হাগিস
মৌসুমী ঘোষ দাস
বাথরুমের দরজা খুলে ঢুকতেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো সিদ্ধেশ্বরীর। যত রাতেই শোন না কেন, বেশ কয়েকবার বাথরুমে যেতেই হয় তাঁকে। দরজার পাশে হাগিসটা পড়ে আছে এখনো। কাল ওনাকে নিয়ে যাবার আগে লুঙ্গি পালটে সেই যে হাগিসটা খুলে রাখা হয়েছে আর ফেলা হয়ে ওঠেনি। কাল ঘর ভর্তি লোকের মধ্যে কারোই খেয়াল ছিল না হাগিসটা ফেলার কথা। দাহকার্য সেরে ওদের ফিরতে ফিরতে সেই রাত সাড়ে বারোটা। তারপর এটা ওটা সেরে শুতে শুতে রাত দেড়টা। সারাদিনের শ্রান্ত শরীর ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছিল।
বাথরুমে ঢুকে হাগিসটা দেখে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। শেষের দিকে বিছানাতেই সব সারতেন বলে হাগিস পরিয়ে রাখা হত। উনি কিছুতেই পরতে চাইতেন না। বারবার জেদ করতেন,- ‘হাগিস পরে শুতে বসতে অসুবিধে হয়, বোঝো না কেন’।
শরীর শুকিয়ে শীর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন। হয়তো তারমধ্যে ওই এক্সট্রা একটা বস্তু শরীরে ধারণ করতে কষ্ট হতো। কিন্তু সিদ্ধেশ্বরী জোর করেই পরাতেন সঙ্গে দুটো কড়া কথা শুনিয়ে “উঃ হাগিস পরবে না! বাঁদি আছে না! তিনি বিছানায় সব সারবেন আর আমি লুঙ্গি, বিছানার চাদর রোজ পাল্টাবো আর কাঁচবো! হাঁটু, কোমরে ব্যাথা নিয়ে চোদ্দবার ছাদে ঊঠে শুকোতে দেবো। এদিকে রোদ ওঠে না, শুকোতে চায় না। অত অত চাদর লুঙ্গি কোথায় পাবো? তাছাড়া আমারও বয়স বাড়ছে, কষ্ট হয়! স্বার্থপর লোক একটা, শুধু নিজের সুবিধেই দেখে”? এমন কথার প্রত্যুত্তর না দিয়ে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকতেন উনি।
হাগিসটা দেখে মনে পড়ে যাচ্ছে সেই করুণ চোখ দুটি! যেন হেসে হেসে বলছেন, ‘কি! আমি শুধুই স্বার্থপর ছিলাম? তোমার কষ্ট বুঝতাম না? এবার কেমন লাগছে মুক্তি পেয়ে?’ দুচোখের কোন দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো সিদ্ধেশ্বরীর।
ছাপ্পান্ন বছর একসাথে থেকেছেন দুজনে। কত সুখ-দুঃখের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বিয়ে হয়ে এসে দেখেছেন, মানুষটার তেজ ছিল খুব! যেভাবে বলবেন সেভাবেই চলতে হবে। তার অন্যথা ঘটুক- কিছুতেই পছন্দ করতেন না। এতটুকু স্বাধীনতা ছিল না। কিন্তু সবার খেয়াল রাখতেন। বাইরের সমস্ত কাজ পালনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির সদস্যদের খাওয়া, বিশ্রাম, পোশাক-পরিচ্ছদ, অসুখ-বিসুখ, অতিথি আপ্যায়ন ইত্যাদি ইত্যাদি -সবদিকে নজর ছিল একজন পুর্নাঙ্গ গৃহকর্তার মতো। কিন্তু আট বছর আগে বিছানায় পড়ার পর থেকে কেবল নিজের শরীরের নানা অসুবিধের কথাই ভাবতেন, আর বলতেন। সবাই কেমন ভুলে গেল যে এই মানুষটাই যখন সুস্থ ছিলেন, নিজের কথা না ভেবে পরিবারের কথাই কেবল ভেবে গেছেন!
ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন সিদ্ধেশ্বরী! কেমন একটা ভয় গ্রাস করেছে তাঁকে। এতদিন মানুষটা বিছানায় পড়েছিলেন, তাও তো ছিলেন। একটা শক্ত খুঁটির মতো জোর ছিল মনে। আজ আর কিছুই রইল না। সারাজীবন রান্না করা, ঘর গোছানো ছাড়া কোনো দায়দায়িত্ব নিতে হয় নি। আর আজ মনে হচ্ছে মাথায় যেন আকাশটা ভেঙ্গে পড়েছে। ঘরের ওপাশে মেঝেতে ছেলে, বৌমা, দুই নাতি ঘুমোচ্ছে। সিদ্ধেশ্বরী ভঙ্গুর হাঁটু কোমর নিয়ে মেঝেতে নিচু হয়ে বসতেই পারেন না, শোবেন কি? তাই ঘরের একপাশে তক্তপোষের ওপর একটা মাদুর বিছিয়ে শুয়েছেন। ফোঁপানোর শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল বৌমার। বিরক্ত হল, “আহ! মা কত রাতে শুয়েছি, সে খেয়াল আছে? একটু ঘুমোতে দিন”! গুটিয়ে গেলেন সিদ্ধেশ্বরী।
কত কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সরকারী চাকরি- মাপা বেতন। তাই দিয়েই সংসার সামলানো, কুটুম্বিতা, ছেলেকে লেখাপড়া শেখানো, ভবিষ্যৎ সঞ্চয়, আর এই একতলা বাড়িখানা। প্রাচুর্য না থাকলেও মোটা ভাত, মোটা কাপড়ে ভালোই চলে যেত। সিদ্ধেশ্বরীর চাহিদাও কম ছিল। কিন্তু একমাত্র ছেলে অভি হয়েছে ঠিক উল্টো। তার কেবল বড়ো বড়ো বাত। কেবলি বলবে, -“উঃ এটা কোন প্ল্যান হয়েছে? যা তা!! আমি হলে এই জায়গার মধ্যেই সুন্দর করে বাড়িটা করতাম। তারপর আস্তে আস্তে পাশের জায়গাটাও কিনে ফেলতাম ভবিষ্যতের জন্য। আজকাল ব্যাংকে কেউ টাকা রাখে? ফুঃ! এসব জমি টমি কিনে রাখে”। মুখে আরও কত বাত। সিদ্ধেশ্বরীর খুব রাগ হয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। পেটে এলেও মুখে কথা জোটে না। মিনমিন করে পাশ কাটান।
যদিও খুব বলতে ইচ্ছে করে, “তুই এ পর্যন্ত নিজের দমে কোন উল্লেখযোগ্য কাজটা করেছিস যে বাবার ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করিস? এখনো পর্যন্ত বেশির ভাগ কাজই বাবার জমানো টাকায় সারছিস অবিবেচকের মতো। একবারও ভাবিস না এই সঞ্চয় বাবার কষ্টার্জিত, শুধুমাত্র বৃদ্ধ বয়সের জন্য। সেই সঞ্চয় ভেঙে তুই একের পর এক নিজের শখ মেটাচ্ছিস”! মানুষটা বিছানায় পড়ার পর থেকে ব্যাঙ্কের সব কাজ অভিকেই সারতে হয়। মাঝে মাঝেই সিদ্ধেশ্বরীকে সই করতে হয় এ কাগজে সে কাগজে! অথচ উনি সুস্থ থাকাকালীন কোনোদিন বাইরের কোনো কাজ করতে হয়নি কাউকে। সব নিজেই সামলাতেন মানুষটা। এখন চোখে সর্ষে ফুল দেখছেন সিদ্ধেশ্বরী। উনি তো চলে গিয়ে বেঁচেছেন। কিন্তু তার কি হবে এখন?
ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। ঘুমও আসছে না আর। আস্তে আস্তে উঠে পড়লেন তক্তপোষ ছেড়ে। পূবের ঘরে জানলাটার সামনে এসে দাঁড়ালেন। পাশের শূন্য বিছানাটা যেন হা করে আছে। এই বিছানাতেই শুয়ে শুয়ে কেটেছে ওনার শেষের আটটি বছর। কী ফাঁকা লাগছে ঘরটা। সব ক্রিয়াকর্ম কেটে গেলে এই শূন্য বিছানাতেই একা শুতে হবে সিদ্ধেশ্বরীকে! ভাবলেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে!
আজ আর কোনো তাড়া নেই। কি আশ্চর্য! একটা মানুষের চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজকর্ম এতো কমে যায়! এখন যে কিভাবে সময় কাটবে সারাটা দিন -ভেবেই পান না সিদ্ধেশ্বরী। ‘এমন হাল্কা হতেই কি চাইতেন?’- মনে মনে ভাবলেন। আট বছর বিছানায় পড়ে থাকা একটা মানুষকে দেখভাল করা! চাট্টিখানি কথা! শেষের দিকে বিরক্তি এসে গিয়েছিল ঠিকই! কিন্তু কি করবেন? মানুষটা যে চোখের আড়াল হতে দিতেন না সিদ্ধেশ্বরীকে। সব সিদ্ধেশ্বরীকেই করতে হতো। শারীরিক অসহায়তা এলে বুঝি মানুষ এমনই করে আঁকড়ে ধরে কাছের মানুষকে! আট বছর কার্যত গৃহবন্দী জীবন কেটেছে সিদ্ধেশ্বরীর।
পুবের আকাশ হাল্কা লাল। দুচোখ ভরে দেখলেন। এভাবে বসে আকাশ দেখা তো দূরের কথা! কতদিন যে নিজের জন্য একটু সময় বের করতে পারেন নি! পাশের পেয়ারাগাছে পাখিদের কিচিমিচি চলছে। পাকা পেয়ারা খেতে খুব ভালবাসতেন, তাই পাশের একফালি জায়গাটায় এই পেয়ারা গাছটা লাগিয়েছিল অভি। বেশ পাকা পাকা পেয়ারা হতো, সেও আর শেষের দিকে খেতে পারতেন না। সব ইচ্ছেই যেন চলে গিয়েছিল!
আকাশটা লাল হয়ে আছে। শরতের ঝিরঝিরে হাওয়ায় একটা ঠাণ্ডা আমেজ লাগছে! আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে ধীরে ধীরে ছাদে উঠলেন। পাড়ার মণ্ডপটার দিকে চোখ চলে গেল! কেমন শ্রীহীন হয়ে পড়ে আছে। বাঁশের কাঠামোটা খুলে নেয় নি এখনো। অথচ কদিন আগেই কত জাঁকজমক ছিল! কত যত্ন, আয়োজন, কত সাজগোজ! মায়ের বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে সব কেমন শ্রীহীন! এটাই তো প্রকৃতির নিয়ম! প্রকৃতিতে সব কিছুই নিয়ম মেনে ঘটে চলে। সংসার বুঝি প্রকৃতিরই ক্ষুদ্র সংস্করণ। এই যে সংসারে, সবাই আছে সবার মতো। কিন্তু একটিমাত্র মানুষের না থাকায় এতখানি শূন্যতা, শ্রীহীনতা নিরাপত্তাহীনতা- কেবলমাত্র সিদ্ধেশ্বরীর জীবনেই নেমে এসেছে! অজান্তেই দুটো হাত বুকের কাছে জোড় হয়ে এলো, “অনেক মুখ ঝামটা দিয়েছি তোমায়! ক্ষমা করো। খুব একা হয়ে গেছি গো। জানি না, কিভাবে কাটবে বাকিটা পথ? খুব ভয় পাচ্ছি! আশীর্বাদ করো যেন আমাকে আর বেশিদিন এই সংসার-সমুদ্রে একা থাকতে না হয়। ততদিন যেখানেই আছো, ভালো থেকো তুমি”।
ছাদ থেকে নেমে এলেন। একটা কাজ এখুনি করতে হবে। আলনায় অব্যবহৃত হাগিসের প্যাকেটটা ঝুলছে। এই প্যাকেটের মাত্র দুটো হাগিস ব্যাবহার হয়েছে। তারপরই সব শেষ! বাকি গুলো আর কোনো কাজে লাগবে না। কি দাম একেকটা প্যাকেটের! মায়া করে লাভ নেই। মানুষটাই মায়া কাটিয়ে চলে গেছে! একটা বড় পলিপ্যাকে প্যাকেটটা ঢোকালেন, তারপর বাথরুমের কোণে পড়ে থাকা কালকের ব্যবহৃত হাগিসটা ঠেসে ঠুসে ভরে মুখটা বন্ধ করে সিঁড়ির পাশে রেখে দিলেন। ময়লা ফেলার ভ্যান আসবে একটু পড়ে, ফেলে দিতে হবে সব কিছু।