এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বিদেশিনী এক গৃহলক্ষ্মীর পাঁচালি 

    L P Datta লেখকের গ্রাহক হোন
    ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১০২ বার পঠিত
  • এই লেখাটি লিখেছিলাম এক কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন। উৎসবের দিনগুলিতে আমার পুজোঘরের প্রধান দুটি উপাচার; নতুন করে কিছু রান্না আর নতুন কোন কিছু পড়া, ইদানীং তার সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু লেখা। সরস্বতী পুজোর দিনগুলোতে সবাই যখন পড়ার বই ঠাকুরের পায়ে সমর্পন করে সেদিনের মত বচ্ছরকারের পড়ালেখার হিসেবে-নিকেশ মেটাতো, আমি আর বোন তখন রাজ্যের গল্পের বই বার করতাম দেওয়াল আলমারি গুলো থেকে। সকাল বেলা সেইসব বই, দেওয়াল আলমারি ঝাড়পোঁছ চলতো আর দুপুরে ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে খিচুড়ি খেয়ে গুছিয়ে বসতাম এককাঁড়ি গল্পের বই নিয়ে। মাঘের শীতের মিঠে রোদে পিঠ ঠেকিয়ে একবাটি কুলের আচার নিয়ে পাতার পর পাতা উল্টোনো, আহা সোনার দিনগুলি ! যদিও আমরাই কেবল ব্যতিক্রম ছিলাম না, আমাদের পাড়ায় দুটি-বোন ছিল, তারা সেদিন সারাদিন ধরে সত্যিকারের পড়াশোনা করতো বছরভরের হিসেবে একদিনে মেটানোর তাগিদে হয়তোবা।
    দেখেছো কান্ড! শুরু করলাম লক্ষ্মী পুজো দিয়ে, চলে গেছি সরস্বতী পুজোয়! মা লক্ষ্মীর পুজো সে-অর্থে দেখতে গেলে গৃহিণীদের পুজো, সেইসকল মানুষদের প্রতিভূ এই দেবী যারা সংসারের অথৈ বিষাদজলে শরীর ডুবিয়ে, মন ডুবিয়ে পার করে দেন গোটা একটা জীবন সংসারের মঙ্গলকামনা করতে করতে। আমাদের আগের বা তারও আগের প্রজন্মে কত মানুষ, মেয়েমানুষ শুধু হেঁশেলের কোণটিতেই তাদের জীবনখানি কাটিয়ে দিলেন, সে খবর কেই বা রাখে ! দেশই হোক বা বিদেশ, গৃহিণীদের ঘর-বসতের মাঝে নিরন্তর দিনযাপনে এমনই কত যে চালচিত্র থাকে তার হিসেব রাখা দায় ! সেসব হিসেব থেকেই কখন যেন একটা দুটো কড়ি বেহিসেবি হয়ে এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ে আর উল্টেপাল্টে দেয় সমাজের স্থির করে রাখা নিয়মের দাঁড়িপাল্লা। এমনই বেহিসেবি এক বিদেশিনী গৃহলক্ষ্মীর পাঁচালি খুলে বসলাম আজ।

    হেস পরিবারে সেদিন সকালটা আর পাঁচটা দিনের মতোই শুরু হয়েছিল, শুধু প্রকৃতির গুমোট আলো-আঁধারের ছটা যেন মধ্যে মধ্যে আলোছায়া খেলছিল গৃহকত্রী এঞ্জোলিনার মুখে-চোখেও। গৃহকর্তা ওয়ালদের শান্তশিষ্ট নির্বিরোধী মানুষ, অত তলিয়ে ভাবার অবকাশ তার স্বভাবে নেই। আর সব পুরুষ মানুষের মতোই কর্মস্থলে কাজের চাপের ছায়া তার স্বাভাবিক জীবনে কিয়ৎ ছন্দহীনতা ঘটিয়েছে একথা সত্য। তবু তার অনুভবী মন একটুক্ষণ পরেই গৃহের গুমোট বাতাবরণে বুঝে নিলেন গতকাল রাতে তার আপাত উচ্চ কণ্ঠস্বর গৃহস্বামিনীর মনে বেশ প্রভাব বিস্তার করেছে। নিজেদের ছোট্ট গৃহকোণটি অন্য সব সকালের মতো আজ তার প্রিয়তমা পত্নীর কলকাকলিতে মুখরিত নয়। শান্তিপ্রিয় ওয়ালদের তৎক্ষণাৎ পত্নীর মান ভাঙাতে অগ্রসর হলেন "গতকাল রাতে আমি উঁচু স্বরে কথা বলেছি, তার জন্য সত্যিই দুঃখিত, আর অভিমান করে থেকো না প্রিয়ে"। ওভেন থেকে কুকিজের প্লেটটা বার করতে করতে এঞ্জোলিনা তার শান্ত স্বামীটির দিকে তাকিয়ে বললেন তুমি উঁচু স্বরে কথা বলেছো তার জন্য সরি চাইতে হবে না, কিন্তু তুমি যে বলেছিলে "ল্যাবরেটরিতে কি ঝামেলা চলছে, আমি সাধারণ মেয়েমানুষ, এসব বুঝবো না", সেই কথাটির জন্য ক্ষমা চাওয়া অবশ্য উচিত তোমার ! ওয়ালদের বিব্রত হয়ে বললেন "আহা আমি তোমার ছোট্ট মাথায় এত চাপ দিতে চাইনি, আর তুমি কি বা বুঝবে আমাদের অণুবিজ্ঞানের ল্যাবরেটরির সমস্যা, তাই ওকথা বলেছিলাম। তোমায় আঘাত করে কিছু বলতে চাইনি।" এঞ্জোলিনা তার শান্ত দীঘির মতো চোখ দুটি তুলে বললেন, আবার একই কথা বলে চলেছো "আমি কিছু বুঝবো না"; যদি না বুঝি তবে বোঝাও আমায়, তোমার সমস্যা তো আমারও সমস্যা নাকি ! ওয়ালদের বুঝলেন আজ তার ছাড়ান নেই। বেশ, শোনো তবে, আমি, প্রফেসর কচ এবং ল্যাবরেটরির বাকি সকলেই চিন্তান্বিত কারণ আমাদের অণুজীবের বংশবিস্তার জনিত গবেষণার অগ্রগতি এখন প্রশ্নের মুখে ; অণুজীবের জীবনধর্ম পর্যবেক্ষণ করার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যে উপাদান, তাদের বংশবৃদ্ধির মিডিয়া বা মাধ্যম সেটিই এখনো আমরা ঠিকঠাক আবিষ্কার করে উঠতে পারিনি, প্রতিনিয়ত আমরা বিফল হচ্ছি যা ল্যাবরেটরিতে অণুজীবের পুনরুৎপাদন এবং তাদের শারীরবৃত্তীয় ঘটনাক্রম পর্যবেক্ষণে বাধাদান করছে ! পাখির নীড়ের মতো চোখ দুটি তুলে এঞ্জোলিনা বলে উঠলেন, তবে এতদিন যে আলু আর মাংসের সিদ্ধ ব্যবহার করছিলে ? কয়েকমাস আগেই তো বানাতে বললে কতবার, আমি বানিয়েও দিলাম তোমায় ! তোমার প্রফেসর সেদিন ডিনারে আমায় কত প্রশংসা করলেন, আমার ওই আলু-মাংসের পরিজ নাকি তোমাদের অণুজীবরাও খুব ভালোবাসে ! আহা ভালোবাসে সেটাই তো সমস্যা, আমাদের ল্যাবরেটরির অণুজীবরা এমনভাবে সেসব ভালোবাসছে যে কিছুক্ষনের মধ্যেই তোমার ওই আলুসিদ্ধকে ওরা উৎসেচকের মাধ্যমে ভেঙে ভর্তা করে দিচ্ছে, সেখানে আর কোন পরীক্ষা, শারীরবৃত্তীয় পর্যবেক্ষনই সম্ভবপর নয় ! ওয়েলদের বলে চললেন, আমরা এরপর জিলেটিনও ব্যবহার করেছি জানো কি! কিন্তু একই অবস্থা, জিলেটিনকেও ভেঙে দিচ্ছে অণুজীবরা উৎসেচকের মাধ্যমে এবং সবথেকে বড় সমস্যা আমাদের সাধারণ ল্যাবরেটরির তাপমাত্রায় জিলেটিন একেবারেই ল্যাতপেতে এক জেলিতে পরিণত হচ্ছে ! তাহলে তোমরা কি চাও ? এঞ্জোলিনার প্রশ্নের জবাবে ওয়েলদের বিষন্ন হেসে জবাব দিলেন আমরা সাধারণ তাপমাত্রায় এক নিখুঁত জেলি চাই যেখানে অণুজীব বংশবিস্তার তো করবে কিন্তু তাকে ভাঙতে পারবে না ! তারা বসতবাটি বানাবে এবং আমরা শান্তিতে পর্যবেক্ষণ করবো তাদের শারিরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপ। জানিনা এমন কিছু পাওয়া সম্ভবপর কিনা আদৌ, ডুমুরের ফুলই খুঁজে ফিরছি বটে আমরা! আর সব দাম্পত্যের গল্পকথার মতো হেস পরিবারের এই কথোপকথনও হারিয়ে যেতেই পারতো সময়ের অন্তরালে। কিন্তু হারাতে দিলেন না এঞ্জোলিনা, এক সাধারণ গৃহবধূ। হেঁসেলের অন্তরালে দিন কাটানো এঞ্জোলিনা সার্থক অর্ধাঙ্গিনী রূপে শুধু যে স্বামীর সমস্ত সমস্যার সমাধান করলেন তাই নয়, একনিমেষে অণুজীববিজ্ঞানের গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে এলেন আরো ১০০ বছর। কিভাবে ? কিশোরী বয়সে ভিয়েতনামিজ এক পাড়াতুতো বান্ধবীর কাছ থেকে এঞ্জোলিনা শিখেছিলেন খাদ্যে আগারের ব্যবহার। আগার সাধারণ তাপমাত্রায় জমে জেলিতে পরিণত হয় তাই সেই শিক্ষানবিশি কাজে লাগিয়ে অনেক সময়ই এঞ্জোলিনা আগার দিয়ে জেলি এবং পুডিং বানাতেন গরমের দিনে ! স্বামীকে তিনি যখন আগারের কথা বললেন, দেখা গেল আগার প্রফেসর রবার্ট কচ এবং তার টিমের সেই অতি দুর্লভ " পরশ পাথর ", যেখানে অণুজীব সাধারণ তাপমাত্রায় কোনোরকম সমস্যা ছাড়াই বঙ্গবিস্তার করছে। এঞ্জোলিনা আমাদের ঠাকুমা দিদিমাদের মতোই এক সাধারণ গৃহস্বামিনী ছিলেন, কেবল তার হেঁশেলের কোণটিতে রান্না আর যাপনের মাঝে ছিল বোধির স্পর্শ, অনুভবের ছোঁয়া। তার হাতের সোনার কাঠির ছোঁয়ায় গতি পেল অণুজীববিদ্যার গবেষণা। এ-যেন মা-লক্ষ্মী পথ দেখিয়ে নিয়ে এলেন জ্ঞানকে, মা সরস্বতীকে।

    শুভ হোক ভাবনা, নির্মল হোক জ্ঞান.

    “কেমন এক পরিচ্ছন্ন বাতাস ভেসে আসে।

    অঘ্রান রাত্রির অগণন জ্বলন্ত নক্ষত্রের আলোয়

    সমস্ত পৃথিবী তার জলঝর্ণার— নগ্ন নারীহস্তের নির্মলতায়

    নিঃশব্দে উৎসারিত হয়ে উঠেছে আজ।“— কবি জীবনানন্দ দাশ

    কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর অনেক শুভকামনা…..
     
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ প্রতিক্রিয়া দিন