এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ফিল্ডার - ১ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | ২৩১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬
    ( ১ )

    টোপাই বাবার ভাঙা সাইকেলটা নিয়ে মন্ডলপাড়ায় রেশান দোকানের দিকে যাচ্ছিল। পাড়ায় অনিতা মাসী খবর দিল যে, রেশানে কাল চাল ঢুকেছে।
    যেতে যেতে রাস্তায় দুবার চেন খুলে গেল সাইকেলের। দোকানে গিয়ে দেখল বিরাট লাইন। সিদ্ধেশ্বর চক্রবর্তী রাস্তার একপাশে ছোট কার্ড আর থলে হাতে নিয়ে হতাশ মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। টোপাই সিদ্ধেশ্বরবাবুর সামনে গিয়ে সাইকেল থেকে নামল।
    --- ' কিরে ..... এখন এলি? আজ আর কিছু পাবি না .... কাল ভোরে এসে লাইন দিতে হবে আমাদের .... '
    --- ' কেন? '
    --- ' এ...ই আজ বলছে কুড়িজনের বেশি পাবে না। আবার কাল কুড়িজন। লাইনে তো দেখছি অন্তত পঞ্চাশজন .... '
    --- ' ও হরি .... '
    --- ' বাবা কাজে বেরিয়ে গেছে? '
    --- ' হ্যা ... ক..খন ... '
    --- ' তুই বেরোবি তো? '
    --- ' হ্যা ... ভাত খেয়ে বেরোব ... '
    --- ' যা... তালে ... আর দেরি করিস না ... আমিও যাই। আজ আর দাঁড়িয়ে লাভ নেই ... '
    চক্রবর্তীবাবু হাঁটতে শুরু করেন।

    টোপাই ক্লাস টেনে ওঠার পর তার বাবা লোকনাথ ধর আর পড়াশোনার খরচ টানতে পারেনি। পরে আরও দুটো ছেলেমেয়ে আছে। তাদেরও তার সাধ্যানুযায়ী মানুষ করতে হচ্ছে। এত পারবে কোথা থেকে ...। তাই ছেলেটা একটু হাত ধরা হবে, এই আশায় কল্যানময় ব্যানার্জীকে ধরে ছেলেটাকে একটা অনলাইন ফুড ডেলিভারি কোম্পানিতে ডেলিভারি বয়ের কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছে। মাস গেলে যা হোক কিছু তো পাচ্ছে। লোকনাথ নিজে একটা কুরিয়ার কোম্পানির সামান্য বেতনের এক সামান্য কর্মচারী। রোজই শোনে, বাজারের হাল খুব খারাপ ... কোম্পানি এত লোক রাখবে না ...

    'এস বসি আহারে '-এর মালিক দীপেন মল্লিক তার ক্রিকেট ক্লাব ' উদয়ন স্পোর্টিং ক্লাব' নিয়ে পড়ে আছেন দিবারাত্র। তার সেজভাই নীলাঞ্জন যদি দাদার ব্যবসার হালটা দক্ষ হাতে ধরে না রাখত ব্যবসা যে এতদিনে লাটে উঠত সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। দুই ভাইয়ের যে ধরণের প্রেম প্রীতির সম্পর্ক তা বোধহয় একমাত্র ত্রেতা যুগে রাম ও ভরতের মধ্যে ছিল। সিংহাসনতলে দাদার পাদুকা স্থাপন করে রাজ্য শাসন করা। এ জমানায় এসব প্রায় বিরল ব্যাপার। তেমন ভাই হলে ব্যবসার হাড় মজ্জা পর্যন্ত চুষে নিয়ে ফোঁপরা করে রেখে যেত। নীলাঞ্জন কিন্তু দাদা অন্ত প্রাণ। দাদার ক্রিকেট ক্লাব নিয়েও সে রীতিমতো সিরিয়াস। উদয়ন স্পোর্টিং-কে সি এ বি লীগে সেকেন্ড ডিভিশানে তোলার জন্য তার দাদার চিন্তা ভাবনার শেষ নেই। সেই চিন্তার কিছুটা দায়ভার সে নিজেও নিয়েছে নিজের কাঁধে। এই 'এস বসি আহারে ' -তেই ডেলিভারি বয় টোপাই, মানে ভাস্কর ধর।বয়েস মোটে ষোল বছর। এখন থেকেই সংসারের জোয়াল কাঁধে তুলে নিয়েছে।

    টোপাই দশটার মধ্যে আউটলেটে ঢুকে গেল।
    আজ অনেকদিন পর দীপেন মল্লিক দোকানে এসেছেন ব্যবসা কেমন চলছে পরখ করতে। তিনি অবশ্য কোন কাজ করেন না। শুধু সেজভাই নীলাঞ্জনের পাশে বসে থাকেন। নীলাঞ্জনের কাজকর্ম দেখেন। ভাইয়ের ওপর তার অগাধ আস্থা।
    নীলাঞ্জন বলল, ' প্যাকগুলো বুঝে নে ... কনসাইনমেন্ট স্লিপ ট্যাগ করা আছে। পরেশের কাছে ডেলিভারি লিস্ট আছে। বুঝে নে ...। একটা স্কুটি খুব দরকার তোর ... দেখ পয়সাকড়ি জমিয়ে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড যদি ম্যানেজ করতে পারিস ... সাইকেলে আর কদ্দুর টানবি ... '
    --- ' হ্যা ... সেটাই দেখছি ... সংসারে খরচ এত বেশি ... বাবার অফিসের অবস্থাও ভাল না ... ', ষোল বছরের টোপাই বিচক্ষণ ভঙ্গীতে বলে।
    --- ' হমম্ ... দেখ কিছুদিন ... ' নীলাঞ্জন মোবাইল স্ক্রল করতে থাকে। টোপাই ভিতরে চলে যাচ্ছিল পরেশ পালের কাছে ডেলিভারি আইটেম বুঝে নিতে। দীপেন মল্লিকের কি একটা কথা মনে পড়ে যায়। সে স্মার্টফোনের অর্ডার লিস্ট থেকে চোখ তুলে বলল, ' এই শোন শোন ... '
    টোপাই ঘুরে দাঁড়ায়।
    --- ' তুই এখন আর খেলিস না? '
    --- ' না ... মানে ... এখন টাইম কোথায়? '
    --- ' ইয়ং ইউনিয়নে তুই উইকেটকিপার ছিলি না? '
    --- ' হ্যা ... '
    --- ' লাস্ট ইয়ারে মুরারীমোহন স্মৃতি চ্যালেঞ্জ শীল্ড ফাইনালে গীতাময় সমিতির হয়ে ফাইনালে ... '
    --- ' হ্যা ... ছিলাম ... '
    --- ' একদম ঠিক ... পাঁচটা ক্যাচ, তিনটে স্টাম্পিং ... তাই তো? ' বিস্মৃতির আস্তরণ সরিয়ে ম্যাচটা আচমকা দীপেনবাবুর চোখের সামনে উঠে আসতে থাকে।
    --- ' হ্যা ... আপনি মাঠে ছিলেন সেদিন টালাপার্কে? '
    --- ' হুঁ হুঁ ... ছিলাম ছিলাম ... কিন্তু উইকেটকিপারটা যে কে ছিল সেটা মন থেকে মুছে গিয়েছিল ... তোকে পিছন দিকে ঘুরতে দেখে হঠাৎ কেমন যেন স্মৃতিটা ফিরে এল ... আমার এমন হয় প্রায়ই ... '
    --- ' আচ্ছা ... আমি তা'লে যাই স্যার ... দেরি হয়ে যাচ্ছে .... '
    --- ' হুঁ ... হুঁ ... ঠিক ঠিক ...দেরি হয়ে যাচ্ছে ...'
    দীপেনবাবু ব্যবসায়িক জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মনে মনে তার একান্ত নিজস্ব চিন্তায় তলিয়ে গেলেন।

    পরের দিন সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ বাবার ভাঙা সাইকেলটা চালিয়ে রেশান দোকানে গিয়ে হাজির হল টোপাই। ভাবতে ভাবতে আসছিল আজ আবার কপালে কি দুর্ভোগ আছে কে জানে। তড়িঘড়ি ওখানে এসে দেখে সব ভো ভাঁ। লোকজন কেউ নেই। দোকানে ঝাঁপ ফেলা। তিন চারজন লোক বন্ধদোকানের সামনে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে কি দেখছে। একজন বলল, ' ভাল খেলা শুরু করেছে ... '

    ওরা নিজেদের মধ্যে কি সব আলোচনা করতে করতে হাঁটা লাগাল। টোপাই দোকানের বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে দেখল একটা সাদা কাগজ সাঁটানো রয়েছে কালো তেলচিটে দরকচা মারা দরজায়। তাতে ডটপেন দিয়ে লেখা --- 'স্টক শেষ হয়ে যাওয়ায় আজ চাল পাওয়া যাইবে না। সামনের বৃহস্পতিবার খোঁজ করিবেন । চাল আসিলে দেওয়া হইবে। '
    টোপাই বাড়ি ফিরে গেল। মা বলল, ' কি রে... আজকেও পেলি না? '
    --- ' না : ... দোকান বন্ধ ... '
    তার বাবা লোকনাথ দাড়ি কামাতে কামাতে বলল, ' যাকগে ... ছেড়ে দাও ... আমি ফেরবার সময়ে দুকিলো নিয়ে আসব'খন।'

    টোপাই দশটার মধ্যেই 'এস বসি আহারে'- তে পৌঁছে গেল। গিয়ে দেখল আজকেও বড়কর্তা দীপেন মল্লিকবাবু এসে বসে আছেন। নীলাঞ্জন বাবুর সঙ্গে কি সব কথাবার্তা বলছেন।
    টোপাইকে ঢুকতে দেখে বললেন, ' এই তো ... এসে গেছে ... '
    কথাটা শুনে মনে হল, তিনি যেন টোপাইয়ের জন্যই অপেক্ষা করে বসেছিলেন। টোপাই কিছু বুঝতে না পেরে চুপচাপ কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দীপেনবাবু তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ' ফার্স্ট শিফ্টটা বারোটার মধ্যে হয়ে যাবে তো? '
    --- ' হ্যা হ্যা .... আরামসে ... ' নীলাঞ্জন বলে।
    --- ' ঠিক আছে ... সেকেন্ড শিফ্টটা নীলেশকে দাও ... ' টোপাইয়ের দিকে দেখিয়ে বললেন,
    ' আমি বারোটা নাগাদ ওকে নিয়ে একটু শিবাজী সঙ্ঘের গ্রাউন্ডে যাব .... ওখানে আজ আমাদের নেট পড়বে ... '
    নীলাঞ্জন কান চুলকোতে চুলকোতে বলে, ' আচ্ছা ... ঠিক আছে ... আমি সামলে নেব ... '

    সন্ময় রক্ষিত গত তিনবছর ধরে টিমের ক্যাপ্টেন। তিন নম্বরে ব্যাট করে। ব্যাটে হাত যথেষ্ট ভাল সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। অনেক ম্যাচেই একার হাতে চাপ থেকে বার করে এনেছে টিমকে। নিজের ব্যাটিং দক্ষতা নিয়ে চাপা অহঙ্কার আছে সেটা বেশ বোঝা যায়। দীপেনবাবুও তাকে বিশেষ ঘাঁটান না। তাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছেন। টিম সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে দেন। সচরাচর হস্তক্ষেপ করেন না।

    মাঠে ঢুকে দেখলেন পনের গজের তফাতে পরপর দুটো নেট পড়েছে। একটা নেট তাদের, মানে উদয়ন স্পোর্টিং-এর। আর একটা শিবাজী সংঘের নিজেদের। দীপেন মল্লিক মনে মনে বেশ বিরক্ত হলেন। ভাবলেন, শিবাজী আজ নেট না ফেললেই পারত। পাশাপাশি দুটো নেট --- এতে প্লেয়ারদের আহত হবার সম্ভাবনা থাকে। যাই হোক, পরের মাঠে প্র্যাকটিস ... অসুবিধে মানিয়ে নিতে হবে ...কিছু করার নেই।

    স্বপ্নেন্দু ঘোষ নেটে ব্যাট করছে। উদয়নের ওপেনিং ব্যাটসম্যান। বাঁ হাতে ব্যাট করে। পরপর দুটো বলে বিট হল। পরের বলটা কপিবুক স্টাইলে কভার ড্রাইভ মারল। সন্ময় কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। স্বপ্নেন্দুর ড্রাইভটা দেখে হাততালি দিল।

    একটা ছেলেকে নিয়ে দীপেনবাবুকে আসতে দেখে সন্ময় এগিয়ে এল। ভাবল, কোথা থেকে আবার একজনকে ধরে এনেছে। টিমে একটা ভাল উইকেটকিপার নেই, একটা খেলা ধরার মতো মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান নেই। ম্যাচ বার করার ব্যাটসম্যান বলতে সে একা। আর তেমনি দলের ফিল্ডিং-এর হাল। প্রতি ম্যাচে চারটে পাঁচটা করে সহজ ক্যাচ পড়ে।
    দীপেনবাবু বললেন, ' সন্ময় ... একে নিয়ে নাও .... খুব ভাল উইকেটকিপার। আমার জানা আছে ... '
    সন্ময়ের ভাবভঙ্গী বেশ দুর্বিনীত গোছের। বোধহয় অনেক ক্লাবের অফার আছে তার কাছে, সে জন্যই। নেহাৎ এই উদয়ন সংঘকে সেকেন্ড ডিভিশানে তোলাটা তার কাছে চ্যালেঞ্জে দাঁড়িয়ে গেছে তাই সে এখানে দাঁত কামড়ে পড়ে আছে। তার কাছে এটা 'ইজ্জত কি সওয়াল' হয়ে দাঁড়িয়েছে।
    যাই হোক, সে তার নিজস্ব ভঙ্গীতে বলল, ' সে তো বুঝলাম ... কিন্তু ব্যাট ধরতে পারে তো? শুধু উইকেটকিপিং এর জন্য নেওয়াটা ভারি পড়ে যাবে ..... একটা প্র্যাকটিস ম্যাচে বরং ক্যাচিং পজিশানে ফিল্ডিং করিয়ে দেখে নেওয়া যায়...'
    --- ' সে ... দেখে নাও না ... অসুবিধে নেই। আমি কনফিডেন্ট ... আমার রিক্রুটমেন্ট ঠিক আছে ... ' দীপেন জানান।
    --- ' সামনের রবিবার শিবাজী সংঘের সঙ্গেই একটা ফ্রেন্ডলি আছে, এই মাঠেই। ওখানে একে খেলিয়ে দেখা যেতে পারে .... তোমার নামটা কি ভাই? '
    --- ' ভাস্কর ধর। সবাই টোপাই বলে। '
    --- ' আচ্ছা ...আচ্ছা। রবিবার খেলতে হতে পারে। তবে এত তাড়াতাড়ি কিপিং করাতে পারব না। টাইম লাগবে। আগে তোর ফিল্ডিং টা দেখে নিই। দুজনের পরে নেটে যাস। ব্যাটটা দেখে নিই। ওখানে দু পেয়ার শ্যূ আছে। দেখ কোনটা ফিট করে ..... '

    টোপাই অনেকদিন খেলার মধ্যে নেই। দীপেন বাবু তাকে বিনা প্রস্তুতিতে হঠাৎ পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দেওয়ায় তার ভয় করতে লাগল। একবার মনে হল, বলে, আমি এসব করতে পারব না এখন ... বলে পালিয়ে যায়। আবার মনে হল, এটা একটা সুযোগ। তার ভাগ্য তাকে একটা দরজা খুলে দিতে চাইছে। বলা যায় না, কোথা থেকে কি হয়ে যায় .....। বাবার অফিসের অবস্থা ভাল না। যে কোনদিন ছাঁটাই হতে পারে। এইসব সাতপাঁচ ভেবে টোপাই পিছু হটতে পারল না।

    দীপেনবাবু নীলাঞ্জনকে বললেন, ' এ ক'দিন অন্য কাউকে দিয়ে ম্যানেজ করে নাও। টোপাইকে তো দুপুরে প্র্যাকটিসে যেতে হবে। শিবাজী সংঘের সঙ্গে ম্যাচটা ফ্রেন্ডলি হলেও টোপাইয়ের জন্য ইম্পর্টান্ট। '
    --- ' ঠিক আছে .... ঠিক আছে দাদা... ম্যানেজ করে নেব ... চিন্তা কোর না ... '
    --- ' না ... এ চিন্তা আমি করছি না ... আমার চিন্তা সন্ময়কে নিয়ে। ছেলেটার ইগো এত বেশি ... টোপাইকে কিভাবে ইউজ করবে আমি চিন্তায় আছি ... '
    --- ' আ: ... দাদা তুমি সন্ময়কে অত মাথায় তুলছ কেন বুঝতে পারি না ... আরে বাবা টিমটা তো তোমার ... ' নীলাঞ্জন বিরক্তি প্রকাশ করে।
    --- ' তা বললে হয় না রে ... এত দিন ধরে টিমকে সার্ভিস দিচ্ছে। ওর ডেডিকেশানের কোন তুলনা হয় না। ওর যা ব্যাটিং কোয়ালিটি অনায়াসে কোন বড় ক্লাবে ঢুকতে পারে .... এটুকু রেসপেক্ট ওর প্রাপ্য ... বুঝলি না ... '
    নীলাঞ্জন এ কথার কোন উত্তর দেয় না। বোধহয় একমত হতে পারে না। চুপচাপ ডেস্কটপের পর্দায় মাউস ঘুরিয়ে ডেলিভারি অর্ডার খুঁজতে থাকে।

    আজ সকাল থেকে আকাশ মেঘলা হয়ে আছে। লোকনাথ ধরের সংসারের আকাশও ময়লা মেঘে ছাওয়া। কালকেই পাকা খবর পাওয়া গেছে লোকনাথের কোম্পানি ব্যবসা গোটাতে চলেছে। চল্লিশ বছরের পুরোনো সংস্থা আর লোকসানের বোঝা টানতে পারছে না। এটাই খুব সম্ভবতঃ শেষ মাস।

    ফাঁক করা ঢাকনা দেওয়া ডেচকিতে ভাত ফুটছে। টোপাইয়ের মা মিনতি আনমনা দৃষ্টিতে ভাত ফোটা ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের ধোঁয়াটে জীবন আন্দাজ করার চেষ্টা করছিল। টোপাইয়ের পরে তাদের আরও দুটো ছেলেমেয়ে আছে। তাদের পড়াশোনায় যে ইস্তফা পড়বে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। জন্ম থেকে দুর্ভাগ্যের বোঝা বইতে বইতে তার ভাবনাগুলো ক্রমশঃ অবশ হয়ে গেছে। এই মুহূর্তের দুর্বহ মানসিক চাপে তার চোখে জল এসে গেল। মিনতি চোখে আঁচল চাপা দিল।

    একটা পুরনো বগলের কাছে ছেঁড়া সাদা জামা আর একটা ছোট হয়ে যাওয়া সাদা প্যান্ট খুঁজে পেতে বার করল টোপাই। প্যান্টটা এত টাইট হচ্ছে যে পরা গেল না। যে প্যান্টটা এখন পরে আছে সেটা ঘিয়ে রঙের। টোপাই ভাবল, এতেই চালিয়ে নেওয়া যাবে। সেটার ওপরেই বগল ছেঁড়া সাদা জামাটা চাপিয়ে নিল। ক্রিকেট শ্যু না থাকলেও কেডস আছে একজোড়া। পরে নিল। শ্যু হয়ত ওরা দেবে, মনে হল টোপাইয়ের। রান্নাঘরের সামনে না গিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ' মা .... আমি বেরুচ্ছি .... দোকানে খাব .... প্র্যাকটিস আছে ... '
    টোপাই বেরিয়ে গেল। মিনতি ঠিক বুঝতে পারল না, কিসের প্র্যাকটিস।

    টোপাই নেটে আগের দিন মিনিট কুড়ি ব্যাট করেছিল। বেশ কিছুদিন ব্যাট না করা সত্ত্বেও খারাপ ব্যাট করল না। স্ট্রোক নেবার সময় ঠিকমতো টাইমিং হচ্ছিল না পা জায়গায় না যাওয়ায়, তবে টোপাইয়ের ডিফেন্সিভ টেকনিক

    সন্ময়ের নজর কাড়ল। কনুই, হাঁটু এবং ব্যাটিং ক্রিজের ব্যবহারে বেশ দক্ষতা লক্ষ্য করা গেল ফ্রন্টফুট ব্যাকফুট দুটোতেই। সন্ময় পিছনে দুহাত রেখে মিড অফ অঞ্চলে দাঁড়িয়ে ছিল।

    টোপাইয়ের দিকে চোখ রেখে বিড়বিড় করে আপন মনে বলল, ' সাত নম্বরে দেখে নেওয়া যায়। ফিল্ডিংটা কেমন কে জানে। দীপেন বাবু বলছিল ... ভাল উইকেটকিপার ... দেখা যাক .... '
    আজকেও টোপাইকে দুজনের পরে নেটে পাঠাল সন্ময়। ওই কুড়ি পঁচিশ মিনিট ব্যাট করল টোপাই। আজ অনেকটা স্বচ্ছন্দে স্ট্রোক নিচ্ছে সে। ডিফেন্স যথারীতি একদম জমাট। সন্ময় আবার আপনমনে বিড়বিড় করল --- ' সাত নম্বরেই ফিট করবে .... সঙ্গে একটু ফিল্ডিং যদি পাওয়া যায় .... হমম্ ... '। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল --- 'ওটা আশা করাই উচিত নয়। এদের ফিটনেস লেভেল জানা আছে। চার পাঁচটা করে ললিপপ গলাবে .... যেন মাখনের আঙুল সব ... উঃ ... এই করে দুটো সিজন ধসিয়ে দিল একেবারে ... মাথা গরম হয়ে যায় ... '

    সেদিনের মতো নেট শেষ হবার পর সন্ময় টোপাইয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে এ তিনদিন প্র্যাকটিসে আসবি কিন্তু ... রোববারের ম্যাচটায় তোকে খেলাবার ইচ্ছে আছে .... '
    টোপাই ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। তাকে যেন একটু চিন্তিত দেখাচ্ছিল।
    সন্ময় তাকে আবার বলল, ' কি রে ... বুঝলি তো? '
    --- ' হ্যা... ঠিক আছে ... আপনাদের ওয়ার্ডে রেশানে চাল দিচ্ছে? '
    --- ' আঁ ... কি ... কি বললি? '
    --- ' ডিজিটাল কার্ডে রেশানে চাল পাচ্ছেন আপনারা? বাবার আবার সামনের মাস থেকে চাকরি থাকবে না ... '
    আচমকা এরকম ডেলিভারির জন্য তৈরি ছিল না সন্ময়। থতমত খেয়ে গেল। ব্যাট নামাবার আগেই পুরোপুরি ইয়র্কড হয়ে গেল।
    --- ' না, মানে ... চাল ... সেটা তো ...ঠিক জানি না ... খবর নিয়ে বলতে পারি ... বাবার চাকরি ... কি বলছিলি? '
    --- ' কোম্পানিতে ছাঁটাই হবে ... বোধহয় সামনের মাসে ... '

    সন্ময় তার সাতাশ বছরের জীবনে এরকম উইকেটে কখনও খেলেনি। ডেলিভারি আন্দাজ করতে পারল না। অচেনা পিচে বল ধরতে না পেরে অপ্রস্তুত ভঙ্গীতে পরিস্কার বোল্ড হল।
    ডাকাবুকো সন্ময় আমতা আমতা করে বলল, ' ও ...আচ্ছা ... তাই তো ... মুশকিলের ব্যাপার .... হমম্ ... কি করা যায় ... '
    সে বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। একটু ভেবে সে তার ক্রিকেটিয় বুদ্ধি প্রয়োগ করে বাতাসে অনেকটা ঝোলানো একটা প্রলোভনকারি লেগ ব্রেক দিল।
    --- ' দেখ ... এসব সমস্যার সমাধান কিন্তু তোরই হাতে। তুই কেমন পারফর্ম করবি তার ওপর তোর ফ্যামিলির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। তোকে এমন পারফর্ম করতে হবে যাতে রেশানের চাল আর খেতে না হয় তোদের। তোর হাতে তো ক্রিকেট ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই। তাই এটাকেই অস্ত্র কর। '
    --- ' কিন্তু আমি কি এমন খেলতে পারব যাতে ... '
    --- ' দেখ ক্রিকেটে ব্যাটিং বোলিং ছাড়াও আর একটা জিনিস আছে ... কি বলতো? '
    --- ' কি ... ফিল্ডিং? '
    --- ' সাবাশ ! একদম ... একদম ঠিক বলেছিস ... শুধু দুর্দান্ত ফিল্ডিং-এর জোরেই বিশ্ববিখ্যাত হওয়া যায়। জন্টি রোডসের নাম শুনেছিস? '
    --- ' হ্যা ... সাউথ আফ্রিকার প্লেয়ার ছিল। দুর্দান্ত ফিল্ডার ... পুরণো খেলা টিভি-তে দেখেছি ... '
    --- ' তবে? শুধু ফিল্ডিং-এর জোরেই ওয়ার্লড ফেমাস। ব্যাটিং স্কিল তো অ্যভারেজ ... '
    --- ' হুঁ হুঁ ... আমি এখন যাই তালে ... '
    --- ' হ্যা ... ঠিক আছে ... যেগুলো বললাম মাথায় রাখিস ... দেখবি দীপেন মল্লিকের কাছ থেকেও অনেক হেল্প পাবি ... '
    --- ' দেখি কি হয় ... চেষ্টা তো করব ... আসছি এখন ... '

    টোপাই হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। মায়ের শরীরটা ভাল নেই।

    সন্ময় প্রসন্ন মনে দেখল যে টোপাই প্রত্যেকটা ফ্লাইটেড ডেলিভারি সুন্দরভাবে ব্লক করল। শেষ বিকেলের মেদুর ছায়া নেমে আসছে। দুটো ছেলে নেট গোটাচ্ছে কি সব বকবক করতে করতে। টোপাই জোর পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। সন্ময় মাথার টুপিটা হাতে নিয়ে জড়ো করে রাখা বস্তাপচা প্যাড গ্লাভসগুলোর দিকে এগোতে লাগল।

    ( ক্রমশঃ )

    ***********
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 2601:84:4600:5410:9440:a34f:5710:***:*** | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২১:৩১541093
  • ভাল শুরু। পড়ছি 
  • aranya | 2601:84:4600:5410:9440:a34f:5710:***:*** | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২১:৪৪541095
  • 'পাঁচটা ক্যাচ , তিনটে স্টাম্পিং'
    - তার মানে এক ইনিংসে আটটা আউট উইকেটের পিছনে। ক্রিকেটে সবই সম্ভব, তাও একটু বেশি ঠেকছে :-)
  • Anjan Banerjee | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:২৯541106
  • বেশি নয় । এটা অনেকটা উইকেটের কন্ডিশানের ওপর নির্ভর  করে । 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই প্রতিক্রিয়া দিন