নিজস্ব সংবাদদাতা – মাট্ন, চিকেন, সয়াবিন বা মাশরুম-এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি পুষ্টিকর একটি খাদ্যের আবিষ্কার করেছেন দুই ভারতীয় মহাপুরুষ, শ্রীযুত নরহরি মুদি ও শ্রীযুত গোমিত সাহা। নব-আবিষ্কৃত এই খাদ্যটির নাম, ‘জুমলা’। ভারত সরকারের কৃপাধন্য কিছু ব্যকরণ শিং, বি এ, খাদ্যবিশারদের মতে এই খাদ্যটির মাহাত্ম্য হলো, এটি খেলে আর অন্য কোনো পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের দরকার পড়ে না কারণ শর্করা, প্রোটিন ও সব রকমের ভিটামিন এই একটি খাদ্যের ভেতরেই বিরাজমান।
এর অপর এক বৈশিষ্ট্য হলো, এই একটি খাবারই দিনে চার বেলা দিব্যি খাওয়া যায়। যেমন, সকালে পাউরুটি বা আটার রুটিতে জুমলার মাখন বা মার্জারিন মাখিয়ে সুস্বাদু প্রাতরাশ খাওয়া যায়। যারা প্রাতরাশে মুড়ি খান, তারা মুড়ি দিয়ে জুমলা মেখে খেতে পারেন। যারা ছাতু খান, তারা ছাতুমাখার সঙ্গে চাটনি হিসেবে জুমলা খেতে পারেন। এমনকি, যারা প্রাতরাশে পান্তাভাত খান তারাও পান্তার সঙ্গে কাঁচালঙ্কার বদলে এটি খেতে পারেন।
দুপুরে ভাত, রুটি, পরোটা বা ফ্রায়েড রাইস ইত্যাদি যে কোনো কিছুর সঙ্গেই জুমলা-কষা বা জুমলার পাতলা ঝোল অতি উপাদেয় ও পুষ্টিকর খাবার। যাদের হজম ক্ষমতা দুর্বল, তারা জুমলাসেদ্ধ দিয়ে ভাত খেতে পারেন।
বিকেলে চায়ের সাথে স্ন্যাক্স হিসেবে জুমলা ফ্রাই-এর জবাব নেই ! আর, রাতের খাবারে পছন্দমতো জুমলার কারি, স্যুপ, স্ট্যু ইত্যাদি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ডিশ সহজেই বানানো যায়।
এ-কথা মনে হতে পারে যে এই খাদ্যটি কোথা থেকে সংগ্রহ করতে হবে, বা, এটি সব মানুষের পক্ষে ক্রয়সাধ্য হবে কি না। এই প্রসঙ্গে জানানো হচ্ছে যে মহান ভারত সরকার, ‘প্রধানমন্ত্রী জুমলা বিতরণ যোজনা’-র মাধ্যমে ‘মূর্খ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী’ ইত্যাদি আপামর জনসাধারণের মধ্যে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই পুষ্টিকর খাদ্যটি বিতরণ করছেন। শ্রীযুত মুদি ও শ্রীযুত সাহা স্বয়ং, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রীগণ, কোনো কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা এই মহৎ কর্মে ব্রতী হয়ে, সশরীরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে দেশবাসীর মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে জুমলা বিতরণ করছেন। এবং সর্বোপরি, ‘ভারতীয় নির্বাচন কমিশন প্রাঃ লিঃ’ নামক একটি কোম্পানি, এই জুমলার সুফল যাতে জনগণের মধ্যে সফলভাবে প্রোথিত করা যায়, সেই বিষয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম আর সরকারের সার্বিক সহযোগিতা করে চলেছে। সুতরাং, এটি সংগ্রহের বিষয়ে দেশবাসীর ভাবিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
এবারে আসা যাক ‘ভারতীয় অর্থনীতিতে জুমলার প্রভাব’ বিষয়ে। এ-প্রসঙ্গে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত উৎকোচ-প্রাপ্ত অর্থনীতিবিদগণের মতে, নিয়মিত জুমলা খাওয়ার ফলে দেশবাসীদের আর কোনো খাবার কিনে খেতে হবে না। ফলে, তাদের প্রত্যেকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা জমতেই থাকবে…জমতেই থাকবে… যে টাকা তারা নানা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে পারবেন এবং শনৈঃ শনৈঃ আরো বিত্তশালী হয়ে উঠতে পারবেন। এইভাবে এক সময়ে প্রত্যেক দেশবাসীর কাছে এত টাকা জমে যাবে যে, কে মাইক্রোসফট কোম্পানি কিনে নেবেন, কে অ্যামাজন ই-কমার্স-এর মালিক হবেন, কে ফেসবুক কিনবেন আর কে-ই বা টেসলা কোম্পানি কিনে নেবেন, এই নিয়ে কাড়াকাড়ি হুড়োহুড়ি পড়ে যাবে।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক তথ্যটি হলো, খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়াও জুমলার বীজ ও খোসা থেকে জ্বালানি তেল তৈরি করাও সম্ভব বলে উপরোক্ত দুই কৃতবিদ্য বিশেষজ্ঞ, শ্রীযুত মোদি এবং শ্রীযুত সাহা জানিয়েছেন। এর ফলে অন্য দেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করার আর প্রয়োজন থাকবে না। বরঞ্চ, এ-দেশ থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হবে। ফলতঃ, প্রচুর পরিমাণে বিদেশি মুদ্রা দেশের কোষাগারে জমা হতেই থাকবে ... হতেই থাকবে ... এবং একসময় অবস্থা এমনই দাঁড়াবে যে প্রত্যেক দেশবাসীর অ্যাকাউন্টে, প্রতি মাসে দশ থেকে পনেরো লক্ষ মার্কিন ডলার ভরে দেওয়া ছাড়া সরকারের কাছে আর অন্য কোনো উপায় থাকবে না।
সুতরাং, এ-কথা পরিস্কার ভাবে বোঝা যাচ্ছে যে জুমলার আবিষ্কার ভারতীয় অর্থনীতিতে স্পেস শিপ-এর গতি আনবে কিন্তু এই গতির অভিমুখ সম্পর্কে শ্রীযুত মুদি বা শ্রীযুত সাহা অথবা ভারত সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত উৎকোচ-প্রাপ্ত অর্থনীতিবিদগণের কেউই কোনোরকম সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেন নি।
সরকারি উৎকোচগ্রাহী বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে জুমলার আবিষ্কার, মানব সভ্যতার ইতিহাসে চাকা, বিদ্যুৎ বা কম্প্যুটর আবিষ্কারের তুল্য একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এরকম একটি বৈপ্লবিক আবিষ্কারের জন্যে শ্রীযুত মোদি এবং শ্রীযুত সাহাকে ‘ভারতরত্ন’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কিন্তু এই বিষয়ে তাঁদের আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁরা ততোমধ্যেই নিজেদের বুকপকেটে রাখা ভারতরত্ন পদক বের করে নিজেদের গলায় ঝুলিয়ে নিয়েছেন।
এরপর সেই উৎকোচগ্রাহী বিশেষজ্ঞদের একটি কমিটি সুইডেনে গিয়ে নোবেল কমিটির কাছে এই দুই দেশবরেণ্য মহাপুরুষের মহান কীর্তি ব্যক্ত করে এই দুইজনকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করার আবেদন করেছিল। কিন্তু নোবেল কমিটি সবিনয়ে জানিয়েছে যে নোবেল-এর মতো ছোটখাটো পুরস্কার দিয়ে এই দুই অসামান্য ব্যক্তিত্বের মহত্ত্ব খর্ব করতে তারা অপারগ। তাই এনাদের জন্যে আরো বড়ো কোনো পুরস্কারের কথা ভাবা হচ্ছে। তারা আরও জানিয়েছে যে খুব সম্ভব সেই পুরস্কারটির নাম হবে ‘নো বেইল’… যাই হোক, পুরস্কারটির ডিজাইনিং এবং কাস্টিং যথাযথ সম্পন্ন হলেই তারা এই দুই অতিমানবকে আমন্ত্রণ করে, সেই পুরস্কারে তাঁদের সম্মানিত করবে এবং নিজেরাও ধন্য হবে।
তথ্যসূত্র – লয়টার।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।