মশাই, একটা প্যারাডক্স নিয়ে বাঁচছি আমরা। যে দেশে একটা গরুর গায়ে আঁচড় পড়লে গোটা টুইটার-জগৎ কেঁপে ওঠে, সেই দেশের পাশের দুটো দেশে হিন্দুরা রোজ মরছে, আর আমাদের অতি বিদগ্ধ আঁতেলকুলের কলম সেখানে গিয়ে হঠাৎ অক্সিজেনের অভাবে অজ্ঞান হয়ে পড়ছে। ব্যাপারটা মেডিক্যাল সায়েন্সের কাছেও একটা রহস্য।
বাংলাদেশ: বিপ্লবের পরে বুলডোজার নয়, বল্লম
২০২৪-এর অগাস্টে হাসিনা গেলেন, আর তার পরের মাসেই ৪৯ জন সংখ্যালঘু শিক্ষককে জোর করে ইস্তফা দেওয়ানো হল। "গণঅভ্যুত্থান" শব্দটা শুনলেই বুক ফুলে ওঠে যাদের, তারা এই ইস্তফাপত্রগুলো নিয়ে একটা সেমিনারও করলেন না। দীপু চন্দ্র দাসকে গণপিটুনিতে মারা হল, শরৎ মণি চক্রবর্তীকে নিজের মুদির দোকানে কুপিয়ে ফেলা হল, রানা প্রতাপ বৈরাগীকে ডেকে নিয়ে মাথায় গুলি, ভবেশ চন্দ্র রায়কে অপহরণের পর হত্যা, আর যোগেশ চন্দ্র রায়—যিনি নিজে মুক্তিযুদ্ধে বন্দুক ধরেছিলেন—তাঁকেও রেহাই দেওয়া হল না সম্পত্তি আর ধর্মের হিসেব মেটাতে। আড়াই হাজারের বেশি সাম্প্রদায়িক হামলা, দেড়শোর বেশি মন্দির পোড়ানো—এই সংখ্যাগুলো কোনো "ইসলামোফোবিক প্রোপাগান্ডা" নয় মশাই, এগুলো হিউম্যান রাইটস কংগ্রেসের রিপোর্ট। কিন্তু ইউনূস সাহেব বললেন, এসব নাকি "রাজনৈতিক সহিংসতা আর অপপ্রচার।" চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে জেলে পোরার পর যখন আদালত চত্বরেই একজন আইনজীবী খুন হলেন, তখনও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের ভাষ্যে "উদ্বেগ প্রকাশ" ছাড়া আর কিছু জোটেনি। অর্থনীতির অধ্যাপক পড়ালে মানবাধিকারের অঙ্কটা বোধহয় সিলেবাসের বাইরে পড়ে যায়।
পাকিস্তান: সেখানে রকেট লঞ্চার, এখানে ব্লাসফেমি
সিন্ধু প্রদেশে হিন্দু হওয়া মানেই যেন একটা এফআইআর অপেক্ষা করছে। নোটন লাল, স্কুলের প্রধান শিক্ষক, একটা মিথ্যা ব্লাসফেমি মামলায় ২৫ বছরের যাবজ্জীবন খেটে ২০২৪-এ খালাস পেলেন বটে, কিন্তু এখনও প্রাণভয়ে কাঁটা। HRCP নিজেই লিখেছে, পাকিস্তানে "হিন্দু হওয়াটাই ব্লাসফেমির অভিযোগের জন্য যথেষ্ট।" ২০২৩-এ কাশমোরে একটা মন্দির লক্ষ্য করে রকেট লঞ্চার দিয়ে হামলা হয়—রকেট লঞ্চার, মশাই, ঢিল নয়। করাচির সোলজার বাজারের ঐতিহাসিক মন্দিরটা প্রশাসনের যোগসাজশে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল রিয়েল এস্টেটের স্বার্থে। জাতিসংঘ নিজেই বলছে, জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত ও বিবাহিত মেয়েদের ৭৫ শতাংশ হিন্দু, তার আশি শতাংশ সিন্ধুতে। জেলখানায় হিন্দু-খ্রিস্টান বন্দিদের "অস্পৃশ্য" ধরে মলমূত্র পরিষ্কারের কাজে বাধ্য করা হয়—এই তথ্যটা কোনো হিন্দুত্ববাদী ওয়েবসাইটের নয়, চার্চের নিজস্ব রিপোর্টের। কিন্তু এই নিয়ে ক্যাম্পাসে মোমবাতি মিছিল বেরোয়নি, কারণ মোমবাতি ব্রিগেডের রুট ম্যাপে সিন্ধু প্রদেশ বোধহয় নেই।
এদিকে নিউ ইয়র্কে যা বলা হল
আর ঠিক এই সময়েই, ২৯ অগাস্ট নিউ ইয়র্কে, আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বললেন—"হিন্দু রাষ্ট্র হলে মুসলিমদের ভারত থেকে বের করে দেওয়া হবে না। যে হিন্দু মনে করে ভারতে মুসলিমদের জায়গা নেই, সে আর হিন্দুই থাকে না।" এই বাক্যটা শুনে যাঁদের ভুরু কুঁচকে গেল, তাঁদের বলি—এই একই ভুরু কাশমোরের রকেট হামলায়, নরসিংদীর কোপে, সোলজার বাজারের বুলডোজারে কেন নড়েনি? সংখ্যালঘুর প্রতি সহনশীলতার পাঠ যাঁরা দেন, তাঁদের চোখ শুধু ভারতের সীমানার মধ্যেই ফোকাস করে কেন? এই সিলেক্টিভ সমবেদনাটাই তো আসল জ্ঞানপাপ, মশাই।
উপসংহার: প্রশ্নটা থেকেই যায়
সহনশীলতার সার্টিফিকেট বিলি করার আগে একবার সীমান্তের ওপারে তাকানো দরকার—এটুকু দাবি বোধহয় অন্যায় নয়। প্রকৃত সুশীলতা মানে সব দিকের নিপীড়নকেই সমান স্বরে প্রশ্ন করা, শুধু নিজের দেশের সরকারকে নয়। এই প্রবন্ধ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা একটি ব্যঙ্গাত্মক রচনা। যাঁরা এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন, তাঁদের যুক্তিও শোনার মতো—অনেকে বলবেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সহিংসতার জন্য ভারতের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিকে দায়মুক্ত ধরে নেওয়া নিজেই একধরনের নির্বাচনী নৈতিকতা, এবং প্রতিবেশী দেশের সমস্যাকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হাতিয়ার করাটাও একধরনের সরলীকরণ।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।