নতুন বই তে গুরু তে লেখা এই লেখা গুলো থাকবে
ইস্কুলের গল্প (৩)
এটা ১৯৮১ এর ঘটনা। তখন আমি সপ্তম শ্রেণী( আজ্ঞে না নবম শ্রেণী নয়)। স্কুলে আমরা তিনজন প্রাণের বন্ধু ছিলাম। আমি,অভীক শী আর বিশ্বজিৎ দে। অভীক পরবর্তী কালে যদুপুর হয়ে এখন নামী অধ্যাপক। বিশু আমেরিকা সেটলড। বড় কোম্পানির বড় চাকুরে।
তো হয়েছে কী, আমরা তো এক একটা পাজির পাঝাড়া ছিলাম। ক্লাশে আমাদের সামনের বেঞ্চে বসছে বিশু। তার ঠিক পেছনের বেঞ্চে আমি, তারক রঞ্জন গুপ্ত ( তিনি ফ্রান্সে পিএইচডি করে বড় কোম্পানির বড় চাকুরে) আর অভীক। বিশু একটা নতুন সাদা জামা ( সাদা জামা,নীল প্যান্ট আমাদের স্কুলের ড্রেস) পরে এসেছে দেখে আমাদের চোখ চকচক করে উঠলো। নিব পেনের নিব টা হালকা করে জামা তে ঠেকাতেই সুন্দর তিনটে নীল বৃত্ত হয়ে গেল। বিশু একটুু পরেই টের পেল।রেগে গিয়ে হেড স্যারের কাছে তিন জনের নামেই নালিশ করে দিল। আমাদের দোতলায় হেড স্যারের ঘরের সামনে নীল ডাউন করে দিল। হেড স্যারের ঘর থেকে একজন বেরোলেন আমাদের দেখে হেসে বললেন তোমাদের টিসি লেখা হচ্ছে একটু ওয়েট করো,!!(আজ ইফ আমাদের খুব তাড়া আছে।)
ওনার কথা শুনে আমরা করুন মুখে আলোচনা করছি বছরের এই মাঝখানে বার করে কোন স্কুলে যাবো বাড়িতে কীরকম পেটাবে।এই আলোচনা চলছে। হঠাৎ করে তারক বলে আমার কোন চাপ নেই। মায়ের স্কুল ভর্তি হয়ে যাবো।
তারকের মা পড়াতেন "পালপাড়া গার্লস হাই " স্কুলে...
শিক্ষক দিবসের প্রাক্কালে....
আমরা হলাম লার্নিং ইংলিশে র প্রথম ব্যাচ। কোন রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে না গিয়ে এটা বলতে চাই যে আমাদের সময় ক্লাস সিক্সে প্রথম ইংরেজি পড়ার সুযোগ হল। ব্যাপারটা শিক্ষক আর ছাত্র দুমহলেই বেশ চ্যালেঞ্জিং। কারণ সম্বল বলতে পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা পরিষদ থেকে নির্দেশিত কিছু কিছু সংখ্যা। যেখানে রিডিং স্কিল, রাইটিং স্কিল, গ্রামার আর ভোকাবুলারি কেমন আসবে সেই সব বলা আছে।
আমরা পড়তাম একটা সরকারী স্কুলে। সেই সময়ে বেশ নামী স্কুল ছিল। খুব খুব ভালো ভালো মাস্টারমশাই এর কাছে সুযোগ পেয়েছিলাম।
ইংরেজিতে প্রথমেই বলতে হয় প্রবাদপ্রতিম হৃষিকেশ স্যারের কথা। উনি খুব ছোট শব্দ ব্যবহার করে সহজ ইংরেজি লেখার পক্ষপাতী ছিলেন। ছেলেদের সেই ভাবে অনুপ্রাণিত করতেন।
৩৯/৪০ বছর পরে আজকে দু তিনটে উদাহরণ মনে আসছে।
জাহাজটা জলের নীচে ডুবে গেল। ড্রাউনড কেন লিখতে হবে? লেখো
"The ship went under the water"
আমি রোজ গাছে জল দি
"I water the plants every day"
নাউন কে ভার্ব হিসাবে ব্যবহার করাতে উনি উৎসাহিত করতেন।
চুনীবাবুর একটা কথা এখনো মনে আছে। উনি বলেছেন একটা কনভারশেসন লিখতে দেওয়া হয়েছিল একজন পড়াশুনা জানা মানুষের সাথে একজন ভিক্ষুকের। সেখানে ভিক্ষুক ভুল ইংরেজি লিখেছে। কারণ সে পড়াশুনা জানে না। আর উনি সেই ছাত্রকে দশ এ দশ দিয়েছিলেন। সেই আউট অফ বক্স থিঙ্কিং টা সেই ছোট বয়েসেও বেশ মনে ধরেছিল....
আমার পরিবেশন করা:-
আগে তো কথায় কথায় কেটারার ডাকার ব্যবস্থা ছিল না।অভিজ্ঞ আত্মীয় স্বজন আর পাড়ার ছেলেপিলে রাই সব কাজকর্ম তুলে দিত।
আমরা ছোটরা দায়িত্ব পেতাম। কলাপাতা বিছানোর। জল, তখন মাটির খুড়িতে। লেবু আর নুন। মাটির খুড়ি গুলোর রান টাইম টেস্টিং হত, একেবারে জল দেবার সময়। অবধারিতভাবে দু তিনটে ফুটো হতো আর পাতা তার নীচে পাতা সাদা কাগজের সীট ভিজিয়ে টিজিয়ে দিয়ে কেলেংকারী ব্যাপার সাপার।
আমাদের গ্রামের বাড়ির কালীপুজোয় প্রচুর নিমন্ত্রিত। জ্ঞাতি গুষ্টি ইত্যাদি করে বৃহত্তর দাস পরিবার ১২৫-+। গ্রামের প্রতি বাড়ি থেকে অন্তত একজন নিমন্ত্রণ করা হত। তো এইরকম পুজোয় ৩০০-৩৫০ লোক হত আনুমানিক। কালীপুজোর পরের দিন সবার নেমতন্নো। ভাত, ডাল,শাক,শুক্তো,আলু ভাজা, ফুল কপি র তরকারি, মাছ,চাটনি,পায়েস,মিষ্টি। এই মোটামুটি মেনু। বহুবছর পরিবেশেন করতে করতে আমি বেশ দক্ষ হয়ে গেছি। লিডারশিপ স্কিল ও খানিকটা ডেভেপলপ করেছে। বাইরের বারান্দায় ডাল টা নিয়ে যা তো তরুণ দা,কিংবা গোপালদা শাক টা ভেতরের ঘরে ঘুরিয়ে দাও গো। এইসব হাঁকডাক।
সেটা খুব সম্ভবত বড়দা র বিয়েতে। বিয়ে আর ফুলসজ্জা র মাঝেরদিন দুপুরে খাওয়া হচ্ছে। দেখছি একটা ব্যাচ প্রায় শেষের দিকে কিন্তু কেউ পান দিচ্ছে না বলে ব্যাচ টা শেষ হচ্ছে না। ছানবিন করে দেখলাম মোট পাঁচ টা পান আছে। নেমতন্নো ব্যাচে ৪০ জন। আর সেই দুপুর তিনটে র সময় কে আবার পান সাজতে বসবে। অকুতোভয় আমি বলললাম "কুচ পরোয়া নেহি। " ভেতর থেকে সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি"। তারপর আমার পরিবেশনের বেগ সেরা সময়ের পিটি উষা কে লজ্জা দেবে। তুই বাচ্চা ছেলে তুই কি পান খাবি, আপনি পান নেবেন নাতো ( সে হ্যাঁ বা না বলার আগেই আমি হাওয়া...)..
পরিবেশনের শেষে দুটো পান বেঁচেছিল।..
আমার আঁকাজোকা :
বাঙালী র ছেলে।শুধু পড়াশুনা নিয়ে থাকলে হবে? তাই, দে গরুর গা ধুইয়ে। অর্থাৎ ভর্তি করে দেওয়া হল "দাদুর পাঠশালা" তে। রবিবার রবিবার আঁকতে যাই। কুমড়ো,আম,ন্যাসপাতি। কালের অমোঘ নিয়মে শেষ অবশ্যম্ভাবী পরিণতি "একটি গ্রামের দৃশ্য "। একটা কুঁড়ে ঘর। টালির বা খড়ের চাল।পেছনে কলা বা অন্য কোন গাছ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। পাতার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রাস্তা।মোরামের।উঠে গেছে সোজা পাহাড়ে। গ্রামের পেছন দিকেই পাহাড়। ঠিক দুটো চুড়ো। তার ফাঁক দিয়ে দেখা আছে সদ্য উদিত হওয়া সূর্য কে। নীল আকাশে চড়ে বেড়াচ্ছে কটা পাখি।গ্রামের আরেক পাশে পুকুর। কিছু কিছু জনতা পুকুরে মধ্যে মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে সেটাও এঁকে দিত। যাইহোক গ্রামের দৃশ্যের প্রথম ধাপ হিসাবে একটা কুঁড়ে ঘর এঁকে আমি যারপরনাই পুলকিত। লাফাতে লাফাতে বাড়ি এলাম। ছোট কাকা নানা আঙ্গেলে খাতা টা দেখলো। তারপরে বললো " বাহ, কী সুন্দর পাঁউরুটি এঁকেছিস রে"। শুনে মনটা একটু দমে গেল। কিন্তু ওই যে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় বলে গেছেন "প্রতিভা আর চুলকুনি কখনো চাপা থাকে না"!! আমি একদিন আঁকলাম একটা বাঁদর,গালে হাত দিয়ে গভীর ভাবে কী যেন ভাবছে। বিভিন্ন মহলে সে আঁকা উচ্চ প্রসংশিত হল। সব থেকে বেশি প্রশংসা করলো ছোটকাকা :- " কী ভালো এঁকেছিস রে??" এটাকে খাতায় রাখা যাবে না। চিন্তিত
আমি বললাম তাহলে? বললো পরে বাঁধিয়ে দেবো। আপাতত ঘরের দেওয়ালে আটকে দি। কেউ এলেই দেখতে পাবে। দিব্যি ব্যবস্থা। বললো তলায় "শিল্পী ব্রতীন দাস" লিখে দিচ্ছি বুঝলি। আমি বললাম অবশ্যই। কিন্তু কাকা লেখা র সময় "শিল্পী " কথাটা আর লিখলো না। বাইরে থেকে কেউ এসে আমার আঁকা দেখলে, আমি গর্ব গর্ব মুখ করে দাঁড়াতাম। কিন্তু সেজকাকা,নকাকা,পিসী সবাই দেখছি মুচকি মুচকি হাসছে।কেমন সন্দেহ হল। সুইচ বোর্ডের মাথা থেকে আঁকা টা খুলে নিলাম।
আমাদের স্কুলে আঁকা শেখাতেন বাঁশরী দি। যেমন সুন্দর দেখতে। তেমনি স্টাইলিশ। আমরা সিক্স,সেভেন, এইটের ছেলে পিলে রা সবাই বাঁশরী দি তে মগ্ন। তো সিক্সের আনুয়াল পরীক্ষায় এলো একটি "টিয়া পাখি" ছবি আঁকো। প্রচুর চেষ্টা চরিত্র করে একটা কিছু খাড়া হল। খাতা জমা দিলাম বাঁশরী দি র কাছে। উনি দেখে বললেন " এটা কী হয়েছে? এটা কী টিয়া পাখি না ট্যাঁপা পাখি?"। হাসি আর অশ্রু গোপন করে বেরিয়ে এলাম পরীক্ষার হল থেকে।....
আদিত্য দা
দুছর আগে,আজকের দিনে আদিত্য দা চলে গেছেন। আমার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার মশাই
বাপি 40 বছর( 1968-2008) প্রেসিডেন্সি তে স্ট্যাটিসটিক্স
পড়িয়েছেন। তার ফলে 1994 এ যখন CU তে ঢুকলাম তখন দেখি হেবববি চাপ। সৌমেন্দু দা, মণীষা দি, আশিস দা,সুগত দা বাবার ছাত্র। শৌটির বাবু, শ্যামাপ্রসাদ বাবু বাবার মাস্টারমশাই। অধীর বাবু বাসুদেব বাবু বাবার সমসাময়িক। নৃপেশ দা, কল্যাণ দা, উত্তম দা আর তথাগত দা আশুতোষ থেকে এলেও বাপির বিশেষ পরিচিত। সেকেন্ড ইয়ারে পেলাম নিপাট ভালোমানুষ গৌরাঙ্গ দা কে। উনি নরেন্দ্রপুরের। বাংলা কথা হল
ক্লাস কাটা বেশ চাপের হয়ে গেল। সবাই জানে BD র ছেলে। তাই আশুতোষের (91-94) সেই সুখের তিন বছর যা কিনা হোস্টেলে 29 আর ব্রিজ খেলে আর আশেপাশের 9/10 হলে সিনেমা দেখে কাটিয়েছি;" সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি" আর রইল না। তবুও সুযোগ পেলেই Rajarshi Kallol Partha ইকবাল ওঙ্কার ইত্যাদি
কয়েকজন গুছিয়ে ব্রিজ খেলতাম টিফিনে 1-2 আর ক্লাশ ছুটির পরে 7/8 অবধি।
তালেগোলে ISI তে চান্স পেয়ে গেলাম। আমার দ্বারা
পড়াশুনা হবে না ভালোই জানতাম। তাই সুযোগ পেতেই টুক করে IT র চাকরী তে ঢুকে গেলাম। 13/14 বছর একঘেয়ে কাজ করার পরে অসম্ভব ক্লান্তি এল। মনস্হির করলাম আকডেমিক্সে মুভ করবো। তাতে লাগবে একটা PhD. বাপিকে বলতে বললো আদিত্য র কাছে কর। আমি বলে দেবো। ততদিনে বর্ধমানের পাঠ চুকিয়ে আদিত্য দা CU তে। বলাবাহুল্য আদিত্য দা ও বাপির ছাত্র। তো এক শনিবার দুরুদুরু বক্ষে স্যারের সাথে দেখা করতে গেলাম। অলরেডি অন্যান্য স্যার দের থেকে খোজখবর নিয়ে আমি ঠিক কতটা ফাকিবাজ উনি জেনে গেছেন। এদিকে BD র ছেলে। মুখের ওপর সরাসরি না ও বলতে পারছেন না। সে এক বিচ্ছিরি অবস্হা। যাইহোক অবশেষে রিসার্চ শুরু হল। বাপি India Govt, Health Ministry র Low Birth weight র ওপর একটা প্রজেক্ট করেছিলেন। সেই ডেটা নিয়ে। তখন ও আমি কগনিজেন্টে। কাজেই দুমাসে এক বা দুবার স্যারের সাথে ব্যাটেবলে হতো। আর বাকি রিসার্চ চলতো বিরাট বিরাট মেলে। আমার ছোট খাটো ভুল গুলো অসীম ধৈর্যের সাথে সংশোধন করে উনি লিখতেন সেই নিখুত মেল গুলো। ব্যক্তিগত জীবনে খুব পারফেকশনিস্ট ছিলেন। আমাকে মাঝেমাঝেই বলতেন "দেখো বাপু, বেশী
বয়েসে PhD করতে এসেছো বলে যা লিখবে, তাই আপ্রুভ করে দেবো ওটি হচ্ছে না। 10 বার লিখে দেখেবে। 11 তম টি আমি আপ্রুভ করবো। আমি দেখলাম বুড়ো
বয়েসে হেবববি চাপ। যাই হোক ঢিমেতালে রিসার্চ চলতে লাগলো। তার জন্যে দায়ী কর্পোরেট প্রেশার আর আমার বিশ্ববিখ্যাত ল্যাদ।
স্যার IAPQR র সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত ছিলেন। ওখানের মিটিং এ মাঝেমধ্যে দেখা হতো আর আমরা খানিকটা প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করতাম। উনি বলতেন আরো
সময় দাও ব্রতীন না হলে নামবে না। ওনার মেয়ের বিয়েতে গিয়েও কুশল জিজ্ঞাসার পর আমি শুরু করতে যাচ্ছিলাম Random Forest ইত্যাদি। উনি মৃদু হেসে বললেন অাজ থাক। 2020 জানুয়ারি তে IAPQR আর CGCRI মিলে একটা ইন্টারন্যাশানাল কনফারেন্স করেছিল ডেটা সায়েন্সের ওপর। সেখান আমি LBW ওপর পেপার টা
পড়লাম। স্যার ছিলেন। ওনার অনেক পুরানো বন্ধুদের সাথে জমিয়ে গল্প করছিলেন। আমাকে দেখে বললেন ওহে আমাদের একটা ফটো তুলে দাও দেখি। তা এই সেই ফটো। তারপরে স্যারের সাথে কথা
হয়েছে। দেখা হ য়নি আর। স্যার ভালো থাকবেন।
গরমের ছুটি
আমাদের ছোট্ট বেলায় খুব মজার ব্যাপার ছিল গরমের ছুটি। এখনকার সদা ব্যস্ত আর পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত ছোট্ট পড়ুয়ারা বোধহয় এর মাধুর্য্য উপভোগ করতে পারবে না।
১৫০টা অঙ্ক, ৩০ পাতা বাংলা আর ৩০ পাতা ইংরেজী হাতের লেখা এই সব দিয়ে আমার মতো ফাঁকিবাজ ছেলেকে আটকানো যাবে? গরমের ছুটি শুরু হলেই আমি চলে যেতাম আমার গ্রামের বাড়িতে। গ্রামের বাড়ি আর মামার বাড়ি একই গ্রামে। হুগলী জেলার তারকেশ্বরর কাছে গোপীনগর বলে একটা গ্রাম।
মামার বাড়িতে আক্ষরিক অর্থেই অনেক মজা। বড়মামা, ছোট মামা, ছাড়াও ঝন্টু মামা, গুপী মামা, টোকন মামা আর সবার থেকে বড় হল দীপু মামা। মায়ের পিসতুতো ভাইরা। তখনো মামাদের কারোর বিয়ে হয় নি। তার ফলে আদরের ভাগনার জন্যে হাতে যথেষ্ট সময়। বড় মামার চিরকাল কিঞ্চিত খাদ্যরসিক। মামার ভুঁড়িটিও বেশ চোখে পড়ার মতো। সেটাতে আমি মনে সুখে ঘুঁসি মারতুম। খুব লাগলে তখন মামা বলে উঠতো "আহ, লাগে না"।
দীপু মামা, খুব মাই ডিয়ার টাইপের ছিলেন। আমাকে আর মানু মাসীকে কালী পুজোয় প্রচুর বাজী কিনে দিতেন। আর যে কোনো জিনিস খাবার আবদার মামার কাছে। বছর তিনেক হল উনি মারা গেছেন। মামার এক মাত্র ছেলে ইন্ডিয়ান আর্মিতে কাজ করে। ওদিকে গেলে মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়।
ছোট মামার সাথে আমি মাঝে মাঝে দুপুর বেলায় মাছ ধরতে যেতুম। মাছের জন্যে চারা ফেলে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে আমার মোটেই পোষাতো না। খালি মামাকে বিরক্ত করতুম। তাই কিছুক্ষণ পরে মামা ভাগিয়ে দিত। কিন্তু কাজের কি অভাব আছে? আমি আর মানু মাসী মিলে দিদিমার ভাঁড়ার থেকে এত্ত তেঁতুল হাতিয়ে নুন লঙ্কা চিনি দিয়ে বেশ করে মেখে দোতলায় সবার চোখের আড়ালে সাঁটাতুম। ঘুমে অচেতন কেউ বিশেষ কিছু টের পেত না।
আরেকটা প্রিয় বিষয় ছিল পুকুরে স্নান করতে যাওয়া। দাদু খুব রাশভারী মানুষ ছিলেন আর আমার পুকুরে স্নান করতে যাওয়ার নেশা উনি ভালোই জানতেন। উনি কলকাতায় চাকরী করতেন। মাঝে মাঝে দেশের বাড়ি আসতেন। উনি না থাকলে আমাকে আর পায় কে? লাফাতে লাফাতে চলে যেতাম রামসাগর। মামার বড়ির ঠিক পেছন দিকে। যেমন বড় পুকুর তেমন ঠান্ডা জল। সেই যে "কাকচক্ষু" না কী যে বলে না সেই রকম। দিদিমার কাছে শুনেছি আগে পুকুরটা (ছোট্ট লেক বলাই ভালো) আরো বড়ো ছিল। একটা ঘোড়াকে নাকি চাবুক মারা হয়েছিল। সে যতটা দৌড়বে তত বড় পুকুর কেটেছিল গ্রামের জমিদাররা। নাম "রামসাগর"।
পরের মজার বিষয় হল মামার বাড়ির নানান ফলের গাছ। মায়ের মুখে শুনেছি সেই বড় বড় কালো জামের গাছের কথা। কিন্তু সেটা আমি দেখি নি। কাঁঠাল গাছ তো ছিলই। আর ছিল নানান আম গাছ বোম্বাই, পেয়ারাফুলি, মধুগুলগুলি। তবে যেটার জন্যে এখনো মন খারাপ করে সেটা হল বাড়িতে ঢুকতেই গোয়াল ঘরের পাশে বিশাল হিমসাগর আমের গাছটি। এর যে কত আম খেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। সেই গাছপাকা আমের স্বাদ এখনো যেন মুখে লেগে আছে। দাদুর খাটের নীচে খড় পেতে আম রাখা থাকত। আমরা সেখান থেকে বেছে বেছে ৪/৫ টা আম দিয়ে ব্রেক ফাস্ট করতাম।
আর সেই দুপুর বেলা ঘুম থেকে উঠে নুন লঙ্কা মিষ্টি দিয়ে আম ছেচা। আহা মনে আসতেই বুকের ভেতর টা হু হু করে উঠলো।
আরো কত স্মৃতি। বয়েস হওয়ার জন্যেই কি এখন বেশী করে স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ছি...
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।