এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ফিল্ডার - ৮

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | ৩৩১ বার পঠিত
  • | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬
    ( ৮ )

    সন্ময় সেদিন মাঠেই বলেছিল, ' হোয়াইট বর্ডারের সঙ্গে খেলাটা কোন মাঠে পড়েছে বড়দা ? ' 
    ---- ' ওদের মাঠেই। '
    ----- ' খুব টাফ টিম। তাছাড়া ওদের মতো উইকেট বানাবে। এই ক'দিনের মধ্যে অন্তত চারদিন সলিড প্র্যাকটিস চাই। এই গেমটা খুব ভাইটাল। এটা জিতে রাখতে পারলে ... অনেকটা অ্যডভান্টৈজ ... ' 
    ইরাবান সন্ময়ের কথাটা সমর্থন করল,  
    ' একদম ঠিক কথা। ওদের ব্যাটিংয়ে ডেপথ আছে। তিনটে ভাল স্পিনারও আছে। ওরা যে স্পিনিং ট্র্যাক বানাবে এটা শিওর .... আর একটা কথা বলে রাখছি, দীপেনদাকে আগেও বলেছি.... আমি কিন্তু উইকে দুদিনের বেশি প্র্যাকটিসে আসতে পারব না ...অফিস ছাড়বে না ... '
    দীপেনবাবু কিছু বলার আগেই সন্ময় বলল, ' আচ্ছা ঠিক আছে ... কি আর করা যাবে ... '
    দীপেনবাবু এই সমঝোতা দেখে উৎফুল্ল হলেন।

        হোয়াইট বর্ডারের সঙ্গে খেলা পরের শনিবার।  এই শনিবারে সবাইকে আসতে বলা হল নেট প্র্যাকটিসে। ইরাবানও এল। সন্ময়ের মনে হচ্ছে সত্যিই পরিবর্তন হয়েছে ইরাবানের। সে নিজে থেকেই ইরাবানের সঙ্গে অনেকক্ষণ আলোচনা করল হোয়াইট বর্ডার ম্যাচটা নিয়ে। প্র্যাকটিসের শেষে সন্ময় আর ইরাবান একসঙ্গে মিত্রর কাফেতে গেল কবিরাজি কাটলেট খেতে।  ইরাবান বলল, ' বাবা মারা যাবার পর আমি একদম বদলে গেছি। .... 
    ----- ' হুঁ ... তাই তো দেখছি ... ' সন্ময় একমত হয়।
    ----- ' আসলে দুনিয়াটা যে চোখে দেখতাম, বাবা মারা যাবার পর সে চোখটা বদলে গেল ? '
    সন্ময় ঠিক বুঝতে না পেরে ইরাবানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।  
    ইরাবান বাইরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল আনমনে।  
    ----- ' এতদিন সংসারের খুঁটিনাটি নিয়ে কোনদিন মাথা ঘামাইনি। বাবা হঠাৎ চলে যাওয়ায় অগাধ জলে পড়লাম। নানা ডকুমেন্ট, কাগজপত্র কোথায় কি আছে কিছুই জানি না। মাকেও তেমন করে কিছু বুঝিয়ে দিয়ে যেতে পারেনি বাবা। বোধহয়, দুম করে যে ডাক এসে যাবে সেটা বাবা কখনও ভাবেনি। সে যাই হোক, এরপর শুরু হল আমার দুই কাকার খেলা। যে বাড়িটায় জন্ম থেকে ছিলাম, সে  বাড়িটা নাকি আসলে তাদের নামে আছে।  উকিল টুকিল নিয়ে এসে নানারকম কাগজপত্র দাখিল করে এটা তারা প্রমাণ করেও ছাড়ল। মা আর আমি দুজনেই সমান আনাড়ি। কিছুই করতে পারলাম না। আর বেশি ডিটেলসে যাচ্ছি না। আমাদের  বাড়িটা ছাড়তে হল। বলা ভাল, উৎখাত করা হল। এখন বিশ্রী একটা   জায়গায়,বিশ্রী একটা এক কামরার ফ্ল্যাটে মা আর আমি ভাড়ায় আছি। কি আর বলব ... মা প্রতিদিন চোখের জল ফেলে। আমার রোজগার খানিকটা না বাড়লে কি করে বাড়ি চেঞ্জ করব ? ক্রিকেট খেলে তো কিছু রোজগার হয় না ... আর চাকরি তো সামান্য মাইনের ...  যদি কোন অফিস ক্লাবে ঢুকতে পারতাম ... ওখান থেকে একটা ওপেনিং পেতে পারতাম ....  কিন্তু সেও বা কদিন ? ' 
    সন্ময় অবাক হয়ে শুনছিল ইরাবানের কথা। বলল, ' দীপেন বাবুকে জানাতে পারিস ... ওনার অনেক কানেকশান আছে ... '
    ---- ' হ্যা ... বলব ... কিন্তু আমি আর কতদিন টানতে পারব ... তারপর আমার মায়ের যে কি হবে ... আমার কোনও বোনও নেই যে ... ' 
    ---- ' মানে ? ' সন্ময় একটা ঘোরালো গুগলির সামনে পড়ে।  ইরাবানের কথা ধোঁয়াটে লাগে তার।  
    ----- ' বছরখানেক আগে লিউকেমিয়া ডিটেক্টেড হয়েছে। কম মাত্রার অবশ্য। কিন্তু ট্রিটমেন্টের খরচ তো একই ... একটা এন জি ও অবশ্য প্রচুর হেল্প করছে। '
    দু প্লেট কবিরাজি কাটলেট এসে গেল।
    ----- ' লিউকেমিয়া ... কার ! '
    ---- ' আরে ... আমার আমার ... ' ইরাবান নির্বিকার এবং নিরুত্তাপ ভঙ্গীতে বলল। তারপর কাঁটা চামচে গেঁথে একটুকরো কাটলেট মুখে পুরল।  
    সন্ময় নিষ্পলক দৃষ্টিতে ইরাবানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখে কোন কথা সরল না।  
    ইরাবান অঢেল পরিতৃপ্তির সঙ্গে সুস্বাদু কাটলেট চিবোচ্ছে।  
    কবিরাজি তৃপ্তি জড়িত রসনার ভিতর থেকে ইরাবানেরই কথা এল আবার ...
    ----- ' নে খা খা ... দারুন বানায় এরা .... অত চিন্তা করে কি করবি ... যা কপালে লেখা আছে হবে ... হোয়াইট বর্ডার ম্যাচটা চিন্তা কর ... টাফ টিম কিন্তু ... '
    রাস্তায় কত লোকের ব্যস্ত লোক চলাচল। সন্ময় টলমলে হতচকিত মন নিয়ে সেই দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে। কাটলেট ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।  
    এলোমেলো মেঘলা হাওয়া বইছে অবিশ্রান্ত, পিচের বাউন্স খাপছাড়া। সন্ময় বলের মুভমেন্ট বাগে আনতে নাজেহাল হতে লাগল।
    ----- ' আমার খুব ইচ্ছে হোয়াইট বর্ডারের এগেনস্টে একটা চাবুকের মতো সেঞ্চুরী করার.... '
    সন্ময়ের মুখ দিয়ে স্বগতোক্তি বেরিয়ে গেল, ' না করার কি আছে .... তোর চেয়ে ট্যালেন্টেড ব্যাটসম্যান কটা আছে স্টেটে ...কিন্তু তুইও জানিস, আমিও জানি ভাগ্যের ক্রেডিট কার্ড  পকেটে না থাকলে জীবনের বাজারে  ভিক্ট্রি কেনা যায় না ... নাহলে তোকে এখানে ঘষটাতে হবে কেন ? '
    ইরাবান বলল, ' কি এত ভাবছিস ? তাড়াতাড়ি খেয়ে নে .... আমাকে যেতে হবে ... মা একলা আছে বাড়িতে ... '
       পরের দিন রবিবার নেট পড়ল অনুরূপা বালিকা বিদ্যালয়ের পিছনের মাঠে। বেশ বড়সড় মাঠ। সন্ময় ইরাবানকে বলল, ' তুই আগে যা নেটে .... কাল থেকে তো তোর অফিস থাকবে ...আবার সেই ম্যাচের দিন দেখা হবে ...'
       ইরাবান নেটে ঢুকল। লেগ স্টাম্প গার্ড নিয়ে একটু তেরছাভাবে সাইড অন স্টান্সে দাঁড়াল। জামার তিনটে বোতাম খোলা। তার রক্তে তো শুধু লিউকেমিয়া নেই, ক্রিকেট প্রতিভার সজীব দুরন্ত কণা অনবরত দৌড়ে বেড়াচ্ছে রক্তস্রোতে। 
    দুটো স্পিনার আর দুটো পেসার বল করছে। প্রথম দশটা বলের সবকটাই নিখুঁত লেংথ লাইনে পড়ল। কোনটা সঠিক জায়গায় মাপা সুইং, কোনটা নিখুঁত স্পটে অফ বা লেগ স্পিন। 
    সন্ময় বিষ্ফারিত চোখে দেখতে লাগল ইরাবানের ব্যাটিংয়ের যাদু যা আগে সে কোনদিন এভাবে দেখেনি। ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো প্রজাপতির মতো ইরাবানের পা দুটো নেচে বেড়াতে লাগল ক্রিজের আগে পিছে, ডানে বামে। শুধু সন্ময় নয়, মাঠের সব কজন ছেলে নেশা ধরা চোখে দেখল  যে, দশটা বল উড়ে গেল পয়েন্ট থেকে স্কোয়্যার লেগে বিভিন্ন জায়গা জুড়ে নানা প্রকার খাঁটি ক্রিকেটিয় শটে।  
    ক্যাপ্টেন সন্ময়  তন্ময় হয়ে দেখতে লাগল  ইরাবানের অলৌকিক ব্যাটিংয়ের হড়পা বানের প্লাবনে দোর্দন্ডপ্রতাপ হোয়াইট বর্ডার দলের ভেসে যাওয়ার আগাম ছবি।  

    ( ক্রমশঃ )

     *******
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 2601:*:*:*:*:*:*:* | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:৩৩541250
  • দারূণ
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন