এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পুজোর ছোটগল্প : চুলোচুলি

    Sagarmay Mandal লেখকের গ্রাহক হোন
    ২১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬৮ বার পঠিত
  • চুলোচুলি
    সাগরময় মণ্ডল

    এই তো দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর আগের দিন, মানে পঞ্চমীর দিন দেশের বাড়ি যাবো বলে ডানকুনি বাসস্টান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। সঙ্গে একটা বড় ব্যাগে পুজোর জামাকাপড় ও অন্যান্য টুকিটাকি জিনিসপত্র আছে। প্রায় আধ ঘন্টা লেটে বাস এলো। এ বাস এসপ্ল্যানেড থেকে ছেড়ে তারাপীঠ যাবে। ব্যাগ নিয়ে বাসে উঠে পড়লাম। কিন্তু দেখলাম একটা সিটও ফাঁকা নেই। দু’ তিন জন আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। ঘন্টা পাঁচেকের পথ। দাঁড়িয়ে যেতে হলে খুব কষ্ট হবে। কন্ডাক্টারের দিকে তাকাতে সে ইশারা করে জানালো পিছনের দিকে যান, বর্ধমানে সিট খালি হবে। সেও তো প্রায় দেড় ঘন্টার পথ। এর পরের বাস কখন আসবে কিম্বা আদৌ আসবে কিন কেউ জানে না। এতএব পিছনের দিকে গিয়ে ব্যাগটাকে পায়ের ফাঁকে চেপে ধরে সিটের সঙ্গে লাগানো হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়ালাম। বাস দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ে ছুটছে। খুব ভালো রাস্তা। পথে স্পিড ব্রেকার নেই। ফলে দাঁড়িয়ে যেতে অসুবিধা হচ্ছে না। বাসের গেটের সামনের সিট ধরে বছর চল্লিশের এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছে। সিটে বসা ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা অনর্গল কথা বলে চলেছেন। আমার কপাল একটু ভালো ছিল, বর্ধমানে নামবে বলে আমার সামনের সাইট বসা ভদ্রলোক শক্তিগড়ে আমাকে তাঁর সিট ছেড়ে দিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে দাঁড়ালো।

    বাস এখন বর্ধমান ছেড়ে বাদশাহি সড়ক ধরে ছুটছে। মানে ছোটার চেষ্টা করছে। কিন্তু রাস্তায় এতো খানা খন্দ যে বাস টাল খেতে খেতে যাচ্ছে। সিটে বসে থাকতেও অসুবিধা হচ্ছে। পিছনের সিটের দুজন ছোকরা তো সিট ছেড়েই উঠে দাঁড়ালো। গেটের কাছের ভদ্রলোক কিন্ত দুহাতে সিটের হ্যান্ডেল পোক্ত করে ধরে গল্প করেই যাচ্ছেন। দেখা গেল জানালার ধারে বসে থাকা এক বয়স্ক যাত্রী সামনের বাস স্টপে নামবেন বলে উঠে দাঁড়িয়েছেন। গল্প করা ভদ্রমহিলা এবার জানালার ধারে সরে যাবেন এবং দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক তাঁর পাশে বসবেন। বয়স্ক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোককে বললেন, যদি কিছু মনে করেন তাহলে দয়া করে আমার ব্যাগটা বাঙ্ক থেকে নামিয়ে দেবেন।

    - ও সিওর। কেন দেব না। এই দিচ্ছি। বলে দুহাত দিয়ে ব্যাগটাকে ধরতে গেলেন। ঠিক সেই সময়েই একটা গাড্ডায় পড়ে বাস্ অনেকটাই বাঁ দিকে কাত হয়ে গেল। একটা বেশ ঝাঁকুনি দিয়ে বাস দাঁড়িয়ে পড়লো। দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক ব্যাগ ধরতে না পেরে প্রায় বাসে দরজার দিকে পড়েই যাচ্ছিলেন। কিন্তু সৌভাগ্যবশত সামনের কিছু একটা ধরে নিজেকে সামলে নিলেন। কি ধরে সামলেছিলেন সেটা বোঝা গেল সামনের সিটে বসা এক ভদ্র মহিলার চিৎকারে। অসভ্য ইতর আমার মাথার চুলগুলো সব ঘেঁটে দিলে। আজ সকালেই আমি পার্লার থেকে চুল সেট করে নিয়ে এলাম একগাদা টাকা খরচ করে। আর উনি কিনা আমার মাথার চুল ছাড়া ধরার জন্য অন্য কোন জিনিস খুঁজে পেলেন না।
    - দেখুন ম্যাডাম, আমি ইচ্ছে করে আপনার মাথার চুল ধরে টানিনি। বাঁচার জন্য আমি সামনে যা পেয়েছি তাই ধরেছি। নইলে আমি গেট দিয়ে বাসের বাইরে চলে যেতাম।
    - গেলেন না কেন? তাহলে আমার চুলগুলো তো বাঁচতো। আমাদের বাড়িতে দুর্গা পুজো, আত্মীয় স্বজন সব আসবে। আমি কত টাকা খরচ করে রাত জেগে লাইন দিয়ে পার্লার থে চুল সেট করে এলাম। আমার সব পরিশ্রম, টাকাপয়সা জলে গেল। পুজোর সময় আমার জা, ননদ সবাই সেজেগুজে হাসি হাসি মুখ করে ঘুরে বেড়াবে, আর আমি খ্যাঁকরা চুল নিয়ে তাদের পাশে পেত্নীর মতো থাকবো! এ হে হে।
    ভদ্র মহিলা সত্যি কেঁদে ফেললেন। সঙ্গে তাঁর ভাই ছিল। সে বলল, চুপ করে বস তো দিদি। চুল ঘেঁটে গেছে তো কি হয়েছে। উনি তো আর সাধ করে তোর চুল ধরে টানেননি। ও বাড়ি গিয়ে ঠিক করে নিবি।
    - নারে ভাই। এ চুল বাড়িতে ঠিক হবে না। চুলে হিট দিতে হয়। গ্রামে কোথায় পাবো! ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে আবার ফোঁস করে উঠে বলল, আমি কিন্তু আপনাকে ছাড়বো না।
    - ভদ্রলোককে তাঁর সঙ্গের মহিলা বললেন, আপনি বসুন তো জাম্বু। উনি কি করবে তখন দেখা যাবে। বোঝা গেল ওনারা শ্যালিকা আর জামাইবাবু। বয়স্ক ভদ্রলোক তখন নিজেই ব্যাগ নামিয়ে নেমে গেছেন। শ্যালিকা জানালার দিকে সরে গিয়ে জাম্বুকে পাশের সিটে বসিয়ে দিল। একটু গুনগুন করতে করতে গুঞ্জন থেমে গেল। কিছুক্ষণ পড়ে দেখা গেল চুল ঘেঁটে যাওয়া ভদ্রমহিলা আর তাঁর ভাই বাস থেকে নামার তোরজোড় করছে। সামনের স্টপেজে নামবে। অনেকগুলো ব্যাগ ম্যানেজ করতে অসুবিধা হচ্ছে দেখে জাম্বু বললেন, আপনারা আগে নেমে যান, আমি ব্যাগগুলো গেটের কাছে এগিয়ে দিচ্ছি। বাস থামলে ভাই আগে বাস থেকে নেমে গেল। দিদি গেটের পাশে দাঁড়িয়ে। সব ব্যাগ নামলে উনি নামবেন। জাম্বু ব্যাগগুলো ভাইয়ের হাতে এগিয়ে দিলেন। এবার ভদ্রমহিলা নামবেন। নামার আগে আচমকা ভদ্রমহিলা জাম্বুর চুলের মুঠি ধরে দিলে এক টান। বাস সুদ্ধ লোক হৈ হৈ করে উঠলো। তারা দেখল জাম্বুর মাথার সব চুল ভদ্রমহিলার হাতে। জাম্বুর মাথা ন্যাড়া। জাম্বুর চোখমুখ লজ্জায় লাল। ভদ্রমহিলাও বেশ ঘাবড়ে গেছেন। তিনি শ্যালিকার কোলে উইগটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, বাড়ি গিয়ে জাম্বুকে পড়িয়ে দেবেন। তারপর বাস থেকে নেমে গেলেন। বাসও ছেড়ে দিল।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন।