একদিন আমি গেলাম এক ইংরেজ চিত্রশিল্পীর স্টুডিওতে। তার নাম ছিল মিস্টার উইলকিনসন। তিনি একজন খ্যাতনামা শিল্পী। আমি তাঁকে বললাম, "স্যার, আমি ন্যাংটা মডেল।"
তিনি ঘরে তাকালেন। কাউকে দেখতে না পেয়ে বললেন, "হু ইজ দেয়ার?"
আমি বললাম, "আই এম হেয়ার। আই অ্যাম এ গোস্ট।"
তিনি ভাবলেন, হয়তো তাঁর মদ খাওয়ার ফল। তিনি বললেন, "অহ, ইটস দ্য হ্যাংওভার।"
তিনি আমাকে পাত্তাই দিলেন না। আমি ন্যাংটা পোজ দিলাম। তিনি কিছুই দেখলেন না। শুধু বললেন, "দ্য উইন্ডো ইজ ওপেন। দ্যাটস হোয়াই আই ফিল কোল্ড।"
বন্ধ করে দিলেন জানালা।
১৩.
এরপর আমি বাঙালি চিত্রশিল্পীদের কাছে গেলাম। একজন ছিলেন শিবপ্রসাদ বসু। তিনি তখন পোট্রেট আঁকতেন। আমি তাঁর কাছে গেলাম। বললাম, "মশাই, ন্যাংটা মডেল লাগবে?"
তিনি চশমা নামিয়ে আমাকে দেখলেন। বললেন, "কৈ? কেউ তো নাই।"
আমি বললাম, "আমি এখানে দাঁড়াইয়া আছি!"
তিনি হাত দিয়ে ঝাড়া দিলেন। বললেন, "উঁহু, শুধু হাওয়া লাগছে।" তারপর নিজেই নিজেকে বললেন, "তুমি আমার বাবার বাবা / বাবা কল্পতরু গো / তোমায় ভজে মুখটি হনু / পুঁকটি হলো সরু গো ।বুঝেছি, বেশি ভাঙ খেয়েছি। "
তিনি আমাকে দেখতে না পেয়েও আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "যদি কোনো ভূত থাকে, তাহলে বল, আমি তাড়িয়ে দেব।"
আমি বললাম, "না, আমি তাড়াতে চাই না। পোজ দিতে চাই।"
কিন্তু তিনি শুনলেন না। তিনি ভাবলেন তাঁর মাথা খারাপ হয়েছে। শেষে ডাক্তার ডাকলেন।
১৪.
এমনি করে গেল আরো একশ বছর। ১৯০০ সাল এসে গেল। শহরে ফটোগ্রাফি এসে গেল। আমি প্রথমবার ক্যামেরা দেখলাম। এক সাহেব একটা বড় ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি একজন মানুষকে বসিয়ে ছবি তুলছেন। ক্লিক! আর সেই মানুষটির ছবি বেরিয়ে এল!
আমি তো অবাক! এ কী জাদু! আমি তখনই সাহেবের কাছে গেলাম। বললাম, "স্যার, আমার ন্যাংটা ছবি তুলবেন?"
সাহেব কাউকে দেখতে না পেয়ে বললেন, "হুজ ডিস?"
আমি বারবার বললাম। কিন্তু তিনি শুনলেন না। শেষে তিনি ভাবলেন, হয়তো তাঁর কানে ভূত ঢুকেছে। তিনি ডাক্তারের কাছে গেলেন।
১৫.
এরপর আমি অনেক ফটোগ্রাফারের কাছে গেলাম। সবাই একই কথা বলল। কেউ কেউ তো আমাকে তাড়ানোর জন্য ওঝা ডাকল। ওঝা এসে নাচতে শুরু করল, মন্ত্র পড়ল, আমার উপর লবণ ছিটাল। আমি দাঁড়িয়ে থেকে দেখলাম। শেষে ওঝা ক্লান্ত হয়ে পড়ল। আমি তখন ওঝাকে বললাম, "ওঝা মশাই, একটু ন্যাংটা পোজ দেবেন?"
ওঝা চিৎকার করে পালাল।
একজন ফটোগ্রাফার তো খুব চালাক ছিল। সে বলল, "আমি যদি তোমার ছবি তুলি, তুমি কি আমাকে সোনা দেবে?"
আমি বললাম, "হ্যাঁ, আমার কবরে সোনা পোঁতা আছে।"
সে বলল, "তাহলে কবর থেকে সোনা এনে দাও। তারপর ছবি তুলব।"
দিলাম। কিন্তু সে ছবি তুলল না। বলল, "কীভাবে তুলব? তুমি তো দেখা যাচ্ছ না!"
আমি রেগে গেলাম। আমি তার সব ক্যামেরা ভাঙলাম। সে চিৎকার করে পালাল।
১৬.
এভাবেই কেটে গেল আরো একশ বছর। ২০০০ সাল এসে গেল। ইন্টারনেট এল। মোবাইল এল। আমি প্রথমে বুঝতেই পারলাম না এগুলো কী। আমি দেখলাম মানুষ ছোট ছোট বাক্সে কথা বলছে। আমি ভাবলাম, এগুলো জাদুর বাক্স।
একদিন আমি একজন তরুণের ঘরে ঢুকলাম। সে কম্পিউটারে কাজ করছিল। আমি তার পাশে দাঁড়ালাম। সে ইন্টারনেটে ন্যাংটা ছবি দেখছিল! আমি তো খুশিতে নাচতে লাগলাম! শেষ পর্যন্ত! পৃথিবীতে এখন ন্যাংটা ছবির কদর আছে!
কিন্তু সমস্যা হলো, সেই ছবিগুলোতে মানুষ দেখছিল, ভূত নয়। আমি ভাবলাম, আমিও তো ন্যাংটা ছবি দেব। কিন্তু কীভাবে?
১৭.
আমি কম্পিউটার শিখতে শুরু করলাম। প্রথমে শিখলাম কীভাবে মাউস চলায়। রাতে যখন সেই তরুণ ঘুমাত, আমি কম্পিউটার চালু করতাম। কিন্তু সমস্যা হলো, আমি ভূত হওয়ায় মাউস ধরতে পারতাম না। আমার হাত দিয়ে মাউস ভেদ করে যেত।
তাই আমি অন্য উপায় বের করলাম। আমি তরুণের স্বপ্নে ঢুকতাম। স্বপ্নে আমি তাঁকে বলতাম, "তুমি যদি আমার ন্যাংটা ছবি তোল, আমি তোমাকে সোনা দেব।"
তরুণ প্রথমে ভয় পেত। তারপর ভাবত, হয়তো তার মাথা খারাপ। শেষে সে মানসিক ডাক্তারের কাছে গেল।
১৮.
এভাবে আবারও কেটে গেল বছর পনেরো। ২০১৫ সাল। আমি এখনও একই অবস্থায়। এখনও ন্যাংটা। এখনও কেউ আমাকে দেখে না। আমার নেশা এখনও আছে, কিন্তু হতাশাও অনেক।
একদিন আমি হাঁটছিলাম পার্ক সার্কাস এলাকায়। দেখলাম একটি ছোট্ট ফ্ল্যাট। ভিতরে একজন তরুণ বসে আছে। তার চোখে হতাশা। পাশে ক্যামেরা। ঘরে অগোছালো। আমি ভাবলাম, এই লোকটিরও কিছু সমস্যা আছে। হয়তো সে আমাকে বুঝতে পারবে।
ঘরে ঢুকলাম। তরুণটির নাম ইমন। সে ফটোগ্রাফার। কিন্তু সফল নয়। কাজ পায় না। টাকার অভাব। সে বসে বসে ইন্টারনেটে অন্যের ছবি দেখে আর হতাশ হয়।
আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রথমে কিছু বললাম না। শুধু দেখলাম। সে এক কাপ কফি খাচ্ছিল। হঠাৎ সে আমার দিকে তাকাল। যদিও আমাকে দেখতে পেল না, কিন্তু যেন কিছু অনুভব করল।
সে বলল, "কেউ এখানে আছে নাকি?"
আমি অবাক! এই প্রথম কেউ আমার উপস্থিতি টের পেল!
১৯.
আমি বললাম, "হ্যাঁ, আমি এখানে আছি।"
ইমন চমকে উঠল। চারদিকে তাকাল। বলল, "কে বলল?"
আমি বললাম, "আমি। আমি ভূত।"
ইমন হেসে ফেলল। বলল, "আমারও মাথা খারাপ হয়েছে। এখন ভূতের সঙ্গে কথা বলছি!"
আমি বললাম, "না, সত্যি। আমি ভূত। এবং আমি ন্যাংটা মডেল হতে চাই।"
ইমন এবার গম্ভীর হল। বলল, "যদি সত্যিই তুমি ভূত হও, তাহলে প্রমাণ দাও।"
আমি কী করি? আমি তার কাপের কফি সরিয়ে নিলাম। কাপটি টেবিলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে গেল।
ইমন চোখ বড় করে দেখল। বলল, "এটা কী? জাদু?"
আমি বললাম, "না। আমি করেছি।"
২০.
ইমন এবার বিশ্বাস করল। সে ভয় পেল না। বরং কৌতূহলী হল। বলল, "তুমি সত্যিই ভূত? এবং ন্যাংটা মডেল হতে চাও?"
আমি বললাম, "হ্যাঁ। ৪০০ বছর ধরে চেষ্টা করছি। কেউ আমার ছবি তুলতে পারেনি।"
ইমন হাসল। বলল, "কারণ তুমি ভূত। তোমার ছবি উঠবে না।"
আমি বললাম, "কেন? আমি তো আছি!"
ইমন বলল, "তুমি আছ, কিন্তু তোমার দেহের উপাদান আলাদা। তোমার রিফ্লেকটিভ ইনডেক্স..."
আমি বাধা দিলাম, "ইংরেজি বলবেন না! বাংলায় বলুন!"
ইমন বলল, "সোজা বাংলায় বলি — তুমি বাতাসের মত। ক্যামেরা বাতাসের ছবি তুলতে পারে না।"
আমি হতাশ হয়ে বললাম, "তাহলে কি আমার ন্যাংটা ছবি কখনো উঠবে না?"
ইমন ভাবল। তারপর বলল, "চেষ্টা করে দেখা যাক। কিন্তু আগে তুমি কেন ন্যাংটা হতে চাও?"
আমি আমার পুরো গল্প বললাম। মৃত্যুর গল্প। নেশার গল্প। ৪০০ বছরের সংগ্রামের গল্প।
ইমন শুনল। শেষে বলল, "তুমি পাগল ভূত। আমি পাগল ফটোগ্রাফার। আমরা দুজনেই পাগল। চল, চেষ্টা করি।"
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।