এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • দাঙ্গা সম্পর্কিত আটটি টুকরো

    Emanul Haque লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৭ মার্চ ২০২৬ | ৩৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • দাঙ্গা সম্পর্কিত আটটি টুকরো
    ইমানুল হক


    ।। ১ ।।

    তিন বন্ধুতে জোর তর্ক শুরু হল।
    -- আমি যে বাড়িটা পুড়িয়েছি সেটাই সবথেকে বড়ো। প্রথম বলল।
    -- মোটেই না, আমারটা আরো বড়ো ছিল। দ্বিতীয়’র মন্তব্য।
    -- বাজে গুল মেরো না। আমার মতো বাড়ি তোমরা দ্যাখোওনি জন্মে।
    ওইটাই সবচে বড় বাড়ি। তৃতীয় বন্ধুর দাবি।
    -- কী করে বুঝলে ? প্রথম ও দ্বিতীয় সমস্বরে জিজ্ঞাসা করে।
    -- আমি আজ সন্ধ্যায় একজন পুলিশকে মোট পঁয়ত্রিশটা কাফন কিনতে দেখেছি। দোকানি তাকে জিজ্ঞেস করে এতগুলো কাফন সে কী করবে ? তাতে সে জবাব দেয়, রোজ ভিলায় আজ পঁয়ত্রিশ জন লোক পুড়ে মরেছে। আর সবচে বড় কথা রোজ ভিলায় আমি আগুন দিয়েছিলাম কাল দুপুরে আর সেটা নিভেছে আজ সন্ধ্যায়।
    -- ইস্‌ ভগবান কেন যে আমরা আগে ওখানে যাইনি। প্রথম ও দ্বিতীয়’র আক্ষেপ।

    ।। ২ ।।

    ঘুমন্ত বাচ্চা মেয়েটার কানে ছিল হীরে বসানো একটা দুল। লোকটা খুলতে গেল। পারলো না। তারপর টান দিতেই গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এল মেয়েটির কান থেকে। লোকটা পকেট থেকে একটা সাদা রুমাল বের করে হীরের দুলটা মুছে নিল। আর তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বাড়ি এসে বুকে বলল, ‘শোনো রহিমাকে ঘুম থেকে তোল তো। দেখবো এই হীরের দুলটা ওকে কেমন মানায়। ওর বড় শখ হীরে পরার।’
    ছ’বছরের মেয়ে রহিমাকে রাত বারোটার সময় ঘুম থেকে জাগানো হল। দুলটা পরানোর সময় একটু লাগল মেয়ের। লোকটা মাথায় চুমু দিয়ে বলল, ইসস, তোকে ব্যথা দিয়ে ফেললুম।

    ।। ৩ ।।

    বেশি পীড়াপীড়ি করার জন্য বুড়োকে প্রাণ দিতে হল। বুড়োর ছেলেকে আগেই ওরা কচুকাটা করেছিল। জিনিসপত্র যা ছিল সব তখন লুটেরাদের কবলে। বউটা কাঁদছিল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে, সিঁড়ির আড়ালে। ওরা তাকে টেনে আনতেই বুড়োটা পীড়াপীড়ি শুরু করে বউটাকে নিয়ে না যাবার জন্য।

    তখনই একজন ছুরিটা বার করে বসিয়ে দেয় বুড়োর গলায়। ঢ্যাঙ্গা লোকটা বউটার কাপড়–জামা ছিঁড়তে ছিঁড়তে বুড়োকে বলে, তোর চিন্তা নেই, এই পাঁচ-ছ জনের কাজ শেষ হলেই একে তোর কাছে পাঠিয়ে দোব।
    বুড়োর রক্তের ওপরেই তার ওপর শুল একে একে ছ-জন। তারপর চলে গেল।

    ।। ৪ ।।

    ‘ক’ মহল্লার একমাত্র বড় বাড়িটায় আগুন লাগিয়ে দিয়েই দাঙ্গাকারীরা চলে গেল। প্রচণ্ড শীত। তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরতে হবে, তাই। খবর পেয়ে ফুটপাতের সব লোকেরা ছুটে এল। ‘ক’ মহল্লার ফুটপাতের লোকেরা ‘গ’ মহল্লার ফুটপাতবাসীদের জিজ্ঞেস করলো, ‘কী ব্যাপার, তোমরা এখানে আজ আগুন পোয়াতে এসেছ।
    -- ‘আজ বড্ড জাড়। আর আমাদের এলাকার লোকগুলো ভীষণ কুঁড়ে, তোমাদের এখানের মত চটপটে নয়।
    তারপর সবাই মিলে আগুন পোহাতে লেগে গেল।

    ।। ৫ ।।

    অন্যেরা যখন জিনিসপত্র লুঠ করছিল ক্ষুধার্ত সে সোজা রান্নাঘরের দিকে চলে এল। রান্নাঘরটা তার চেনা। কেননা সে আগেও এখানে এসেছে। রান্নাঘরের পাল্লা খুলতেই মাংসের গন্ধে ভরে উঠলো বারান্দা। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে সে দরজা বন্ধ করে দিল আর একগোছা রুটি নিয়ে গোস্তের হাঁড়িতে ডুবিয়ে খেতে শুরু করল। খেতে খেতে একজনকে দেখে সে উঠল চমকে। বলল, ‘ত-তু-তুমি এখেনে। আগন্তুকের মন্তব্য, ‘নেড়েগুলো কিন্তু গোরুর মাংস বেড়ে রাঁধে মাইরি।’

    ।। ৬ ।।

    জোর তর্ক চলছিল মদের আড্ডায়।
    -- পাইপগান ছাড়া শালা দাঙ্গাই জমে না।
    -- আরে বাবা, বোম্‌ চাই বোম্‌। ছাড়ো একখানা দুড়ুম। শাল্‌লা, সব ফাঁকা।
    -- খুন করে হলে শাল্‌লা তরোয়ালই ভালো। বেশ কুচি কুচি করে কাটা যায়।
    -- ধুত্তোর কোন পুণ্যিই হবে না।
    -- কেন ?
    -- আবে তরোয়ালটা মুসলমানের জিনিস, তুই জানিস না। এক মাতালের মন্তব্য।

    ।। ৭ ।।

    শান্তি ফিরিয়ে আনার কাজে ব্যস্ত থাকায় তাকে –পুরো একমাস কাটাতে হয়েছিল বাইরে। সে বাড়ি ফিরে দেখল ঘর ফাঁকা। বউ পালিয়েছে অন্যের সঙ্গে। পাশের ঘরে জিজ্ঞেস করে সে জানলো, তার আড়াই বছরের মেয়ে কল্যাণীকে নিয়ে গেছে পাশের মহল্লার জামিলা খোলা। ও তাড়াতাড়ি সেখানে গেল। তারপর মেয়ের জন্য কৌটো দুধের খোঁজে তাকে বের হতে হল রাস্তায়।

    সে গোটা শহর ঘুরে বেড়াল। কিন্তু একটাও ওষুধের দোকান খোলা পেল না। একটা দোকান খোলা পেল না। একটা দোকানে সে কেবল তোবড়ানো টিন আর ভাঙ্গা কাচ দেখতে পেল। তাকে হন্যে হয়ে ঘুরতে দেখে একজন জানাল, থানার পাশেই কেবল একটা দোকান খোলা আছে। সে দোকান থেকে মাল নিয়ে বেরোতে না বেরোতেই দোকানটায় লুঠ শুরু হয়ে গেল। সে ছুটতে থাকল। থানার পাশ দিয়ে আসার সময় তাকে এক কনেস্টবল থামাল।
    -- এ্যাই শোন্‌, কি লুঠ করে পালাচ্ছিস ?
    -- কিছু না, আমি লুঠ করি না। লুঠ করাকে আমি ঘেন্না করি।
    -- শালার বড় বড় বাত। হাতে এটা কীরে শুয়োরের বাচ্চা।
    হল্লা শুনে থানার অন্য পুলিশরাও বেরিয়ে এল। তারপর তার দুধের কৌটো কেড়ে নিয়ে আচ্ছা করে পিটিয়ে লুঠ করার অপরাধে কেবল তাকেই পুরে দেওয়া হল লক্‌আপে।

    ।। ৮ ।।

    তার গুমটিটা পুড়িয়ে দেবার পর মহল্লার সব লোকদের জড়ো করে সে মেতে ওঠে দাঙ্গায়। পাশের মহল্লার একটার পর একটা বাড়ি তারা লুঠ করে। বাজারের সব জিনিসপত্তর উধাও হয়ে যায় নিমেষের মধ্যে। সব জায়গায় সে দিচ্ছিল নির্দেশ। কোথাও নিজে লাগায় নি হাত। লুঠ শেষ করে তারা ফিরে আসছে। এমন সময় গলির মুখে পুড়ল একটি গুমটি। সেটা দেখেই একজন চি‌ৎকার করে উঠল, ‘ওই যে আর একটা বাকি।’ শাবলের চাড় দিয়ে পাল্লাটা ভাঙ্গা মাত্র চোখে পড়ল সারি সারি পানের গোছা। সেটা দেখেই সে চি‌ৎকার করে উঠল, খবরদার কেউ হাত লাগাবে না।
    তার তখন নিজের গুম্‌টিটার কথা মনে পড়ছিল।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন