মানালি, আপনি বলেছেনঃ
"কিন্তু বিশ্বাস আর যুক্তি তো পৃথক জিনিস। ঐতিহাসিক বস্তুবাদের প্রতিটা স্তর নিয়ে গবেষণাভিত্তিক তথ্যের উপর মার্কস ও এঙ্গেলস্ তাঁদের ধারণা তৈরী করেছেন। রিলিজিয়নে কিছু বিশ্বাস থাকে, যা তর্কের অতীত"।
খালি সময়ে কিছু বকবক করছি। অন্যভাবে নেবেন না প্লীজ !
১ মার্ক্স ও এংগেলস তাঁদের সময়সীমায় উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে "ঐতিহাসিক বস্তুবাদ" নামক তত্ত্বে মানব সমাজের বিকাশ ও পরিবর্তনের সূত্র পেশ করেছিলেন। যার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা ওনাদের ম্যানিফেস্টোতে আছে। তাঁদের মতে এই ডায়নামিক্সের ড্রাইভিং ফোর্স হল শ্রেণী সংগ্রাম।
আবার এর ভিত্তি হোল সমাজের উৎপাদন শক্তি ( টেকনোলজি এবং স্কিল্ড মানব সম্পদ) এবং উৎপাদন শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ। যেমন ফুলের ভেতরে বীজ ও ফল বড় হলে ফুলের খোলস ফাটিয়ে বেরিয়ে আসে।
এই প্রেমিস থেকে তাঁরা মানব সমাজের পরিবর্তনের যে স্টেজ গুলো ধরেছেন তা অত্যন্ত জেনারেলাইজড এবং সরলীকৃত একটা মডেল মাত্র।
তাঁদের চিন্তা ছিল ইউরোসেন্ট্রিক। পরবর্তী কালে অনেক মার্ক্সিস্ট ইতিহাসবিদ এই স্টেজগুলোকে এশিয়ার ক্ষেত্রে সঠিক মনে করছেন না।
যেমন ভারতের ক্ষেত্রে ডি ডি কোশাম্বী এবং চীনের ক্ষেত্রে জোসেফ নীডহ্যাম।
এঁরা সামন্ততন্ত্রের আগে দাস ব্যবস্থার স্টেজ-- চীন ও ভারতে হয় নি বলছেন।
অর্থাৎ দুই দেশেই দাস ছিল, কিন্তু মূল উৎপাদন ব্যবস্থা দাসের শ্রমএর উপর দাঁড়িয়ে ছিল না। মার্ক্স নিজে এশিয়াটিক সোসাইটি নিয়ে কিছু গবেষণা করেছেন--তা অসমাপ্ত।
২ যদি মার্ক্সবাদ বিজ্ঞানের মত অবজেক্টিভ ট্রুথ হত তাহলে সবার ব্যাখ্যা একই রকম হত। তার বদলে কী দেখছি -- আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নানারকম কমিউনিজমের মডেল। সবাই বলে আমাদেরটা একমাত্র আগমার্কা ্মার্ক্সবাদ।
ভারতে দেখুন-- সিপি আই, সিপিএম এবং নকশাল , সবাই বলে আমরাই খাঁটি মার্ক্সবাদী।
যখন কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ভেঙে দেয়া হোল তখনই স্পষ্ট হোল যে মার্ক্সবাদের সর্বস্বীকৃত ব্যাখ্যা নেই। স্তালিনের নির্দেশ ও মডেল চিনে মাও মানতে অস্বীকার করেছিলেন।
৩ লেনিন তাঁর "মেটিরিয়ালিজম অ্যান্ড এম্পিরিও ক্রিটিসিজম" (১৯০৯) বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন কেন সোশ্যাল সায়েন্সের সত্যি অমন তথাকথিত অব্জেক্টিভ হতে পারে না।
৪ পেরেস্ত্রৈকার দিনে বহুদিন বেলেঘাটা মেন রোডে সিপিএম এর ব্যানার দেখেছি--"মার্ক্সবাদ অমর, কারণ ইহা বিজ্ঞান"। মনে হয় কবরে মার্ক্স পাশ ফিরে শুলেন।
৫ অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিন্সন একবার রাশিয়ায় অ্যাকাডেমিসিয়ানদের সংগে আলোচনায় বসেছিলেন।
ওনার প্রশ্ন ছিল--মার্ক্সকে আপনারা মানুষ ভাবেন। কোন ত্রিকালজ্ঞ ঋষি ভাবেন না। তাহলে তাঁর কিছু না কিছু ভুল হওয়া স্বাভাবিক।
--ঠিক বলেছেন। উনি মানুষ, ভুল করতেই পারেন।
--দয়া করে মার্ক্সের একটা দুটো ভুলের উল্লেখ করবেন?
সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন, কিন্তু নিরুত্তর।
৬ এলসিএম যা বলেছেন যে বিজ্ঞান শুধু যুক্তির সমাহার নয়, বরং নতুন তথ্যের ভিত্তিতে আগের আপেক্ষিক সত্যের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা স্বীকার করে এগিয়ে চলে। (সেই কার্ল পপারের শর্ত)।
কিন্তু যেই আমরা ভুল হওয়ার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করি, অমনই আমাদের দর্শন বা ইডিওলজি বৈজ্ঞানিক থাকেনা, ভক্তকুল পরিবৃত হয়ে ধর্মের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।