এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মীর তাকি মীর : দিল্লী থেকে লখনৌ অভিযাত্রা 

    upal mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ৭১ বার পঠিত
  • Mir Taqi Mir Photo Gallery - Urdu Poet Mir Taqi Mir Pictures

    উত্তর পূর্ব দিল্লীর চাঁদনী চক ওয়ার্ডের পুরোনো দরিয়াগঞ্জের কুচা চেলান মহল্লা ছিল শিল্পী-কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা, ১৮৫৭ র মহাবিদ্রোহে দিল্লী পুনর্দখলের সময় সেখানে পরিকল্পিত গণহত্যা চালায় ইংরেজরা। কয়েকশো শিল্পী-কবি-সাহিত্যিকদের কোতল করা হয়। উর্দু কবিতার ঈশ্বর - খুদা এ শাকুন মীর তাকি মীর একসময় সেখানেই থাকতেন। এছাড়াও তিনি থাকতেন দিল্লীর চাঁদনী মহল আর মাটিয়া মহল্লায়। শায়েরদের মুরুব্বি ছাড়া চলে না তাই মীরকেও নানা মুরুব্বির আশ্রয়ে থাকতে হয়, সব বড় বড় সমজদার মুরুব্বি : ইতিমাদ দৌলা দুই, জাভেদ খান, রাজা নগর মহল, ইমাদ উল মুলক, রাজা যুগল কিশোর আর রাজা নগর মল। সবাই পড়তি মোঘল দরবারের আমির ওমরাহ। হ্যাঁ, পড়তি তো বটেই সেসময় কারণ সতেরশো তেইশে আকবরাবাদে-আগ্রায় জন্মে মীর শাজাহানাবাদে - পুরোনো দিল্লী আসছেন সতেরোশো তেত্রিশ নাগাদ আর নাদির শাহ দিল্লী ছারখার করেন ঊনচল্লিশে। সেসব বছর ষোলর মীরকে দেখতে হবে। বাবা মুহম্মদ আলির দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে মীর মুহম্মদ তাকি এক জটিল চরিত্রের লোক ছিলেন। মীর ছিল তাঁর তাখাল্লুস - ছদ্ম নাম। কো নো মুরুব্বির সঙ্গেই তাঁর বেশিদিন বনিবনা হতো না যার মধ্যে কিছুটা ব্যতিক্রম হচ্ছেন রাজা নগর মল।



    এহেন মীর সতেরশো বিরাশিতে একষট্টি বছর বয়সে দিল্লী ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন লখনৌ। কাঁহাতক আর দিল্লি জুড়ে জাট, রোহিলা,শিখ আর মারাঠাদের দাপাদাপি সহ্য করা যায়। মোঘল বাদশাহ তো পরস্পর বিরোধী নানা শক্তির সামনে নিতান্তই অসহায়, তাদের হাতের পুতুল। যে চার দশক মীর দিল্লীতে ছিলেন সে সময় পাঁচ পাঁচজন বাদশাহ লাল কেল্লার তখতে বসেছেন আর গেছেন। তাছাড়া আপন মেজাজে থাকতে গিয়ে সব মুরুব্বি হারিয়ে তিনি ভুগছিলেন অর্থকষ্টে। বাবা সিয়া হলেও মায়ের সুন্নি পরিচয়ে নিজেকে সুন্নি আর সৈয়দ বংশ গরিমার একজন মনে করে, সেই চেষ্টাকৃত স্বাভিমানে, পীর খাজা মীর দর্দের মুরিদ মীর সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতেই প্রিয় শহর দিল্লী ছেড়ে লখনৌ গিয়েছিলেন এতে কোনো সন্দেহ নেই।

    লখনৌতে গিয়েছিলেন নবাব আসফ উদৌলার আমন্ত্রণে। মেহমান এলে সে সরাইখানায় উঠবে এটাই দস্তুর। তাই প্রথমে মীর উঠলেন এক সরাইখানায়। সেখানে বসেই খবর পেলেন সূর্য উঠলেই তার লাল আলো আলো এসে পড়বে গোমতি নদীর জলে সেটা যেমন নিশ্চিত তেমনি নিশ্চিত যে নবাবী মহলে সারাদিনের মুশায়েরা আয়োজন। কবিরা-শায়েররা শিশুর মতো সরল হয়। সামান্য ঘটনায় তাঁদের কারু বাসনা জেগে ওঠে। মীরেরও জেগে উঠলো কারু বাসনা। তিনি এক গজল লিখে ফেলছেন।তারপর সুর্মা-আতর চড়িয়ে, মাথায় পেল্লায় পাগড়ি বেঁধে, পা অবধি লম্বা শেরওয়ানি পরে, প্রায় দেখা যায় না এমন সিল্কের পাজামার তলায় পায়ে শুঁড় উঁচু নাগরা জুতো গলিয়ে কোমরবন্ধের ডান দিকে সইফ-সূঁচালো তলোয়ার আর বাঁ পাশে ছোরা গুঁজে রওয়ানা দিলেন সেই মেহফিলের পানে। জনাব যেন প্রাচীন দিল্লীর এক আমির গোটা শহর এ দিল্লীর কেৎ দেখাতে দেখাতে চলেছেন। কিন্তু লখনৌয়ের আদব কায়দা আলাদা সেখানকার মেহমান নাবাজির উপযুক্ত চাল চলন না থাকায়, জবরজঙ্গ পোশাকে মীর সাহেব হয়ে পড়েন উপহাসের পাত্র। তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি হতে থাকে। কেউ একজন বিদ্রূপে বলে ওঠে, ''তা নবাব সাহেবের মহল কোথায় জানতে পারি কি?'' আশপাশের লোকেদের মধ্যে নিশ্চয়ই হাসাহাসির রোল উঠেছিল। তখনই অপমানিত মীর টাকি মীরের কণ্ঠে শোনা যায় সেই বিখ্যাত গজল যা এই মেহফিলের জন্যই তিনি লিখে রেখেছিলেন আর সেটাই হলো তাঁর জবাব। এমনই সুরেলা আর ইয়াদগার সে গজল যে এখনো লোকের মুখে মুখে ফেরে:

    ক্যা বুদ-ও-বশ পুছহো পুরব কে সাকিনো
    হ্যাম কো গরিব জান কে হস হস পুকার কে


    দিল্লী জো এক শহর থা আলম মে ইন্তেখাব
    রাহতে থে মুন্তাখাব হি জাহান রোজগার কে

    উস কো ফালাক নে লুট কে বিরান কর দিয়া
    হাম রাহনে বালে হ্যায় উসি উজদে দেয়ার কে

    কী জানতে চাও আমার তুমি পুরব দেশের লোক
    ঠাউরে গরীব আমায় পড়ে হেসে লুটোপুটি


    ছিল বটে দিল্লী এক শহর দুনিয়া সেরা
    থাকত যেথায় বাছাই করা কাজের মানুষেরা

    লুঠলো তাকে পোড়া কপাল দস্যু করে খালি
    ঘরটি আমার সেথায় সে নষ্ট দেশের বুকে।


    লুন্ঠিত দিল্লীর কান্না, শহরের কান্না এমন চারপাশ ছেয়ে গেলো যে উপস্থিত সবাই তওবা তওবা বলতে বেমালুম ভুলে যায়, তাদের বেয়াদবির জন্য ক্ষমা চাইতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে আর সারা শহর জুড়ে, লখনৌ শহর জুড়ে রটে যাচ্ছে মীরের আগমনবার্তা। যে সে লোক নয় স্বয়ং খোদা এ শাকুন মীর তাকি মীরকে সম্মান জানাতে গোটা লখনৌ উঠে দাঁড়ায়। তবে আসফ উদৌলার সঙ্গেও মীরের বেশিদিন পটেনি। আবার নিশ্চিত আশ্রয় ছেড়ে জীবনের বাকি আঠাশটা বছর নিদারুণ অর্থকষ্টে লখনৌতে কাটিয়ে দিলেন তিনি। মারা যান আঠেরোশো দশে। যতদিন ছিলেন সারাক্ষণ দিল্লীর জামা মসজিদের মুখের ভাষাকে, রেখতাকে, হিন্দুস্থানের মিশ্র তেহজিবকে আগে রেখেছেন মীর তাঁর সৃষ্টিতে কিন্তু লখনৌ ছাড়ার কথা ভাবছেন না কখনো।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • b | 117.238.***.*** | ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:০২739926
  • গজলটির মাত্রা ও উচ্চারণ এরকম (সুত্র ঃhttps://www.rekhta.org/qita/kyaa-buud-o-baash-puuchho-ho-puurab-ke-saakino-unknown-qita?lang=hi)
     
    क्या बूद-ओ-बाश पूछो हो पूरब के साकिनो
    हम को ग़रीब जान के हँस हँस पुकार के

    दिल्ली जो एक शहर था 'आलम में इंतिख़ाब
    रहते थे मुंतख़ब ही जहाँ रोज़गार के

    उस को फ़लक ने लूट के वीरान कर दिया
    हम रहने वाले हैं उसी उजड़े दयार के
     
  • upal mukhopadhyay | ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:২৭739928
  • ধন্যবাদ
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন