এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • ৩-ইডিয়টস - একটি আলোচনা

    অর্ণব রায় লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ১৩ মার্চ ২০১০ | ১১০০ বার পঠিত
  • ""মা! ম্যায় পাস হো গ্যায়া'' = ভালো ছেলে এবং ""খম্বে য্যায়সি খড়ি হ্যায়'' = খারাপ ছেলে। বলিউডের এই চিরাচরিত আঙ্গিক আমূল বদলে দিয়েছিল যে যুগান্তকারী চলচ্চিত্র, তার নাম "দিল চাহতা হ্যায়'। এই প্রথম হিন্দি সিনেমার পর্দায় দেখা গিয়েছিল সেই কলেজ পড়ুয়াদের যারা সত্যিকার কলেজের ছেলেমেয়েদের মতই কথা বলে বা পোষাক পড়ে। ফিল-গুড এই অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের গল্পটি ছুঁয়ে গিয়েছিলো সকলের মন, এবং অনেকের পছন্দের তালিকায় উপরের দিকে স্থান করে নিয়েছিল এই ছবি। সকলের মতো আমারও ভালো লেগেছিল চিরন্তন বলিউডি ঘরানা থেকে সরে আসা নতুন এই আঙ্গিক।

    কিন্তু কোথাও যেন আমি কিছুতেই নিজের সাথে মেলাতে পারিনি এই তিন বন্ধুকে, যারা মার্সিডিজ চালিয়ে গোয়া যায় উইক-এ¾ড এ, অত্যাধুনিক ডিস্কোয় কাটায় বিনিদ্র রজনী, অথবা মুখের কথায় চলে যায় অস্ট্রেলিয়ায় বাবার ব্যবসায় যোগ দিতে।

    মেলাতে না পারার কারণটা অন্য অনেকের মতই একান্ত ব্যক্তিগত।

    আমি বড় হয়েছি কলকাতায়, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে। পড়াশুনা যে কলেজে তাকে কো-এড বললে ভুল বলা হয়, এবং বন্ধুবান্ধব সকলেই আমারই মতন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। আমাদের কাছে আড্ডা মানে ছিল সিগারেটে সুখটান অথবা বড়জোর মনজিনিস এর প্যাস্ট্রি। এই পরিবেশে বড় হওয়ার পর সিড, সমীর বা আকাশ এর দুনিয়াটাকে খুব স্বাভাবিক ভাবেই মনে হয়েছিল ভিনগ্রহ। হয়ত এখনকার অনেক কলেজ পড়ুয়ার কাছে সেটাই বাস্তব। তবে আমার কাছে নয়।

    অবশেষে ৩-ইডিয়টস এ খুঁজে পেলাম নিজের কিছু অংশ।

    অংশ বললে ভুল বলা হয়, খুঁজে পেলাম অনেকটাই।

    এবং সেই কারণেই অনেক ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও ভাল লেগে গেল ছবিটি।

    এই প্রথম হিন্দি সিনেমায় ফুটে উঠেছে কলেজের সেই জীবন, যাতে কুল পোষাক, সুন্দরীদের ক্যাটওয়াক, অত্যাধুনিক গাড়ি বা নাচ-গান-পার্টি এর উপরে জায়গা করে নিয়েছে কঠোর বাস্তব। কলেজ মানে পড়াশোনার চাপ, ব্যর্থতার ভয়, পরিবার এবং কর্তৃপক্ষের জাঁতাকল। সর্বোপরি, কলেজ মানে "অন্যেরা তোমার কাছে কী চায়' এবং "তুমি নিজে কী হতে চাও' - এই দুই বিরোধী স্বত্বার এক নিরবিচ্ছিন্ন দ্বন্দ্ব। এ সেই দ্বন্দ্ব যা আমি অনুভব করেছি দীর্ঘ ৪ বছর, প্রতিদিন, কারণ এই সিনেমারই এক চরিত্রের মত আমারও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শুধুমাত্র নিরাপদ ভবিষ্যৎ এর লোভে, সখে নয়। ইচ্ছে ছিল লেখক হব, বা জার্নালিÙট, আর ঘটনাচক্রে হয়ে গেলাম ইঞ্জিনিয়ার।

    পর্দায় যখন এক চরিত্র নিজের অজান্তেই সর্বসমক্ষে পড়ে শোনায় তার বক্তৃতার রিমিক্স ভার্সান, তখন হলের অন্য দর্শকদের চেয়ে একটু বেশীই জোরে হেসে উঠি আমি। মনে পড়ে কলেজের সেই সব দিনের কথা যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক পার্টির আবেগপূর্ণ প্যামফ্লেটকে নিমেষে বানিয়ে ফেলতাম সারা ক্লাসের হাসির খোরাক, সামান্য কয়েকটি শব্দ বদলে দিয়ে।

    এই ছবিটির অসংখ্য মুহূর্ত এভাবেই মনে পড়িয়ে দেয় কলেজ এবং স্কুল জীবনের অবিস্মরণীয় স্মৃতি। আমার ক্ষেত্রে অবশ্য স্কুল ছিল কলেজের চেয়েও বিভীষিকাময়, কারণ সেখানে আমাদের মূল্যায়নের একমাত্র মাপকাঠি ছিল আমাদের প্রাপ্ত নম্বর।

    প্রতিযোগী-মনভাবাপন্ন "চতুর' বা ইঞ্জিনিয়ার-বাই-নেচার "র‌্যান্‌চো' (আমির খান) কে দেখে যেমন ভেসে ওঠে কোন কোন সহপাঠীর মুখ, তেমনই নিজের ছায়া দেখি "ফারহান্‌' (মাধবন) এবং "রাজ'¤ (শর্‌মন জোশী) দের মধ্যে। এক চরিত্রকে স্বীকার করতে শোনা যায় - বন্ধুর ফেল করার চেয়ে বেশী দু:খ হয় বন্ধু ফার্স্ট হলে। মুখ লুকিয়ে হাসতেই হয় একথা শুনে, কারণ এর চেয়ে সরল ও স্পষ্ট স্বীকারোক্তি শুনিনি বহুদিন।

    ৩-ইডিয়্‌টস এর সাফল্যের সিংহভাগ কৃতিত্ব দাবী করে রাজকুমার হিরাণীর অসাধারণ পরিচালনা এবং ছবিটির বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা। দর্শককে সর্বক্ষণ মজিয়ে রাখার মতো অসংখ্য কৌতুকপূর্ণ মুহূর্তে সাজানো এই চলচ্চিত্রটির কারিগরী নৈপুণ্য এবং ক্যামেরার কাজ সমানভাবে প্রশংসনীয়। অভিনয়ের মাপকাঠিতে মাধবন, শরমন জোশী ও আমির খান অবিশ্বাস্যভাবে সফল, এবং তার একটি প্রধান কারণ এই যে এদের দেখে আর কলেজপড়ুয়া বলে মনে হয়না। যদিও এই বিষয়ে আমার স্ত্রীর মত সম্পূর্ণ ভিন্ন - ""আমির খান-এর থেকেও কিউট কলেজপড়ুয়া? অসম্ভব!''

    এত প্রশংসা সত্ত্বেও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে ৩-ইডিয়টস একেবারে নিখুঁত নয়। প্রথমত, তিন বন্ধুর অসাধারণ কেমিস্ট্রির ছন্দপতন ঘটিয়েছে আমির-করিনার অনাবশ্যক প্রেমকাহিনী। যতবার পর্দায় দেখা দিয়েছেন করিনা, ততবারই যেন আরো বেশী করে মিস করেছি ত্রিমূর্তির উপস্থিতি। দ্বিতীয়ত, ছবিটিতে এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে পেটে সুড়সুড়ি দিয়ে হাসানোর প্রয়াস চোখে পড়ে। "চতুর-দ্য-সাইলেন্সর' এর কার্টুনিশ্‌ চরিত্রচিত্রণ বা বোমান ইরাণীর মুন্নাভাই-সুলভ একনায়কতন্ত্রী ইমেজে মাঝে মাঝে সেই সুড়সুড়িও মনে হয় জনি লিভার ঘরানার ভোঁতা আঙ্গুলের খোঁচা। এমন নয় যে এই চরিত্রগুলি অবাস্তব, কিন্তু কোন কোন সময় অতিরঞ্জিত অভিনয়ে এরা বিশ্বস্ততা হারিয়ে হয়ে উঠেছে ক্যারিকেচার।

    তবে এই সব দোষ নগণ্য হয়ে যায় যখন আমরা ৩-ইডিয়্‌টস এর মত একটি অনন্যসাধারণ সম্পূর্ণ ছবি উপহার পাই। মনে হয় এই তো চলচ্চিত্রকার এবং লেখকদের বহু-আকাঙ্খিত পরশপাথর, সেই ক্রিটিকল মাÙটারপিস, যা সোজা দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করে।

    **লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল http://greatbong.net/ এ। ইংরাজী থেকে বাংলায় লেখাটি অনুবাদ করেছেন সৌরভ সেনগুপ্ত।

    ১৩ই মার্চ, ২০১০
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ১৩ মার্চ ২০১০ | ১১০০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন