এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • রাগ পুনর্গঠন ও পার্টির আত্মা অয়ন মুখোপাধ্যায়

    Ayan Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩৬ বার পঠিত
  • রাগ, পুনর্গঠন ও পার্টির আত্মা
     
    অয়ন মুখোপাধ্যায়
     
    রাগ আছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়: এই রাগটা কাদের বিরুদ্ধে? পার্টির বিরুদ্ধে, নাকি পার্টির ভেতরে জমে ওঠা কিছু বিকৃতির বিরুদ্ধে?
     
    যে সংগঠন কেবল একটি নির্বাচনযন্ত্র নয়, যে সংগঠনের যে পার্টির ইতিহাসে, রক্ত, ত্যাগ আর মতাদর্শের দীর্ঘ অনুশীলন আছে—তার বিরুদ্ধে রাগ সহজে জন্মায় না। রাগ জন্মায় তখনই, যখন প্রত্যাশা ভাঙে। যখন দেখা যায়, আদর্শের জায়গায় ব্যক্তি বড় হয়ে উঠছে; তাত্ত্বিক চর্চার জায়গায় কৌশলী নীরবতা; সংগঠনিক গণতন্ত্রের জায়গায় গোষ্ঠীসর্বস্ব আধিপত্য।
    দীর্ঘ সময় সরাসরি যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট দেখেছি—গত দুই দশকে পার্টির নেতৃত্বের একাংশ ক্রমশ মতাদর্শিক দৃঢ়তা হারিয়েছে। রাজনৈতিক শিক্ষা কমেছে, তাত্ত্বিক আলোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। সমালোচনা উঠলেই বা প্রশ্ন করলেই তাকে ‘শৃঙ্খলাভঙ্গ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভিন্নমতকে সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে পার্টির ভেতরে সেটা চেপে রাখার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে সংগঠন ভেতর থেকে শক্তিশালী হওয়ার বদলে আরও ভঙ্গুর হয়েছে।
     
    এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট করে বলা দরকার ।পার্টি একটি ঐতিহাসিক সত্তা। তাকে চালান কিছু ব্যক্তি। ব্যক্তি ভুল করতেই পারেন, পথভ্রষ্ট হতে পারেন, এমনকি ব্যক্তিস্বার্থে সংগঠনকে ব্যবহারও করতে পারেন। কিন্তু সেই বিচ্যুতি গোটা পার্টির সাথে সমার্থক নয়। রাগ যদি থাকে, তবে তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক, এটা পার্টির ভেতরের নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে।
     
    প্রতিকূরের বক্তব্য এই দ্বন্দ্বটাকেই পরিষ্কার করে দেয়। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—এত রাগ কেন পার্টির উপর? তাঁর উত্তর ছিল সরল ও তীব্র ভাবে বলেছেন
    “এই পার্টির জন্য প্রাণ দিতে বসেছিলাম। অসংখ্য কমরেড প্রাণ দিয়েছেন। রাগ পার্টির উপর নয়। রাগ তাঁদের উপর, যারা কর্মীদের চুপ করিয়ে রাখতে চান। হাজার হাজার কর্মী প্রতিদিন সংগঠনের ভেতরেই অপমানিত হন। তাঁদের রাগও পার্টির বিরুদ্ধে নয়—কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে।”
     
    এই বক্তব্যে আবেগ আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা এই কথাগুলোর মধ্যে একটা রাজনৈতিক সততা আছে। কারণ যে সংগঠনের প্রতি টান নেই, যে সংগঠনকে ভালোবাসে না তার বিরুদ্ধে কেউ ক্ষুব্ধ হয় না। রাগ আসলে প্রত্যাশার অন্য নাম। রাগ মানে বিচ্ছেদ নয়; রাগ মানে ভাঙা বিশ্বাসকে পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা।
     
    তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন সংগঠন ধীরে ধীরে মতাদর্শ থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিনির্ভর হয়ে ওঠে। যখন সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে কোনো নীতি , থাকে ব্যক্তি। যখন শাখা স্তরের কর্মীর প্রশ্নকে বা তার আবেগকে গুরুত্ব না দিয়ে তাকে চুপ করে থাকতে বলা হয়। যখন সংগঠনকে কেবল নির্বাচনী মেশিনে রূপান্তরিত হয়ে যায় যখন সাংগঠনিক কাজ মানে একটা আমলা তান্ত্রিকতা লক্ষ্য করা যায় তখন ক্ষয় শুরু হয় ভেতর থেকে।
     
    কমিউনিস্ট ঐতিহ্য ব্যক্তিপূজার নয়। বরং বামপন্থী দলগুলির মধ্যে যে সংগঠনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল এমন নেতৃত্বের হাত ধরে, যাঁরা ব্যক্তিগত প্রচারের চেয়ে সমষ্টিগত সিদ্ধান্তকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। যেমন জ্যোতি বসু কিংবা বিনয় কোঙার-এর রাজনৈতিক চরিত্রে সংযম, তাত্ত্বিক দৃঢ়তা এবং সংগঠনিক শৃঙ্খলা ছিল স্পষ্ট। মতবিরোধ ছিল, বিতর্ক ছিল, কিন্তু মতাদর্শ কেন্দ্রে ছিল দল।আজ যদি সেই কেন্দ্রে ফাঁক দেখা যায়, প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। এখানে বাজারে সোশ্যাল মিডিয়ারে পার্টির অভ্যন্তরে চিঠি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
     
    তবে এখানে আরও একটি বাস্তবতা আছে। নির্বাচনের মুখে কিংবা রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের সময় প্রকাশ্য কোন নেতৃত্ব যদি অভিযোগের ঝাঁপি খোলেন তাহলে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হয়। আত্মসমালোচনা জরুরি, কিন্তু তা হতে হবে সংগঠনের ভেতরে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে। প্রকাশ্য আত্মপ্রসাদ সংগঠনকে শুদ্ধ করে না; বরং দুর্বল করে।
    তাই প্রশ্নটা রাগের নয়; রাগের ব্যবহার নিয়ে। রাগ যদি সংগঠনের বিরুদ্ধে যায়, তা ধ্বংস ডেকে আনে। কিন্তু রাগ যদি সংগঠনকে পরিশুদ্ধ করতে চায়, তবেই পুনর্গঠনের শুরু হবে 
     
    একজন কর্মী চলে যেতেই পারেন। কিন্তু যদি হাজার হাজার সৎ কর্মী কে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পার্টি ফাঁপা হয়ে যাবে। পার্টি ভাঙে বাইরের আক্রমণে নয়; ভাঙে ভেতরের অবক্ষয়ে। আবার পুনর্জন্মও শুরু হয় ভেতর থেকেই—আত্মসমালোচনার সাহস, মতাদর্শে প্রত্যাবর্তন এবং ব্যক্তির উপর নীতির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। রাগ আছে। কারণ ভালোবাসা আছে। কারণ এই সংগঠনের ইতিহাস এখনও মূল্যবান।প্রশ্ন তাই রয়ে যায়—রাগ কি বিভাজনের হাতিয়ার হবে, না কি পুনর্গঠনের? পুনর্জাগরণের সূর্যোদয় হবে সেটা পরবর্তী সময় বলবে তবে উত্তর নির্ভর করছে তাদের উপর, যারা এখনও নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন, বিশ্বাস হারাননি, কিন্তু প্রশ্ন তুলতে ভয় পান না।সেই প্রশ্নই পার্টির প্রকৃত শক্তি।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন