এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পরাণ বাগ্দী - ৪ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৫ জুন ২০২২ | ৯৯৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)



  • ' ভাইজান আছেন নাকি ..... ও ভাইজান .... '
    সকাল নটা বাজে। দেবমাল্যর কাল একটা হলফনামা জমা দেওয়ার ব্যাপার আছে বারাসাত কোর্টে বেলা দেড়টার সময়। কাল তৈরি হয়ে বেরোতে হবে বারোটা নাগাদ। কাগজপত্র গুছিয়ে নিতে হবে আজকের মধ্যেই। একটা তহবিল তছরুপের মামলা। তাছাড়া কলতান গুপ্তেরও আজ আসার কথা। তেমনই তো কথা আছে। শিয়ালদা থেকে ছটা তেত্রিশের ট্রেনটা যদি ধরে ....।একবার ফোন করে দেখবে কিনা ভাবছিল দেবমাল্য ....
    এমন সময়ে ' ভাইজান ..... ও ভাইজান .... '। কে আবার ডাকে এই সময়ে। কলতান বাইরে বেরিয়ে এল। দেখল লুঙ্গি আর হলুদ রঙের ফুলশার্ট পরা এক মিঞা দাঁড়িয়ে আছে। গালে চাপদাড়ি। পায়ে ছেঁড়া চটি। দেবমাল্যকে দেখে দাঁত বার করে হাসল। হাসনাবাদের ওদিককার
    লোক হবে মনে হয়। আগে কখনও দেখেনি।
    ------ ' বল ..... কি ব্যাপার .... '
    ------ ' ভাল আছেন বাবু ? আমি আফতাব ....' মিঞা বলল হাতজোড় করে।
    ----- ' হ্যা ..... তোমায় তো ঠিক চিনলাম না ....'
    ----- ' অ...ই দ্যাখ ..... এরই মধ্যে ভুলে গেলেন ?'
    ----- ' মানে ? তোমার সঙ্গে আমার আগে দেখা
    হয়েছিল নাকি ? '
    ----- ' ওমা .... কি যে বলেন .... এই তো পরশুদিন দেখা হল ..... যাকগে, দ্যান আমার গামছাগুলো দ্যান ...... '
    ----- ' পরশুদিন ..... গামছা ! '
    ---- ' বা : .... পরশুদিন কলকাতায় দেখা হল না ..... ও..ই কলেজ স্ট্রীটের ওখানে ..... সে যাক, দ্যান গামছাগুলো দ্যান .... '
    কলকাতা, কলেজ স্ট্রীট .... এসব শুনে কেমন খটকা লাগল দেবমাল্যর। সামনে এগিয়ে এল।
    মিঞার মুখে সার্চলাইটের মতো চোখ ফেলে পরীক্ষা করতে লাগল। তারপর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল ....
    ----- ' আরে ..... কলতানদা .... এক্স্ট্রাঅর্ডিনারি, ইনক্রেডিবল ..... আপনিই পারেন ... '
    ----- ' হাঃ হাঃ ..... শুধু গামছা নয়, তোমার সাইকেলটাও একটু লাগবে .... '

    একটু পরে অনন্ত পোদ্দারের বাড়ির পাঁচিলের গেটটা খুলে উঠোনে ঢুকে হাঁক পাড়ল আফতাব মিঞা -----
    ----- ' ভাল গামছা ছিল বাবু ..... বসিরহাটের গামছা ..... '
    ভিতর থেকে হৃদয়ের গলার আওয়াজ এল .....
    ------ ' .... কে চেল্লাচ্ছে বাইরে দেখতো পদা .... '
    পদা মানে বসন্ত বেরিয়ে এল। তাকে দেখে আফতাব মিঞা রূপী কলতান বলল, ' এই যে ছোটকর্তা .... ভাল আছেন ? আমি সেই সে বছরে জস্টি মাসে এসেছিলাম ..... কর্তামা আমার গামছা নিয়েছিল। ষাট টাকা আর সত্তর টাকা। এই দামে এরম জিনিস আর কারো কাছে পাবেন না। আফতাবের মতো গামছা আর কেউ দিতি পারবে না ..... হলফ করে বলতি পারি ..... ' গামছা বোঝাই সাইকেল ধরে উঠোনে দাঁড়িয়ে রইল কলতান। কোন জস্টি মাসে আফতাব মিঞা এ বাড়িতে গামছা বেচতে এসেছিল কিনা বসন্তর স্মরণে এল না, এ হয়ত তার স্বর্গত কাকাবাবুর জমানায় কোন একদিন এসেছিল। কিন্তু গামছাওয়ালাটা তাকে ছোটকর্তা বলে সম্বোধন করায় বসন্ত খুশিতে ডগমগ হল।
    ----- ' মায়েরা কেউ নেই ? উনারাই ভাল বুঝবেন ..... '
    ----- ' আছে ..... কাজ আছে ... আমি দেখছি তো ..... '
    ----- ' হ্যা .... দ্যাখেন ..... খুব খাপি জিনিস .... বড়বাবু নেই বুঝি ..... ' কলতান সাইকেলটা ঠেকা মেরে দাঁড় করিয়ে গামছাগুলো নামিয়ে ফেলে বারান্দায় রাখল। দ্যাখেন বাবু .... এইগুলা ষাট টাকা, এইগুলা সত্তর টাকা .... একেবারে পাকা রঙ ..... একটারও রঙ উঠবে না ..... এই তো বড়বাবু .... আসেন...আসেন ...'
    হৃদয় বেশ সন্দেহের দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ জরিপ করে নিল। তারপর বলল, ' তুমি আমায় চেন ? তোমায় তো আগে দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না ..... কোন সাইটে থাক ? '
    ----- ' ওই বসিরহাট সাইটে বাবু .... আমি তো একবার এসছিলাম সেই জস্টি মাসে ....অনন্তবাবু জানে ..... ডাকেন না উনারে .... ওই পিছনের বাগানটায় উনি কাজ করছিল .... আমারে দেখে এখানে এল .... চারটে গামছা নিয়েছিল উনার বিবি .... উনি নাই ? ডাকেন না ..... '
    হৃদয় মন্ডল গামছাওয়ালার এইসব অনর্গল বাতুলতার কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল। বসন্ত কি একটা বলতে যাচ্ছিল। হৃদয় সেটা চাপা দিয়ে তাড়াতাড়ি বলল, ' তা... তোমার জিনিস তো ভালই মনে হচ্ছে ..... এ..…ই ন্যাও... এই দুখানা দাও .... '
    হৃদয় বান্ডিল থেকে দুটো গামছা তুলে নেয়।
    -----' পঞ্চান্ন টাকার বেশি দিতে পারব না কিন্তু ....'
    ------ ' কেনা নেই বাবু ... বিশ্বাস করেন .... সদরে গেলে এ গামছা একশ টাকার কমে পাবেন না ....কলকাতায় একশ কুড়ি টাকা.... মাইরি বলছি .... '
    যাই হোক, হৃদয় সত্তর টাকা করে দুটো বেশ আকর্ষণীয় গামছা কিনল।
    টাকা পয়সার লেনদেন মিটে যাবার পর আফতাব হোসেন বাড়ির উত্তর দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে রইল। অনন্ত আর তার ছেলে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই উসখুস করছে। ব্যাটা কতক্ষণে বিদেয় হবে। গামছাওয়ালা উদাস স্মৃতিচারণার মতো করে আওড়াতে লাগল, ' পিছনের ওই বাগানে অনন্ত দাদাবাবু ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কত সব্জি উনি নিজের হাতে ফলাত ..... কি সুন্দর ঝিঙের একটা ক্ষেত ছিল ..... '
    হৃদয় আর থাকতে পারল না। বলল, ' তুমি এত কথা জানলে কি করে ..... তুমি কি পিছনের বাগানে গেছে কোনদিন ? '
    ----- ' হ্যা ... বাবু একবার গিছিলাম। আমি এখানে এর আগে দুবার এসেছি। ঝিঙে ক্ষেতটা দেখেছি। আপনাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি .... অনন্তবাবু এখন কোথায় ? '
    হৃদয় ঠিক করতে পারল না সত্যি বলা উচিত না অনন্তর খুনের ব্যাপারটা চেপে যাবে। শেষে অনেক ভেবেচিন্তে বলল, ' কেন তুমি জান না .... এ তো এ তল্লাটে সবাই জানে .... '
    ------ ' কি বাবু ? '
    ----- ' আমার ভাই অনন্ত আর বেঁচে নেই। সে তিনবছর আগে খুন হয়েছে ওই বাগানে ....
    ------- ' সে কি ! .....বলেন কি .... কে খুন করল ? '
    ----- ' পরাণ বাগ্দী বলে একজন। এই বাগানে মালির কাজ করত। শালা নিমকহারাম .... '
    -----' তাই তো ..... নিমকহারাম বলে নিমকহারাম ..... এইরকম পাপও মানুষ করে .... হায় আল্লা .... তা কিভাবে খুন করল ?'
    ------ ' ওই ..... ধারালো কোন কিছু দিয়ে গলার নলি কেটে .... কি পিশাচ ! '
    ------ ' পিশাচ বলে পিশাচ .... নরকেও ঠাঁই হবে না ..... উ : .... ভাবতে পারছি না ..... '
    আফতাব খানিকক্ষণ দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে রইল। তারপর আবার বলল, ' ওই নলি কাটা ছুরিটা পুলিশ এসে উদ্ধার করল নিশ্চয়ই..... ব্যাটা নিশ্চয়ই হাতেনাতে ধরা পড়েছিল ..... নাকি আপনারাই ওটা খুঁজে পেয়ে পুলিশের হাতে দিয়েছিলেন ?'
    নড়বড়ে জায়গায় ক্রমাগত আঘাত করতে থাকলে যথেষ্ট চতুর লোকেরও চাতুর্যের ফোকাস নড়ে যায়। কলতান জানে সেটা পরীক্ষিত সত্য।
    হৃদয় মন্ডল ফস করে বলে বসল, ' না না ..... ওসব কিছু পাওয়া যায়নি ..... কোথায় ফেলে দিয়েছে কে জানে .....'
    ------ ' ফেলে দিয়েছে ? হায় আল্লা ..... কোথায় ফেলল ? যারা ওকে পাকড়েছিল তারা কিছু দেখতে পেল না ..... ব্যাটা ভয়ানক চালাক .... গলা কাটার পর ছুরিটাও সরিয়ে ফেলল ! কিন্তু অস্তরটা ফেলল কোথায় ? '
    আফতাব চিন্তিত মুখে দাড়ি চুলকোতে লাগল।
    ঘটনাক্রমে তাৎক্ষণিক মানসিক বিশৃঙ্খলতাবশত হৃদয় বলে বসল, ' কে জানে... কোথাও জলে ফেলে দিয়েছে হয়ত .... বড় পুকুরের তো আর অভাব নেই তল্লাটে ..... '
    আফতাব হোসেন আর কথা বাড়াল না যে, যে
    ছুরি চালালো সে ছুরি জলে ফেলার সময়ই বা পেল কি করে, সে যদি ধরাই পড়ে গিয়ে থাকে।
    সে দুহাতে আবার মুখ থেকে বলল, 'হায় .... আল্লা ..... দোয়া কর .... '
    আফতাব এবার বলল, ' আমি তাহলে এবার আসি ..... আনন্দ আর কষ্ট দুটো নিয়েই গেলাম ..... আচ্ছা আর কার বাড়ি যাওয়া যায় আপনাদের চেনাশোনার মধ্যে ? যদি আরও ক'খানা বিক্রী হয় ..... আছে কেউ ? '
    বসন্ত প্রবল উৎসাহে বলল, ' হ্যা .... ওই বড় পুকুরটার ধারে .... ওই বাড়িটায় যাও না .... কানাইলাল সামন্তর বাড়ি .... ওনার মেয়ের নাম মৌসুমী সামন্ত .... আমার নাম করতে পার ...'
    ভাবের আতিশয্যে বাবার কটমট করে তাকিয়ে থাকাকে অগ্রাহ্য করেই বলে ফেলল বসন্ত।
    ----- ' হ্যা বাবু....... তাই যাই ..... অনেক সুক্রিয়া ....', বলে সাইকেল নিয়ে হাঁটা দিল আফতাব মিঞা।
    সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হৃদয় মন্ডল ভাবল ব্যাপারটা কেমন যেন হল ....।

    ক্ষুদিরাম সামন্তর বাড়ি খানিক পাকা, খানিক কাঁচা। ওখানে গিয়ে আফতাব গামছা বিক্রির হাঁক পাড়তে মৌসুমী বেরিয়ে এল। সে পড়তে বসেছিল। দেখল, সাইকেলে একগাদা গামছা চাপিয়ে এক মিঞা দাঁড়িয়ে আছে।
    ----- ' এখন গামছা লাগবে না ..... ' মৌসুমী বলে।
    আফতাব মানে কলতান দেখল দরজার মুখে দাঁড়িয়ে এক ছিপছিপে ফর্সা তরুণী। তার মনে হল এ..ই বোধহয় মৌসুমী, হৃদয় মন্ডলের ছেলে তার কাছে তাকে রেফার করেছে। সম্পর্কটা কি একটু একটু আন্দাজ করতে পারছে।
    ----- ' ওই হৃদয় মন্ডলের বাড়ির ছেলে এখানে পাঠাল ..... কেনাকাটি পরের ব্যাপার .... দ্যাখেন না একটু ..... মাকে ডাকুন না একটু .... খুব ভাল জিনিস ..... ' আফতাব জানায়।
    মৌসুমী বলে উঠল, ' কে ..... কে পাঠাল ? '
    ---- ' ওই হৃদয় মন্ডল সাহেবের ছেলে ..... বলল আপনারা ভাল খদ্দের ..... ওনারা নিয়েছেন দুখানা .... আপনার নাম কি মৌসুমী ? '
    মৌসুমী বিরস মুখে বলল, ' হুঁ ... '
    তারপর ' মা .... এদিকে এস তো .... গামছা বিক্রী করতে এসেছে .... ' বলে ভিতরে চলে গেল। আফতাব লক্ষ্য করল চলে যাওয়ার মধ্যে বেশ বিরক্তির ভাব। আফতাবের মনে হল অনুরাগটা বোধহয় এক পাক্ষিক। বাড়ির পরিবেশটা বেশ সুন্দর। পাশেই এক ভরাট দীঘি।
    মৌসুমীর মা ঘোমটা টানতে টানতে বেরিয়ে এলেন। তার সঙ্গে ছুটে বেরোল একটা ছটফটে বাচ্চা ছেলে
    *****************
    মৌসুমীর মা কমলিকাদেবী বেরিয়ে এসে বললেন, ' ও বাবা ..... এ তো বেশ গামছা .... কোথা থেকে আসছ গো ? '
    ----- ' ওই.... বসিরহাটের দিক থেকে মা .....আমার নাম আফতাব .... খুব ভাল জিনিস মা .... দ্যাখেন না .... একটারও রঙ উঠবে না .... ওই ওরাও নিয়েছে .... ' বলে হৃদয় মন্ডলদের বাড়ির দিকে দেখাল।
    কমলিকা বললেন, ' ও .... '। গুল্টুর কি মনে হল, বলে বসল, ' খুব পাজি ..... '।
    কমলিকা মহা দুরন্ত নাতিকে শাসন করে বললেন, ' আ..ই .... চুপ কর .... অসভ্য ছেলে .... ওরকম বলে ? '
    গুল্টু সে কথায় কর্ণপাত না করে বান্ডিল থেকে একটা লাল গামছা ধরে টানাটানি শুরু করল।
    ---- ' আ..ই গুল্টু ..... এবার কিন্তু ভীষণ মার খাবি .... ছাড় ...ছাড় বলছি .... '
    ----- ' আহা ..... ছাড়ান দেন ... ছাড়ান দেন .... বাচ্চা মানুষ ..... ' আফতাব বলে।
    তারপর গুল্টুর দিকে তাকিয়ে বলল, ' ওরা কি লোক ভাল না বাবু ? '
    গুল্টু কি একটা বলতে যাচ্ছিল। এই সময়ে মৌসুমী তড়িঘড়ি বেরিয়ে এসে বলল, ' গুল্টু এদিকে শোন ..... একটা জিনিস দেখাব .... '
    গুল্টু 'একটা জিনিস' দেখার কৌতূহলে তাড়াতাড়ি পিসীর সঙ্গে বাড়ির ভিতরে চলে গেল। আফতাব মিঞা বাচ্চাটার কান্ড দেখে খুব হাসতে লাগল। মৃদু কন্ঠে বলতে লাগল, 'ছেলেমানুষ ..... কখন যে কি বলে .... হ্যা : হ্যা: হ্যা: ..... ওদের কথা ধরতে আছে ? দ্যাখেন এই গামছাটা দ্যাখেন ..... '
    মৌসুমী এক পলকে দেখল গামছাওয়ালার সামনের একটা দাঁত ভাঙা।
    শেষ পর্যন্ত ষাট টাকা দিয়ে কমলিকাদেবী একটা বেশ জেল্লাদার একটা গামছা নিলেন।
    সাইকেলের ওপর গামছার বান্ডিল চাপাতে চাপাতে বলল, ' আজ তাহলে আসি মা .... আবার কোনদিন হঠাৎ এসে পড়ব'খন .... '
    ----- ' হ্যা ..... এস .... '
    কলতান সাইকেল হাঁটিয়ে সামনের রাস্তায় এসে পড়ল। বাঁ দিকে ঘুরে সোজা যাবার জন্য সাইকেলে উঠতে যাচ্ছিল। হঠাৎ কি মনে করে একবার পিছন ফিরে দেখল। দেখল মৌসুমী জানলা দিয়ে তাকে দেখছে। সে ঘুরে তাকাতে ঝট করে সরে গেল। কলতান ভাবল, 'তা ভাল .... বসন্ত-বিলাপ কান্ড .....কাজে লাগলেই ভাল ..... '
    সে আরও দুচার বাড়ি গামছা নিয়ে হানা দিল কিন্তু অনেক বকবক করার পরও গামছা আর বিকোল না। এক বাড়ি থেকে বলল, ' মাস পড়লে এস .... এখন টানাটানি যাচ্ছে .... যখন তখন এলেই হল .... '

    কলতান দেবমাল্যর বাড়ি ফিরল বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ। দেবমাল্য বাড়িতেই ছিল।
    বলল, ' আসুন আসুন .... সেই কখন বেরিয়েছেন .... খুব ধকল গেল .... '
    কলতান নকল সাজপোশাক দাড়ি টাড়ি খুলতে খুলতে বলল, ' ও: ..... হাঁফ ধরে গেছে .... যাক ফার্স্ট রাউন্ডটা তো হয়ে গেল। এবার সেকেন্ড রাউন্ড ..... '
    ----- ' আউটপুট কিছু জেনারেট করল ? '
    ----- ' সেটা ইনপুটগুলো অ্যসেমবল্ করলে বোঝা যাবে .... এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না .... এখনও ফোকাস ফিক্স করতে পারিনি। আমাকে দু একটা দিন এখানে থাকতে হবে। অসুবিধে নেই তো ? '
    ------ ' না না ..... কি যে বলেন .... আর্জটা তো আমারই ..... কাজটা যতদিন না হয় ....'
    ---- ' দেখা যাক কি হয় ..... আর কোন কানেকশান পাওয়া যেতে পারে ? '
    ----- ' কানেকশান তো আছে কিন্তু কতটা এফেকটিভ হবে জানি না .... '
    ----- ' কিরকম ? '
    ----- ' যেমন বীরেন ঘোষ ..... ওনার অর্গানাইজেশান খুব স্ট্রঙ্গ ছিল এ অঞ্চলে। এখন অবশ্য সংগঠন নানা কারণে বসে গেছে, তবে কিছু ডেডিকেটেড ছেলে এখনও এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। '
    ----- ' চল তা'লে বিকেলের দিকে যাওয়া যাক ঘুরতে ঘুরতে .....'
    ----- হ্যা ... দিনের আলো থাকতে থাকতেই যাব..... জঙ্গলের ধারে তো ..... '
    ----- ' ও ... আচ্ছা ... '
    দেবমাল্যর পরিবারে অনেকে আছে। তারা বাড়ির ভিতরের অংশে থাকে। এদিকে সাধারণতঃ আসে না। বাইরের অংশ টা দেবমাল্য ব্যবহার করে।

    বিকেল পাঁচটা বেজে গেল বীরেন ঘোষের বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে। আলো এখনও বেশ চড়া। জঙ্গলের গাছগুলোর মাথায় পশ্চিমের রোদ ঝিলমিল খেলাচ্ছে।
    দেবমাল্য বলল, ' বীরেনদা আছেন নাকি ....'
    বীরেন ঘোষ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তার পিছনে বেরিয়ে এল আরও দুই যুবক। দেবমাল্য দুজনকেই চেনে। অলোক আর রবি।
    দেবমাল্য ভাবল, ভিতরে হয়ত সংগঠন-এর ব্যাপারে কিছু আলোচনা চলছিল।
    সে যাই হোক, অলোক এবং রবি 'আজ তাহলে আমরা আসি বীরেনদা ..... ' বলে বিদায় নিল। দুজনেই দেবমাল্যর বাল্যবন্ধু। তারা দেবমাল্যর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ' ভাল আছিস তো রে ..... এখন আসি .... পরে দেখা হবে .... '

    বীরেনবাবু বললেন, ' হ্যা ..... কলতানবাবু আমি খবরের কাগজে আপনার নাম দেখেছি। রাজারহাটে একটা খুনের মামলায় খুব সম্ভবত .....'
    ----- ' হ্যা ...... বছর দুই আগে ..... '
    ----- ' একজ্যাক্টলি ..... ওই রকমই হবে .... '
    কলতান বলল, ' পরাণ বাগ্দীর কেসটা তো আপনি জানেন .... ' কলতান বলল।
    ----- ' হ্যা .... বিলক্ষণ জানি .... আমি খুব ব্যথিত ব্যাপারটা নিয়ে ..... একটা নির্দোষ লোক এইভাবে .....মেনে নেওয়া যায় না ...... আপনার সাহায্য নিয়ে দেবমাল্য বিরাট কাজ করেছে ..... দেখুন যদি পরাণকে বার করে আনতে পারেন ..... আমরা আমাদের যথাসাধ্য সাহায্য করব ....নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন .... '
    ----- ' ধন্যবাদ ... বীরেন বাবু। আচ্ছা.... আপনি আমাকে একটা ক্লু দিতে পারেন .... আপনি তো, আমার অনুমান, বেশ কিছু এক্সক্লুসিভ খবর রাখেন এ গ্রামের লোকজন সম্বন্ধে কারণ আপনার সংগঠন আছে, কিছু ছেলে এখনও আছে। বলতে পারবেন এ গ্রামে হৃদয় মন্ডলের সবচেয়ে বড় বন্ধুই বা কে আর সবচেয়ে বড় শত্রুই বা কে ? '
    প্রশ্নটা শুনে বীরেনবাবু একটা বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর একদিকে তাকিয়ে আনমনে কি ভাবতে লাগলেন। একটু পরে বললেন,
    ------ ' হৃদয়ের বন্ধু বলতে কেউ আছে বলে আমার জানা নেই। চামচা আছে অনেক। তাদের তো আর বন্ধু বলা যায় না। আর শত্রু যদি বলেন তো .... একনম্বর শত্রু আমি .... '
    ----- ' আপনি ! কেন দাদা ? '
    ----- ' কারণ ... আমার এই মরা সংগঠন নিয়ে আমি এখনও হৃদয় মন্ডলের গ্রামপ্রধান হওয়ার লাগাতার বিরোধিতা করে চলেছি .…... জানি এতে আমার জীবনের ঝুঁকিও আছে ..... কারণ হৃদয় কেমন লোক তা সবাই জানে .... '
    ----- ' হুমম্ ..... বেশ বেশ ..... তা'লে তো সুবিধেই হল .....
    বীরেন ঘোষ এবং দেবমাল্য দুজনেই কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কলতানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
    ----- ' আচ্ছা এখানকার থানার ওসি কেমন লোক ? '
    ----- ' এখন যে আছে খুব অনেস্ট এবং সেনসিবল ....আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে ...এর আগে যে ছিল তার কথা আর বলার নয়..... ' বীরেনবাবু জানালেন।
    ----- ' বা: বা: ..... ফাইন। আর কিছু না ..... তার কাছে একটা রিকোয়েস্ট রাখতে চাই ..... যদি একটা ক্রেন ম্যাগনেটের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন ..... '
    ----- ' ম্যাগনেট ! মানে, চুম্বক ? '
    ----- হ্যা ..... ওটাই ..... হয়ত কাজে লাগতে পারে আর কি ...... '
    ঠিক এই সময়ে বীরেনবাবুর ঘরের সামনের ইঁট বেরোন এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে একটা মেয়ে দখিনপাড়ার দিকে চলে গেল দ্রুতবেগে। এক ঝলক তাকিয়ে দেখে নিল এদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে।
    কলতান এক মুহুর্তে দেখে নিল .... সাইকেলের সিটে মৌসুমী সামন্ত।
    ( ক্রমশঃ )
    ************************************************************************************






     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • যোষিতা | 194.*.*.* | ১৫ জুন ২০২২ ১৩:৫০509025
  • এমন সময়ে ' ভাইজান ..... ও ভাইজান .... '। কে আবার ডাকে এই সময়ে। কলতান বাইরে বেরিয়ে এল। দেখল লুঙ্গি আর হলুদ রঙের ফুলশার্ট পরা এক মিঞা দাঁড়িয়ে আছে।

    এটা কলতান হবে না, দেবমাল্য হবে।

     
  • Mousumi Banerjee | ১৫ জুন ২০২২ ১৭:২৮509031
  • ...টাকাপয়সার লেনদেন মিটে যাবার পর ....অনন্ত আর তার ছেলে – অনন্ত র বদলে হৃদয় হবে
  • Anjan Banerjee | ১৬ জুন ২০২২ ০৮:৪৪509055
  • ঠিক ঠিক ..... একদম ঠিক। অসাবধানতাবশত বিরাট ভুল হয়ে গেছে। মাফ করবেন।
  • বিপ্লব রহমান | ২৬ জুন ২০২২ ০৫:৫২509410
  • কলতানের ছদ্মবেশ! দারুণ আইডিয়া!! কিন্তু কিছু নগদ প্রাপ্তির তথ্য দিলে পাঠক মন তৃপ্ত হতো, অন্ততঃ কিছু ক্লু প্রাপ্তির আভাস।
     
    পড়ছি...
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন