আমেরিকানদের চুক্তিভঙ্গের ইতিহাস
আমেরিকানদের চুক্তি করার ইতিহাসটা অনেকটা সেই ছেলেটার মতো, যে বউকে বলে "আমি আর মদ খাব না", কিন্তু পরের দিনই বন্ধুদের সাথে বারে গিয়ে ফের গ্লাস হাতে ধরা খায়। ব্যাপারটা একদম সিরিয়াস, কিন্তু বলতে গেলে হাসি পায়!
চুক্তি মানে কী? আমেরিকার কাছে তা এক ধরণের 'টিস্যু পেপার'!
আমেরিকা যত চুক্তি করেছে, তার অধিকাংশেরই অবস্থা হয়েছে সেই বিখ্যাত উক্তি "ইটস কমপ্লিকেটেড"-এর মতো। ওদের কাছে চুক্তি মানে যেন টিস্যু পেপার - একবার ব্যবহার করে ফেলে দিতে হবে, বা প্রয়োজনে সেটা দিয়েই মুখ পুঁছে নিতে হবে!
আদিবাসীদের সাথে 'বন্ধুত্বের গল্প'
গল্পটা শুরু করা যাক ১৭০০ শতকের দিকে। তখন আমেরিকা আদিবাসীদের খুব ভালোবাসত, ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে নিয়ে যেত হাজার হাজার একর জমি!
আমেরিকা: "ভাই, তুমি তোমার এই জমিটা আমাকে দাও। আমি তোমাকে চিরকাল মনে রাখব, তোমার যত্ন নেব, খাবার দেব, কম্বল দেব। চলো, চুক্তি করি!"
আদিবাসী: "ঠিক আছে, তোমার মুখ দেখে বিশ্বাস করলাম।"
পরের দিন... ভূগর্ভে স্বর্ণ পাওয়া গেছে!
আমেরিকা: "ওহ! স্বর্ণ! চুক্তি? কোন চুক্তি? ওটা তো ওল্ড ডকুমেন্ট, সেটা মিউজিয়ামে রেখে দাও। বাই দ্য ওয়ে, তোমরা এখান থেকে সরে যাও, ওই রিজার্ভেশনে চলে যাও!"
ব্ল্যাক হিলসের ঘটনা তো ক্লাসিক উদাহরণ। ১৮৬৮ সালে ফোর্ট ল্যারামির চুক্তিতে স্পষ্ট লেখা "ব্ল্যাক হিলস চিরকাল সিউ উপজাতিদের থাকবে"। কিন্তু সেখানে স্বর্ণ পাওয়া যেতেই আমেরিকার মনে পড়ে গেল - "আরে, 'চিরকাল' শব্দটার মানে কী? ওটা তো সাপেক্ষ ব্যাপার!" স্বর্ণ আর আদিবাসীর অধিকার - যেখানে স্বর্ণ, সেখানেই অধিকার ট্রাম্প কার্ড!
কিউবার সাথে 'লিজ-এ-গ্রীণমেন্ট'
এবার ১৯০৩ সালের ঘটনা। আমেরিকা কিউবার কাছ থেকে গুয়ানতানামো বে 'লিজ' নিল। চুক্তি অনুযায়ী, চাইলে যেকোনো পক্ষ চুক্তি বাতিল করতে পারে। কিউবা বিপ্লবের পর ১৯৫৯ সালে বলল, "আমরা বাতিল করলাম। নাও তোমার চেক, নাও তোমার চুক্তি!"
আমেরিকা: "কি? বাতিল? ও, না না না, তুমি ভুল বুঝেছ। আমাদের চুক্তিতে 'বাতিল' শব্দটা আছে, কিন্তু সেটা শুধু তোমাদের জন্য প্রযোজ্য না। আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। আর চেক? ওটা তো রাখো, আমরা খুশি হয়ে তোমাদের ট্যাক্স দেব! কিন্তু চলে যাব? না না, আরাম করো!"
আজও গুয়ানতানামো বে-তে আমেরিকার ঘাঁটি আছে। কিউবা বলছে "যাও", আমেরিকা বলছে "না, আরেকটু থাকি"। ব্যাপারটা অনেকটা সেই মেহমানের মতো, যে বলে "আমি তো এক কাপ চা খেয়েই যাব", কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেখানেই থেকে যায়!
ইরানের সাথে 'ডেট-কাম-ডেট-গো'
২০১৫ সালে ভিয়েনায় বসে বিশ্বের বড় বড় নেতারা ইরানের সাথে এক ঐতিহাসিক চুক্তি করলেন। ইরান বলল, "ঠিক আছে, আমি আমার পরমাণু কর্মসূচি কমিয়ে দেব, তোমরা নিষেধাজ্ঞা তুলে নাও।" বিশ্ববাসী খুশি, শান্তি ফিরল মধ্যপ্রাচ্যে।
তারপর এলেন মি. ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প বললেন, "ওই চুক্তি? সেটা তো খুব খারাপ চুক্তি! ওবামার করা। আমি বাতিল করলাম।"
পুরো বিশ্ব: "কি???"
ইরান: "আপনারা তো বলেছিলেন চুক্তি চিরন্তন!"
আমেরিকা: "চিরন্তন? ওই শব্দটা আবার চুক্তিতে ছিল নাকি? ওটা তো শুধু আদিবাসীদের সাথে করতাম আমরা!"
ট্রাম্প সাহেব একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল করে দিলেন। ইউরোপের মিত্ররা চিৎকার করছে, রাশিয়া বলছে "আমি তো আগেই বলেছিলাম", আর ইরান বসে বসে ভাবছে - "আমার বিশ্বাস করার কী ছিল!"
লিবিয়ার ট্র্যাজিক কমেডি
২০০৩ সালে লিবিয়ার গাদ্দাফি ভাবলেন, "আচ্ছা, আমি যদি আমার সব অস্ত্র পরিত্যাগ করি, তবে পশ্চিমারা কি আমাকে ভালোবাসবে?" ব্রিটেন আর আমেরিকা বলল, "অবশ্যই! তুমি আমাদের বন্ধু। আমরা তোমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি। বিশ্বাস করো!"
গাদ্দাফি বিশ্বাস করলেন। নিজের অস্ত্র কর্মসূচি গুটিয়ে নিলেন। আট বছর পর... ২০১১। আরব বসন্ত। লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ।
আমেরিকা ও ন্যাটো: "ওহে গাদ্দাফি! আমরা তো এসেছি তোমার দেশের মানুষদের বাঁচাতে। তুমি একটু সরে দাঁড়াও তো!"
গাদ্দাফি: "কিন্তু আপনারা তো আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন!"
আমেরিকা: "সেটা তো সেদিনের কথা। আজ নতুন দিন, নতুন হিসাব!"
গাদ্দাফির পরিণতি? তিনি মৃত, দেশ ছারখার। আর লিবিয়ার মানুষ আজ ভাবছে - "বুঝলাম না, অস্ত্র রাখলে খারাপ, রাখলেও খারাপ। শেষ রক্ষা কী?"
এবারো সেটা
অতি সম্প্রতি, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ঘটনাও মনে করিয়ে দেয় এই চুক্তিভঙ্গের ইতিহাস। তালেবানের সাথে দোহাতে চুক্তি করে আমেরিকা বলেছিল "আমরা চলে যাব, কিন্তু শর্ত মেনে"। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই 'অর্ডারলি উইথড্রল'-এর পরিবর্তে যা হলো, তা দেখে আফগান মিত্ররা হতভম্ব! তারা ভাবছে, "আমেরিকা আমাদের কথা দিয়েছিল, কিন্তু কথা তো হাওয়ায় মিশে গেল!"
চুক্তি মানে কী আমেরিকার কাছে?
আমেরিকার চুক্তিভঙ্গের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, ওদের কাছে চুক্তি মানে যেন একটা মুভি টিকিট। দেখলাম, মুভি শেষ, টিকিট ফেলে দিলাম। নতুন মুভি, নতুন টিকিট।
আদিবাসীদের সাথে প্রতারণা থেকে শুরু করে ইরান চুক্তি ভঙ্গ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমেরিকা প্রমাণ করেছে, যখন স্বার্থের প্রশ্ন আসে, চুক্তি তখন তাদের কাছে অনেকটা -এর মতো – যা যখন খুশি যেমন খুশি মোড়ানো যায়!
আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়? তারা এখন আমেরিকার সাথে চুক্তি করার আগে একবার ভাবে - "এই চুক্তি কি কাল পর্যন্ত টিকবে, নাকি আজ রাতেই ভাঙবে?"
তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, আমেরিকা নিজেও জানে যে ওদের এই চুক্তিভঙ্গের খ্যাতি আছে। কিন্তু তাতে কী? ওরা বলে, "দেখো, ইতিহাস তো ইতিহাস। আমরা বর্তমান নিয়ে ভাবি। আর বর্তমানে আমাদের যা খুশি করার ক্ষমতা আছে, সেটাই বড় কথা!"
সুতরাং, আমেরিকার চুক্তি ভঙ্গের ইতিহাস নিয়ে যতই মজা করি না কেন, এর পেছনের বাস্তবতা কিন্তু খুব গম্ভীর। আর এই গম্ভীর বিষয় নিয়ে মজা করার সময়ও মনে রাখতে হবে, যে জাতি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, তারা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। আর আমেরিকা যেন ঠিক সেটাই বারবার প্রমাণ করে চলেছে - বারবার চুক্তি ভাঙা, বারবার নতুন চুক্তি, আর বারবার সেই চুক্তি ভাঙার নাটক!
আর চুক্তিভঙ্গের পেছনে রয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্ন—যা প্রতিবারই টুকরো টুকরো হয়ে গেছে আমেরিকার স্বার্থের বলিতে।)