||১||কৌশাম্বী নগরের রাজমাতার চোখে ঘুম নেই। তিনি দীর্ঘজীবনের সায়াহ্নে এসে পৌঁছেছেন। তাঁকে এমন অনাচার শেষপর্যন্ত দেখতে হবে, এ তাঁর ভাবনার বাইরে ছিলো। অপরাহ্নের ম্লান আলো এসে পড়েছে হাতির দাঁতের কারুকার্য করা পালঙ্কের উপর। দুগ্ধফেননিভ বিছানাত অর্ধশয়ন অবস্থায় তিনি ভারাক্রান্ত মুখে একথাই ভাবছিলেন। শ্বেত পট্টবস্ত্র ও মুক্তার অলংকারে তাঁর দেহ আবৃত। এক দাসী এসে নতমস্তকে দাঁড়ালো। কৌশাম্বী রাজপ্রাসাদে রাজমাতার কক্ষটিই সবচেয়ে নিভৃত। বিশেষ করে পড়ন্ত গোধুলিতে কেউই এখানে আসে না। আর বর্তমানের অশান্ত পরিস্থিতিতে তো আর কারো আগমন বিনা কারণে হতে পারেনা। তিনি ক্লান্ত হলেও মাথা তুলে বললেন,
-- "কী প্রয়োজন, অম্বিকা?"
দাসীটি তেমনই নতমস্তকে ও ম্লানমুখে জানায় --"রাজপুরোহিত মহাশয় আপনার দর্শনপ্রার্থী, দেবী।"
এইসময়ে রাজপুরোহিত চন্ডেশ্বর? বেশ আশ্চর্যের কথা। সাধারণতঃ, এই মহান তথা ক্রোধী ব্রাহ্মণের কাছে রাজপরিবারের সদস্যরাই মাথা নত করে গিয়ে থাকেন। তিনি অসময়ে রাজমাতার দর্শনপ্রার্থী? সম্মতি জানালেন রাজমাতা। কক্ষে প্রবেশ করেন রাজপুরোহিত চন্ডেশ্বর। দৃঢ় দেহ, কঠিন মুখাবয়ব, দীর্ঘদেহী ব্রাহ্মণের পরণে গৈরিক বসন ও কন্ঠে স্ফটিকমালা। তাঁর প্রভাব ও প্রতিপত্তি কৌশাম্বী নগরে সর্বাধিক। যেহেতু প্রজাদের মনে রাজা বিষয়ে ধারণা বলতেই দৈবরাজতন্ত্র, তাই তাঁর উপস্থিতি সহজেই সবার মনে সমীহ জাগিয়ে তোলে। রাজমাতা দ্রুত প্রণাম করলেন, আশীর্বাদ করে আসন গ্রহণ করলেন রাজপুরোহিত। কয়েকমুহূর্ত পরে রাজমাতা ভীতস্বরে প্রশ্ন করেন,
- - "সব কুশল তো?"
চন্ডেশ্বর গম্ভীর কন্ঠে উচ্চারণ করলেন
-- "দেবী, রাজদ্রোহ সমাগত!"
চমকে উঠলেন রাজমাতা। বললেন, "তবে কি পরবর্তী বিষয়টি এতোদূর গড়িয়েছে?"
নিমীলিত চোখে চন্ডেশ্বর যা জানালেন তার মর্মার্থ হলো এই, বিলাসে মত্ত রাজপরিবার খবর না রাখলেও তিনি রাখেন। নগরীর উপকন্ঠে কিছু রাজার বিরাগভাজন কারিগর ও স্থানীয় গ্রামবাসীবৃন্দ গড়ে তুলেছে রাজ-বিরোধী চক্রান্ত। তাদের বক্তব্য, রাজধর্ম পালিত হচ্ছে না। রাজপরিবারের এই চূড়ান্ত বিলাস তাদেরই রক্তের বিনিময়ে। প্রায় বৎসর জুড়ে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে। এতে হাজার হাজার সৈনিকের প্রাণ যেমন যাচ্ছে, তেমনই বাড়ছে রাজস্বের জন্য অত্যাচার। নগরীর প্রান্তদেশে গ্রামাঞ্চলে মরছে দরিদ্রগণ, রাজ অনুগ্রহ না পেলে কারিগরের অন্নসংস্থানের উপায় নেই। সুতরাং এই অধার্মিক, অনাচারী রাজতন্ত্রের বিনাশে তারা রাজদ্রোহ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।গড়ে উঠছে সৈন্যদল, নিষ্ঠুর রাজা চক্রধ্বজের বিনাশ হতে দেরী নেই।
রাজমাতা আতঙ্কিত হলেন। নিজপুত্র চক্রধ্বজের হিংস্র প্রকৃতির কথা তাঁর অজানা নয়। যুদ্ধ, বিনাবিচারে মৃত্যুদন্ড, প্রজানিগ্রহ ইত্যাদি তার প্রিয় কাজ। কিন্তু রাজার ধ্বংস? এ কেমন কথা? এ যে ঈশ্বরের নির্দেশে তৈরী রাজ্য! তিনি বললেন,
-- "তারা কি দেবী ললাটেশ্বরীকেও ভয় পায় না? রাজবিদ্রোহ যে অধর্ম?"
পুরোহিত বললেন, "তারা আমার ব্যাখ্যা মানে না দেবী, অন্যকিছু বোঝাতে চায়।"
-- "কী!" প্রায় আর্তনাদ করে ওঠেন রাজমাতা।
-- "হ্যাঁ, তাদের নেতৃত্ব দান করছে সৈন্যাধ্যক্ষ চন্দ্রবর্মা। " পুরোহিত গর্জে উঠলেন।
--"এখন বিদায়, দেবী। তবে জানবেন, বিপদ আসন্ন।রাজসৈন্যগণ তাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর কারণ ও রহস্য কাল রাজসমীপে বলবো। আজ বিদায়।"
বিদায় নিলেন রাজপুরোহিত। রাজমাতা তীব্র আশঙ্কায় ভাবতে লাগলেন, কী রহস্য কাল রাজসভায় পেশ হবে? এমন কী হতে পারে যাতে রাজসৈন্যরা বিপর্যস্ত?
||২||
কৌশাম্বীর রাজসভায় মহারাজ চক্রধ্বজ সিংহাসনে উপবিষ্ট। মন্ত্রী-পারিষদগণ নিজ নিজ আসনে। রাজপুরোহিত চন্ডেশ্বর আজ বিশেষ কিছু বলবেন। সেনাপতির মাথা নত। তাঁর সৈন্যবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়েছে বিদ্রোহীদের হাতে। কীই বা উত্তর দেবেন তিনি? সকলেই রাজবিদ্রোহের আশঙ্কায় তটস্থ। চন্ডেশ্বর প্রবেশ করা মাত্র উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানালেন রাজা। 'জয়স্তু' বলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন রাজপুরোহিত।
মহারাজ বললেন, "হে বিপ্রশ্রেষ্ঠ, আপনি জ্ঞানী ব্যক্তি। সবই জানেন গতকল্য কী কী ঘটেছে, কীভাবে আমার রাজসৈন্য পরাজিত হয়েছে ওই অর্বাচীন বিদ্রোহীদের হাতে! কী এর প্রতিকার?"
কম্পিত একটি হাত তুললেন চন্ডেশ্বর।
সভা নিশ্চুপ হলো। রাজসভায় এখন একটি সূচিকা পতনের শব্দও শ্রুতিগোচর হবে। পুরোহিত চাপা কন্ঠে বলে উঠলেন
--- "রাজন্, সর্বাগ্রে রাজকন্যা প্রহেলিকাকে সভায় ডাকুন।"
দ্বিধাগ্রস্ত হলেও কিঙ্করীর সাহায্যে রাজা অন্তঃপুরে ডাক পাঠালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থিত হলো রাজকুমারী প্রহেলিকা। সপ্তদশী কন্যাকে পরমাসুন্দরী বলা চলে না। তবে এক আশ্চর্য লাবণ্যের দীপ্তি তার সর্বাঙ্গে ব্যাপৃত। নীলবস্ত্র পরিধানে ও সামান্য কিছু স্বর্ণালঙ্কার। অধিকাংশ গহনা বরং ফুলের তৈরী। রানী চম্পকবালার এ নিয়ে প্রচন্ড আপত্তি ছিলো। রাজকন্যার সাজসজ্জা গ্রাম্য বালিকার মতো কেন হবে? কিন্তু প্রহেলিকার স্বর্ণ-রৌপ্য-হীরকের ভার সহ্য হয় না বলেই হয়তো সে শুধু পুষ্পাভরণেই সুন্দর।
চন্ডেশ্বরকে প্রণাম জানিয়ে নিশ্চুপ রইলেন রাজকন্যা। পুরোহিত ধীরে ধীরে জলদগম্ভীর কন্ঠে বললেন,
" কন্যা প্রহেলিকা, রাজবিরোধীদের সমর্থন কিন্তু অপরাধের সামিল। এর শাস্তি জানো?"
মহারাজ ও সভাসদবর্গ আশ্চর্য ও বিমূঢ়। কী বললেন মহাপূজারী? রাজবিরোধের সঙ্গে কন্যা প্রহেলিকার কী সম্পর্ক? রাজা চক্রধ্বজ প্রশ্ন করলেন, "বিপ্র, আপনার কথার মর্মার্থ বুঝিয়ে বলুন।"
চন্ডেশ্বর ক্ষিপ্তকন্ঠে বললেন, "মূর্খ রাজা! রাজদ্রোহ প্রতিহত করবে? কালসর্প তোমার প্রাসাদের অন্তঃপুরেই!"
রাজা আশ্চর্য ও ভীত গলায় বললেন, "কন্যা প্রহেলিকা?"
চন্ডেশ্বর যা বুঝিয়ে বললেন তাতে সভাসদবৃন্দ বাকরুদ্ধ হয়ে রইলো। কালরাতে রাজসৈন্য যে বিরোধী শিবির ধ্বংস করতে যাচ্ছে, তা আগে থেকে জেনে গিয়েছিলো বিদ্রোহীদের অধিনায়ক চন্দ্রবর্মা। সে সসৈন্যে প্রস্তুত হয় সেইমতো। আর এই ঘটনার নেপথ্যে দায়ী রাজকন্যা প্রহেলিকা। সে চিরদিন পক্ষ নিয়েছে ওই অর্বাচীন চন্দ্রবর্মা নামক সৈন্যের। কথা শেষ হবার আগেই তীব্রগতিতে উঠে দাঁড়ালেন রাজা চক্রধ্বজ।
-- "পাপীয়সী! নিজকন্যা হয়ে তুই রাজ্য ও রাজপরিবারের সর্বনাশে ব্রতী হলি? পাপিষ্ঠা! চন্দ্রবর্মাকে সাহায্য করলি রাজবংশের বিরুদ্ধে? তোর পিতার বিরুদ্ধে?"
সমগ্র রাজসভার দৃষ্টি এখন রাজকন্যার দিকে নিবদ্ধ। সপ্তদশী কন্যা বললো, "আমি রাজকন্যা, পিতা। রাজধর্ম প্রজাপালন। ধ্বংস ও হিংস্রতা নয়। আমি আপনার ও রাজতন্ত্রের বিনাশ চাই না। চাই না এ রাজ্যের ধ্বংস। আমি সমাপ্তি চাই নিষ্ঠুরতার, ধ্বংসের আর যুদ্ধের।"
চন্ডেশ্বর বিদ্রুপের স্বরে বললেন, "তুমি কী ভাবো, রাজনন্দিনী? ওই অনাচারীগণ তোমার পিতাকে মার্জনা করে ছেড়ে দেবে? তাকে হত্যা করবে না?"
প্রহেলিকা বললো, "অবশ্যই গুরুদেব। কারণ চন্দ্রবর্মা এ রাজ্যের প্রকৃত উত্তরসূরী। তার পিতা রাজা সোমবর্মাকে বন্দী করা হয়েছে কারাগারে। মাতা রুক্মিণীদেবী নিহত। আমি প্রশ্ন করি আচার্যদেব, এই কি মনুষ্যধর্ম? রাজা কি সর্বাগ্রে মানুষ হন না?"
চন্ডেশ্বর সামান্য দ্বিধাগ্রস্ত হলেও কন্ঠস্বরে তেজ এনে জবাব দিলেন,
"তোমার এসকল বোধগম্য হওয়ার বয়স হয়নি কন্যা। কেন এই কূটচক্রে পা দিচ্ছো?"
ঠিক তখনই সভায় প্রবেশ করলো দূত। তার দৌড়ানোর ধরণ দেখে সবাই আশঙ্কিত। দূত বললো,
-- "মহারাজ, বিদ্রোহী চন্দ্রবর্মা কারাগার থেকে মুক্ত করেছে সোমবর্মাকে। সে তার পিতাসহ সৈন্যদল নিয়ে রাজ্যের সীমান্ত ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে। যুদ্ধ থেমে গেছে। এই পত্র সে আপনাকে প্রেরণ করেছে। "
পত্র পড়লেন রাজা চক্রধ্বজ। কেবল কয়েকটি ছত্র।
পূজ্যপাদ মহারাজ,
আমি মহাত্মন্ রাজপুরুষ সোমবর্মার পুত্র, চন্দ্রবর্মা। আমি আপনাকে সিংহাসনচ্যুত করবো না। রাজক্ষমতা দখল করে দ্বিতীয় চক্রধ্বজ হতে আমি চাই না। আমি শুধু আপনার রাজ্যের প্রজাবৃন্দকে জাগ্রত করে দিয়ে গেলাম। তারা আয়ত্ত করতে শিখেছে, কীভাবে সম্মিলিত শক্তির প্রয়োগ ঘটাতে হয়। এই ছিলো আমার মনোগত অভিলাষ। এখন আমি পিতা ও সৈন্যদলসহ বিদায় নিলাম।
প্রণতিপূর্বক -- চন্দ্রবর্মা
হতবাক হলেন রাজা চক্রধ্বজ। নীরব সভাসদবৃন্দ। মহাপুরোহিত চন্ডেশ্বরও নীরব, বাকরুদ্ধ। কেবল মানুষকে জাগ্রত করার জন্য কেউ যোদ্ধা হয়?
প্রথম কথা বললো কন্যা প্রহেলিকা।
--- "পিতা, আমি যাকে শ্রদ্ধা করেছিলাম, তিনি কখনোই রাজক্ষমতালোভী নন, মুক্তিপ্রিয়।"
সেদিনের মতো সভা ভঙ্গ হলো। পরদিন প্রভাতে কন্যা প্রহেলিকাকে সমগ্র রাজপ্রাসাদে কোথাও পাওয়া গেলো না। তাঁর শয্যার উপর পড়ে আছে কিছু শুষ্ক স্থলপদ্মের পাপড়ি, যা কেবল নগরীর উপকন্ঠে একটি বৃক্ষে প্রস্ফুটিত হয়। যেখানে সেই সৈন্যদল শিবির তৈরী করেছিলো।
||৩||
কৌশাম্বীর রাজদ্রোহের পর কেটে গেছে বহুবছর। ক্ষমতায় এসেছেন বহু রাজা, মহারাজা। কেবল নগরীর সীমান্তের কুটিরটির কথা কেউ মনে রাখেনি। সেখানে বসবাস করেন এক সন্ন্যাসীনি। পরিধানে তার শ্বেতবস্ত্র, কন্ঠে রুদ্রাক্ষমালা, বেণীতে স্থলপদ্ম ফুল গাঁথা। সন্ন্যাসীনির নাম কেউ জান না। জানার চেষ্টা করে না তার অতীত। নিত্যদিনের কর্মমুখর কলরবে নগরবাসীর এতো ভাবনার অবকাশও নেই।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।