এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ফিলিস্তিনের কবিতা ঃ পর্ব ২ 

    A G লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ অক্টোবর ২০২৫ | ১৯৭ বার পঠিত
  • দ্বিতীয় পর্ব।
    নাজওয়ান দারবিশ
    প্রথম পর্বে দিয়েছিলাম মাহমুদ দারবিশ এর ‘কিততা’ কয়েকটি। কাজটা শুরু করেছিলাম গত জুন থেকে, আমার অক্ষম অনুবাদে ধরতে চাইছিলাম মাটি আর রক্তের ঘ্রাণ। আজ নাজওয়ান দারবিশ। জন্ম যাঁর ১৯৭৮ এ, মাহমুদ দারবিশ এর ঠিক ৩৭ বছর পর। মাহমুদ দারবিশের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক আছে ? এই প্রশ্নের উত্তরে নাজওয়ান বলেছিলেন, অবশ্যই আছে, মাটি আর রক্তের। ফিলিস্তিনের মাটি আর ফিলিস্তিনী দের রক্তের উত্তরাধিকার। কুড়িটি ভাষায় নাজওয়ান অনুদিত হয়েছেন, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হল নাজওয়ান, ফিলিস্তিনের মাটি আঁকড়ে আছেন।

    সবকটি কবিতাই আরবী হতে ইংরাজিতে রূপান্তর করেছেন করিম জেমস আবু-জাইদ। সেখান থেকে বর্তমান অনুবাদগুলি।

    (১) মেরি

    আমার মা, ইদানীং যীশুর কাহিনীতে মগ্ন হয়ে থাকেন।
    তাঁর বিছানা ঘিরে দখল নেয় আমার পাঠাগার থেকে নিয়ে আসা যত বই, উপন্যাস, গল্পগাথা, বিতর্ক ; লেখকরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে রত হয়। মাঝে মাঝে তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে ডেকে সেই দ্বন্দ্বের মীমাংসা করতে বলেন ( এই যেমন কিছুক্ষণ আগেই আমি ঐতিহাসিক কামাল সালিবি কে সাহায্য করলাম, যাঁর কপাল ফেটে গিয়েছিল ক্যাথলিক পাথরে। )

    যিশুর সন্ধানে রত আমার মা কে আমি হতাশ করতে পারিনা, তিনি এক নিমগ্ন পাঠক ঃ আমি তো প্রথম ইন্তিফাদায় শহীদ হইনি, দ্বিতীয় ইন্তিফাদাতেও নয়, এমনকি তৃতীয়তেও নয়। আর তোমাকে বলছি, আগামী কোনো ইন্তিফাদাতেও আমি শহীদ হব না, বুকে বোমা বেঁধে নিয়ে যদি কোনো সারস আসে আততায়ীর মত, তাহলেও নয়।

    মা যত পড়তে থাকেন, তাঁর কল্পনাগুলো আমাকে ক্রুশবিদ্ধ করতে থাকে… আমি তাঁকে বই আর পেরেকের যোগান দিতে থাকি।

    [ ইন্তিফাদা কথার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘ ঝাঁকুনি’ হলেও সমসাময়িক আরবী ভাষায় এর অর্থ স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান। ]



    (২) এই মাটি নিয়ে লিখতে চাই,

    সেই শব্দগুলো আমি খুঁজছি
    যারা এই মাটি আর জমি হয়ে উঠবে।
    কিন্তু, আমি রোমানদের খোদাই করা সেই প্রস্তরমূর্তি
    যাকে বিস্মৃত হয়েছিল আরবরা
    উপনিবেশের প্রভুরা যার হাত কেটে নিয়ে
    যাদুঘরে সাজিয়ে রেখেছিল,
    তবুও আমি লিখতে চাই
    এই ভূমিখণ্ডকে।
    আমার শব্দরা সবর্ত্রগামী
    নীরবতাই আমার কাহিনী।

    (৩) গোলাবর্ষণ থেমে গেছে

    আগামীকাল তোমাকে কেউ চিনবে না ;
    এখন গোলাবর্ষণ থেমেছে,
    তা আবার তোমার মধ্যে শুরু হবে
    বাড়িগুলো ভেঙ্গে পড়ছে আর পুড়ে যাচ্ছে দূরের দিগন্ত
    সেই আগুন এখন দৌড়ে বেড়াচ্ছে তোমার মধ্যে
    সেই আগুন; যা পাথরকেও গিলে ফেলতে পারে।

    নিহতেরা এখন ঘুমের অতলে,
    কিন্তু তোমার ঘুম আসছে না
    আসবেও না কোনদিন
    আসবেও না, যতক্ষণ না পাথরগুলো ধুলো হয়ে পড়ছে
    যে ধুলো আদতে অবসৃত ঈশ্বরের চোখের জল

    ক্ষমা নিহত , লুপ্ত;
    আর করুণার শরীর বেয়ে ঝরছে রক্তধারা
    তোমাকে আজও কেউ চেনেনা
    আগামীকালও চিনবে না কেউ
    তুমি সেই গাছ
    যা রোপিত হয়েছিল গোলার আঘাতে ধ্বস্ত ভূমিতে।

    (৪) কোনোরকমে শ্বাস

    দুঃখ আর কান্না উজিয়ে আসছে ঘরগুলো থেকে
    আর আমি এক প্রেতের মত তোমার পরিত্যক্ত বাড়িতে এসেছি
    আমার অন্তিম এখন আমার মুঠিতে ধরা,
    নিজের ধ্বংস কাঁধে নিয়ে নিদ্রাতুর হেঁটে যাচ্ছি
    এই এত এত শূন্যতা নিয়ে
    এত নৈশব্দ নিয়ে, হাঁটি
    আর পরিত্যক্ত বাড়িগুলো আমায় ঘিরতে থাকে
    পরিত্যক্ত বাতাস তোমার বাড়িগুলোতে
    আমি তাদের শূন্য হৃদয়ে, কোনরকমে শ্বাস নিচ্ছি।

    কোনো আরব
    অথবা কোনো পারস্যদেশের মানুষ
    অথবা বাইজেন্টায়িনের কেউ
    আমাকে কেউ বোঝেনা।
    আমার কি কোনো ইতিহাস ছিল না ?
    কী করে হারিয়ে গেল সেসব ?
    আর সেই কবিতাগুলো
    আর তোমরাও ;
    রেখে গেলে অগাধ শূন্যতা
    বুকের খাঁচা ছাড়া একটা গ্রহ
    তোমরা এই গ্রহটাকে চাপিয়ে দিলে আমার কাঁধে

    যদি বলি, আমি চিরতরে চলে যাচ্ছি
    তাহলেও কেউ বিদায় জানাতে আসবে না
    কেবল এক পরিত্যক্ত রু রু বাতাস
    যার কর্কশ কণ্ঠ আমার স্বরকে গ্রাস করে নেয়।

    (৫) এই অন্ধকার

    আমি যে অন্ধকারে থাকি, তার বিষয়ে কিছু কথা
    যার কঠিন পাথর থেকে আমার দিনগুলোকে খোদাই করি।
    আমি ওপরে উঠতেই থাকি
    যতক্ষণ না আমি নিজেই সেই অন্ধকার হয়ে যাই।

    (৬) একটা দীর্ঘ ক্ষত

    বসে আছো সময়ের হতভাগা একটা খাঁড়িতে
    যার কোথাও কোন আশা নেই, আভূমি প্রণত
    যেন ঈশ্বরের অন্তহীন মুখে এক দীর্ঘ ক্ষত।
    তুমি বসে আছো, তোমার পাশ দিয়ে ঝরে পড়ছে টুকরো টুকরো আশা
    এক উন্মাদ আগুনের মধ্যে
    যেমনভাবে দেশগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে
    একের পর এক,
    এক নির্মম আততায়ীর হাতে।

    অত্যাচারীরাও ঝরে যাচ্ছে,
    বদ্ধ জলাভূমির ওপরে
    বৃষ্টির ফোঁটার মত

    যখন ভেঙ্গে পড়ছে দেশ ও কাল
    তুমি শুয়ে আছো একটা সরু খাঁড়িতে
    ঈশ্বরের মুখে একটা ক্ষতচিহ্ন যেন।


    (৭) যেটুকু বাকি আছে আজ

    এক বেগুনী অন্ধকারকে অনুসরণ করা ছাড়া
    আমার হাতে আর কোনো কাজ নেই
    এই সেই মাটি
    যেখানে পুরাণকথায় ধরছে দীর্ঘ চিড়, ভাঙছে
    হ্যাঁ, ভালোবাসাও তাই
    যেমন আমার দেশের মুখ।

    আমার দেশ আমার মানুষ
    তারা এখন আমার ভিতরে এক প্রেতচ্ছায়া।

    (৮) ইস্তাম্বুলের ভূমিকম্প বিষয়ক কিছু কথা
    ( শেষ স্তবক )

    আমি আমার কাছের মানুষদের সাথে নিয়ে
    ধ্বংসস্তূপ সরাবো
    তাদের সাথে নিয়ে গড়ে তুলবো নতুন ঘর
    আমার ক্রোধ এখন স্তিমিত
    কারণ এই ধ্বংস ঘটিয়েছে সর্বংসহা ধরিত্রী
    ঔপনিবেশিক বিমানপোতগুলো
    যা নিয়ে আসে বেজন্মা বিমানচালকরা
    তারা বোমা ফেলে এটা ঘটায়নি।

    (৯ ) যেখানে রাখবে তোমার হাত

    প্রভুর সেই ক্রুশকাঠ কেউ খুঁজে পায়নি
    আর আমাদের ক্রুশকাঠ ?
    তুমি যাকে দেশ বলো
    তার যেখানে হাত রাখবে
    সেখানেই পাবে।

    এক হাত হতে আরেক হাতে
    এক অনন্ত হতে আরেক অনন্তে
    আমি সেই ক্রুশকাঠগুলো
    জড়ো করতে থাকি।

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • MP | 115.*.*.* | ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:০৭734736
  • স্মৃতি স্মৃতি শুধু স্মৃতি টুকুই ভরসা | এই কবিতাগুলো একটা ফেলে আসা সময়ের স্মৃতিটুকুই রেখে যায় | লেখককে ধন্যবাদ |
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে প্রতিক্রিয়া দিন