এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • চাণক্যের শেষ চাল: একটি বাঙালি রাজনৈতিক মহাকাব্য

    হারামির হাতবাক্স লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৫৪ বার পঠিত
  • বাঙালি যখন কাউকে 'চাণক্য' বলে ডাকে, তখন বুঝতে হবে সে লোক হয় অত্যন্ত চালাক, নয়তো অত্যন্ত দুর্ভাগা। কারণ বাঙালির কাছে চাণক্য মানেই এমন কেউ, যিনি সারাজীবন অন্যের জন্য জাল বুনলেন, আর শেষমেশ সেই জালেই নিজে জড়িয়ে পড়লেন। মুকুল রায়ের জীবনটাও ঠিক এইরকম একটি অদ্ভুত বাঙালি গল্প — যেখানে চতুরতা আর ভাগ্য, দুটোই পাল্লা দিয়ে হেরেছে।
     
    ২০১৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। মাসের শেষ দিন। বাঙালি সাধারণত মাসের শেষে বেতন পায়, কিন্তু মুকুল রায় সেদিন পেলেন পদচ্যুতির নোটিশ। সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো — দলের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে, একটি ঘোষণার মাধ্যমে, অত্যন্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। বাঙালি রাজনীতিতে 'গণতন্ত্র' মানে হলো, নেত্রী যা ঠিক করেছেন সেটাই সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হওয়া। এই প্রক্রিয়ায় কেউ দ্বিমত করেন না, কারণ দ্বিমত করার মানুষগুলো সাধারণত আগেই 'বদলি' হয়ে যান।
     
    মুকুলবাবুর পদচ্যুতিটা অবশ্য একদিনেই হয়নি। আগের দিন, ২৭ ফেব্রুয়ারি, তাঁকে রাজ্যসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলনেতার পদ থেকেও সরানো হয়েছিল। অর্থাৎ, দু'দিনে দু'টো পদ। বাঙালি যদি এত দ্রুততায় অফিসের কাজ করত, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ আজ সিঙ্গাপুর হতো। কিন্তু বাঙালি এই ক্ষিপ্রতা দেখায় শুধু তখনই, যখন কাউকে সরানোর বিষয় থাকে। লাগানোর সময় ফাইল আটকে থাকে, সরানোর সময় রকেটগতি।
     
    ১৯৯৮ সাল থেকে মুকুল রায় এই পদে ছিলেন। অর্থাৎ যখন থেকে দল গঠন হয়েছে, তখন থেকে। সতেরো বছর। সতেরো বছরে একজন বাঙালি সন্তান জন্মায়, মাধ্যমিক দেয়, এবং বুঝতে পারে যে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া উচিত ছিল কি না। মুকুলবাবু সতেরো বছর দলের জন্য শ্রম দিলেন, আর শেষে পেলেন একটি মসৃণ 'বিদায়'। বাঙালি প্রতিষ্ঠানের এটাই সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য — কৃতজ্ঞতার আয়ু সাধারণত উপযোগিতার চেয়ে কম।
     
    এই 'অন্তর্দ্বন্দ্বে'র গল্পটি মূলত দুটি প্রজন্মের মধ্যে একটি ক্লাসিক সংঘাত। একদিকে পুরনো, অভিজ্ঞ, সাংগঠনিক দক্ষতায় পরিপক্ক মুকুল রায়। অন্যদিকে তরুণ, উদীয়মান, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে — পারিবারিক সম্পর্কে এগিয়ে থাকা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বাঙালি রাজনীতিতে 'মেধা' এবং 'রক্তের সম্পর্ক' — এই দুইয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা হলে ফলাফল সাধারণত বলে দেওয়া যায়। বলিউডের সিনেমার মতো, শেষ দৃশ্যে পরিবার জেতে।
     
    সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারি এই গল্পে একটি চমৎকার 'প্লট টুইস্ট' এনেছিল। সিবিআই যখন মুকুলবাবুকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল, দলের ভেতরে একটি সংশয় তৈরি হলো — এই লোক না জানি কী বলে দিচ্ছে! বাঙালি রাজনীতিতে এই 'না জানি কী বলে দিচ্ছে' আশঙ্কাটি অত্যন্ত কার্যকর একটি হাতিয়ার। আসলে কে কী বলেছে তার চেয়ে বড় ব্যাপার হলো — কে কী বলতে পারে, সেই সম্ভাবনাটুকুই যথেষ্ট। বাঙালি কল্পনাশক্তি কাজের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়।
     
    দলের দিল্লি অফিস মুকুল রায়ের বাড়ি থেকে সরিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হলো। এটি ছিল একটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা। বাঙালি রাজনীতিতে সরাসরি কিছু বলা হয় না — অফিস সরিয়ে দেওয়া হয়, ফোন ধরা বন্ধ হলো, চায়ের আমন্ত্রণ আসা বন্ধ হলো। মুকুলবাবু নিশ্চয়ই সেদিন বুঝেছিলেন যে বাতাসে কিছু একটা বদলে যাচ্ছে। বাঙালির রাজনৈতিক 'বায়োস্কোপ'-এ তিনি আর নায়ক নন, পার্শ্বচরিত্রেও নন — তিনি এখন সেই দৃশ্যের মানুষ, যার নাম কৃতিত্ব তালিকায় থাকে না।
     
    মুকুলবাবুর জায়গায় এলেন সুব্রত বক্সী। বাঙালি রাজনীতিতে 'বিশ্বস্ত' বলে একটি শ্রেণি আছে, যারা নিজে কখনো বড় হওয়ার চেষ্টা করেন না, বরং নেতার ছায়ায় থেকে আনুগত্যের পুরস্কার পান। এই শ্রেণিটি টিকে থাকার বিদ্যায় পারদর্শী। মুকুলবাবু হয়তো একটু বেশিই 'স্বতন্ত্র' হয়ে যাচ্ছিলেন। আর বাঙালি দলীয় রাজনীতিতে 'স্বতন্ত্রতা' হলো সেই গুণ, যেটা নেতার মধ্যে থাকলে 'দূরদর্শিতা' আর কর্মীর মধ্যে থাকলে 'বিশ্বাসঘাতকতা'।
     
    এই পুরো প্রক্রিয়াটিতে পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং কুনাল ঘোষের মতো নেতারাও নিজ নিজ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁরা মুকুল রায়ের 'দলবিরোধী' কাজের সমালোচনা করেছিলেন। রাজনীতিতে 'দলবিরোধী কাজ' একটি চমৎকার অভিযোগ — এর সংজ্ঞা নির্ভর করে কে অভিযোগ করছে তার ওপর, অভিযুক্তের কাজের ওপর নয়। পরবর্তীকালে অবশ্য পার্থবাবু নিজেও বিভিন্ন 'কাজ'-এর জন্য আলোচনায় এলেন, কিন্তু সেটা ভিন্ন গল্প, ভিন্ন অধ্যায়।
     
    ২০১৭ সালে মুকুলবাবু তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিলেন। বাঙালি রাজনীতিবিদের দলবদল একটি প্রাচীন ও সম্মানজনক ঐতিহ্য। এতে দোষের কিছু নেই — মানুষ চাকরি বদলায়, বাড়ি বদলায়, দলও বদলায়। মুকুলবাবু এই বদলটা একটু দেরিতে করলেন, কিন্তু করলেন। তবে বিজেপিতে গিয়েও তিনি শেষ পর্যন্ত 'চাণক্য' হয়ে উঠতে পারলেন না — পরে আবার ফিরলেন, আবার গেলেন। বাঙালির রাজনৈতিক যাত্রা অনেকটা লোকাল ট্রেনের মতো — গন্তব্য থাকে, কিন্তু কোন স্টেশনে কতক্ষণ থামবে সেটা আগে থেকে বলা যায় না।
     
    শেষটা এলো ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, ভোররাত দেড়টায়। কলকাতার সল্টলেকের অ্যাপোলো হাসপাতালে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭১ বছর বয়সে চলে গেলেন মুকুল রায়। দীর্ঘদিন ধরে কিডনির সমস্যা, ডিমেনশিয়া, স্নায়বিক জটিলতায় ভুগছিলেন। শেষ কয়েক বছর কোমায় ছিলেন। বাংলার রাজনীতির এই 'চাণক্য' যে মানুষটি একদিন সমস্ত সুতো নিজের হাতে ধরে রাখতেন, তিনি শেষজীবনে নিজের স্মৃতির সুতোটুকুও ধরে রাখতে পারলেন না।
     
    ছেলে সুভ্রাংশু রায় মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করলেন। রাজনৈতিক মহলে শোকের ছায়া নামল। যাঁরা একদিন তাঁকে সরিয়েছিলেন, তাঁরাও শোক জানালেন। বাঙালি রাজনীতির এটাই সবচেয়ে মানবিক দিক — জীবদ্দশায় যাকে ছাঁটাই করা হয়, মৃত্যুর পর তাকে 'অপরিহার্য' বলা হয়। এই সৌজন্যটুকু বাঙালি বিনামূল্যে দেয়, কারণ তখন আর কোনো ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকে না।
     
    মুকুল রায়ের জীবন আসলে বাংলার রাজনীতির একটি ছোট্ট দর্পণ। যেখানে বিশ্বস্ততা একটি মেয়াদি আমানত, ক্ষমতা একটি ঘূর্ণায়মান চেয়ার, এবং চাণক্যরাও শেষমেশ ইতিহাসের পাদটীকায় পরিণত হন। বাঙালি এই গল্প বারবার দেখেছে, বারবার ভুলেছে, এবং পরের দফায় আবার একই অবাক বিস্ময়ে দেখেছে — 'এ কী হলো!'
     
    এটাই বোধহয় বাঙালির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না, কারণ ইতিহাস পড়তে বসলেই ঘুম আসে। আর রাজনীতির ইতিহাস পড়তে বসলে — আরও দ্রুত।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • dc | 2a09:bac2:3f40:16b4::243:***:*** | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:১১738763
  • মুকুল রায় বিরাট করাপ্ট লোক ছিল। এই লেখাটা পড়ে বুঝলাম পটোল তুলেছে।লোকটার জেলে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু যেতে হলো না। ভাগ্য ভালো বলতে হবে। 
  • কৌতূহলী | 115.187.***.*** | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৪৬738767
  • মুকুল ,দেখতে পাচ্ছ সোনার কেল্লা? 
    ওটা দুষ্টু লোক। 
    দুষ্টু লোক আজকে ভ্যানিশ হলেন। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন