জিহ্বার প্রত্নতত্ত্বজিভে লাগছে। কিন্তু স্বাদ নেওয়া হচ্ছে না, স্বাদ আক্রান্ত হচ্ছে, আক্রমণ করছে স্বাদকোরকগুলোকে, যারা প্রতিটা এক অন্ধ, স্পর্শকাতর সৈন্য, যারা রাসায়নিক সংকেতকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে, কিন্তু এবার সেই সংকেতগুলো উল্টোপথে চলছে, বাইরে থেকে ভিতরে না, ভিতর থেকে বাইরের দিকে, জিভের ডগা থেকে বেরিয়ে আসছে স্বাদ, জিভ স্বাদের উৎস হয়ে উঠছে, জিভ নিজেই স্বাদ। আর সেই স্বাদগুলো শুধু মিষ্টি, নোনতা, টক, তেতো, উমানি নয়, স্বাদগুলো এখন ধারণা, আবেগ, স্মৃতি, ভবিষ্যৎ, অনুতাপ, গর্ব, সন্দেহ, নিশ্চয়তা—সবকিছু। স্বাদের বিপর্যয় ঘটেছে, স্বাদের রাজ্যে অভ্যুত্থান, স্বাদের গৃহযুদ্ধ।
প্রথম স্তর: মুখের ভিতরের মৌলিক স্বাদ। শুষ্কতা। জিভ তালুতে লেগে আছে, খসখসে, ধুলোয় ধূসর, সেই ধুলোর স্বাদ মাটি না, ছাই, না, কিছু মৃতের দেহের গুঁড়ো, যা পানির অভাবে গলাধঃকরণের চেষ্টা করছে, কিন্তু পানি নেই, আছে শুধু লালা, কিন্তু লালাও গাঢ়, আঠালো, তার স্বাদ এক ধরনের ধাতব মিষ্টত্ব, যেমন রক্তের স্বাদ, কিন্তু রক্ত নয়, রক্তের সম্ভাবনা। তারপর দাঁতের মাড়ির স্বাদ, একটি মৃদু রক্তাভ স্বাদ, যেন দাঁতে দাঁতে ঘষা লেগেছে, সামান্য রক্তপাত হয়েছে, অদৃশ্য, কিন্তু স্বাদে টের মেলে। গলার ভিতর দিয়ে নিঃশ্বাস যাওয়ার সময় বাতাসের স্বাদ—ধূসর, ঠাণ্ডা, ফাঁপা, কোনও পুষ্টিহীনতা।
দ্বিতীয় স্তর: রক্তের স্বাদ। কিন্তু রক্ত নয়, রক্তের স্মৃতি, যা জিভের উপর একদিন লেগেছিল, যখন নিজের রক্ত, অথবা অন্যের রক্ত ছিটকে এসে মুখে পড়েছিল। সেই স্বাদ স্তরে স্তরে: প্রথমে লবণের মতো, তীক্ষ্ণ, তারপর লোহার মতো, ভারী, ধাতব, তারপর একটু মিষ্টি, যেমন পাকা ফলের স্বাদ, কিন্তু সেই মিষ্টির পরেই তিতা, একটি গভীর তিক্ততা যা গলার পেছন পর্যন্ত নেমে যায়, পাকস্থলীতে গিয়ে আগুন জ্বালায়। রক্তের স্বাদ বারবার ফিরে আসে, বিশেষ করে যখন জিভ শুষ্ক হয়, তখন লালার পরিবর্তে রক্তের স্বাদ নিঃসৃত হয়, মনে হয় যেন দেহ ভিতর থেকে রক্তের স্বাদ তৈরি করছে, যেন দেহই এখন একটি রক্তের স্বাদের কারখানা।
তৃতীয় স্তর: মাটির স্বাদ। হাঁটতে হাঁটতে ধুলো উড়ে মুখে আসে, জিভে লাগে, গিলে ফেলতে হয়। সেই ধুলোর স্বাদ এক নয়, বহু। কোনওটা লাল মাটির, কোনওটা বালি, কোনওটা কাদা শুকনো হয়ে যাওয়া, কোনওটা পাথরের গুঁড়ো। মাটির স্বাদে মিশে থাকে সেই মাটিতে যা ঘটেছে তার স্বাদ—রক্ত, ঘাম, মূত্র, শ্লেষ্মা, অশ্রু, বীর্য, সবকিছুর আণবিক অবশেষ। মাটি স্বাদে তিক্ত, কিন্তু সেই তিক্ততায় একটি গভীর সত্য নিহিত, একটি স্বীকারোক্তি যে সবকিছুই শেষ পর্যন্ত মাটিতে মিশে যাবে, মাটির স্বাদই শেষ স্বাদ।
চতুর্থ স্তর: ধনুকের ছিলার স্বাদ। কখনো ধনুকের ছিলা কামড়ে ধরতে হয়েছে দাঁত দিয়ে, যখন দুই হাত ব্যস্ত, তখন দাঁত দিয়ে টেনে ধরে রাখতে হয়েছে ছিলাকে। সেই চামড়ার স্বাদ—নোনতা, তিক্ত, মানবদেহের ঘামে ভেজা, আর একধরনের ভেষজ গন্ধ যা ছিলা সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হতো, নিমপাতা, বা অন্য কিছু, তার তেতো স্বাদ। চামড়া কখনো কখনো ফেটে যেত, দাঁতে লাগত তার ভিতরের স্তর, আরো তিক্ত, আরো কষা। সেই স্বাদ মুখে থাকত দিনের পর দিন, এমনকি খাবার সময়েও, ছিলার স্বাদ খাবারের স্বাদকে ঢেকে দিত, খাবারও হয়ে যেত ছিলার স্বাদ, জীবনও হয়ে যেত ছিলার স্বাদ—একটি নোনতা, তিক্ত, দৃঢ় স্বাদ যা আটকে থাকে জিভের পৃষ্ঠে, সময়েও মোছা যায় না।
পঞ্চম স্তর: জলের স্বাদ। কিন্তু বিশুদ্ধ জলের স্বাদ মনে নেই, জলের স্বাদ এখন বিভিন্ন নদী, বিভিন্ন কুয়ো, বিভিন্ন পাত্রের স্বাদে মিশে গেছে। যমুনার জলের স্বাদ—একটু মিষ্টি, বালির আভাস। গঙ্গার জলের স্বাদ—গম্ভীর, ধাতব, পবিত্রতার একটি স্বাদ যা লবণাক্ত নয়, কিন্তু ওজন আছে। যুদ্ধের ময়দানের কাদা-জলের স্বাদ—বমি করার মতো, পচন, মৃত্যুর স্বাদ। আর শত্রু শিবির থেকে চুরি করা জলের স্বাদ—ভয়ের স্বাদ, প্রতারণার স্বাদ, কিন্তু তৃষ্ণায় সেই স্বাদও অমৃত। জল এখন দুর্লভ, তাই জলের স্বাদ এখন একটি স্মৃতি, একটি প্রত্যাশা, যা জিভকে শুষ্ক করে তোলে আরো বেশি।
ষষ্ঠ স্তর: খাদ্যের স্বাদ। কিন্তু খাদ্য শুধু পুষ্টি নয়, খাদ্য এখন সামরিক রসদ, শুকনো চানা, যবের গুড়ো, শক্ত বাটি, কখনো শিকার করা মাংস যা অর্ধপাক। সেই মাংসের স্বাদ—রক্তের স্বাদ, আগুনের স্বাদ, ধোঁয়ার স্বাদ, আর তাড়াহুড়োর স্বাদ, কারণ খাওয়ার সময় নেই, চিবিয়ে খেতে হবে দ্রুত, গিলতে হবে, পাকস্থলীতে নামাতে হবে, শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। চানার স্বাদ শুষ্ক, গলায় আটকে যায়, জলের প্রয়োজন হয়, কিন্তু জল নেই, তাই চানা গলার ভিতর আটকে থেকে একটি তিক্ত স্বাদ ছড়ায়। সেই সময়ের কিছু ফল, বনের ফল, তাদের স্বাদ অচেনা, কিছু মিষ্টি, কিছু তিতা, কিছু বিষাক্ত, কিন্তু ক্ষুধা এত তীব্র যে স্বাদ গুরুত্বহীন, খেতে হবে, বাঁচতে হবে। খাদ্যের স্বাদ এখন বাঁচার স্বাদ, জীবনের স্বাদ নয়, জীবনের জন্য লড়াইয়ের স্বাদ।
সপ্তম স্তর: প্রেমের স্বাদ। একটি স্ত্রীর রান্না করা খাবারের স্বাদ? না, তা নয়, প্রেমের স্বাদ সরাসরি ওষ্ঠের স্বাদ, চুম্বনের স্বাদ, কিন্তু চুম্বন কি ছিল? স্মৃতি অস্পষ্ট। চুম্বনের স্বাদ এখন লবণের মতো, কারণ অশ্রু মিশেছে, বিচ্ছেদের অশ্রু। প্রেমের স্বাদ এখন একটি মিশ্র স্বাদ—মিষ্টি, তিতা, নোনতা, টক—সবকিছু একসাথে, একটি জটিল স্বাদ যা বিশ্লেষণ করা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়, এবং সেই অনুভব বেদনাদায়ক, কিন্তু সেই বেদনাই একমাত্র স্বাদ যা জীবনের অনুভূতি দেয়, যা মনে করিয়ে দেয় যে এই দেহ এখনো , এখনো কামনা করে, এখনো ভালোবাসার স্মৃতিতে ভিজে থাকতে চায়। প্রেমের স্বাদ মুখে আসে যখন চোখ বন্ধ হয়, যখন সেই সব মুখ মনে পড়ে, সেই সব কথার প্রতিধ্বনি কানে বাজে, তখন জিভে লাগে একটি অদৃশ্য স্বাদ, যা খাদ্য নয়, যা শুধু একটি আবেগের রাসায়নিক প্রকাশ।
অষ্টম স্তর: ভয়ের স্বাদ। ভয়ের স্বাদ শুষ্ক, ধাতব, যেমন লোহার গন্ধার সাথে মিশে থাকা স্বাদ। যখন ভয় পাই, তখন মুখ শুকিয়ে যায়, লালা গাঢ় হয়, তার স্বাদ তিতা, জিভের ডগা শক্ত হয়ে যায়, স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতা লোপ পায়, সবকিছু স্বাদহীন মনে হয়, শুধু সেই তিক্ততা, যা আসলে ভয়ের স্বাদ। ভয়ের স্বাদ যুদ্ধ শুরুর আগে মুখে লেগে থাকত, তখন খাবারও সেই স্বাদ নিয়ে আসত, জলও সেই স্বাদ বহন করত। ভয় যেন এক ধরনের স্বাদ-রঙ, যা সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে, সব স্বাদকে এক করে দেয়—ভয়ের স্বাদে।
নবম স্তর: বিজয়ের স্বাদ। বিজয়ের স্বাদ কেমন? রক্তের স্বাদের মতো? না, তা নয়। বিজয়ের স্বাদ প্রথমে মিষ্টি, একটি উত্তেজনাপূর্ণ মিষ্টি, যেমন খুব মিষ্টি ফল যা জিভে ঝাঁঝালো অনুভূতি দেয়। তারপর সেই মিষ্টি ধীরে ধীরে তেতে যায়, কারণ বিজয়ের অর্থ মৃত্যু, ধ্বংস, আর সেই মৃত্যু ও ধ্বংসের স্বাদ তিতা, গলায় আটকে দেওয়ার মতো। বিজয়ের স্বাদ শেষ পর্যন্ত লবণের মতো, কারণ বিজয়ের পরেই আসে ক্লান্তি, ঘামের লবণাক্ততা, আর একটি গভীর শূন্যতা, যা স্বাদহীন, কিন্তু সেই স্বাদহীনতার স্বাদই সবচেয়ে তিক্ত, সবচেয়ে দুর্বোধ্য।
দশম স্তর: সারথির বাক্যের স্বাদ। যখন তিনি কথা বলেন, তাঁর কথার স্বাদ জিভে লাগে, কথাগুলো শুধু কানে যায় না, তারা স্বাদ নিয়ে আসে। তাঁর যুক্তির স্বাদ মাখনের মতো মসৃণ, মিষ্টি, কিন্তু সেই মিষ্টির মধ্যে লুকানো আছে এক ধরনের ধূর্ততা, একটি তিক্ত । যা বলে যে এই মিষ্টি দিয়ে ঢাকা কিছু কঠিন সত্য। তাঁর আদেশের স্বাদ লবণের মতো। তীক্ষ্ণ। স্পষ্ট। যা জিভে জ্বালা করে, কিন্তু সেই জ্বালায় একটি অসততা আছে, একটি নির্মম স্বচ্ছতা। তাঁর প্রশ্নের স্বাদ টকের মতো, যা জিভকে সংকুচিত করে, চিন্তাকে অসক্রিয় করে। তাঁর নিঃশব্দতার স্বাদ তেতো, একটি গভীর তিক্ততা যা সমস্ত স্বাদকে গ্রাস করে, সবকিছুকে তিক্ত করে তোলে। তাঁর উপস্থিতির স্বাদ একইসাথে সব স্বাদ—মিষ্টি, নোনতা, টক, তিতা, উমানি—একসাথে, একটি অসম্ভব মিশ্রণ যা জিভকে হতবাক করে, বুঝতে দেয় না, শুধু অনুভব করতে দেয়।
একাদশ স্তর: ধর্মের স্বাদ। ধর্মের স্বাদ কি? হয়তো তা নির্মল জলের স্বাদ, কিন্তু সেই জল কোথায়? ধর্মের স্বাদ অনেক সময় রক্তের স্বাদের সাথে মিশে গেছে, অনেক সময় মাখনের স্বাদের সাথে। ধর্মের স্বাদ যখন আদেশ হিসেবে আসে, তখন তা লবণের মতো, যখন প্রবঞ্চনা হিসেবে আসে, তখন তা মিষ্টির মতো, যখন সত্য হিসেবে আসে, তখন তা তেতোর মতো। ধর্মের স্বাদ মুখে দিতে গেলে গলায় আটকে যায়, কারণ তা গলাধঃকরণের জন্য নয়, চিবানোর জন্য নয়, ধর্মের স্বাদ শুধু জিভে রাখার জন্য, স্বাদ নেওয়ার জন্য, তারপর থুতু ফেলে দেওয়ার জন্য, কারণ তা পাকস্থলীতে সহ্য হবে না। ধর্মের স্বাদ এখন একটি দ্বিধার স্বাদ, একটি সন্দেহের স্বাদ যা জিভকে শক্ত করে, স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতা নষ্ট করে।
দ্বাদশ স্তর: মৃত্যুর স্বাদ। মৃত্যুর স্বাদ সরাসরি মুখে নেওয়া হয়নি, কিন্তু মৃত্যুকে ঘিরে থাকা সবকিছুর স্বাদ নেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর আগের শেষ নিঃশ্বাসের স্বাদ—একটু মিষ্টি, একটু তিতা, একটু ধাতব। মৃত্যুর পরের শ্মশানের ধোঁয়ার স্বাদ—ঝলসে যাওয়া, তিক্ত, যা গলার ভিতর জ্বালা করে। মৃত্যুর স্বাদ আসলে স্বাদহীনতা, একটি পরম শূন্যতা যা সমস্ত স্বাদকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়, জিভকে মৃত করে তোলে, স্বাদকোরকগুলোকে নিষ্প্রাণ করে। কিন্তু সেই স্বাদহীনতাই সবচেয়ে তীব্র স্বাদ, কারণ তা অন্যান্য সব স্বাদকে মনে করিয়ে দেয়, তাদের অনুপস্থিতিকে উপলব্ধি করায়।
ত্রয়োদশ স্তর: এই হাঁটার স্বাদ। হাঁটার কোনও স্বাদ আছে কি? হাঁটা যখন দীর্ঘ হয়, তখন মুখ শুকিয়ে আসে, সেই শুষ্কতার স্বাদ। পায়ের ঘামের স্বাদ? না, তা মুখে আসে না। কিন্তু হাঁটার মাধ্যমে যে সব অভিজ্ঞতা অর্জন করা হয়, তার সমষ্টিগত স্বাদ। এই হাঁটা তিক্ত, কারণ এটি ক্লান্তিকর, অনিশ্চিত, দীর্ঘ। এই হাঁটা মিষ্টি, কারণ এটি মুক্তির দিকে নিয়ে যায়, হয়ত। এই হাঁটা নোনতা, কারণ এতে ঘাম ঝরেছে, অশ্রু ফেলেছে। এই হাঁটা টক, কারণ এতে পচন ধরা স্মৃতি আছে, ব্যর্থতার স্বাদ আছে। এই হাঁটা উমানি, কারণ এতে গভীরতা আছে, একটি মাংসল বাস্তবতা আছে যা অস্বীকার করা যায় না। এই হাঁটার স্বাদ প্রতিদিন বদলে যায়, কখনো এক প্রাধান্য পায়, কখনো অন্য। কিন্তু স্বাদ যাই হোক, হাঁটা চলতে থাকে, স্বাদ পরিবর্তনশীল, কিন্তু হাঁটা স্থির, একগুঁয়ে, অনন্ত।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।