড়া গোদি মিডিয়া আর কেউ বিশ্বাস করেনা। ওটাকে জনমত বলে চালানো হয়। আরশোলারা সেই সত্যটা একদম উলঙ্গ করে দেখিয়ে দিয়েছে। বেলুনটা ফাটারই ছিল, সর্বভারতীয় স্তরে ফাটাতে আমাদের ভদ্রলোকরা একটু মেনে নিয়েছেন। আর দ্বিতীয় কারণ হল, মোদিও নড়বড় করছেন। গোদি মিডিয়ার ভরসায় না থেকে রিল বানাতে লেগেছেন। ... ...

অবশ্য, ওঁদের একটু রিলিফ দিতে পারেন বিরোধী নেতারা। সারা ভারতবর্ষে এই আন্দোলন নিয়ে গোদি-বাহিনীর বদনাম করার তো কোনো অন্ত নেই। কিন্তু কোত্থাও দেখবেন না, বিরোধী নেতারা এরকম বিগলিত হয়ে মাটিতে মিশে যাচ্ছেন। একদিকে ওঁদেরই ছাত্র-যুবরা ফাটিয়ে লড়ছেন, অন্যদিকে বিধায়ক আগ বাড়িয়ে কালো ব্যাজ পরে ফেলছেন। প্রধানমন্ত্রীর অপমান? ছি ছি মাপ করবেন। অপশব্দের ব্যবহার? মার্জনা করে দেবেন প্রভু। ... ...

এরকম আরও আওয়াজ তোলা হয়েছে। বাঙালিই তুলেছে। বিজেপির সম্ভাব্য পশ্চিমবঙ্গ জয় যে ভারতবর্ষজুড়ে একট বিরাট বিপর্যয়ের সূচনা, বাংলায় বহুবার বলা হয়েছে। এসআইআর স্রেফ এসআইআর না, একটা বড় পরিকল্পনার অংশ, ভোট ক্রমশ প্রহসনে পরিণত হচ্ছে, অবিজেপি শক্তিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত, এও বহুবার বলা হয়েছে। ... ...

সোনম বলেছেন তিনি হিরো না। ঠিক কথা। তিনি শ্রদ্ধেয় এবং সম্মাননীয় ব্যক্তি। তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে লড়ছেন। সবকিছুতে মত মিলবেনা, কিন্তু লড়ছেন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এবং এই লড়াইয়ে কোনো ঢিসুম-ঢাসুম হবেনা। খুব বেশি হলে মরে যেতে পারেন। ... ...

আর দ্বিতীয় কথাটা হল, চারটি স্তম্ভের বাইরে বেশ তাগড়াই একটি পঞ্চম বাহিনীও আছে। স্পেনের গৃহযুদ্ধে ফাসিস্ত ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে লড়ছিল আন্তর্জাতিক সংহতি। ফ্রাঙ্কো তখন বলেছিলেন, মাদ্রিদ আমরা দখল করবই, কারণ মাদ্রিদের চারদিকে আছে আমাদের চারটি বাহিনী। আর মাদ্রিদের ভিতরে আছে পঞ্চম বাহিনী। ... ...

সব মিলিয়ে যা বোঝা যাচ্ছে, বিরোধীদের জন্য বারুইপুর অবরুদ্ধ। কিছু হলেও ডিম্মিডিয়া দেখাবেনা। মোটের উপর ব্ল্যাক আউট চলছে। পোস্ট মর্টেম কী হয়েছে কেউ জানেনা। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, যে বস্তায় দেহ ছিল, সেটা এখনও পড়ে। এভিডেন্স আদৌ সংগ্রহ করা হয়েছে কিনা জানা নেই। এবং ময়ূখের বক্তব্যের পর সন্দেহ হচ্ছে, একমাত্র সাক্ষী বলে যাঁর কথা শোনা যাচ্ছে, তাঁকেই "খরচা" করে দেওয়া হতে পারে। পরপর অনেকগুলো ধর্ষণ বা লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটল নতুন জমানায়। চন্দ্রনাথের খুনের কোনো কিনারা হয়নি। ইভিএম পুড়ে গেল এবং ডিম-ছোঁড়া জাতীয় গণহিংসায় কার্যত উৎসাহ দেওয়া চলছে। ... ...

এই তো সময়, যখন বিপ্লবীরা শমীকবাবুর থানে গিয়ে হত্যে দিচ্ছেন, বাম কবিরা অটলবিহারী বাজপেয়ীতে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছেন, সায়নী ঘোষ সাদা শাড়ি ছেড়ে টি-শার্টে ফিরে যাচ্ছেন, চাকরি হারিয়ে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন আরবানায় থাকতে যোগ্যতা লাগে। ... ...

খবর এইটুকুই। কিন্তু একটা কথা এই প্রসঙ্গে বলে নেওয়া ভাল। কিছু বিজেপির সমর্থক এইসব কাণ্ড-কারখানা দেখে একটু আমতা-আমতা করে যা বলছেন, সেটা খুবই হাস্যকর। কেউ বলছেন, "ওরা ক্ষমতায় এলে যা করত, এ তার চেয়ে কমই হচ্ছে"। ... ...

এই সব কাকতালীয় ঘটনা যোগ করলে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি নির্বাচনে সংখালঘু থাকলেও নির্বাচনোত্তরপর্বে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। একবার হয়ে গেলে ডিলিমিটেশন সহ যা যা পাশ করাতে চায়, সবই টপাটপ পাশ করিয়ে ফেলতে পারবে। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক। কিন্তু আসলে তা নয়। ... ...

এর মধ্যে তৃণমূলের দামাল ছেলেরা অর্ধেক ভালো হয়ে গেছে। অর্ধেক জেলে। বাকি যে অর্ধেক থাকে, তাদের কুনাল ঘোষ আকুল আবেদন জানিয়েছেন, এখন সমালোচনা না করতে। বুদ্ধিমান রাম-বামরা এত ঝক্কি নেন নি। শিরদাঁড়াযুক্ত বিখ্যাত ডাক্তার-আন্দোলনের নেতারা আগেই আটঘাট বেঁধে দুই নেতাকে পাঠাতে পেরেছেন বিধানসভায়। তাঁরাই এখন হইচই করে হকার-উচ্ছেদ করছেন। ... ...

আরশোলারা অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রাণী। তার প্রথম কারণ হল, ওরা দলবেঁধে থাকে এবং নোংরার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু ওয়াশিং মেশিনে বিশ্বাস করেনা। যেন গায়ে ময়লা টয়লা লাগেনা, আস্ত পরমহংস। ... ...

সর্বত্র আশাভঙ্গের বেদনা ফুটে-ফুটে বেরোচ্ছে। তোমাকে সব দিয়ে ভালোবেসেছিলাম, এই কি তার প্রতিদান? ... ...