কথাটা কানে যেতেই , বিরক্তিতে কুশলের মুখটা বিকৃত হয়ে গেল। ঝাঁজালো স্বরে বলে উঠল – তোমার এই বাড়াবাড়িগুলো আমার অসহ্য লাগে, মা !
কী বলছিস তুই ! – মায়ের গলায় ব্যথা মেশানো বিস্ময়।
ঠিকই বলছি – দাড়ি কামাতে কামাতে, আয়নার ভেতর দিয়ে মায়ের দিকে চেয়ে কঠিন স্বরে বলল কুশল – এই সব ধান্ধাবাজ গরিব লোকগুলোকে আমি একদম টলারেট করতে পারি না ! তোমাকে ভালোমানুষ পেয়ে ভজিয়ে ভাজিয়ে ক্যাটারাক্ট অপারেশনের জন্য একগাদা টাকা নিয়েছে। কাঙ্গাল টাইপের লোক এরা। অন্যের থেকে কী করে টাকা আর সুবিধে বাগিয়ে নেওয়া যায়, শুধু সেই ফিকিরে থাকে, আর ভালোমন্দ খাওয়ার সুযোগ পেলেই এদের জিভ লকলক করে ওঠে। আজকে আমার হাউসওয়ার্মিং পার্টিতে সব এস্টিমেবল্ গেস্টরা আসবে সেটা কি তুমি জানো না ? আজ ওকে ইনাভাইট না করলে কি চলছিল না ? এখানে এসে আবার কী কী চেয়ে বসে দ্যাখো। ইটস্ জাস্ট লোদ্সাম ! আটারলি লোদ্সাম ! – ক্লিন-শেভড মুখটা আয়নায় খুঁটিয়ে দেখতে থাকে কুশল।
তোর সাফল্যের পেছনে শঙ্কর স্যারের অবদানটা ভুলে গেলি ? – শুধু এটুকু বলে মা তাঁর নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
গালে ইম্পোর্টেড আফটার শেভ লাগাতে লাগাতে কুশল বলল – তুমি ঐ সেন্টিমেন্ট নিয়েই থাকো। জেনে রেখ, আমি সফল হয়েছি , বড় হয়েছি আমার নিজের ক্যালিবারে। নিজের ট্যালেন্টে। স্কুল-লাইফের একজন প্রাইভেট টিউটরের দয়ায় নয়। আয়্যাম আউট অ্যান্ড আউট আ সেল্ফ-মেড সাক্সেস।
২
এই যে, কুশল… অনেকদিন পর তোমাকে দেখে কী যে ভালো লাগছে ! তুমি এত উন্নতি করেছ , এত বড় বাড়ি করেছ , দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। আশীর্বাদ করি, আরো অনেক উন্নতি করো। – আধময়লা পায়জামা আর সস্তার পাঞ্জাবি পরা, ক্ষয়াটে চেহারার শঙ্করবাবু কুশলের কাছে এসে বললেন। প্রাক্তন ছাত্রের সাফল্যে তাঁর শীর্ণ মুখটা হয়ে উঠেছিল উজ্জ্বল, হাসিমাখা।
বন্ধু আর সহকর্মীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল কুশল। প্রত্যেকের হাতে গেলাস। জাঁকালো ইউনিফর্ম পরা সুন্দরী ওয়েট্রেসরা ট্রে হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে সকলকে স্কচ আর স্ন্যাক্স সার্ভ করছিল। দামী মদ আর দামী পারফ্যুমের গন্ধে বিশাল, বিলাসবহুল হলঘরটার বাতাস আভিজাত্যের ভারে ভারী হয়ে ছিল।
আপনি এখানে কেন ? – বিরক্তি ঝরে পড়ল কুশলের সর্বাঙ্গ থেকে – লিভিং-রুমে মা আছেন, আপনি ওখানে গিয়ে বসুন – পাথর-শীতল স্বরে ও বলল।
একটু ইতস্তত করে শঙ্করবাবু বললেন – তোমার জন্যেই আমার ছানি অপারেশনটা করাতে পারলাম বাবা ! আবার দৃষ্টি ফিরে পেয়েছি ! কী বলে যে তোমাকে আশীর্বাদ –
আপনি ও-ঘরে যান তো ! – এবারে বেশ চেঁচিয়েই বলে উঠল কুশল – বললাম না, মা লিভিং-রুমে আছেন…
শঙ্করবাবু কুশলের দিকে অপলকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে, আর কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে সেই বিশাল হলঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। যেতে যেতে তাঁর কানে এল, কেউ একজন জিজ্ঞেস করল – লোকটা কে রে ?
আমাদের পুরনো বাড়িতে ওর যাতায়াত ছিল। ঐ, এর্যান্ড বয় টাইপের… এনিওয়ে, যে কথাটা তোদের বলছিলাম, লাস্ট মান্থে ডেট্রয়েটে… – কুশলের কথাগুলোও কানে এল শঙ্করবাবুর।
ছানি অপারেশনের পর শঙ্কর স্যার বেশ পরিস্কার দেখতে পাচ্ছিলেন। এখন আবার সব কেমন ঝাপসা দেখাচ্ছে …