এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ছোটগল্প : চন্দ্রযোগ

    Fazlul Huque লেখকের গ্রাহক হোন
    ০২ এপ্রিল ২০২৫ | ৫৩ বার পঠিত
  • চন্দ্রযোগ
    মুহাম্মদ ফজলুল হক

    কমলাপুর রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে শুয়ে আছে মুকবল হোসেন। তার ঘুম আসছে না। আশেপাশের মানুষ ঘুমে। বিকট শব্দে ট্রেন আপ-ডাউন করলেও কারো ঘুমের ব্যঘাত নেই। ঘুমানোর প্রশান্তি অন্যরকম। অশান্তির চাপ থাকলেও মুকবল হোসেনের ঘুম আসে। শান্তির ঘুম। মাঝ রাতে টহল পুলিশ এসে বিরক্ত করলে পকেট হাতরে কিছু টাকা দিলে চলে যায়। ঘুম আরো গাঢ় হয়। ঘুমের মধ্যে সে দেখে চাঁদ তার নিকটে চলে এসেছে। এত নিকটে ইচ্ছে করলে সে চাঁদ স্পর্শ করতে পারে।

    পুলিশের হাঁকডাক ও বাঁশির শব্দে ঘুম ভাঙ্গে। চিরকালীন ট্যাপে হাতমুখ ধুয়ে পানি পান করে স্টেশন থেকে বের হয়। এখন এখানে থাকা যাবে না। রাতে আবার আসবে। মুকবল হোসেন একা আসে না। তার মত শত শত লোক প্রতিদিন প্লাটফর্মে ঘুমাতে আসে। দেশের রাজধানী ঢাকা শহর যাদের আশ্রয় দেয়নি তাদের রাতের আশ্রয়স্থল কমলাপুর রেলস্টেশন।

    নব্বাই দশকের শুরু। উন্নয়নের উচ্ছ্বাসে ভাসছে ঢাকা শহর। বড় বড় দালানের মাঝ দিয়ে গরম পিচঢালা পথে হাটছে মুকবল হোসেন। গন্তব্য বাসাবো। এলাকাটি নতুন হলেও পরিপাটি বাড়িঘর গড়ে উঠেছে। ঢাকার প্রথম বৌদ্ধ মন্দির পেড়িয়ে সামনে এগুলে মসজিদ। মসজিদ পেড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ হেটে ডানদিকে মোড় নিয়ে হাটতে হাটতে বামে ঘুরে সরু রাস্তা পার হয়ে পাঁচতলা ভবন সংলগ্ন ছোট গেইট দিয়ে কুর্ণিশ করে টিনশেড গৃহে প্রবেশ করে সে। বারান্দায় একপাশে যতটুকু খাট ততটুকু রুমে বাস করে এক রহস্যময় মানবী।

    এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তিনি। তাঁর ছায়া মুকুবল হোসেন। মুকবল হোসেন তাঁর জন্য অপেক্ষা করে। যতক্ষণ তিনি না আসেন ততক্ষণ মুকবল হোসেন বারান্দায় দাড়িয়ে থাকে। কোন বাক্য বিনিময় করে না। ক্ষিধা ও গরমে কাবু হয় না মুকবল হোসেন। রহস্যময় মানবী দৃশ্যমান হয়। কৃশকায়। চুল সাদা জটাযুক্ত। শীর্ণ বিভা ছড়ানো দেহ সাদা শাড়িতে আবৃত। শাড়ির মতই চোখ সাদা। কালো ভ্রযুক্ত পরিষ্কার চোখে মুকবল হোসেনকে পর্যবেক্ষণ করে স্পর্শ করে। কিছু বোঝার আগেই তার হাতের মুঠোয় কি যেন ঠেসে দেয়। কেঁপে উঠে মুকবল। নিঃশব্দে বেড়িয়ে যায় সে।

    মুকবল হোসেন গোলাপ শাহ মাজারের উদ্দেশ্য হাটা শুরু করে। গুলিস্তানে অবস্থিত এই মাজার নিয়ে বিস্তর কাহিনি প্রচলিত হলেও মাজারটি নব দম্পত্তির নিকট জনপ্রিয়। জনশ্রুতি আছে এই মাজার জিয়ারতে নবদম্পতির জীবন সুখের হয়।

    মুকবল বাসবো থেকে বেড়িয়ে খিলগাঁও-শাহজাহানপুর-মতিঝিল হয়ে বাইতুল মোকাররমের সামনে দিয়ে মাজারে পৌঁছে। উন্মুক্ত মাজারের সামনে বিয়ের পোষাকে সজ্জিত এক দম্পতির সামনে বসে। দম্পতি মুকবলকে বেশ সমীহ করে। টিফিনবাক্স খুলে খাবার পরিবেশন করে। খুশি হয় মুকবুল। খাওয়া শেষ হলে পরম যত্নে তারা মুকবলের হাত পরিষ্কার করে। মুকবল কাগজে মোড়ানো আলোকিত বস্তু তাদের হাতে সমর্পণ করে ওসমানী উদ্যানে গমন করে।

    ক্লান্তি দূর হলে মুকবল শাহ আলী মাজারের উদ্দেশ্য নগ্ন পায়ে হাটা শুরু করে। হযরত আলীর বংশধর শাহ আলী বাগদাদী মোঘল আমলে দিল্লি থেকে ইসলাম প্রচারে ফরিদপুর হয়ে ঢাকায় আগমন করে মিরপুরের এক জরাজীর্ণ মসজিদে অবস্থান করেন। তাঁর মৃত্যু হলে মসজিদ কেন্দ্র করে সমাধি নির্মিত হয়। হিন্দু মুসলিমসহ সব ধর্মের মানুষ প্রত্যাশা পূরণে এখানে সমাবেত হয়। মাগরিবের আযান শুনতে শুনতে মুকবল মাজার কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। নামাজ শেষ না পর্যন্ত অপেক্ষা করে। নামাজ শেষে দীর্ঘকায় এক ব্যক্তি তার নিকটে আসে। সে হাতের মুঠো থেকে আলোর পরশ লোকটির হাতে বলিয়ে দেয়। আনন্দের ঝিলিক দেখা যায় লোকটির মধ্যে। 

    দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে হাইকোর্ট মাজারে গমন করে মুকবল। হালকা বাতাসে মানুষের ভীড় ভেদ করে এগিয়ে চলে। রাত বাড়লে চাঁদের আলো স্পষ্ট হয়। বিদ্যুৎ বিহীন শহরে চাঁদ পথ দেখায়। চাঁদের পিছনে সে হাটে নাকি তার পিছনে চাঁদ বোঝা যায় না। হাইকোর্ট গেইট দিয়ে প্রবেশ করে মুকবল। এখানে খাজা মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতীর দ্বিতীয় পুত্র খাজা শরফুদ্দিন চিশতীর মাজার। প্রতিদিন হাজারো মানুষ মনোবাঞ্ছা পূরণে মাজারে আসে। মাজারের সন্নিকটে মধ্যবয়সী অন্ধ এক ভিক্ষুক হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে। মুকবল তার হাত ভিক্ষুকের হাতে রাখে। চমকে উঠে ভিক্ষুক। আলোর বিনিময় ঘটে। সে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। অন্ধকারে চাঁদের আলো তার নিত্যসঙ্গী।

    কেউ কি ডাকছে তাকে। অদৃশ্য অস্পষ্ট স্বর। ঘুমের আবেশ উপলব্ধি করে রহস্যময় মানবী দাঁড়িয়ে। সাদা শাড়ি বাতাসে উড়ছে। চোখের সাদা অংশে মুকবলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তুমি কি জানো, তুমি কোথায় যাচ্ছ? মানবীর কণ্ঠ মৃদু কিন্তু স্পষ্ট। শুধু বার্তা পৌঁছে দিয়েছি, বলে সে। মানবী হাসে, রহস্যময় হাসি। হাতের মুঠোয় কী জানো? মুকবল মাথা নাড়ে। কিছু বলতে পারে না। ঘুমে চোখ ভারী হয়ে আসে। চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে তলিয়ে যায় অদ্ভুত ঘুমের গভীরতায়।

    প্লাটফর্মে মুকবলের ঘুমানোর স্থান আলো ছড়াচ্ছে। নিস্তব্ধ স্টেশন। ট্রেনের যান্ত্রিক শব্দও মাঝে মাঝে থেমে যায়। ঘুমন্ত শহরকে বিরক্ত করে না। চাঁদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুকবল। চাঁদের মায়াময় আলো তাকে শান্ত করে। চাঁদ আরো নিকটে চলে আসে। মনের খুশীতে সে চাঁদের হাসিতে মিশে যায়।

    ভোরের আলো ফোটে। স্টেশনে কোলাহল শুরু হয়। লোকজন আসা-যাওয়া শুরু করে। মুকবল জাগে না। পুলিশ দেখে প্ল্যাটফর্মের কোনে মুকবলের নিথর দেহ পড়ে আছে। তার মুখ চাঁদময়। হাতের মুঠোয় কি যেন মোড়ানো। পুলিশ কৌতূহলী হয়ে হাত খুলে অবাক হয়। চাঁদের স্পর্শে লেখা,  "তুমি শেষ করেছো গল্পের এক অধ্যায়। কিন্তু এই গল্প কখনো শেষ হয় না।"

    মুকবলের মাধ্যমে চাঁদের স্পর্শ পাওয়া নবদম্পতি, দীর্ঘকায় ব্যক্তি ও অন্ধ ভিক্ষুক একই স্বপ্ন দেখে। চাঁদের মরমী আলো অনুভব করে শান্তিতে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। সবার মুখে যেন চাঁদের হাসি।

    রহস্যময় মানবীর নতুন গল্প শুরু হয়। সকালে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। চাঁদের বিভায় আলোকিত সে। যদিও মুকবল হোসেনের সাথে তার কখনোই দেখা হয়নি!
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন