—ব্লাউজ পিস আছে? টু বাই টু রুবিয়া?— কী রং দেখাবো? কীরকম পছন্দ আপনার? দাঁড়ান দেখাচ্ছি...
এইরকম ভাবে একের পর এক ব্লাউজ পিস পরপর যেমন সেলসম্যান দেখাতো এককালে, হুবহু সেই স্টাইলে সেই মেয়েটি বলে উঠল — অবশ্যই বিদেশিদের বিক্রি করা হয়। আমাদের প্রচুর ক্রেতাই তো বিদেশি। বলুন কেমন প্রপার্টি পছন্দ আপনার? এই মুহূর্তে আমাদের এই ব্রেস্ত শহর ওবং উপকণ্ঠ মিলিয়ে দুই হাজারের ওপর প্রপার্টি বিক্রির জন্য রয়েছে। আপনার রিকোয়্যারমেন্ট কেমন? বাজেট কত?
বাঘুর দিকে তাকাই থতমত খেয়ে।
বাঘু বলল — কী বলছে ও, আমাকে বলো।
আমি মেয়েটিকে বললাম, একটু অপেক্ষা করুন, ইনি তো ভাষা জানেন না, চট করে ওঁকে অনুবাদ করে দিই?
এমনি করে আমাদের বাক্যালাপ চলল মিনিট পাঁচেক।
বিশাল প্রাইস রেঞ্জের মধ্যে হরেকরকম বাড়ি, ফ্ল্যাট, বাগানবাড়ি থেকে শুরু করে ডুপ্লেক্স ইস্তক কী নেই তাদের কাছে। দাম হয় ইউরো, নয় রুবল, নয় ডলারে।
— ডলারে?!
আমি চমকে প্রশ্ন করি। ডলারে কে কেনে? আপনাদের সঙ্গে না পশ্চিম দুনিয়ার স্যাংশন চলছে?
মেয়েটির কথা শুনে মনে হলো, স্যাংশন ব্যাপারটা সে শুনেছে, তবে ও নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। এখানে জীবনযাপনের কোনও স্তরেই স্যাংশন কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারে নি। এবং আরও জানালো যে সরাসরি ডলার দিয়ে যারা কিনছে, তারা অধিকাংশই অ্যামেরিকান।
— অ্যাঁ? বলেন কী! ব্যাংক ট্র্যানজাকশান চালু আছে অ্যামেরিকার সঙ্গে?
— না। ব্যাংক মারফত এরা পেমেন্ট করে না কেউ।
— তাহলে?
— কেন? ক্যাশ।
— ক্যাশ? লক্ষ লক্ষ ডলার ক্যাশে?
— ক্যাশ হাতে হাতে পেলে বিক্রেতার সুবিধে হয়।
আমার চোয়াল ঝুলে পড়েছে বিষ্ময়ে।
বাঘুকে অনুবাদ করে দিতে, সে ও হাঁ হয়ে গেছে। বলছে, জিজ্ঞেস করো, ক্যাশ কি তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসছে অ্যামেরিকা থেকে?
জিজ্ঞেস করলাম মেয়েটিকে।
সে ইতিবাচক উত্তর দিল।
বাঘু শুনে বলে, এ কী করে সম্ভব? এতো ক্যাশ ফ্লাইটে আনবে কেমন করে?
আবার অনুবাদ করি এই প্রশ্ন।
মেয়েটি বলে, তা তো আমি জানি না, তবে নিয়মিত এই কাজই করছি এবং দেখছি ক্যাশ তারা দিচ্ছে। কত ঘরের অযাপার্টমেন্ট আপনাদের পছন্দ? শহরের ভেতরে না বাইরে?
— শহরের ভেতরে। তিন ঘর হলেই চলবে।
— কেমন মেটিরিয়ালের বাড়ি? ইট, বেটন না মনোলিথ?
— সবরকমই দেখতে চাই।
— কোন ফ্লোর?
— লিফট থাকলে ফ্লোরের কোনও প্রেফারেন্স নেই। নইলে একতলা।
— বাজেট কেমন আপনাদের?
আমি বাঘুর সঙ্গে গুজুর গুজুর করে বাজেট ঠিক করতে লেগেছি। বাঘু কীরকম হকচকিয়ে গিয়ে বলে উঠল, টাকা আনব কেমন করে সেটা ভেবে দেখেছো? ক্যাশ ওভাবে আনা যায় নাকি?
আমি বোঝাতে লেগেছি তাকে, কী মুশকিল তোমাকে কে কি এখুনি কেউ জোর করে ঘর কেনাচ্ছে নাকি? আমরা তো আলোচনা করছি।
আরো অল্প কিছু কথা টথা বলে, যোগাযোগের ব্যবস্থা জেনে নিয়ে আমরা সেখান থেকে বের হলাম।
বাইরে বেরিয়ে, সোভিয়েৎস্কাইয়া উলিৎসায় খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আমরা হেসে উঠেছি দুজনেই।
একটু আগে যেটা ঘটল, যা শুনলাম দেখলাম সব সত্যি?
নাকি স্বপ্ন?
—শোনো, এটা সত্যি বলেই মনে হচ্ছে। কেন জানো?
— দুটো কারণে।
— কীরকম?
— আমাদের সঙ্গে বাসে একজন সুইস আসছিল মনে আছে?
— জঁ লুক?
— লুক নয়, নোয়েল। জঁ নোয়েল।
— রাইট, রাইট। ও মিন্সকে বাড়ি কিনেছে বলছিলো না তোমাকে?
— অর্থাৎ ব্যাপারটা কারেক্ট। ওর নম্বর আমার কোটের পকেটে আছে। দাঁড়াও দেখছি।
কোটের পকেটে সেই কাগজের টুকরোটা পাওয়া গেল না। যাইহোক সে পরে খুঁজে দেখা যাবে নাহয়।
— তো জিনিসটা দাঁড়ালো এইরকম, যে এখানে প্রচুর বিদেশি রিয়েল এস্টেটে টাকা ঢালছে।
— আর দ্বিতীয় কারণটা? সেটা বলো।
— তোমার মনে আছে, গেল মাসে কাজাখস্তানে গেছলাম যখন, সেই বিশাল পার্টি হচ্ছিলো যেদিন আলমাটিতে।
— হ্যাঁ। মনে আছে।
— সেই পার্টিতে মদ টদ খেয়ে তোমার প্রিয় গ্রেগর কী বলেছিল?
— কী বলেছিল?
— গ্রেগর তোমাকে ইংরেজিতে বলল না, যে এই গত কয়েক বছরে হু হু করে ডলার ঢুকছে রাশিয়ায়।
— রাইট। তোমার মনে আছে।
— আছেই তো। তার আগে বলো, তোমার কি এই শহর ভালো লেগেছে?
— দুর্দান্ত লেগেছে। আমি এরকম আশা করি নি।
— দাঁড়াও একটু। কদিন পরে আমরা ট্রেনে করে মিন্সক যাচ্ছি। মিন্সক দেখে নাও আগে। তারপরে কোন শহর বেশি পছন্দ হয় জানিও।
কিন্তু এখন আমাদের হোটেলে ফিরতে হবে। আমরা ট্যাক্সির খোঁজে হাঁটা দিলাম।