এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • তথ্যের আড়ালে রাজনীতির খেলা: কেন টার্গেট পশ্চিমবঙ্গ?

    SHANKAR BHATTACHARYA লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ১২০ বার পঠিত
  • বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি রিপোর্ট নিয়ে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৪১.৬% মহিলার বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়েছে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এই তথ্যের প্রকাশ এবং প্রচারের পেছনে যে সুগভীর রাজনৈতিক অভিসন্ধি ও তথ্যের কারচুপি রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

    ১. তথ্যের কারচুপি ও সময়ের প্রহসন

    কেন্দ্রীয় সরকার যে তথ্যের (NFHS-5) দোহাই দিচ্ছে, তা মূলত ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সংগৃহীত।

    লকডাউন এফেক্ট: করোনা মহামারীর সময় যখন স্কুল বন্ধ ছিল, তখন সারা ভারতেই বাল্যবিবাহের হার সাময়িকভাবে বেড়েছিল। সেই সময়কার ডেটাকে ২০২৬-এর উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।

    ভোটের প্রচার: নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের মতো প্রগতিশীল রাজ্যকে সামাজিক সূচকে পিছিয়ে দেখানো দিল্লির কৌশলী প্রচারের অংশ ছাড়া আর কিছু নয়।

    ২. আমদানিকৃত কুসংস্কার: পরিযায়ী জনসংখ্যা ও হিন্দি বলয়

    পশ্চিমবঙ্গের বাল্যবিবাহের হারের পেছনে একটি বড় কারণ হলো প্রতিবেশী রাজ্যগুলি থেকে আসা জনস্রোত।

    সাংস্কৃতিক দূষণ: উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ বা রাজস্থানের মতো রাজ্য থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিকরা যখন পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ী হন, তারা তাদের সঙ্গে করে বয়ে আনেন শতবর্ষ প্রাচীন কুসংস্কার ও জাতপাতের মানসিকতা।

    পরিসংখ্যানের বোঝা: এই পরিবারগুলোর মধ্যে লুকিয়ে হওয়া বাল্যবিবাহ যখন সরকারি রেকর্ডে ওঠে, তখন দায় পড়ে পশ্চিমবঙ্গের ঘাড়ে। অথচ এটি পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব সংস্কৃতি নয়, বরং পার্শ্ববর্তী ‘হিন্দি বলয়’ থেকে আমদানিকৃত পশ্চাৎপদতা।

    ৩. শিক্ষা ও সমাজ: পশ্চিমবঙ্গ বনাম তথাকথিত ‘বিমারু’ রাজ্য

    বাল্যবিবাহের সংখ্যার চেয়ে বড় মাপকাঠি হল — মেয়েরা স্কুলে কতটুকু নিরাপদ এবং সমাজ কতটা জাতপাতমুক্ত।

    জাতপাতহীন শিক্ষা: উত্তরপ্রদেশ বা রাজস্থানের স্কুলে আজও দলিত শিশুদের আলাদা বসানো বা অস্পৃশ্যতার খবর পাওয়া যায়। বিপরীতে, পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি স্কুলে হিন্দু-মুসলিম-দলিত নির্বিশেষে সকলে একই থালায় মিড-ডে মিল খায় এবং একই বেঞ্চে বসে পড়াশোনা করে। এটিই প্রকৃত উন্নয়ন।

    কন্যাশ্রী বিপ্লব: বাংলার প্রায় ৮০ লক্ষ মেয়ে আজ 'কন্যাশ্রী'র অন্তর্ভুক্ত। স্কুল ও কলেজে মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের সমান বা কোথাও কোথাও বেশি। যে রাজ্যে মেয়েরা এত বেশি সংখ্যায় উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে, সেখানে বাল্যবিবাহের তকমা দেওয়াটা এক ধরণের উপহাস।

    ৪. কেন পশ্চিমবঙ্গ প্রকৃত অর্থেই শ্রেষ্ঠ?

    কেন্দ্রীয় রিপোর্ট যা বলছে না, তা হলো সামাজিক সুরক্ষা।

    রূপশ্রী প্রকল্প: বিয়ের জন্য আর্থিক সাহায্য পেতে গেলে ১৮ বছর হওয়া বাধ্যতামূলক। এটি বাল্যবিবাহ রোধে পৃথিবীর অন্যতম সফল ‘লিগ্যাল ফিল্টার’।

    ড্রপ-আউট হ্রাস: কেন্দ্রীয় শিক্ষা দপ্তরের (UDISE+) রেকর্ড বলছে, পশ্চিমবঙ্গে স্কুলছুট হওয়ার হার হিন্দি বলয়ের চেয়ে অনেক কম।

    উপসংহার: লড়াইটা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে

    পশ্চিমবঙ্গের কিছু সীমান্তবর্তী জেলায় বাল্যবিবাহের হার বেশি হওয়ার কারণ মূলত ভৌগোলিক ও দারিদ্র্য, কিন্তু বিহার-ইউপি-র মতো ধর্মীয় গোঁড়ামি বা জাতপাত নয়। কেন্দ্রীয় সরকার যদি সত্যি বাল্যবিবাহ দূর করতে চাইত, তবে তারা হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর অস্পৃশ্যতা এবং মেয়েদের স্কুলছুট হওয়া নিয়ে আগে কথা বলত।

    বাংলার সামাজিক সম্মান কালিমালিপ্ত করার এই রাজনৈতিক প্রচেষ্টাকে রুখে দেওয়ার সময় এসেছে। তথ্য নয়, সত্যের বিচার হোক।

    প্রশ্ন —

    ১. তথ্যের আড়ালে রাজনীতির খেলা: কেন টার্গেট পশ্চিমবঙ্গ?
    ২. বাংলার উন্নয়ন বনাম দিল্লির পরিসংখ্যান: বাল্যবিবাহের আসল সত্যটা কী?
    ৩. কন্যাশ্রী বনাম কুসংস্কার: বাংলা কি সত্যিই পিছিয়ে, নাকি তথ্যের কারচুপি?
    ৪. হিন্দি বলয়ের আমদানি করা কুসংস্কারের দায় কেন নেবে পশ্চিমবঙ্গ?
    ৫. যেখানে স্কুলে জাতপাত নেই, সেখানে বাল্যবিবাহের তকমা কেন?

    কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক রিপোর্ট কি ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের 'টুলকিট'? যে রাজ্যে ৮০ লক্ষ মেয়ে কন্যাশ্রী নিয়ে স্বপ্ন দেখছে, সেখানে বাল্যবিবাহের হার দিয়ে কেন দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে? অথচ সত্য এটাই — হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলো থেকে আসা পরিযায়ী পরিবারগুলোর কুসংস্কার আজও বাংলার পরিসংখ্যানকে প্রভাবিত করছে। উত্তরপ্রদেশ-বিহারে যেখানে আজও স্কুলে অস্পৃশ্যতা চলে, সেখানে বাংলা ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত শিক্ষা দিচ্ছে। তথ্যের রাজনীতি রুখে দিন!
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে প্রতিক্রিয়া দিন