এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ডাউন মেমোরি লেন - দিলীপ রায়

    Rajat Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ৩৩ বার পঠিত
  • মনে পড়ছে ১৯৮২ সালে রিলিজ, শরৎ চন্দ্র রচিত প্রফুল্ল উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপ। যার প্রধান চরিত্র যোগেশ ঘোষ। সেই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দিলীপ রায়। অসাধারন বললেও কম বলা হবে। আশির দশকে তৈরি হওয়া ত্রিশ চল্লিশের দশকের গল্পের অসামান্য চিত্ররূপে দিলীপ রায় প্রাণ ঢালা অভিনয় করে বলা যায় মাত করে দিয়েছিলেন। 

    সেটে আলো পড়েছে। ক্যামেরার চোখ অস্থির। গল্প এগোচ্ছে, সংলাপ চলছে, আবেগের ঢেউ ধাক্কা খাচ্ছে। অথচ ফ্রেমের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি — যিনি দর্শককে কখনও চোখে চোখে না ছুঁয়ে মৃদু অথচ গভীর প্রভাব ফেলেছেন — নীরব। তার চোখে জীবনের বহু না-বলা কথা জমে আছে, হাসি লুকানো কষ্টের ছায়া। তিনি ছিলেন দিলীপ রায়, বাংলা চলচ্চিত্রের সেই নীরব নায়ক, যিনি কখনও কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও কেন্দ্রকে অর্থ দিয়েছেন।

    ১৯৩১ সালের ১৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে অধুনা বাংলাদেশে জন্ম নেন তিনি। দেশভাগের আগুন, শিকড় ছেঁড়া মানুষের কষ্ট, উদ্বাস্তু জীবনের ছায়া — সবই শৈশব থেকে তাঁর ভিতরে প্রবেশ করে। সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী কালে তাঁর অভিনয়ের গভীরতা গড়ে তোলে। তিনি ছিলেন সেই অভিনেতা, যিনি সংলাপের চেয়ে দৃষ্টিতে কথা বলতেন, যিনি নীরব থাকায় কথার বেশি অর্থ তৈরি করতে পারতেন।

    বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর পদচারণা ধীরে, নিঃশব্দে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে, যখন উত্তম-সুচিত্রার জোয়ার বাংলা সিনেমাকে প্লাবিত করেছে, তখনও দিলীপ রায় ছিলেন অন্যরকম এক শক্তির প্রতীক — সংযত, অন্তর্মুখী, চরিত্রনির্ভর অভিনয়ের এক নির্ভরযোগ্য মুখ। ক্ষুধিত পাষাণ, অপরিচিতা, দুই পুরুষ, আপনজন — এই সব ছবিতে তাঁর উপস্থিতি যেন গল্পের নীরব স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায়, দৃশ্যকে ভারী করে, আবেগকে আরও নিখুঁত করে তোলে। কিছু ছবিতে তিনি নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বলাই বাহুল্য খলনায়ক রূপেও তিনি ছিলেন অনবদ্য। তিনি পরিচালক বা প্রযোজককে বলতেন, চরিত্র ছোট হোক তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু সেই চরিত্রে যেন অভিনয় করার সুযোগ থাকে।

    তিনি কখনও নায়ক হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় অভিনয় করেন নি। বরং যে চরিত্রটি তিনি পেয়েছেন, তা জীবনের মতো করে বাঁচিয়েছেন। মধ্যবিত্ত পুরুষের দ্বিধা, সমাজের বন্দী মানুষদের অপরাধবোধ, নৈতিক সংকট — এইসব সূক্ষ্ম অনুভূতি তাঁর অভিনয়ে এমনভাবে ফুটে উঠত যে দর্শক অনায়াসে তা নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিত।

    কিন্তু তিনি শুধু অভিনেতা ছিলেন না। তাঁর ভেতরে ছিল এক অন্যতর বাসনা—নিজের চোখে গল্প বলা। সেই বাসনা তাঁকে পরিচালনায় নিয়ে যায়। ১৯৭৯ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর উপন্যাস অবলম্বনে দেবদাস পরিচালনা করেন তিনি। উত্তমকুমারের ছায়া তখনও চরিত্রটির উপর গভীর, কিন্তু দিলীপ রায় নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে দেবদাসকে দেখাতে চেয়েছিলেন — আরও ভাঙা, আরও নিঃসঙ্গ, আরও অন্তর্দহে পুড়ে যাওয়া এক মানুষ হিসেবে।

    এরপর আসে অমৃত কুম্ভের সন্ধানে, নীলকণ্ঠ, গরমিল। এই ছবিগুলিতে তিনি সমাজের ভেতরের ক্ষতকে খুঁজে দেখেছেন — নৈতিক ভাঙন, সম্পর্কের ক্লান্তি, আদর্শের সঙ্গে বাস্তবের সংঘর্ষ। তাঁর পরিচালনায় ছিল বাজারি চমকের অভাব, কিন্তু ছিল ধীর গতি ও গভীর প্রশ্ন, যা দেখলে দর্শক থমকে যায়, ভাবতে বাধ্য হয়। তিনি জনপ্রিয়তার চূড়ায় পৌঁছাননি, কিন্তু শিল্পের প্রতি সততা কখনও আপস করেননি।

    দিলীপ রায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো — তিনি সবসময় সম্মানিত ছিলেন, কিন্তু খুব কম সময়ই উদযাপিত। তিনি ছিলেন সেই নীরব শিলা, যাকে বাদ দিলে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যেত। সহ-অভিনেতা হিসেবে তিনি দৃশ্যকে ভারী করেছিলেন, পরিচালক হিসেবে সিনেমাকে চিন্তার খোরাক দিয়েছেন।

    ২০১০ সালের ২ সেপ্টেম্বর, ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। সেই বছরই মুক্তি পায় সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের অটোগ্রাফ — দিলীপ রায়ের শেষ অভিনীত ছবি। যেন জীবনের নিখুঁত সমাপ্তি — এক সদ্য আসা পরিচালকের গল্পে, এক সংবেদনশীল শিল্পীর বিদায়।

    আজ বাংলা সিনেমার ইতিহাস যখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে, বড় নামগুলো ঝলমল করে। কিন্তু আলোয় দাঁড়ানো সেই মানুষটিকে ভুলে গেলে চলবে না, যিনি আলোকে অর্থ দিয়েছিলেন ছায়া হয়ে। দিলীপ রায় ছিলেন সেই ছায়া — নীরব, গভীর, অপরিহার্য।

    তিনি প্রমাণ করেছেন, নায়ক হওয়া মানে সবসময় কেন্দ্রে থাকা নয়। কখনও কখনও — চুপচাপ দাঁড়িয়েও ইতিহাস লেখা যায়। কখনও কখনও — নীরবতার গভীরতা আলোকে ছাপিয়ে যায়। দিলীপ রায় সেই অমোঘ প্রমাণ, যে চলচ্চিত্রকে করেছে আরও মানবিক, আরও শ্বাসরুদ্ধ, আরও গভীর।

    _____________
    ©রজত দাস 
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে প্রতিক্রিয়া দিন